আইনের ক, খ এবং ৫৭ ধারা

ড. শাহদীন মালিক

dr. shahdin malikসাংবাদিক প্রবীর সিকদারের ত্বরিত গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং পরবর্তী সময়ে একইভাবে দ্রুতগতিতে জামিনের ঘটনায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন আবার আলোচনায় এসেছে। দেশের সংবাদপত্র সম্পাদকদের পরিষদ এই আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অনেক লেখালেখি, প্রতিবাদ হয়েছে। আবার অন্যদিকে মন্ত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ এই ধারার পক্ষে নিয়েছেন জোরালো অবস্থান, অন্য মন্ত্রীর অবস্থান কিছুটা নমনীয় ইত্যাদি।

টক শোতেও ঝড় উঠেছে। এত কিছুর পরও গুরুত্ব বিবেচনায় ধারাটি নিয়ে আরও একটু ঘাঁটানো দরকার। তাই অধমের এ বয়ান।

গত বিএনপি আমলে ২০০৬ সালে সংসদ কর্তৃক প্রণীত এই আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে: ‘১. কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।

২. কোন ব্যক্তি উপধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বছর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে আইনটি প্রণীত হয়েছিল ২০০৬ সালে, বিএনপি আমলে। বিএনপি আমলের আইনটির ৫৪, ৫৬, ৫৭ এবং ৬১ ধারার অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১০ বছর কারাদণ্ড। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলে প্রথমে ২০ আগস্ট ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৫৪, ৫৬, ৫৭ ও ৬১ ধারার অপরাধে শাস্তিগুলো বাড়িয়ে সর্বাধিক ১৪ বছর ও অন্যূন ৭ বছর করা হয়। তৎপরবর্তী সময়ে ৯ অক্টোবর ২০১৩-তে সংশোধনী আইন পাস করে অধ্যাদেশের বর্ধিত সাজা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

জিয়া ও এরশাদ আমলে যখন সংসদ ছিল না, তখন যত্রতত্র অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন জারি করা হতো। ১৯৯১-এর পর কোনো সরকারই বেশি অধ্যাদেশ জারি করেনি। যখন সংসদ অধিবেশন থাকে না, তখন হঠাৎ বিশেষ প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। ২০১১ সালে মোট অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল তিনটি। ২০১৩-তে মোট অধ্যাদেশ হয়েছিল ছয়টি। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে সংসদ অধিবেশন যখন ছিল না, তখন তড়িঘড়ি এই আইনের অধীনে কিছু অপরাধের শাস্তি কেন ১০ থেকে ১৪ বছর করা হয়েছিল, তা বোধগম্য নয়।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও একটি বিদ্যমান আইনের শাস্তির মাত্রা বাড়ানোর জন্য অধ্যাদেশ জারি করাকে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ বলা যায় না।

২.

৫৭ ধারাটিতে অনেকগুলো অদ্ভুত অপরাধের কথা বলা হয়েছে। প্রথম অপরাধটা হলো, ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করা। যা প্রকাশ বা সম্প্রচার করা হয়েছে, তা একই সঙ্গে মিথ্যা এবং অশ্লীল হতে হবে। শুধু মিথ্যা বা শুধু অশ্লীল হলে হবে না। পাঠক, একটু চিন্তা করুন, মিথ্যা এবং একই সঙ্গে অশ্লীল কী হতে পারে? সম্ভবত ক–এর ন্যাংটো ছবি প্রকাশ করে যদি বলি, এটা খ–এর ছবি, তাহলে একই সঙ্গে মিথ্যা ও অশ্লীল হওয়ার কারণে এই আইনের অধীনে হবে অপরাধ।

