জাতীয় ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান খালেদার: ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন,ভয়ের কিছু নেই’

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে তিনি সরকারকে ‘ভয়ের কিছু নেই’ বলে আশ্বস্ত করে ‘জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি’ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দলের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি জাতীয় ঐক্যের এ আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি ও আওয়ামী লীগকেই গ্রহণ করে নিয়েছে। এ দুই দল ঘুরে-ফিরে ক্ষমতায় আসবে। দেশে যে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তারা তেমনভাবে মানুষের কাছে যেতে পারছে না। তাই ভয় কিসের। আপনাদের অভয় দিচ্ছি যে আচরণ আমাদের সঙ্গে করেছেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে তেমন আচরণ করব না।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, কর্মসূচি পালন করতে দিতে এত ভয় কেন? কারণ তারা খুন গুম করেছে। তারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে এর কি জবাব দেবে; তাই ভয় পাচ্ছে। অনেক পরিবার এখনও হারানো স্বজনদের পথ চেয়ে বসে আছে। গুম হওয়া পরিবারের স্বজনরা একদিন না একদিন বিচার পাবে।
খালেদ জিয়া বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। মানবাধিকার নেই, আইনের শাসন নেই, বাক স্বাধীনতা নেই। তাদের ভাষা এত নোংরা, এত কুৎসিত ভাষায় এরা কথা বলে, যেটার জবাব দিতেও লজ্জা লাগে।
তিনি বলেন, সরকার বাংলাদেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। পুলিশ দিয়ে কখনও দেশ চালানো যায় না। এভাবে গণতন্ত্র কায়েম হয় না। এতে পুলিশের অত্যাচার জুলুম অনেকগুন বেড়ে যায়। পুলিশ চরিত্র নষ্ট করে ফেলে। পুলিশ বলে আমরা নিজেরাই এই সরকারকে টিকিয়ে রেখেছি। আমরা গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আওয়ামী লীগ সরে গেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসও করে না। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের দল বিএনপি। জিয়াউর রহমানের দল মুক্তিযোদ্ধাদের দল।
জিয়াউর রহমান উন্নয়নের রাজনীতি করতেন দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, জিয়া পায়ে হেঁটে হেঁটে সারাদেশ ঘুরেছেন। এরকম নজির কম পাওয়া যাবে। গ্রামের উন্নয়ন শুরু হয়েছে জিয়াউর রহমানের সময় থেকে। পল্লীবিদ্যুৎ শুরু করেন জিয়া। কৃষক ও শিল্পের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই তিনি এমন করেছেন।
জিয়াউর রহমান ফারাক্কার পানি বেশি এনেছেন। নিজেদের প্রাপ্যটা এনেছেন। আজ সব নদীর উজানে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এরকম করলে দেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। প্রতিবেশী হিসেবে ন্যায্য প্রাপ্যটা পাওয়া উচিত। অথচ অনির্বাচিত স্বঘোষিত সরকার সব কিছু দিয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা কিছুই পাইনি। যা চেয়েছে তাই দিয়েছে। তারপরও বলবো আমরা দেশের শান্তি উন্নয়ন চাই। প্রতিটি মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা চাই। কিন্তু দেশে আজ মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর কোন গ্যারান্টি নেই। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই।
তিনি বলেন, অন্যায় অপকর্মের কারণে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে আজ পর্যন্ত কোন শাস্তি দেওয়া হয়নি। সরকার ছাত্রলীগ-যুবলীগকে মানুষ পেটানোর ও মারার জন্য লাইসেন্স দিয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিশোধ প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিতে হবে। প্রতিশোধের রাজনীতি বিএনপি কখনও করেনি, করবে না। আমরা করবো ঐক্য উন্নয়নের রাজনীতি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবো। কোন বিচারককে বলবো না অমুককে ধরে শাস্তি দেন, জেল দেন।
বিএনপির ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, এখন কোন আইন নিয়ম কিছুই নেই। আগে বিচারকরা তাদের পেশাকে সম্মান করতেন। কিন্তু বর্তমানে সরকারের সঙ্গে আসা যাওয়া চলছে। অমুক দাওয়াত তমুক দাওয়াতেও অংশ নিচ্ছেন। বিচারপতি পাবলিকলি পলিটিক্যাল বক্তব্য দিচ্ছেন। এটা কত বড় অপরাধ, এগুলো আমরা হতে দিব না। সত্যিকারের স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করবো। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবো। অফিসারকে নির্ভয়ে কাজ করার সুযোগ দেব। কোন দল দেখা হবে না। দক্ষতা যোগ্যতা দেখে প্রমোশন হবে। সেখানে দেখা হবে না, কে বিএনপি, কে আওয়ামী লীগ, কে জামায়াত ও কে জাতীয় পার্টি।
