‘এমন কিছু করার পরও গান্ধী কিভাবে মহাত্মা হয়ে গেলেন’ : অরুন্ধতী রায়

আইনবিদ, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, নৃতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ ভীমরাও রামজি আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) বাবাসাহেব হিসেবেই ভারতের দলিত সম্প্রদায়ের কাছে সুপরিচিত। ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন-শোষণে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণীর মানুষের সামনে তিনি আলোর মশাল নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। জাতপাত থেকে দলিত সম্প্রদায়কে চিরতরে মুক্তি দিতে তিনি বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাকে ভারতীয় সংবিধানের পিতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি তাকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন: দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট নামে।

সংস্কারবাদী হিন্দু সংগঠন জাত-পাত-তোদক মণ্ডলের (অস্পৃশ্যতা বিলোপ ফোরাম) ১৯৩৬ সালের বার্ষিক অধিবেশন আয়োজন করা হয়েছিল লাহোরে। এতে বক্তৃতা করতে ড. ভীমরাও (বি আর) আম্বেদকরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বক্তৃতার কপি দেখে আয়োজকদের মনে হলো লেখাটা ‘অসহ্য।’ আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। আম্বেদকর তখন তার নিজের পয়সায় বক্তৃতাটির ১৫ শ’ কপি ছাপালেন। নাম দিলেন ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট – Annihilation of Caste’ (জাতপাতের সম্পূর্ণ বিলোপ)। অল্প সময়ের মধ্যে সেটি কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হলো। লেখাটি দলিত সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় গ্রন্থের মতো সমাদৃত হয়। কিন্তু যে উচ্চবর্ণের লোকদের জন্য এটি লেখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রায় অপঠিতই থেকে যায়।

বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক অরুন্ধতী তার ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ বইয়ে বক্তৃতাটির ভূমিকা হিসেবে যে প্রবন্ধটি লিখেছেন সেটি নিশ্চিতভাবেই বর্তমান পাঠকদের নজরে আসবে।

চারশ’ পৃষ্ঠার বইটির প্রায় অর্ধেকটাই অরুন্ধতীর প্রবন্ধ, বাকিটা ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’। গান্ধী-আম্বেদকর মতভিন্নতা নিয়ে আলোকপাত করার পর অরুন্ধতী বর্তমান ভারতের জাতপাতব্যবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন। জাতপাত ব্যবস্থা বর্ণগত মই বেয়ে নেমে চলে এবং কখনোই পুরোপুরি অদৃশ্য না হওয়ায় আম্বেদকরের বর্ণিত ‘অনুকরণের সংক্রমণ’ (প্রতিটি বর্ণেরই ক্রমপরম্পরায় নিম্নতর বর্ণের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা) দিয়ে শুরু করে অরুন্ধতী লিখেছেন, “তেজস্ক্রিয় অণুর অর্ধেক-জীবনের মতো ‘অনুকরণের সংক্রমণ’ গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।” এর ফলে এমন এক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে যেটাকে আম্বেদকর বলেছেন ‘ক্রমবিন্যস্থ বৈষম্য’। এতে ‘আরো নিচুর তুলনায় নিচু বর্ণও বিশেষ অধিকারভোগের অবস্থানে থাকে। প্রতিটি বর্ণই বিশেষ অধিকার ভোগ করে, প্রতিটি শ্রেণীই ব্যবস্থাটি বজায় রাখার ব্যাপারে আগ্রহী।’”

অরুন্ধতীর শক্তিশালী ও বিচলিত হওয়ার মতো প্রবন্ধটির তীর্যকতা গান্ধী-আম্বেদকর বিতর্ক নিয়ে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে ব্যবহৃত হলেও জাতির পিতা হিসেবে দেবতুল্য স্থানে তুলে রাখা মানুষটি এই গ্রন্থে সেভাবে উপস্থাপিত হতে পারেননি। তিনি লিখেছেন, ‘আম্বেদকর ছিলেন গান্ধীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। তিনি কেবল রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন। গান্ধীর কাহিনী থেকে আম্বেদকরকে ছেঁটে ফেলাটা, যদিও আমরা এমন কাহিনী শুনতে শুনতেই বেড়ে ওঠেছি, অপলাপ মাত্র। একইভাবে আম্বেদকর সম্পর্কে লেখার সময় গান্ধীকে অগ্রাহ্য করা হলে তা হবে আম্বেদকরের অনিষ্টসাধন। কারণ আম্বেদকরের জগতে গান্ধী অজস্রভাবে এবং অতি সাধারণভাবে মিশে আছেন।

বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ নিয়েই তার সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন সাবা নকভি। এখানে তা প্রকাশ করা হলো।

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রশ্ন:ড. আম্বেদকরের ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’-এর নতুন, টীকাযুক্ত সংস্করণে আপনার ভূমিকা তথা দ্য ‘ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ গান্ধীর বিচলিত অবস্থা সৃষ্টিকারী সমালোচনাও, বিশেষ করে তাদের কাছে যারা গান্ধীকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।

অরুন্ধতী:হ্যাঁ, আমি জানি। এটা লেখা কোনোভাবেই সহজ ছিল না। তবে বর্তমানেও যখন আমাদের সবাই অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি, হতাশায় ভুগছি, বিরাজমান অবস্থা এমন কেন হলো তা বুঝতে পারছি না, তখন আমি গান্ধী ও আম্বেদকরের মধ্যকার বিতর্ক আবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এতে অনেকে বিচলিতও হতে পারেন, তা মূলত এ জন্য যে এটা পুরনো ও নিষ্পত্তি হয়ে থাকা ধরনটি এলোমেলো করে দিতে পারে। কিন্তু তবুও বলব, সবশেষে এটাই আমাদেরকে পথ দেখাতে সহায়ক হবে। আমি মনে করি, ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ নির্দ্বিধায় অবশ্য পাঠযোগ্য গ্রন্থ। আমাদের সমাজে পচনের মূলে রয়েছে জাতপাত প্রথা। অধস্তন জাতের প্রতি যা কিছু করা হয়েছে, তা তো আছেই, সেইসঙ্গে এটা বিশেষ অধিকারভোগকারী বর্ণের নৈতিকতার মূলে পচন ধরিয়েছে। আমাদেরকে এখন আম্বেদকরকে আরো বেশি করে প্রয়োজন।

প্রশ্ন:আম্বেদকরকে নিয়ে লেখা বইতে গান্ধী চরিত্রটিকে কেন এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলো? এমনটা কিভাবে ঘটল?

অরুন্ধতী:আম্বেদকর ছিলেন গান্ধীর সবচেয়ে তীক্ষè সমালোচক, কেবল রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই নয়, নৈতিকভাবেও। আর মূলধারার রচনায় সেটা পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। এটা অপলাপ মাত্র। গান্ধীর সাথে তার বিতর্কের বিষয়টি উত্থাপন ছাড়া আমার পক্ষে বইটির ভূমিকা লিখার উপায় ছিল না। কারণ বিষয়টি এই বর্তমানকালেও আমাদের ওপর প্রবলভাবে চেপে আছে।

‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ আম্বেদকরের লিখিত বক্তৃতা, যদিও তিনি সেটি কোথাও দেননি। আর্য সমাজের শাখা জাত-পাত-তোদক মণ্ডল যখন প্রবন্ধটি দেখল, তারা বুঝতে পারল যে আম্বেদকর সরাসরি হিন্দুবাদ এবং এর পবিত্র গ্রন্থের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন। তারা তখন আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করল। আম্বেদকর পুস্তিকা হিসেবে সেটি প্রকাশ করলেন। গান্ধী তার হরিজন পত্রিকায় এর একটি জবাব প্রকাশ করলেন। তবে এই বিরোধ দুজনের মধ্যকার দীর্ঘ ও তিক্ত সংঘাতের একটি অংশ মাত্র। আমি যখন বলি যে কাহিনীতে মুছে ফেলা হয়েছে, তখন আমি এটা বলতে চাই না যে তাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, বরং এর বিপরীতে তার দিকে বেশ নজর দেয়া হয়েছে, সেটা ‘সংবিধানের স্থপতি’ হিসেবে কিংবা ‘অস্পৃশ্যদের নেতা’ হিসেবে তাকে বৃত্তাবদ্ধ করে বা প্রশংসা করে- যেভাবেই হোক না কেন। তবে যে ক্রোধ ও আবেগ তাকে তাড়িত করেছে, কাহিনী থেকে সেটাকেই কমবেশি মুছে ফেলা হয়েছে। আমি মনে করেছি, বর্তমানে আমরা নিজেদেরকে যে জটিল পরিস্থিতিতে দেখতে পাচ্ছি, সেটা থেকে উত্তরণের কোনো পথ খুঁজতে চাই, তবে আমাদেরকে অবশ্যই আম্বেদকরকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। দলিতরা সেটা অনেক বছর আগেই জেনেছে। এখন সময় এসেছে, দেশের বাকিদের সেটা জানা।

