হাইকলের বিস্ফোরক মন্তব্য এবং ইয়েমেন মিসর ইরান সৌদি আরব

ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরব ও ইরানের সাথে মিসরের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির এক অদ্ভুত খেলা শুরু হয়েছে। নবতিপর মিসরীয় সাংবাদিক হাসনেইন হাইকল এ ক্ষেত্রে পালন করছেন রহস্যজনক ভূমিকা। জামাল আবদুল নাসেরের অঘোষিত তথ্য উপদেষ্টা তৎকালীন আল আহরাম সম্পাদক হাসনেইন হাইকল প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে জেনারেল সিসির অভ্যুত্থানের নেপথ্য উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখন তিনি ইরানের সাথে মিসরকে বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করে সৌদি আরব ও মিসরকে লড়াকু প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা করছেন। একটি লেবাননি পত্রিকার সাথে দেয়া সাক্ষাৎকারে হাইকল বলেছেন, ইরানের পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে আরব দেশগুলোর কোনো লাভ হবে না বরং পাঁচ বছরের মধ্যে সৌদি রাজতন্ত্র ভেঙে পড়বে।

হাসনেইন হাইকলের এ ধরনের মন্তব্যের হয়তো তেমন কোনো তাৎপর্য থাকত না, যদি সিসির কর্মকাণ্ডে তার কৌশলগত চিন্তার প্রভাব লক্ষ করা না যেত। হাইকলের পরামর্শে সিসি ইতোমধ্যে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাথে গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। নেপথ্য সম্পর্ক তৈরি করেছেন ইরানের সাথেও। সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর সর্বতো-সমর্থনে সিসি মুসলিম ব্রাদারহুড ও প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে গণহত্যা ও দমনপীড়ন চালাতে পারলেও এখন অতীত সৌদি আনুকূল্যের কথা এই জেনারেল ভুলে গেছেন। এই অকৃতজ্ঞ মিসরীয় জেনারেল হুথি শিয়া বিদ্রোহীদের মাধ্যমে কায়রোতে এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজন করে ইয়েমেনে সৌদি আরবের যুদ্ধাপরাধ তুলে ধরার ব্যবস্থা করেছেন। সৌদি সরকারকে সিসি বার্তা দিতে চাইছেন, ব্রাদারহুড দমন ও দলটির নেতাদের গণফাঁসি দেয়ার কাজে শতভাগ সমর্থন না দিলে তিনি ইরান শিবিরে যোগ দেবেন। ইরানও সৌদি আরবকে শায়েস্তা করতে মিসরের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। মিসরীয় নাগরিকদের অন অ্যারাইভাল ভিসার ভিত্তিতে দেশটি সফরের নতুন সুযোগ দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে ইরান। দুই দেশের অতীত সম্পর্ক যে পর্যায়ে ছিল তাতে এটি কল্পনাও করা যায় না। ইরানের পক্ষ থেকে মিসরে সৌদি সহায়তা বন্ধ হলে তা পূরণ করার আশ্বাস দেয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।

ইয়েমেনের ব্রাদারহুড হিসেবে পরিচিত আল ইসলাহ পার্টির সর্বাত্মক সহযোগিতায় বন্দরনগরী এডেন থেকে হুথি-সালেহ মিলিশিয়াদের বের করে দেয়ার পর সেখানে যুদ্ধ ভারসাম্যে যে নতুন অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে ইরান সৌদি আরবকে চাপে ফেলতে চাইছে সিসিকে ব্যবহার করে। সিসির রহস্যজনক কর্মকাণ্ড দেখে সৌদি আরবের প্রভাবশালী ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান কায়রো সফরে গিয়ে মিসরের বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন। একই সময় বাদশাহ সালমানের সাথে জেনারেল সিসির টেলিফোনে আলোচনা হয়। হামাস নেতা খালিদ মিশালের সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফর এবং ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে সিসির সাথে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের আলোচনা হয়। এ সময় হামাস নেতার সৌদি আরব সফরের অনুমতি পবিত্র উমরাহ পালনের জন্য দেয়া হয়েছে বলে আশ্বস্ত করা হয়।

