প্রধান বিচারপতির কাছে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর চিঠি

প্রধান বিচারপতির একটি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জবাবি চিঠি দিয়েছেন আপিল বিভাগের বিদায়ী বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
মঙ্গলবার পাঠানো চিঠিতে তিনি লিখেছেন: “আপনার নির্দেশনায় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ২৫ আগস্ট যে মেমো পাঠিয়েছেন তাতে আমি বিস্মিত এবং হতবাক।”
কারণ ব্যাখ্যা করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী লিখেছেন: “ওই মেমোতে রেজিস্ট্রার জেনারেল জানিয়েছেন, তিনি আপনার (প্রধান বিচারপতি) দ্বারা এই মর্মে আদিষ্ট হয়েছেন যে আমি সকল রায় লেখা শেষ না করা পর্যন্ত যেনো আমার পেনশন সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা না হয়। বিষয়টি নিয়ে আমার কষ্টের কারণ ব্যাখ্যা করার আগে আমি জানাতে চাই যে হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়া আমার কোনো রায় অপেক্ষমান নেই।”
আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর শেষদিনের মতো আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী এর আগে হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালন করে ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ আপিল বিভাগে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন: সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতির পেনশন তার কাজ শেষ করার ওপর নির্ভর করে বলে কোনো আইনি উপাদানের কথা যেমন আমার জানা নেই, তেমনই এটাও আমার জানা নেই যে রায় লেখা শেষ না করলে কোনো সহকর্মী বিচারপতির পেনশন আটকে রাখার জন্য প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিতে পারেন।
এক্ষেত্রে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী কিছু আইনি বিষয় এবং তথ্য উল্লেখ করেন: ক. কোনো বিদায়ী বিচারপতির পেনশনের সঙ্গে তার রায় লেখা শেষ না করার বিষয়টি মাননীয় প্রধান বিচারপতি যুক্ত করতে পারেন না। শর্তপূরণের একমাত্র বিষয় হলো বিদায়ী বিচারপতির অবসরগ্রহণ।
খ. কোনো বিচারপতিকে রায় লেখা শেষ করতে মাননীয় প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিতে পারেন এরকম কোনো আইন, চর্চা বা উদাহরণ নেই।
গ. বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোনো বিভাগের একজন বিচারপতি যখন অবসরে যান তখন তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ণাঙ্গ রায়ের লিখিত রূপ অপেক্ষমান থাকে। কারণ, কর্মজীবনের শেষদিনও একজন বিচারপতি রায় দেন এবং সেই পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে সময় লাগে। এ কারণে কোনো বিচারকের পক্ষেই সকল রায় লেখা শেষ করে অবসরে যাওয়া সম্ভব নয়। কোনো দেশেই এটা সম্ভব হয়নি।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী তার চিঠিতে লিখেছেন, মাননীয় প্রধান বিচারপতিরও পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে কয়েক মাস সময় লেগে যায় এবং আপনিও অবসরে যাওয়ার সময় পূর্ণাঙ্গ রায় অপেক্ষমান থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক। শুধু বাংলাদেশ নয়, সব দেশের জন্যই এটা স্বাভাবিক বিষয় কারণ রাতারাতি রায় লেখা সম্ভব নয়।
কারণ হিসেবে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী লিখেছেন:
১. আদালতের সময়ের বাইরে রায় লেখা হয়। সাধারণত: সপ্তাহান্তে বা অবকাশের সময় লেখা হয় রায়।
২. অনেক রায়ের জন্য গভীর গবেষণা করতে হয়।
৩. অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে শত শত পৃষ্ঠার রায় লিখতে হয় (যেমন যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়)।
রায় লেখার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ যা একজন বিচারপতির ক্ষেত্রে অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী। যাদুর বাতি দিয়ে রায় লেখা সম্ভব নয়। এমনকি উন্নত দেশ যেখানে ডিক্টাফোন এবং সাবমিশন রেকর্ডিং সিস্টেম আছে এবং বিচারপতিরা গবেষণাকর্মে সহায়তা পান সেসব দেশেও এটা স্বাভাবিক বিষয়।
তিনি লিখেছেন: অতীতের সকল বিচারপতির ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে এবং এমন কোনো উদাহরণ নেই যেখানে মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশে কোনো বিচারপতির অবসরকালীন ভাতার বিষয়টি রায় লেখা শেষ করার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কোনো বিচারপতির পক্ষেই সব রায় লেখা শেষ করে অবসরে যাওয়া সম্ভব না উল্লেখ করে তিনি কিছু উদাহরণ দিয়েছেন:
১. সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০১১ সালের ১৭ মে অবসরে যান এবং সব রায় লেখা শেষ করতে তার দুই বছর সময় লাগে। কিন্তু তার অবসরকালীন ভাতার বিষয়টি কোথাও আটকে যায়নি।
২. সাবেক প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জুল ইসলাম ২০১০ সালের ৭ ফেব্র“য়ারি অবসরে যান। মাত্র দুইমাস আগে তিনি সব রায় লেখা শেষ করেছেন। কিন্তু তার পেনশন প্রক্রিয়া কোনো সমস্যায় পড়েনি।
৩. সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হুসেইন ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি অবসরে গেছেন। এখনো তিনি রায় লিখছেন। কিন্তু তার অবসরকালীন ভাতা বাধাগ্রস্ত হয়নি।
৪. বিচারপতি শামসুল হুদা তার অবসরের অনেক মাস পর রায় লেখা শেষ করেছেন। তার পেনশন নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।
৫. বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ অবসরের বেশ কয়েক মাস পর সব কাজ শেষ করতে পারেন। তার পেনশন প্রক্রিয়া কোথাও আটকে যায়নি।
৬. বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক, বিচারপতি মো. খন্দকার মুসা খালেদসহ অন্যরা কাজ শেষ করতে অনেক মাস সময় নিয়েছেন। কিন্ত কারো ক্ষেত্রেই পেনশন সুবিধা পিছিয়ে দেওয়া হয়নি।
‘আমি বুঝতে পারছি না যে একা আমি কেনো বৈষম্য এবং পক্ষপাতিত্ব বিরোধী আইনের লংঘনের শিকার হলাম। এটা স্বীকৃত সত্য যে অবসরে যাওয়া বিচারপতিগণ অবসরে যাওয়ার পরও যাতে রায় লেখা চালিয়ে যেতে পারেন এজন্য তাদেরকে অফিস, কম্পিউটার এবং সহযোগীও দেওয়া হয়,’ বলে উল্লেখ করেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।
তিনি প্রধান বিচারপতিকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তা না হলে তাকে তার আইনগত অধিকার চর্চা করতে হবে।
বিচারপতিদের বেতন সুপ্রিম কোর্ট দেন না, বরং নির্বাহী বিভাগ থেকে বেতন-ভাতা হয় উল্লেখ করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী চিঠিটির কপি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোর কথা জানান।
আজ বা আগামীকাল সুপ্রিম কোর্টের দুই বিভাগের সকল বিচারপতির কাছেও চিঠির কপি পাঠানোর কথা জানান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

You Might Also Like