তিনি বলেন, আমরা অতীতের মতো শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেব। কারণ প্রতিটি ছেলে মেয়েকে শিক্ষিত করতে হবে। অথচ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সরকারের টাকার অভাব দেখা দিয়েছে। চুরি করার কারণে টাকার অভাব দেখা দিয়েছে। ভ্যাট বাতিল করতে হবে। এটা আমরা মেনে নেব না।
খালেদা বলেন, দেশে বিপুল অংকের চাল আমদানী করা হচ্ছে। আমি আমদানীর বিরোধী নই। প্রয়োজনে দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাল আমদানী করতে হবে। কিন্তু তার আগে দেশের কৃষককে বাঁচাতে তাদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে ধান ক্রয় করতে হবে। বিদেশ থেকে আমদানি কমাতে হবে।
আওয়ামী লীগ দেশের পাটশিল্প ধ্বংস করেছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, পাটশিল্প একসময় আমাদের গৌরব ছিল। পাট ছিল সোনালি আঁশ। কিন্তু আজ বহু মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকারত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। কুইক রেন্টালের মাধ্যমে টাকা চুরি করে পকেটে নেওয়ায় বিদ্যুত গ্যাসের মূল্য আবার বাড়িয়েছে। বিদ্যুত-গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজীবনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাদের প্রভাব পড়বে না। কারণ তাদের তো সব ফ্রি।
তিনি আরও বলেন, বাজারে ৫০ টাকার নিচে কোন সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। হাসিনা কথা দিয়েছিল ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবে। কিন্তু এক দিনের জন্যও আমরা তা দেখিনি। এখন আছে ঘরে ঘরে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ নেই। কৃষকদের বিনামূল্যে সার দেওয়ার কথা ছিল। সব হিসেব আমাদের কাছে আছে। আজ ঘরে ঘরে চাকরির বদলে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ হলে চাকরি পাবে বিএনপি হলে ডিএনএ পরীক্ষা করে বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এখন সময় হয়েছে সজাগ হওয়ার। দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই। জেল থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের মুক্তি দিন। অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করুন। জামিন আটকিয়ে রাখবেন না। আইনকে নিজস্বভাবে চলতে দিন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদল সভাপতি রাজিবকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার চরিত্রহনন করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে এটা প্রচার করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে দেশের সব তরুণরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে।
তিনি তার দলের নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যের একটি অংশের বিরোধীতা করে বলেন, বাংলাদেশে কোন জঙ্গি নাই। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে দেওয়া হবে না। আমাদের সমাজ ঐক্যবদ্ধ। সেখানে জঙ্গিদের কোন জায়গা হবে না। আমরা আওয়ামী লীগের মত ধর্মনিরপেক্ষ নই। আমরা সব ধর্মের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। সবার ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন আচরণ করছে। সরকার মুসলমান হলে জঙ্গি বানায়। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখল করছে। তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা কোথায়? আজকে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও নানাভাবে হয়রানি করছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রয়োজন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। তার জন্য প্রয়োজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। নাম যাই হউক নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে কি নির্বাচন হয়, তা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখেছি।
অথর্ব নির্বাচন কমিশনকে বাতিল করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। আমার কোন লোক দিতে হবে তা বলছি না।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা ভালোর পক্ষে। ভারতে নির্বাচন হয়। সেখানে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ। পুলিশ নিরপেক্ষ। প্রশাসন নিরপেক্ষ। ব্রিটেনেও দেখেছি সেখানে সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন হয়। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা পরিবর্তনের আশায় বসে আছে। পরিবর্তন আসবে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে।
খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্রি. জে.(অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন বিএনপির মুখপাত্র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন।

You Might Also Like