প্রশ্ন:আপনি কি গান্ধী সম্পর্কে সবসময় এমন ধারণাই পোষণ করতেন, নাকি আম্বেদকর এবং তার মাধ্যমে গান্ধীকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তা আবিষ্কার করেছেন?

অরুন্ধতী:আমি ধর্মানুরাগ, বিশেষ করে তা যখন রাজনৈতিক ইস্তেহারে পরিণত হয়, আমি সহজাতভাবেই সেদিকে আকৃষ্ট হই না। আমি বলতে চাচ্ছি, দোহাই, গান্ধী খাওয়া-দাওয়াকে ‘ভয়াবহ নোংরা কাজ’, যৌন সম্পর্ককে ‘সাপের বিষের চেয়েও খারাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্বীকার করতেই হবে, আধুনিকতা এবং ‘উন্নয়ন’-সংক্রান্ত পাশ্চাত্যের ধারণা যে পৃথিবী ও এর অধিবাসীদের ক্ষতি করতে যাচ্ছে- তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথিকৃত। অন্যদিকে তার ‘তত্ত্বাবধায়ক মতবাদ’ (যাতে তিনি বলেছেন যে ধনীদের অবশ্যই তাদের সম্পদের অধিকার ত্যাগ করতে হবে এবং তা গরিব মানুষের কল্যাণে ন্যস্ত করতে হবে)- যাকে আমরা বর্তমানের ‘করপোরেট সামাজিক দায়দায়িত্ব’ হিসেবে অভিহিত করতে পারি- তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি। নারীদের প্রতি তার মনোভাবে আমি সবসময়ই অস্বস্তি অনুভব করি। তবে জাতপাত এবং এ ব্যাপারে গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে আমি ছিলাম বিভ্রান্ত ও অস্পষ্ট। ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ আমাকে আম্বেদকরের ‘হোয়াট কংগ্রেস অ্যান্ড গান্ধী হ্যাভ ডান টু দ্য আনটাচেবল’ পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। আমি এটা পড়ে খুবই বিচলিত হই। আমি গান্ধী, তার চিঠিপত্র, সংবাদপত্রে প্রকাশিত তার রচনা পড়তে শুরু করি। আমি সেই ১৯০৯ সালে তিনি যখন তার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা ‘হিন্দ স্বরাজ’ লিখেন, তখন থেকে জাতপাত সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্টা করেছি। গবেষণা করা এবং ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ লেখার সময় আমি এমন কিছু পড়েছি, যা আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখুন, গান্ধী ছিলেন জটিল একটি চরিত্র। তিনি সত্যিকার অর্থে কী ছিলেন (অত্যন্ত মেধাবী রাজনীতিবিদ, মুগ্ধতা সৃষ্টিকারী, দোষযুক্ত মানুষ) সেটা দেখার সাহস আমাদের থাকতে হবে। তার দোষ-ত্রুটিগুলো কেবল তার ব্যক্তিগত জীবন কিংবা স্বামী ও বাবা হিসেবে তার ভূমিকায় সীমিত থাকা উচিত নয়। আমরা যদি তাকে তাকে শ্রদ্ধা করতে চাই, তবে আমাদেরকে অবশ্যই তিনি কী ছিলেন, সেটার আলোকেই শ্রদ্ধা করা উচিত। তার সম্পর্কে আমাদের হাতের কাছে থাকা কিছু কল্পিত, রচিত ধারণা দিয়ে নয়।

