ধর্ষণের সাংবাদিকতা বন্ধ হওয়া উচিত

খবরের কাগজের পাতা এখন ধর্ষণের সংবাদে পূর্ণ থাকে। সাংবাদিকতার একটা বিশেষ উপজীব্য হয়ে উঠেছে ধর্ষণের খবর, যা বন্ধ হওয়া উচিত। কেননা, এ ধরনের খবর পরিবেশন ধর্ষণের প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করে, সৃষ্টি করছে অনুকূল পরিবেশ। যেটা সৎ সাংবাদিকতার লক্ষ্য হতে পারে না। অনেক প্রাচীনকালে হিন্দু সমাজে রাক্ষস বিয়ে বলে একটি বিয়েপদ্ধতি প্রচলন ছিল। এই প্রথা অনুসারে একজন পুরুষ একজন নারীকে জোর করে ধরে নিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে করতে পারত। কিন্তু তাকে সে হত্যা করত না। কিন্তু এখন ধর্ষক ধর্ষিতাকে ধর্ষণ করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হত্যা করছে। ধর্ষিতা নারীর লাশ ভাসছে পুকুরে, খানাখন্দে। অথবা পড়ে থাকছে পথের ধারে। যেটা আগে ছিল অজ্ঞাত। মানুষ নারীর প্রতি এ দেশে এতটা নির্দয় আচরণ করেনি। আগে গণধর্ষণ বলে কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তা যেন পেতে যাচ্ছে বিশেষ ব্যাপ্তি। ইংরেজ আমলে ধর্ষণ কথাটা এখনকার মতো এতটা প্রচলিত ছিল না। ধর্ষণের জায়গায় ফ্যালসানি শব্দটা অধিক প্রচলিত ছিল। আরবি ফ্যালসানি শব্দটা ফারসি ভাষার মাধ্যমে এসেছে বাংলা ভাষায়। কিন্তু এখন ধর্ষণ কথাটা বিশেষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখন ধর্ষণ আগের তুলনায় বেশি ঘটছে। এর কারণ, মেয়েরা এখন বাইরে কাজ করতে বেশি আসছে। বাইরে কাজ করা মেয়েরা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। আগেও অনেক দরিদ্র মেয়ে বাইরে কাজ করত। কিন্তু তারা এত সাজগোজ করে বাইরে কাজ করতে বের হতো না। তারা তাই বাড়াত না পুরুষের আসঙ্গলিপ্সা। কিন্তু এখন অনেক নারী এমনভাবে সাজগোজ করে বাইরে কাজ করতে বের হচ্ছেন, যা তাদের করে তুলছে ধর্ষণের শিকার। কেননা পুরুষ তাদের প্রতি হচ্ছে সহজেই আকৃষ্ট। তাদের মধ্যে জেগে উঠছে আসঙ্গলিপ্সা। আমরা জানি, যৌনতাড়না যৌন-হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। মেয়েদের সাজসজ্জা বাড়াচ্ছে যৌন হরমোনের ক্ষরণ মাত্রা। সব পুরুষ এক রকম নয়। এর ফলে কোনো কোনো পুরুষ হয়ে উঠছে কাম-উন্মাদ। হয়ে উঠছে ধর্ষক। আমাদের সাংবাদিকতা এখন সস্তা যৌনতাকে নির্ভর করে চলতে চাচ্ছে। যার ফলে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। এ দিক থেকেও মনে হয় আমাদের সংবাদ-সাহিত্য (Journalism) হয়ে উঠছে বিশেষভাবে আদিরস নির্ভর। যেটা সংযত হওয়া প্রয়োজন।

ধর্ষণের অনুকূল পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত না হলে ধর্ষণের মাত্রা কমানো যাবে না। বাড়বে ধর্ষকামীর সংখ্যা। মানুষের ব্যক্তিত্ব পরিবেশনির্ভর। পরিবেশ মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তুলতেই পারে। অপরাধপ্রবণতা এখন কেবল যৌনজীবনে নয়, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ প্রশাসন এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। যখনই কোনো দেশে প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই জীবনের নানা ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতা দেখা যায় বৃদ্ধি পেতে। আমাদের দেশেও সেটা ঘটছে।

আমরা সাধারণভাবেই মনে করি, কার কখন মৃত্যু ঘটবে, সেটা কেউ বলতে পারে না। কথাটা এক দিক থেকে খুবই সত্যি। কিন্তু আরেক দিক থেকে দেখলে বোঝা যায়, মৃত্যুরও আছে কিছু নিয়ম। তা না হলে, কোনো জীবনবীমা কোম্পানি টিকতে পারত না। একটি বিশেষ বয়সের পরে জীবন বীমা কোম্পানিগুলি সাধারণত কারো জীবনবীমা করতে চায় না। কেননা, একটা বয়সের পর, মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একইভাবে, কোন শহরে কোন ব্যক্তি গাড়ি চাপা পড়ে মারা যাবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তবে একটি শহরে বছরে গড়পড়তা কতজন লোক গাড়ি চাপা পড়ে মরতে পারে, তার এটা হিসাব করা যায়। আর গাড়ি চাপা পড়ে মৃত্যুর হার কমানোর ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে।