প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এই সফরকালে জেনারেল সিসি তার নীতি পদক্ষেপের ব্যাপারে কতটা আশ্বস্ত করেছেন এসব বিষয় নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে সিসি ইয়েমেনের সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে ব্ল্যাকমেইল করতে ইয়েমেনের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছেন। তার এই খেলার পেছনে কোনো কোনো পশ্চিমা দেশের ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করা হয়। হাইকলের রহস্যময় সাক্ষাৎকার প্রকাশ হওয়ার পর অনেক বিশ্লেষক তাৎপর্যপূর্ণ নানা মন্তব্য করেছেন। কেউ হাইকলকে আগাগোড়া আমেরিকার মিসরীয় এজেন্ট, কেউ মধ্যপ্রাচ্যের ‘বড় শয়তান’, কেউ আরব স্বার্থের শত্রু, আবার কেউ ইহুদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তাকারী হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পাশ্চাত্যের যে ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু করার পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে, তা বাস্তবায়নে হাইকল তার জীবনের শেষ সময়টাকে যে নিবেদন করতে চাইছেন তাতে সন্দেহ থাকছে না।

হাইকলের সাক্ষাৎকারের দু’টি মন্তব্য বিস্ফোরকতুল্য। একটিতে তিনি বলেছেন, পাঁচ বছরের মধ্যে সৌদি রাজতন্ত্র আর থাকবে না। অন্যটিতে তিনি বলেছেন, ইসরাইল রাষ্ট্রের যবনিকাপাত ঘটবে অনারব শক্তির দ্বারা, আরবরা এ কাজ করতে পারবে না। প্রথম মন্তব্যটি করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি মুসলিম শক্তির প্রধান রাষ্ট্র সৌদি আরবের শক্তি ও অবস্থান সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়ে আরব জনগণের নৈতিক মনোবল দুর্বল করতে চেয়েছেন। হাইকল এমনও বলেছেন, ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারায় বারাক ওমাবাকে একান্ত বাধ্য হয়ে চুক্তিটি করতে হয়েছে। কিন্তু এর আগে আফগানিস্তানে তালেবান ও ইরাকে সাদ্দাম শাসনের অবসান ঘটাতে ইরান-আমেরিকা অনেকটা এক কাতারে ভূমিকা রাখার বিষয়টি তিনি বলেননি। ইরান অমেরিকার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণ করেছে এ কথা সত্যি। কিন্তু ইরানের বাইরে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে তেহরান ভূমিকা রেখেছে এমনটি দেখা যায় না। সংখ্যাগুরু সুন্নি মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করতে ইরানকে আনুকূল্য দেয়ার সাথে পরমাণু চুক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি হাইকল একেবারে চেপে গিয়েছেন।

জামাল আবদুল নাসেরের অভ্যুত্থান, আরব ইসরাইল-যুদ্ধ ও পরে ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে নাসেরের অভিযানে সমর্থন জোগানো- হাসনেইন হাইকলের এ সব কিছুই ইসরাইল রাষ্ট্রকে শক্তি অর্জনে সহায়তা করেছে। এখন তিনি বলছেন, ইসরাইল রাষ্ট্রের পতন অনারবদের হাতে ঘটবে। এতে তিনি ইরানের প্রতি ইঙ্গিত দিতে চাইলেও কৌশলের স্বার্থে বলেছেন ইরান তুর্কি বা কুর্দিদের হাতে এটি ঘটতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য বিস্তারের পথে মিসরীয় সুন্নিরা যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তার জন্য তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের বিনাশের একটি কথা বলে রেখেছেন। হাইকল যে সিসির পক্ষে অভ্যুত্থানের সময় ভূমিকা রেখেছেন এবং পরবর্তী তার সব ধরনের অনৈতিক ও মানবাধিকার পরিপন্থী কাজে সমর্থন দিয়েছেন সেসব কাজের মূল পৃষ্ঠপোষক হলো ইসরাইলের কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু।