প্রশ্ন:আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে পারে যে, আপনি কেবল গান্ধী সম্পর্কে আপনার কল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ে তার লেখাগুলো গ্রহণ করে তার চরিত্র নির্মাণ করেছেন…

অরুন্ধতী:কোনো মানুষ যদি ৯৮ খণ্ডের ‘কালেকটেড ওয়ার্কস’ রেখে যান, তবে নির্বাচিত কিছু বিষয় গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে? অবশ্যই আমি নির্বাচিত কিছু রচনা নিয়েছি, তবে অন্য সবাইও ঠিক এ কাজটিই করেছেন। বলতেই হবে, ওইসব নির্বাচিত বিষয় ছিল ওই মানুষটির রাজনীতি নিয়ে, আর তিনি বাছাই করা কিছু লোকের জন্য কাজ করেছিলেন। আমি সেটা করেছি ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’-এর সংক্ষিপ্ত ভূমিকা লেখার জন্য। আম্বেদকরকে পড়ে আমি বুঝতে পেরেছি যে, আম্বেদকরের বিশ্বে গান্ধী কত বিশাল স্থান জুড়ে ছিলেন। আমি যখন জাতপাত প্রথাকে সমর্থন করে গান্ধীর ঘোষণা পড়ি, তখন আমি অবাক হয়ে ভাবি যে তার অহিংসা ও সত্যাগ্রহ মতবাদ কিভাবে এমন একটি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর এত সাবলীলভাবে খাপ খেয়ে যায় – যেটা কেবল দাঁড়িয়ে আছে সহিংসতার স্থায়ী হুমকি এবং বারবার অকল্পনীয় সহিংসতার প্রয়োগের মধ্যে। আমার বিস্ময়ের ঘোর বাড়তে থাকে এ জন্য যে, এমন কিছু করার পরও গান্ধী কিভাবে মহাত্মা পর্যন্ত হয়ে গেলেন!

আমি দেখতে পেয়েছি যে ১৯১৫ সালে তাকে প্রথম প্রকাশ্যে মহাত্মা হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০ বছর কাটিয়ে ভারতে ফিরে আসার অব্যাহতি পরের ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি এমন কী করেছিলেন, যাতে তিনি এমন সম্মান পেতে পারেন?

আর সেটা আমাকে ১৮৯৩ সালে ফিরিয়ে নিল, যে বছর তিনি ২৪ বছর বয়স্ক আইনজীবী হিসেবে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন। জাতপাত নিয়ে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে গান্ধী যেসব লেখা লিখেছিলেন, আমি সেগুলো দেখেছি। ফলে ‘গান্ধী কি বদলে ছিলেন? আর যদি বদলে থাকেন, কেন? তার শুরুটা কি খুব খারাপ ছিল এবং পরে তিনি মহাত্মায় পরিণত হয়েছেন?’- এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার সময় আমি খাদ্যাভ্যাস বা প্রাকৃতিক আরোগ্য বিধানের ব্যাপারে গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসলে গবেষণা করিনি, আমি জাতপাতের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি লক্ষ রেখেছি। আর তা করতে গিয়ে আমি হোঁচট খেয়েছি। তবে সব টালমাটাল পরিস্থিতি এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যেও আমি অবিচ্ছিন্ন অবস্থান খুঁজে পেয়েছি। সবকিছু পরিষ্কার হয়েছে আমার কাছে।

তার অবস্থানে কোনো অসামঞ্জস্যতা ছিল না। অব্যাহতভাবে তা ছিল বিচলিত হওয়ার মতো। আসল সত্য হলো, তিনি অন্য যা কিছু বলেছেন, যা কিছু করেছেন, এবং সেগুলোর কোনো কোনোটি সুন্দর হলেও তিনি কিছু বিচলিত হওয়ার মতো কথা বলেছেন, লিখেছেন এবং করেছেন। এগুলোর ব্যাখ্যা অবশ্যই দিতে হবে এবং কেন বলা হয়েছে তা জানতে হবে। এটা আমাদের সবার ক্ষেত্রে, প্রত্যেকের, পাপী বা সন্ন্যাসী সবার জন্যই প্রযোজ্য। আসুন আমরা যুক্তির খাতিরে কল্পনা করি, যে কেউ চরম বিরূপ ধারণার বশবতী হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলী তন্নতন্ন করে খোঁজ করলেন, আমি রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ নই, তবে আমার প্রবল সন্দেহ আছে যে, ওই মানুষ ‘কালেকটেড ওয়ার্কস অব মহাত্মা গান্ধী‘তে থাকা কিছু লেখা যেমন উদ্বেগ সৃষ্টি করে সেখানেও তেমন ধরনের চিঠি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, সাক্ষাতকার পাবেন।

