`সম্রাট আওরঙ্গজেব বনাম রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম’

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় :

তরুণী জুলিয়েট মধ্যযুগে ভেরোনা নগরীর বাসিন্দা ছিল। বর্তমান ভারতে থাকিলে সে প্রেমিক রোমিয়োকে উল্টা বুঝাইতে পারিত, নামে অনেক কিছু আসে যায়। প্রয়োজনে পূর্ব দিল্লির বিজেপি সাংসদ মহেশ গিরির কথা বলিতে পারিত। মহেশ প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখিয়া আবেদন করিয়াছেন, নয়াদিল্লির আওরঙ্গজেব রোডের নাম পরিবর্তন করিয়া সদ্য-প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের নামে করা হউক।

তাঁহার বক্তব্য, এই ভাবে কালামের স্মৃতি ও ঐতিহ্য অটুট থাকিবে। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তাঁহার বহুবিধ ব্যস্ততার কারণে এই আবেদন লইয়া উচ্চবাচ্য করেন নাই। নীরবতায় তাঁহারও মঙ্গল, দেশেরও মঙ্গল। কিন্তু মহেশ গিরির আবেদনে ভারতীয় রাজনীতিকদের কাজ না করিয়া শস্তা করতালি জোগাড়ের সুলভ পন্থাটি ফের প্রকাশিত হইল। ক্ষেপণাস্ত্র লইয়া গবেষণা নহে, তরুণ ভারতকে স্বপ্নের অগ্নিডানায় সওয়ার করা নহে। মায় দরিদ্র ও সংখ্যালঘু মৎস্যজীবী পরিবারের সন্তানের দেশের প্রথম নাগরিক হওয়ার উত্থানকাহিনি লইয়া পাঠ্যপুস্তকে প্রেরণা সঞ্চারও নহে। স্রেফ একটি পরিচিত রাস্তার নাম বদলাইয়া দিলেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির স্বপ্ন ও স্মৃতি অটুট থাকিবে!

মহেশ গিরি ব্যতিক্রম নহেন। জনপ্রতিনিধি হিসাবে এলাকায় নতুন রাস্তা, উড়ালপুল বা উদ্যান গড়িয়া তাহা আব্দুল কালামের নামে উৎসর্গ করিলেই প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হইত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাঁহাকে কাজ করিতে হইত। চাঁদিপুর বা অন্যত্র কালামের নামে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র-গবেষণাগার গড়াও তাঁহার চটজলদি আয়ত্তে নাই। অতএব, ঝটিতি দিল্লির জনবহুল রাস্তার নাম বদলাইবার প্রস্তাব। কালামের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন না হউক, জনপ্রিয়তা লাভের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ হইবে। সম্ভবত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বাঙালি মৌসুমি বাতাস দিল্লির বিজেপি নেতাদের শরীর ও মনে লাগিয়াছে। খিদিরপুরের কবিতীর্থ সরণি কী ভাবে কার্ল মার্ক্স সরণি হইয়া যায়, ধর্মতলা স্ট্রিট আচমকা লেনিনের নামে রূপান্তরিত হয়, সেই বিপ্লবস্পন্দিত ভোজবাজি বাংলার নিজস্ব। রাজা আসে, রাজা যায় তবু শস্তা জনপ্রিয়তার মোহ কাটে না। ই এম বাইপাস হইয়া যায় বিশ্ববঙ্গ সরণি, গড়িয়া বাজার স্টেশন নাম বদলাইয়া কবি নজরুল।

নামবদলের এই জীবাণুজ্বরে বাংলা কেন জর্জরিত, তাহার হয়তো ঐতিহাসিক কারণ রহিয়াছে। বাঙালি জানে, রুশ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ কখনও পেত্রোগ্রাদ, কখনও লেনিনগ্রাদ। অবশেষে এখন ফের সাবেক সেন্ট পিটার্সবার্গ। শতাব্দীপ্রাচীন সেই সোভিয়েত ভাইরাস এক্ষণে দিল্লির বিজেপি সাংসদকেও ধরাশায়ী করিয়াছে।

কিন্তু মহেশ গিরির সংক্রমণটি ভয়ঙ্কর। ৯/১১-উত্তর পৃথিবীতে সোভিয়েত পার্টিজান ভাইরাসটির মিউটেশন ঘটিয়াছে, সে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছে। ভাল মুসলমান বনাম খারাপ মুসলমান। বুদ্ধিমান মহেশ দিল্লির অরবিন্দ মার্গ বা বেদান্ত দেশিকা মন্দির মার্গের নামটি কালামের নামে রূপান্তরের প্রস্তাব করেন নাই। মুছিয়া দিতে হইবে শুধু মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাম। টুইটারে মহেশ-অনুগামীরাও এক বাক্যে বলিতেছেন, আওরঙ্গজেবের ন্যায় ধর্মান্ধ, অত্যাচারী শাসকের পরিবর্তে রাস্তাটি আব্দুল কালামের নামে রাখা হইলেই ভারতীয় সংস্কৃতির জিত হইবে। আওরঙ্গজেব ভারতীয় ছিলেন না? তিনি ধর্মান্ধ এবং অত্যাচারী ছিলেন কি না তাহা ইতিহাসের বিষয়।

বন্দি মরাঠা বীর শিবজি এবং শম্ভুজির জন্য তিনি হিন্দু পাচক রাখিয়া দিয়াছিলেন। হিন্দু-মুসলমান ও ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতিরাষ্ট্রের দাঁড়িপাল্লায় মধ্যযুগের ইতিহাসকে কখনও বিচার করা যায় না। কিন্তু মহেশকে ইতিহাস বুঝাইবার ধৃষ্টতা কাহার হইবে? তিনি জানেন, হিন্দু ও মুসলমান এই দুইটি নামে অনেক কিছু আসে যায়।

You Might Also Like