সিসি এমন এক সময় তার ইরান-হুথি কার্ড খেলতে শুরু করেছেন, যখন সৌদি আরব মার্চে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় যেতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের প্রশিক্ষিত হাদি অনুগত ইয়েমেনি সুন্নি যোদ্ধাদের হাতে এডেনে হুথি-সালেহ বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে। এডেন বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণে আসার কারণে প্রেসিডেন্ট হাদি অনুগত বাহিনীর সহায়তায় সৌদি জোটের নিয়মিত বাহিনীকে মোতায়েনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরবে প্রবাসী হাদি সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা এখন এডেনে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। পুরো ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম না হলেও সৌদি সামরিক অভিযান ব্যর্থ হবে বলে যে ধারণা করা হয়েছিল, তা এখন কেউ মনে করছেন না। সৌদি আরব যখন রাজধানী সানা দখল পরবর্তী লক্ষ্য হবে বলে ঘোষণা করেছে ঠিক তখনই ইয়েমেনে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত সৌদি আরবকে আর সামনে অগ্রসর না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ পরামর্শের যে অনেক তাৎপর্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নতুন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের ওপর সৌদি সমর্থিত হাদি সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব আর না-ও আসতে পারে। হয়তোবা ইয়েমেন আবার উত্তর-দক্ষিণ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে। এক দিকে সংখ্যাগুরু সুন্নিদের সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে আর অন্য দিকে থাকতে পারে হুথি-সালেহ সমর্থকদের সরকার। ইয়েমেনের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে হাদিপন্থীদের সাফল্য জাতিসঙ্ঘ যে রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছে, সেটির দর কষাকষিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অবস্থান শক্তিশালী হবে। হুথিদের এ ক্ষেত্রে প্রথম পরাজয়ের পর সামরিক সাফল্যের ব্যাপারে ইতোমধ্যে হতাশা নামতে শুরু করেছে।

এ কথা ঠিক যে, রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে একতরফা কোনো সামরিক সমাধান এখন বাস্তবসম্মত নয়। সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ সব শহর থেকে হুথিদের প্রত্যাহারের যে দাবি করে আসছিল, সেটিও বাস্তবে ঘটবে না। হুথি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দু’টি প্রদেশ সৌদি আরবসংলগ্ন বলে সেগুলোর ওপর সুন্নি শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ইয়েমেনের বাস্তবতাকে সামনে রেখে সেখানে একটি অসামরিক ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে সব পক্ষকে যেতে হবে। এটি না করে ইয়েমেনে সর্বাত্মক জয় চাইলে ইয়েমেনের ব্যাপক গণহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে, সেটি সৌদি শাসনকেও একপর্যায়ে হুমকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা শক্তি ইয়েমেনে যে এখন সৌদি কোয়ালিশনের বিজয় চাচ্ছে না, সেটি অনুমান করা কঠিন নয়।

মধ্যপ্রাচ্যে অগ্নিকুণ্ডলি সৃষ্টির পেছনে নেপথ্যে যারা কাজ করছে তারা তা করছে দুই পক্ষকে ইন্ধন দিয়ে। আর এ সমস্যার সমাধান না হওয়ার পেছনেও তাদের হাত রয়েছে। সিরিয়ায় তিন লক্ষাধিক মানুষের জীবনহানির পরও সেখানে যুদ্ধ ও অরাজকতা অব্যাহত থাকছে। সিসির কট্টর মার্কা জঙ্গি শাসন দিয়ে এই শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম রাষ্ট্রটিকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। ব্রাদারহুড নেতাদের নির্বিচারে ফাঁসি দেয়ার বিষয়টিও হতে পারে দেশটিকে কার্যত দু’টি ভাগ করে রাখার লক্ষ্যে। এ জন্য বিবদমান কোনো শক্তিকে নিঃশেষ হতে দিতে চায় না বিশ্বশক্তি চক্র। সিরিয়ায় যখন আসাদের সামরিক পরাজয় ঘটার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন বিদ্রোহীদের সামরিক সহায়তা সঙ্কুচিত করা হয়। আবার আসাদ যখন ইরান ও হিজবুল্লাহর সহায়তায় একপর্যায়ে দেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে পৌঁছে, তখন ঝোড়োগতিতে আইসিস রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি হওয়ার পর আটকে রাখা সম্পদ অবমুক্ত ও অবরোধ তুলে নেয়া হলে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে জোয়ার সৃষ্টি হবে। এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি শক্তির বিনাশ বা দুর্বল করার কাজে লাগাতে চাইছে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রকেরা। এ উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি মানচিত্র ভাঙচুরের বিষয় ঘটতে পারে। কিন্তু তাতে বিদ্যমান সুন্নি দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান পারস্য সাম্রাজ্য নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা অথবা ফাতেমি খেলাফত আমল ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন দেখছে, সেটিও বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

