প্রত্যেকের বেডরুমে উঁকি দেয়া সম্ভব নয়: পর্নোগ্রাফি বন্ধে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেলের মন্তব্য

ভারতে শিশুরা যাতে অবাধে পর্নোগ্রাফিক সাইটে যেতে না-পারে, সেই যুক্তিতে ভারতের টেলিকম মন্ত্রণালয় দিনকয়েক আগেই ৮৫০টিরও বেশি পর্নো সাইট ব্লক করতে আইএসপি-গুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল।
এই নির্দেশের জেরে গত কয়েক দিন ধরেই বেশ কয়েকজন শিল্পী-লেখক-বুদ্ধিজীবী সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদও জানিয়েছেন।
ফলে মাত্র দিনদশেকের মধ্যেই সরকার তাদের অবস্থান আমূল বদলে ফেলেছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়ে দিয়েছেন ‘প্রত্যেকের বেডরুমে উঁকি দেওয়াটা’ তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বা শিশু যৌনতা বিষয়ক পর্নো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও সরকার দাবি করেছে।
পর্নোগ্রাফিক সাইট দেখার ক্ষেত্রে কতটা বিধিনিষেধ থাকা উচিত বা আদৌ উচিত কি না, তা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই ভারতে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে।
দিল্লির রাস্তায় যুবক-যুবতীরা যেমন খোলাখুলি বলছেন, নিজের ঘরের ভেতর কে কী দেখছে তাতে নাক গলানো সরকারের কাজ নয়।
পর্নো নিষিদ্ধ করলেই যৌন হিংসা কমবে, এই যুক্তিও ধোপে টেঁকে না বলে অনেকে বলছেন। তা ছাড়া অনেক মেয়েও যে পর্নো দেখেন সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
সম্ভবত এই তীব্র জনমতের চাপেই সরকার তাদের আগের অবস্থান থেকে পিছু হঠেছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, পর্নো নিষিদ্ধ করা উচিত কি না তা নিয়ে সমাজে বা পার্লামেন্টের বৃহত্তর পরিসরে বিতর্ক দরকার।
কিন্তু সেই বিতর্কের আগে সরকারের পক্ষে যে প্রতিটি লোকের বেডরুমে গিয়ে নজরদারি করা সম্ভব নয়, সেটাও তিনি জানিয়ে দেন।
সরকার যে ভোল বদলাতে যাচ্ছে, এই ইঙ্গিত ছিল টেলিকম মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের কথাতেও। তার মন্ত্রণালয় এর আগে ওয়েবসাইটগুলো ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছিল।
মি. প্রসাদ সুপ্রিম কোর্টের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই দাবি করার চেষ্টা করেন, তাদের কথাতেই ওই নির্দেশ জারি করতে হয়েছিল – নইলে “সরকার এমনিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পক্ষপাতী নয়।“
পর্নো নিষিদ্ধ করার দাবিতে মূল মামলাটি যিনি করেছিলেন, ইন্দোরের সেই আইনজীবী কমলেশ ভাসওয়ানি অবশ্য এখনও হাল ছাড়তে রাজি নন।
বরং তিনি এদিনও বলেছেন, ভারতের আইন অনুযায়ী পর্নো দেখাটাই বে আইনি, তিনি সেই আইন প্রয়োগ করার দাবি জানাচ্ছেন মাত্র।
তাঁর যুক্তি, সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয়, না-খেলেও হয় – তার মানে এই নয় যে সিগারেটে খেতে দিতে হবে।
একইভাবে, পর্নোগ্রাফিতে হিংসার ছড়াছড়ি, কীভাবে গণধর্ষণ করা হয় সে সব দেখানো হচ্ছে এবং বাচ্চারাও দেখছে। হয়তো অন্য জায়গা থেকেও শিখছে, কিন্তু পর্নো তো নিষিদ্ধ করাই যায়।
মি. ভাসওয়ানি আরও বলেন, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭-এ ধারার নয় সম্বর রুলেই পর্নো সাইট ব্লক করার কথা আছে, আমি শুধু সেটা বলবৎ করার কথা বলছি। আমাদের দেশের নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্যই এটা দরকার।
সমাজতাত্ত্বিক ও দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কমল মিত্র শেনয় অবশ্য মনে করছেন, ২১ শতকের ভারতের ছবির সঙ্গে পর্নো নিষিদ্ধ করার ছবিটা মোটেই খাপ খায় না।
তিনি শুধু এটাকে সরকারের অপরিণত ভাবনার ছাপ বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, একে চূড়ান্ত রক্ষণশীল ও পেছনে-তাকানো পদক্ষেপ বলেও বর্ণনা করছেন।
তার মতো অনেকেরই ধারণা, আপাতত পর্নো সাইট ব্লক করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেও সরকার অনলাইন কনটেন্টের ওপর নজরদারি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হবে না।
বস্তুত এই দায়িত্ব দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি বা সুশীল সমাজের কোনও প্রতিনিধির নেতৃত্বে একটি ওমবাডসম্যান গড়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলছে।

You Might Also Like