সিরিজ বোমা হামলার ১০ বছর : বিচারাধীন ৫৮ মামলা

আজ ১৭ আগস্ট। দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার দশ বছর। ২০০৫ সালের এই দিনে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সেই সময় একযোগে কেঁপে উঠে সারা দেশ। সিরিজ বোমা হামলার দশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই হামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি।
সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৬১ মামলার মধ্যে ১০৩ মামলার রায় হয়েছে। এখনও বিচারাধীন রয়েছে আরও ৫৮ মামলা। জামিনে মুক্ত হয়ে অনেক আসামি ফের শুরু করেছে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের পূণর্গঠনের কাজ, ছদ্মবেশে চালাচ্ছে দাওয়াতি কার্যক্রম।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১২টার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলার সাড়ে ৪ শ স্থানে পাঁচ শতাধিক বোমার বিম্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। উগ্রপন্থি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে সেদিন আদালত, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একযোগে এই বোমা হামলা চালায় জেএমবি ।
এতে মারা যায় দুজন, আহত হয় আরো শতাধিক মানুষ। সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমেই তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের প্রকাশ ঘটায় সংগঠনটি। এখানেই শেষ নয় ১৭ আগস্টের পরও তারা বিভিন্নস্থানে আত্মঘাতী হামলায চালায়। এসব হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাসহ আরও ৩৩ জন মারা যান। এরপরই তাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে নামে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দেশের বিভিন্নস্থানে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৬১। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৬০ জনকে। এর মধ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে ৪৫৫ জন, জামিনে রয়েছে ৩৫ জন। বাকি ৫০ জন পলাতক রয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিরিজ বোমা হামলার ১০৩ মামলার ঘোষিত রায়ে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে ২৬৪ জনকে এবং মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে ১২১ জনকে। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ১৫জনের রায়ের মধ্যে ছয় জনের রায় কার্যকর করা হয়েছে।
এরা হলেন, ওই সময়ের শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুন।
ঝালোকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় ২০০৬ সালের ২১ মার্চ মামুন, সুলতান হোসেন খান, শায়খ আব্দুর রহমান, আব্দুল আউয়াল, আতাউর রহমান সানি, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, শাকিল আহমেদ মোল্লা ওমর (মৃত) ও মেহেদীসহ আটজনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
২০০৬ সালের ৩০ মে মামলার রায়ে শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, আব্দুল আউয়াল, মাসুম, খালিদ, সাইফুল্লাহসহ মোট সাতজনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ রাতে এদের ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অপর জঙ্গি আসাদুর রহমান আরিফ পলাতক রয়েছে।
সিরিজ বোমা হামলার সর্বশেষ রায় হয় গত ১০ আগস্ট। ২০০৫ সালে ১৭ই আগস্ট গাজীপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনসেহ জয়দেবপুর থানাধীন নয়টি স্থানে সেদিন বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এঘটনায় দীর্ঘ দশ বছর পর ১০ আগস্ট ঢাকার চার নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুর রহমান সরদার, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে আসামিদের ১০ বছর কারাদণ্ড- প্রদান করেন। অভিযোগ সন্দেহাতিত ভাবে প্রমানিত না হওয়ায় আটক ২১ জনের মধ্যে চারজনকে খালাস দেন তিনি। বাকি ১৭ জনের প্রতেককে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড পাশাপাশি দশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদণ্ড দেন।
সিরিজ বোমা হামলার পাঁচ বছর পর ২০১০ সালে জেএমবির সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু নিষিদ্ধ এই জঙ্গি সংগঠনটি এখনো গোপনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে নামে বেনামে প্রায় ৪০টি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। তবে অধিকাংশ সংগঠনই অকার্যকর। যারা কার্যকর তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মধ্যে রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা থেকে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত আমিরসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ফতারকৃতরা দেশের ছয় টি বিভাগে জেএমবিকে পুনর্গঠনের কাজ করছিল। কারাগারে থাকা জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা সাঈদুর রহমান ও শীর্ষ নেতা মুফতি জসিমউদ্দিনকে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ছিল। এমন তথ্য রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়।
এ বছর সন্ত্রাস দমন আইনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবি, হুজিসহ চারটি জঙ্গি সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করে সরকার। একই অপরাধে ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হয় হিযবুত তাহরীর।
গোয়েন্দা সুত্র জানায়, বাংলাদেশে জেএমবিসহ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), হিযবুত তাহরীর, ইসলামিক স্টেটসের (আইএস) সদস্যরা একজোট হয়ে কাজ করছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা গোপন বৈঠকের মাধ্যমে নতুন দল গঠনের কাজ করছে । দেশে বড় ধরণের নাশকতা চালিয়ে আসামি ছিনতাইয়ের মতো পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
র‌্যাবের একটি গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এনআইএ এর সঙ্গে জঙ্গি দমন ইস্যুতে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে এনআইএ এর সঙ্গে র‌্যাব কাজ করছে। দুই দেশেরই লক্ষ্য জঙ্গি দমন করা।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ সংগঠনের জঙ্গিরা একসঙ্গে হয়ে ‘বাংলাদেশ জুনুদআল তাওহীদ ওয়াল খিলাফাহ’ এবং ‘বাংলাদেশ জিহাদী গ্রুপ’ নামে দুটি সংগঠনের নামে নিজেদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে এসব সংগঠনের সদস্য সংখ্যার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই পুলিশের কাছে।
জঙ্গিদের পুরোপুরি দমন করা না গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারনে জঙ্গিরা কোন ধরণের নাশকতা করার সক্ষমতা রাখে না বলে জানান সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগ এলাকার র্সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে জেএমবির আমির শায়খ আব্দুর রহমানকে, ২০০৬ সালের ৬ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানাধীন চেচুয়া বাজারের রামপুরা গ্রাম থেকে জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইকে গ্রেফতার করা হয়।
২০১০ সালের ২৫ মে এ রাজধানীর সবুজবাগ ও নারায়নগঞ্জ এলাকা থেকে জেএমবির পরবর্তী প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান, তার স্ত্রী নাইমা আকতার, সামরিক শাখার প্রধান আনোয়ার আলম শিবলু ও মজলিসে সুরা সদস্য সোহেল মাহফুজকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।
জঙ্গিদের ব্যাপারে র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স শাখার পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, র‌্যাব এসব মামলার সরাসরি তদন্ত না করলেও আসামিদের গ্রেফতার করেছে। সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির শীর্ষ নেতাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে র‌্যাব। র‌্যাব শুরু থেকেই জঙ্গি দমনে প্রতিনিয়ত কাজ করছে। পলাতক আসামিরা ভারতে গিয়ে নিরাপদে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ তৎপর থাকায় জঙ্গিরা ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করতে পারছে না। আশা করছি দ্রুত তাদের গ্রেফতার করতে পারবো।
বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি মিডিয়া নজরুল ইসলাম জানান, সিরিজ বোমা হামলার সবগুলো মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ। ওই মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামীকেও পুলিশ গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি দেশের জঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) জানান, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গি দমনে ৬৩২টি মামলায় ২ হাজার ৫৪৩ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, জঙ্গি দমনে পুলিশ শতভাগ না হলে ৮০ ভাগ সফল।

You Might Also Like