গত এক দশকের মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি যারা গভীরভাবে অবলোকন করে এসেছেন তারা বুঝতে পারবেন এই অঞ্চলে মানচিত্র পরিবর্তনের একটি এজেন্ডাকে সামনে নিয়ে পাশ্চাত্য শক্তি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আমেরিকান আর্মস ফোর্সেস জার্নালে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এক মানচিত্র প্রকাশ, লেবাননে ইসরাইলি হামলার পর তদানীন্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসের মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিন্যাসের প্রসব বেদনার সাথে এই আগ্রাসনকে তুলনা করা, এরপর আকস্মিক ‘আরব বসন্ত’ এবং এর দুই বছর যেতে-না-যেতেই ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী দমন-পীড়ন, সৌদি আরবের গা ঘেঁষে ইয়েমেনে শিয়া হুথিদের কর্তৃত্ব স্থাপনের সর্বাত্মক অভিযান, এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপ, মিসর সিরিয়া লিবিয়ার চলমান ঘটনাপরম্পরা- এ সব কিছু মধ্যপ্রাচ্যকে ভলকানাইজ বা উত্তপ্ত করে নতুন কিছু সৃষ্টির জন্যই করা হচ্ছে। এই কাজে মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নিপ্রধান দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণে হয়তো ইরানকে পাশে পেতে চাইছে পাশ্চাত্য।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ইরান তার প্রচারণা যুদ্ধে সব সময় আমেরিকা ও ইসরাইলের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করলেও আন্তর্জাতিকভাবে কদাচিৎ তাদের স্বার্থে আঘাত করে। এমন কথাও বলা হয় যে, ইরানে যে এক লক্ষাধিক ইহুদির বসবাস রয়েছে তাদের মাধ্যমে দেশটির সরকার ইসরাইলের সাথে একধরনের যোগসূত্র রক্ষা করে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তেহরানের ইসরাইলি সামরিক সরঞ্জাম প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই যোগসূত্র কাজ করেছে। ইরানের সাথে ছয় বিশ্বশক্তির যে পরমাণু চুক্তি হয়েছে, ইসরাইলের তার বিরোধিতা করার ব্যাপারটিকে অনেকে লোকদেখানো কৌশলের অংশ মনে করেন। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরে ইসরাইলের সাথে একটি গোপন যোগসূত্র বজায় রেখেছে বলে মনে করা হতো। যেটি আরব বসন্তের পরে অনেকটাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, ইরানও একই ধরনের যোগাযোগ তেল আবিবের সাথে রক্ষা করে এসেছে যার কারণে পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবে স্বাক্ষরিত হতে পেরেছে। এই চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান তার প্রভাব বলয় সৃষ্টির কাজ জোরেশোরে শুরু করেছে।

ইরানের একটি পত্রিকায় সম্প্রতি একটি মজার খবর প্রকাশ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ঈদুল আজহার পর ইরান সফরে যাবেন। এই সফর হবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে সৌদি আরব মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করবে। এর বিনিময়ে রাজতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত রয়েছে।

ইরানি মিডিয়ায় অনেক খবর বের হয় তাদের তাকিয়া বা কৌশলগত প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে। এই খবর তেমন কি না নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হাইকলের বক্তব্য ও সিসির তৎপরতা এবং ইয়েমেনে সৌদি কোয়ালিশনের অভিযানে পাকিস্তান-তুরস্ককে নিবৃত্ত রাখার ব্যাপারে সর্বাত্মক চাপের মধ্যে অনেক রহস্য রয়েছে। এক এক করে এসব রহস্যের গিঁট হয়তো খুলতে শুরু করবে অচিরেই। তবে এত কিছুর পরও মুসলিম বিশ্বের সুন্নি ও শিয়া ধারার দুই শক্তি একে অপরকে নির্মূল করার উসকানিতে পা ডুবিয়ে না দিয়ে অভিন্ন উম্মাহ স্বার্থের ব্যাপারে সমঝোতায় গেলে মুসলিম দুনিয়ায় একটি নতুন সময়ের সূচনা হতে পারে। পথটি খুব সহজ হবে তা মনে করার কারণ নেই। তবে অমানিশার স্থায়িত্ব একটি সময় পর্যন্ত, এর পর আলোর উদ্ভাসন হয় অনিবার্য।

mrkmmb@gmail.com

You Might Also Like