লতিফ সিদ্দিকী, রেহমান সোবহান ও কর্নেল অলির বক্তব্য

ক. ফ্রেডরিখ নিৎশের বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘বারবার নিজেকে সঠিক ঘোষণা করার জেদ ধরার চেয়ে ভুল স্বীকার করে নেয়া ভালো’। এ শিক্ষাটা আমরা কেউ কাজে লাগাই না। তার পরও জনগণের অনুভূতিকে মাঝে মধ্যে সবাই শ্রদ্ধা দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন, মেনে নিচ্ছেন নিৎশের বক্তব্য।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী রাজনীতিবিদ। তার বিলম্বিত বোধোদয় প্রশংসনীয়। তার কিছু হারিয়ে ও ঠেকে শেখার এই সদিচ্ছা সমর্থনযোগ্য। তাকে নিয়ে আগেও লিখেছিলাম। অনুরোধ করেছিলাম, বিনয়ের সাথে সত্য ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে। তার নতশিরে ক্ষমা চাওয়ার পর সংুব্ধ মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানানো দায়বোধ করলাম। এ লেখায় তার আবেগ উপস্থাপনের প্রয়াস সে কারণেই। একইভাবে প্রবীণ অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ও কর্নেল অলিকে সাক্ষ্য মানলাম ইতিহাস ও বর্তমান বোঝার তাগিদে। এতে আমাদের বোধোদয় ঘটতেও পারে।

যারা মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করানÑ তারা মতলববাজ। যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় ও বাড়াবাড়ি করেন, তারাও ধান্ধাবাজ। তবে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করা জরুরি ছিল; বিশেষ করে হজ সম্পর্কে। তাবলিগ সম্পর্কে তার মন্তব্য কতটা বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিনির্ভর ও শোভন; সেটা আলাদা বিষয়। একটি দল সম্পর্কে তার অভিমতের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি; কিন্তু তার অধিকারের সীমা অস্বীকার করতে পারি না।

অবশেষে দশম সংসদের সপ্তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ইতোমধ্যে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে। মাঝে কিছু অসঙ্গত বক্তব্য দিলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ দাবি করে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন। পবিত্র হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে আগেই সমালোচনার মুখে পড়ে দল ও মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন তিনি। বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকী তার মন্তব্যে যারা কষ্ট পেয়েছেন, তাদের কাছে নতশিরে মা চেয়ে সংসদ থেকে বিদায় নেন।

উল্লেখ্য, এভাবে কোনো এমপির পদত্যাগের এটাই প্রথম নজির বাংলাদেশে। সংবিধান ও নজিরে যাই থাকুক, তার ক্ষমা প্রার্থনা ও সাচ্চা মুসলমানিত্বের দাবিকে অবশ্যই সম্মান করব। এতে তিনি ছোট হননি; বরং যখন এক ধরনের অহমিকা ও দুর্বিনীত ভাব প্রকাশ করছিলেন, তাতেই ছোট ও নিন্দার পাত্র হয়ে যাচ্ছিলেন। সংসদে তাকে দেখে এমপিরা একে অপরের দিকে জিজ্ঞাসুর দৃষ্টিতে তাকান। কেউই তার পাশে যাননি। আগবাড়িয়ে কথা বলেননি। পয়েন্ট অব অর্ডারের সুযোগ নিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকী হজ নিয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন।

গত বছর নিউ ইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকী পবিত্র হজ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার পর সর্বত্র তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। সরকার বাধ্য হয় তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে। এরপর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম থেকেও তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। আরো পরে তার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করে দেয় দলটি। এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থান গ্রহণযোগ্য। জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ দেয়া যায়।

সংসদীয় বক্তব্যে সিদ্দিকী স্পষ্টভাবে বললেন, ‘এই দিনে কারো বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ, অভিমান, অভিযোগ আনছি না। দেশবাসী আমার আচরণে যদি কোনো দুঃখ পেয়ে থাকেন, নতমস্তকে তাদের কাছে মা চাচ্ছি।’ এরপর বলেন, ‘প্রথমে আমি বলে নিই, আমি মুসলমান, আমি বাঙালি, আমি আওয়ামী লীগার। এই পরিচয় মুছে দেয়ার মতো শক্তি পৃথিবীর কারো নেই। কারণ, এটা আমার চেতনা, আমার জীবনবেদ, প্রাণের রসদ, চলার সুনির্দিষ্ট পথ। আমি মানুষ বলেই আমার ভুলভ্রান্তি আছে, ত্রুটি আছে। কিন্তু মনুষ্যত্বের স্খলন নেই, মানবতার প্রতি বিশ্বাস হারাই না। যত বড় আঘাতই আসুক, ধৈর্যহারা হই না। আমি বিশ্বাস করি, আঁধার মানেই আলোর হাতছানি। রাষ্ট্র নিপীড়ন করলেও আমি ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে মেনে নিয়েই তা মোকাবেলা করলাম।’…

এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো। সিদ্দিকীর মুসলমান ও বাঙালি পরিচয় কেউ চ্যালেঞ্জ করবে না। তবে আমৃত্যু তিনি আওয়ামী লীগার থাকবেনÑ এটা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না; যদিও দল চাইলে আবার ফিরতে চাওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃপণ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লালন করতে পারবেন; কিন্তু তার দলীয় পরিচয় চিরস্থায়ী না ও হতে পারে।

সিদ্দিকী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করলেন, ‘আমি সাচ্চা মুসলমান। ধর্মীয় জীবন একান্তই আমার জীবন। এই জীবনধারণে জনবাহবা বা নিন্দা কোনোটাতেই আমি কুণ্ঠিত, বিব্রত ও ভীতসন্ত্রস্ত হই না। নিজের কাছে নিজে জবাবদিহি করেই সন্তুষ্ট। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার ধর্মকুঠুরির ভাবজগৎ নিয়ে সমষ্টিতে আলোড়ন আন্দোলন দেখা দিয়েছে। সমষ্টি আমাকে ত্যাজ্য করেছে। যেভাবেই ভাবা যাক, রাজনীতির সামষ্টিক কোনোক্রমেই ব্যষ্টির বা স্বতন্ত্র অবস্থান স্বীকার করে না। কারণ, রাজনীতি মানবকল্যাণের একটি প্রকৃষ্ট উপায়, কোনো বিচ্ছিন্ন উপায় নয়। অন্য দিকে ব্যক্তিজীবন একান্তই ব্যক্তির। এখানে সমষ্টির প্রবেশ নিষিদ্ধ। ব্যক্তি এখানে সব কিছু। আমাকে ষড়যন্ত্রকারী, প্রতিশোধপরায়ণ, ধর্মদ্রোহী গণদুশমন, শয়তানের রিপ্রেজেন্টেটিভÑ বিভিন্ন ঘৃণার পাত্র সাজাতে সবশেষে ধর্মকে প্রতিপ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি স্পষ্ট করে দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই, আমি ধর্মবিরোধী নই, আমি ধর্ম অনুরাগী, একনিষ্ঠ সাচ্চা মুসলমান। আমি বলতে সাহস পাই, ধর্মীয় অনুশাসন মানে যেসব করন্তকাজ ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী গোষ্ঠী স্বীয়স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর, তাদের বিরুদ্ধে শান্তির ধর্ম, ন্যায়ের ধর্ম, সত্যের ধর্ম অন্ধকার থেকে আলোর দিশা ধর্ম ইসলামের সঠিক তাৎপর্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে অম্লান থাকবে আমার পথচলা …।’

‘… আমি মনে করি হজ প্রতিপালন ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে অন্যতম ফরজ। এ ফরজ পালনেও আরো কতগুলো অবশ্যপালনীয় ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালন মাত্র একবারই করার কথা, যা নিজেও করেছি। ওয়াজিব-সুন্নত পরিহার করে অবশ্যপালনীয় ফরজ তরক করে যারা এ ফরজটি পালনে প্রতি বছর ব্যস্ত, তাদের মানসিকতা আর আমার বিবেচনা ভিন্ন। হজ যে একটি বিরাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তা কিন্তু মানতে না চাইলে মিথ্যা হয়ে যায় না। রোজার মাসটি আমার প্রাত্যহিক জীবনের অবশ্যপালনীয় মাস। আমি এই ধর্মীয় আচারটি পালন করি। মহানবী সা: আল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধি, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। শূন্য থেকে একক প্রচেষ্টায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনে দ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক। আমার চলার পথের আলোকবর্তিকা। আদর, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মানে নিজের বুকে আগলে আবদুল্লাহপুত্র মোহাম্মদ বলে আদর প্রকাশে কুণ্ঠিত, ভীত বা শঙ্কিত নই। এই দুর্লভ মানবজীবন, সামনে মহানবীর আদর্শিক জীবন চলার নির্দেশনা থাকার পরও কি সুন্দরের আরাধনা মনে জাগবে না?’