অনেক দেশেই যেসব মেয়ে বাইরে কাজ করেন, তাদের জীবন বীমা করার সময় বীমা কোম্পানিরা করে অধিক হারে প্রিমিয়াম গ্রহণ। কিন্তু যেসব মেয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকে, বাইরে কাজ করতে যায় না, তারা জীবন বীমা করতে গেলে জীবন বীমার প্রিমিয়াম দিতে হয় কম। এর কারণ, গৃহকর্মে নিরত নারীদের গাড়ি চাপা পড়ে মরার সম্ভাবনা থাকে কম। ধর্ষণকে মনে করা যেতে পারে, নারীজীবনে একটি শোচনীয় দুর্ঘটনা। মেয়েরা যদি তাদের জীবনে এই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমাতে চায়, তবে তাদের বেপরোয়া চলাফেরা অবশ্যই কমাতে হবে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটে অসাবধানতার কারণে। ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে বহু ক্ষেত্রেই মেয়েদের অসাবধানতারই জন্য। এটা মেয়েদের উপলব্ধিতে থাকতে হবে। লোকে বলে সাবধানের ঘরে চুরি কম হয়। পুলিশ থাকা সত্ত্বেও রাতে আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমাই। কেবলই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে থাকি না। ধর্ষণের ক্ষেত্রেও হতে হবে মেয়েদের সাবধানী।

প্রাচীনকালে বাংলাদেশে অনেক বৌদ্ধ মঠ ছিল। এসব মঠে থাকতেন বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুনী। এসব ভিক্ষুণীরা মঠ থেকে একা বাইরে বের হতো না। কম করে দুজন একসাথে বাইরে বের হতো। তবে সাধারণত বের হতো চারজন করে। মেয়েরা পুরুষের তুলনায় কায়িক শক্তিতে দুর্বল। কিন্তু একাধিক নারী একত্রে থাকলে এই দুর্বলতা তারা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারে। ভিক্ষুনীরাও তাই বাইরে এক একা চলাফেরা না করে চলত একাধিকজন একত্র হয়ে। মেয়েরা এই প্রাচীন দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে। কর্মজীবী মেয়েরা চলাফেরা করতে পারে সঙ্ঘবদ্ধভাবে। জাপানে আছে জেন নামে এক বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তারা ধর্মচর্চার সাথে সাথে করেন ব্যায়াম ও কুস্তি চর্চা। এদের মধ্যে উদ্ভব হতে পেরেছে যুযুৎসু। যুযুৎসুর কৌশলে অনেক বলশালী ব্যক্তিকেও সহজেই কাবু করা সম্ভব হয়। রাজশাহীতে যুযুৎসু শেখার একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এখানে যুযুৎসুতে প্রশিক্ষণলব্ধ কয়েকজন নারী একদিন রাজশাহীতে সন্ধ্যায় বেড়াচ্ছিল পদ্মা নদীর পাড়ে। এ সময় কয়েকজন বখাটে ছেলে তাদের ওপর চড়াও হয়। কিন্তু ওই মেয়েরা তাদের যুযুৎসুর প্যাঁচ কষে মাটিতে ফেলে চিৎকার শুরু করে। তাদের চিৎকারে অনেকে ছুটে যান ঘটনাস্থলের দিকে। বখাটে যুবক ক’টি কোনোমতে পালিয়ে গণধোলাইয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়। দেশের সব লোক ধর্ষক হয়ে যায়নি। তারা ধর্ষণবিরোধী। এ ক্ষেত্রেও তারই পরিচয় পাওয়া গেল। দেশে ধর্ষণ ঠেকাতে হলে এর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে গড়তে হবে সামাজিক প্রতিরোধ।

অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮) তার দেনা পাওনা উপন্যাসে ইঙ্গিত করেছেন, যেহেতু মুসলমান সমাজে হিন্দু সমাজের চাইতে ধর্মের প্রভাব বেশি, এবং যেহেতু ইসলাম ধর্মে মেয়েদের প্রতি অনেক সদয় ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, তাই মুসলমান সমাজে হিন্দু সমাজের তুলনায় নারী নির্যাতন হয় কম। কথাটা আমার মনে আসছে। কারণ একদল বিজ্ঞানমনস্ক ব্লগার বলছে, ইসলাম নাকি ধর্ষণে উৎসাহ জোগায়। কিন্তু শরৎচন্দ্র বলেছেন, অন্য কথাই। ইসলাম সর্বপ্রকার নারী নির্যাতনের বিরোধিতা করে। আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় এখন ব্লগারদের প্রতি নানাভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে সহানুভূতি। আর নানা কৌশলে প্রচার করা হচ্ছে, ইসলামবিরোধী বক্তব্য। এ ধরনের সাংবাদিকতাও হচ্ছে কার্যত ধর্ষণেরই সহায়ক। কেননা, এরা ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরোধিতা করছে। কিন্তু পাশাপাশি সৃষ্টি করছে না কোনো নতুন মূল্যচেতনা; যা বাড়াতে পারে সমাজে শৃঙ্খলা।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

You Might Also Like