প্রশ্ন:দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকার সময় কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপারে গান্ধী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন সেটাকে আপনি বর্ণবাদী বলছেন। আপনি তার অবস্থানকে ত্রুটিপূর্ণ ও ভণ্ডামিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে মনে হচ্ছে। আপনি কি সত্যিই তেমনটি বলতে চাচ্ছেন?

অরুন্ধতী:আমি এসব বিশেষণ ব্যবহার করিনি। আমার মনে হচ্ছে, আমি আমার ভূমিকায় গান্ধীর বক্তৃতা ও রচনার অত্যন্ত সহজবোধ্য যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছি, আপনি সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। সত্যিকার অর্থে, আমি গান্ধীকে ভণ্ড মনে করি না। বরং এর বিপরীতে তিনি আশ্চর্য রকম খোলামেলা। আমি আরো অভিভূত হয়েছি যে তিনি তার সব লেখা, যেগুলোর কিছু কিছু (অন্তত আমার দৃষ্টিতে) অত্যন্ত সমালোচিত, সেগুলোও তিনি ‘কালেকটেড ওয়ার্কস’-এ ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।

এটা আসলেই উৎসাহজনক ব্যাপার। গান্ধী যে কয়েক বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন আমি তখনকার বিষয়ও লিখেছি। ওই সময়ের অল্প কিছু কথা এখানে বলছি। প্রথমত, গান্ধীকে পিটারমাটিজবার্গে ‘শ্বেতাঙ্গ সর্বস্ব’ রেলওয়ে কম্পার্টমেন্ট থেকে ছুঁড়ে ফেলার মাধ্যমে বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে তার রাজনৈতিক সচেতনা সৃষ্টি হয়েছিল বলে যে বিখ্যাত কাহিনীটি বলা হয়, তা কেবল অর্ধেক সত্য। অপর অর্ধেক হলো, গান্ধী বর্ণবাদী বিভাজনের বিরোধিতা করেননি। দক্ষিণ আফ্রিকায় তার অনেক আন্দোলন ছিল ভারতীয়দের সাথে আলাদা আচরণ করার দাবিতে। তিনি কেবল ভারতীয়দের প্রতি ‘নিগ্রোদের’ (যাদের কাফির হিসেবে বলা হয়েছে) মতো আচরণ করার বিরোধী ছিলেন। তার প্রথম দিককার রাজনৈতিক বিজয়ের একটি ছিল ডারবান ডাকঘরের ‘সমস্যা দূরীকরণ’। তার সফল আন্দোলনের ফলে তৃতীয় একটি দরজা খোলা হয়। ফলে ভারতীয়দের আর ‘নিগ্রোদের’ মতো একই দরজা ব্যবহার করতে হতো না। অ্যাংলো-বুয়র যুদ্ধে এবং বোমবাথা বিদ্রোহ দমনে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে কাজ করেছেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেছেন, তিনি ‘একটি রাজকীয় ভ্রাতৃত্ববোধ’-এর অপেক্ষা করছেন। এভাবেই কাহিনী এগিয়েছে। ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক নেতা জ্যাঁ স্মাটসের সাথে সমঝোতায় পৌঁছার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন গান্ধী। ভারতে ফেরার পথে তিনি লন্ডনে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি তার খেদমতের জন্য তাকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ পুরস্কার দেওয়া হয়। এটা কিভাবে বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়?

(চলবে…)
(আমাদের বুধবার, ১৩/০৪/২০১৪ )

You Might Also Like