এখানে আমাদের বক্তব্য হচ্ছেÑ নবীজীবনকে সামগ্রিক ভেবে আবার খণ্ডিত করে দেখলে বিশ্বাসে চিড় ধরে। এটা নবীকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বানিয়ে দেয়ার মতোই অজ্ঞতা। সব কিছু মানতে না পারা নিজের সীমাবদ্ধতা। ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অবয়বের কমতি নেই। ইসলামে কোনো খণ্ডিত জীবনাচার চলে না। অর্ধেক মেনে অর্ধেক ছাড় দিয়ে ইসলাম হয় না। যেমনÑ বিশ্বাসের কোনো খণ্ডিত রূপ নেই। এরপর তাবলিগ সম্পর্কে তার বক্তব্য হচ্ছে, ‘যতবার বলতে বলা হবে ততবার বলব, তাবলিগ প্রচারকারীরা যদি ধর্মপ্রচারের সাথে সমাজ-রাষ্ট্র চেতনাবৃত্তির দিকে মনোযোগী হতেন, তাহলে তাবলিগের যে প্রভাব আমাদের সমাজ-জীবনে প্রতিফলিত, তা আরো ফলবতী হতো, কার্যকর ভূমিকা রাখত। নবী সা: কখনো জীবনকে অস্বীকার করে ধর্ম পালন করতে বলেননি। জীবনের জন্য ধর্ম অপরিহার্য। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে বিদায় হজের ভাষণে নিষেধ করে গেছেন। যারা অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিকতার কথা প্রচার করেও ধর্মানুগ নীতি নিয়ে শোরগোল তোলেন, তাদের বিষয়ে নীরব থাকাই সমীচীন মনে করি। … আজকে আমার সমাপ্তি দিন। এই দিনে কারো বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ অভিমান অভিযোগ আনছি না।’

এখানে এসে তিনি স্ববিরোধী হয়ে গেলেন, তাবলিগের সীমাবদ্ধতা বুঝলেন, নিজের ও দলের সীমাবদ্ধতা আমলে নিলেন না। তার পরও বলব, লতিফ সিদ্দিকী আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যেভাবেই সত্যটা প্রকাশ করতে চান না কেন, তাতে বৈপরীত্য ঠাঁই না পাওয়াই সঙ্গত। কিছু স্ববিরোধিতা নিয়েও তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। আশা করি যারা সংুব্ধ হয়েছিলেন, তারা আর কোনো অস্বস্তিবোধ করবেন না। লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুর এখানেই যবনিকা টেনে সবার উচিত তার জন্য দোয়া করা।

খ. অধ্যাপক রেহমান সোবহান ধীমান ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট রচনায় তার ভূমিকা ব্যতিক্রমী ও উল্লেখযোগ্য। ২৯ আগস্ট শনিবার তার নতুন বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়ে গেল। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ রেহমান বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাধারণ মানুষের রক্তের ঋণ শোধ করতে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বগুণে সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। আর তা সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে।’ আলোচ্য বইয়ের নাম ‘ফ্রম টু ইকোনমিক্স টু টু নেশনস : মাই জার্নি টু বাংলাদেশ’ অর্থাৎ ‘দুই অর্থনীতি থেকে দুই দেশ : বাংলাদেশের দিকে আমার অভিযাত্রা’। এটি মূলত রেহমান সোবহানের ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত লেখার সঙ্কলন। পাকিস্তান শাসনামলে নিজের লেখার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রেহমান সোবহান বললেন, ‘ওই সব দিনে ফিরে গেলে এটা ভাবি, কীভাবে এসব কথা সেদিন বলতাম। এসব কথা বলার সময় ডান-বাম চিন্তা করতাম না। এসব বলতে পারতাম, কারণ এগুলো ছিল মনের কথা।’ রেহমান সোবহান আরো বললেন, ‘কিন্তু এখন কোনো লেখা লিখতে গেলে এটি প্রকাশের আগে এক সপ্তাহ লেগে যায় এবং পাঁচবার পড়ে মত দেন রওনক (তার স্ত্রী)। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্য সবার মতো আমাকে আজকাল প্রতিটি শব্দ নিয়ে ভাবতে হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পাকিস্তানের সামরিক শাসনামলে আমরা টেবিলে বসেই দুই ঘণ্টায় যেকোনো কিছু লিখতে পারতাম।’

একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে রেহমান সোবহানের মতো প্রজ্ঞাবান মানুষকে আজকের দুঃসময় ও পরিস্থিতির বাস্তবতা বোঝানোর স্বার্থে সাক্ষী মানলামÑ এ জন্য যে, তিনি শুধু তার বক্তব্যে এই সময়ের সাহসী মানুষ হয়ে ওঠেননি, আজকের বাস্তবতাকে সংযত কিন্তু ঋজু ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। আমরা তার বক্তব্য আমলে নিয়েছি। এইচ এম এরশাদও এই সময়টিকে অন্ধকার সময় বলে অভিহিত করেছেন। আমরা তা আমলে নিইনি, কারণ তিনি তার দায় ভুলে থাকছেন। শাসকদের বিবেচনাবোধ একেবারে ভোঁতা না হয়ে গেলে তারাও আত্মসমালোচনার সুযোগ নিতে পারেন।

ফরমায়েশি ও মতলববাজির জরিপ নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকলে গণবিচ্ছিন্ন হতে হতে একসময় দেখা যাবেÑ আশপাশে কেউ নেই। কঠিন দুঃসময় ঘিরে ধরেছে। রেহমান সোবহানরা সত্য উচ্চারণের জন্য নন্দিত হয়ে উঠলেন।

গ. কর্নেল অব: অলি আহমদ প্রথম সারির একজন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি, যুদ্ধ শুরুর হুইসেলবাদকদের একজন। বর্তমানে এলডিপির চেয়ারম্যান। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা। ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি বললেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর জাসদের প্ররোচনায় সামরিক বাহিনীতে ১৯ বার অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হয়েছে এবং আমরা সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছি। এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল, সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়া।’ জাতীয় প্রেস কাবে অনুষ্ঠিত এ সভায় সাংবাদিকদের রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি সত্যকে সত্য বলার এবং মিথ্যাকে পরিহার করে জনগণের পক্ষে কলম ধরার আহ্বানও জানালেন।

এখানে কর্নেল অলিকে সাক্ষী মানলাম শুধু জাসদ-আওয়ামী লীগ কুতর্ক-বিতর্কের জন্য নয়; একটি ক্রান্তিকালের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার অবস্থানের জন্য। আজকের জাসদ বোঝার জন্য। সেদিনকার ঘটনাপ্রবাহ জানার জন্য। এ ধরনের সাক্ষীরা বেশি দিন বেঁচে থাকবেন না। অনেক অদেখা ঘটনার সাক্ষী খন্দকার মোশতাককে কবর থেকে তুলেও আর কিছু জানা যাবে না। কর্নেল ওসমানী তো ইতোমধ্যে স্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন। আমাদের ইতিহাস জানার প্রয়োজনে নায়কদের ভূমিকা যেমন সামনে আনতে হবে, তেমনি খলনায়কদেরও। সেখানে আমরা একরোখা থাকলে কিংবা চোখ বন্ধ করে রাখলে প্রলয় ঠেকে থাকবে না।

জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট। মুক্তিযুদ্ধোত্তর তারুণ্যের স্বপ্নভঙের দ্রোহের পুরোটাই ধারণ করেছিল জাসদ। আজ জাসদ কাচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে রয়েছে। নেতৃত্ব স্খলিত। যে জাসদ বঙ্গবন্ধুর ‘ভুলের’ রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, সেই জাসদ বক্তব্য নিয়ে আজ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায় না কেন? হঠকারিতাগুলো স্বীকার করা উচিত। অর্জনগুলো সামনে এনে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করা প্রয়োজন। কর্নেল অলির বক্তব্য কোনো জাসদ নেতা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেননি। কারণ, তারা সুবিধাভোগী রাজনীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিতপালিত হচ্ছেন। এটাই কি তাহলে জাসদের শেষ নিয়তি? নিৎশের উক্তিটি সম্পর্কে আর মন্তব্য নয়। সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, জেদ ধরলে কেদ বাড়বে। পাপের বোঝা অধিকতর ভারী হবে। জনগণের কাছে মাথা নত করতে হবে। সেটা এখনই নয় কেন?

You Might Also Like