দ্বিতীয় অপরাধ হলো, ওয়েবে বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত কোনো বিষয় ‘কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট… হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন’। দুটি প্রশ্ন—নীতিভ্রষ্ট হওয়াটা কী? কোন নীতি থেকে ভ্রষ্ট হলে একজন নীতিভ্রষ্ট বলে বিবেচিত হবেন? ইদানীং পত্রপত্রিকায় দেখছি, বিএনপির বহু নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। বিএনপি কি দাবি করতে পারে যে এঁরা নীতিভ্রষ্ট হচ্ছেন? শুধু নীতিভ্রষ্টই না, ‘নীতিভ্রষ্ট…হইতে উদ্বুদ্ধ হওয়া’ যে ন্যূনতম সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মতো একটা ভীষণ অপরাধ হতে পারে, এমন আইন অন্য কোনো দেশেই মিলবে না।

তৃতীয় অপরাধ হলো, ‘অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন…’। একই প্রশ্ন—অসৎ হওয়াটা কী? এটা অবশ্য দুর্নীতি, প্রতারণা, ঠকানো ইত্যাদি অপরাধ নয়। কারণ, ওই সব অপরাধের জন্য অন্য আইন আছে। অবশ্যই সবাইকে সৎ পথে চলতে হবে, অসৎ পথে চলা ঠিক নয়, এটা অন্যায়। কিন্তু এটা কোন অসততা, যার জন্য লেখালেখি দ্বারা কাউকে উদ্বুদ্ধ করলে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে? শুধু ‘উদ্বুদ্ধ হলো’, কিন্তু অসৎ হলো না, তাহলে কত বছর?

কেউ কারও কাছ থেকে ঘুষ-দুর্নীতির অর্থ নিলে বা দিলে সেটা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু এখানে কোনো অপরাধমূলক কাজের কথা নেই—‘অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হওয়া’। অধমের লেখা পড়ে আপনি যদি মনে মনে উদ্বুদ্ধ হয়ে যান, তাহলে অধমের ১৪ বছরের জেল। এতে যে কারোরই ভড়কে যাওয়ার কথা।

এরপরের অপরাধ—‘যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে’। অল্প কথায় সারি—মানহানিটা এখন সব সভ্য দেশে দেওয়ানি অন্যায়। অর্থাৎ আমার কোনো প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত বক্তব্যে আপনার মানহানি হলে আপনি আমার বিরুদ্ধে মানহানির জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করে দেওয়ানি মামলা করবেন। আপনি মামলায় জিতলে রায় অনুযায়ী এক লাখ, ১০ লাখ বা কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেব। মানহানি করার জন্য সভ্য জগতে কারাদণ্ড হয় না বহু দশক ধরে।

তারপরের অপরাধ—রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। ধরা যাক, প্রথম আলো এই অধমের একটা ছবি ছাপল। অধমের বিবেচনায় ছবিতে অধমের ‘সৌন্দর্য’ যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়নি, ফলে অধমের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফলে ফটোগ্রাফার ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা। আর যত দূর জানি, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কথাবার্তা বলতে পারে না। তার অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, তা তো রাষ্ট্র বলতে পারবে না। কে বলবে, কে প্রমাণ করবে, কীভাবে?

রাষ্ট্র দাবি করতে পারে যে রাষ্ট্রের যেকোনো সমালোচনায় তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অতএব ১৪ বছর। অর্থাৎ মানুষ রাষ্ট্রের জন্য, রাষ্ট্র মানুষের জন্য নয়।

বহু বছর আগে একটা জনপ্রিয় গানের প্রথম কয়টি শব্দ ছিল ‘একই অঙ্গে এত রূপ…’। তখন কি জানতাম আইনের একটা ধারায় গোটা দশেক এমন সব অপরাধ সন্নিবেশিত হবে, যা বিশ্বাস করাও কঠিন। ৫৭ ধারায় আরও অনেক অপরাধ আছে। ফিরিস্তি দীর্ঘায়িত করলাম না।

৩.

মালালা ইউসুফজাই স্কুলে গিয়ে তার সম্প্রদায়ের মানের হানি ঘটায়ে দিল। ওই জন্য তাকে মাথায় গুলি করা হয়েছিল। সম্প্রদায়ের মান-ইজ্জত রক্ষার জন্য। আমরাও কি সে পথে হাঁটব?

এই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারায় কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির অনিষ্টসাধন-সংক্রান্ত নয়টি ভিন্ন ভিন্ন অপরাধের (চেষ্টাসহ) বর্ণনা আছে, যার জন্য শাস্তি সর্বনিম্ন সাত ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড। একইভাবে ৫৫ ধারায় কম্পিউটার সোর্স-কোড পরিবর্তন-সংক্রান্ত অপরাধ, ৫৬ ধারায় কম্পিউটার সিস্টেমের হ্যাকিং-সংক্রান্ত অপরাধ, ৫৮ ধারায় লাইসেন্স-সংক্রান্ত অপরাধ, ৫৯ ধারায় নির্দেশ লঙ্ঘন-সংক্রান্ত অপরাধ। এভাবে ৬০ থেকে ৬৭ পর্যন্ত আরও আটটি ধারায় কম্পিউটার-সংক্রান্ত আরও বহুবিধ অপরাধের ঢালাও ফিরিস্তি আছে। অর্থাৎ ৫৪ থেকে ৬৭ ধারায় মোট ৭০-৮০টি অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ৭০-৮০ বললাম এ জন্য যে আলাদাভাবে সব অপরাধ পড়তে ও বুঝতে অধমের অন্তত ১৫ দিন লাগবে। আর ফিরিস্তি পড়ে পাঠক নির্ঘাত ‘মাইর’ দেবেন।

৪.

যে ক্ষতিটা দেখা যায়, মাপা যায়, দৃশ্যমান, যে ক্ষতি রোধ করার জন্যই ফৌজদারি আইন, দেহের বিরুদ্ধে অপরাধ (খুন, জখম, অপহরণ ইত্যাদি), সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধ (চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা ইত্যাদি), রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, দেশদ্রোহ ইত্যাদি), মানসিক আঘাত, অশান্তি, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া, সম্মানহানি হওয়া, হৃদয়ে চোট বা ব্যথা পাওয়া—অর্থাৎ মন, হৃদয়, অনুভূতি, সম্মান, ইজ্জত, বংশমর্যাদা ইত্যাদি রক্ষা করতে বিনা কারণে শত শত বছর ধরে লাখ লাখ নিরপরাধ ব্যক্তির কারাবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বের সব সভ্য দেশের ফৌজদারি আইন থেকে এসব অপরাধ তুলে দেওয়া হয়েছে। কার কথায় বা লেখায় কার মনে কী আঘাত লেগেছে, পুলিশ যদি তার পেছনে দৌড়াতে থাকে বা ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্বে সিআইডি নিয়োজিত থাকে, তাহলে…।

ভাবমূর্তি কতটা ক্ষুণ্ন হয়েছে, ইজ্জতে কতটা আঘাত লেগেছে, মানের কয় সের হানি ঘটেছে ইত্যাদি পরিমাপ করা যায় না। তাই কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান—এসব অপরাধের জন্য—বর্তমানে পাওয়া যায় এমন রাষ্ট্রের নাম খুঁজে পাওয়াই ভার। মালালা ইউসুফজাই স্কুলে গিয়ে তার সম্প্রদায়ের মানের হানি ঘটায়ে দিল। ওই জন্য তাকে মাথায় গুলি করা হয়েছিল। সম্প্রদায়ের মান-ইজ্জত রক্ষার জন্য। আমরাও কি সে পথে হাঁটব?

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ বিধানাবলি কার্যকর করা হলে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য, কারণ যখনই কম্পিউটার চালাবেন, তখনই কোনো ‘অপরাধ’ করে ফেলতে পারেন।

ধারণা করছি, যাঁরা এই আইনটি প্রণয়ন করেছিলেন, তাঁরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন না।

ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

You Might Also Like