বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

রোজার ঈদের পর সাউথ লন্ডনে এক বন্ধুর বাসায় আড্ডা হচ্ছিল। বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন পরিচিত বন্ধু এসেছেন এবং ওই বাসাতেই উঠেছেন। তারা রাজনীতিক নন। অন্য পেশাজীবী। তবে বামঘেঁষা রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তি। বাঙালির আড্ডায় যা হয়, শেষ পর্যন্ত রাজনীতির কথা উঠল।

এক বন্ধু বললেন, দেশে এখন রাজনৈতিক প্রশান্তি নেই। হাসিনা দেশ ভালোই চালাচ্ছেন। তবে এত বেশি শান্তিতেও নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারছি না। দেশে শান্তি বিরাজিত থাকা সত্ত্বেও কেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না- জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, আমরা বহু বছর ধরে অশান্তির মধ্যে বাস করতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন টানা শান্তিতে অস্বস্তিবোধ করছি। এই সুখ কপালে কতদিন সইবে? এটা ঝড়ের আগের শান্তি নয়তো?

দ্বিতীয় বন্ধু, তিনিও বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, বললেন, এই শান্তি সহসা ভঙ্গ হবে মনে হয় না। এই সরকারের একটা বড় সাফল্য বিএনপি ও জামায়াতের সন্ত্রাসী রাজনীতির কোমর ভেঙে দেয়া। এখন এই সরকারের বিরোধিতা করতে হলে শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় এগোতে হবে। বিএনপি সম্ভবত অনেক ঠেকে এ কথাটা বুঝেছে। তাই জামায়াতের সংস্রব ত্যাগ করে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা ভাবছে। এমনকি খালেদা জিয়া এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ছেড়ে দিয়ে তাদের মুখ রক্ষার মতো যে কোনো ধরনের একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি।

প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় জনকে বললেন, আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু আমার কথা হল, এই শান্তিটা স্বাভাবিক শান্তি কিনা? আর স্বাভাবিক শান্তি না হলে তা কতদিন টিকবে? বিএনপি, জামায়াত ছাড়াও দেশে অশান্তি সৃষ্টি করার চক্র কি আর নেই? তারা এখন ঘাপটি মেরে থাকতে পারে; কিন্তু সুযোগ পেলেই মাথা তুলবে না তার নিশ্চয়তা কী? লিবিয়ার গাদ্দাফি কি ভাবতে পেরেছিলেন, তার দেশের ভেতরের কোনো বিরোধিতায় নয়, তিউনিসিয়ায় আবির্ভূত আরব স্প্রিংয়ের ঝড়ে তার দেশ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে?

তার এই বিশ্লেষণটা সঠিক মনে হল। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার মনে এই আশংকা দেখা দেয়ার কারণটা কী? তিনি বললেন, বাংলাদেশে এখন অশান্তির রাজনীতি নেই এ কথা সত্য। কিন্তু সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেও একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সংসদের ভেতরে এবং বাইরেও সরকারের বিরুদ্ধে কোনো শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক বিরোধিতা নেই। এটা গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য শুভ নয়। গণতান্ত্রিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে তা পূর্ণ করে অগণতান্ত্রিক অশুভ শক্তি। বাংলাদেশে এই অশুভ শক্তির অভ্যুত্থান আমরা কয়েকবার দেখেছি। দেশটাতে তাই বিএনপি-জামায়াতের অপরাজনীতি নিপাত যাক, কিন্তু একটা শক্তিশালী সুস্থ, গণতান্ত্রিক বিরোধী দল চাই; যারা সংসদের ভেতরে সরকারের ভুল কাজের সমালোচনা করবে এবং সংসদের বাইরে প্রয়োজন হলে সরকারের ভুল পদক্ষেপের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলবে।

সেদিনের ঈদের আসরেই রাজনৈতিক আলোচনা জমে উঠল। প্রশ্ন উঠল; বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের শূন্যতা পূর্ণ করতে পারে কারা? বিএনপি সংসদ এবং সংসদীয় নির্বাচন বর্জন করে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সন্ত্রাসের রাজনীতির পথে এগিয়ে গিয়েছিল। ফলে দলটি এখন বিপর্যস্ত। বিএনপি কি সহজে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসতে পারবে? আর পারলেও কতদিন লাগবে তা কেউ বলতে পারে না। বিএনপির নীতি ও নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে তার অসাড় দেহে চেতনা সঞ্চার সহজ নয় এবং তা সম্ভবও নয়।

দেশের ডান রাজনীতিতে এই মুহূর্তে মাথা তোলার মতো কোনো দল নেই এবং নেতৃত্বও নেই। ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস, ডা. বদরুদ্দোজা, কর্নেল (অব.) অলি প্রমুখ এখন রাজনীতির মাঠে কফিন। কাদের সিদ্দিকী এখন আর বঙ্গবীর নন, বাক্যবীর। গণফোরাম, বিকল্পধারা, লিবারেল ডেমোক্রেট নামে যে শক্তিশালী ডান রাজনীতির তৃতীয় ধারা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল তা মাঠে মারা গেছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল অলি প্রমুখ এখন কফিন অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিএনপিতে ফিরে আসার লক্ষ্যে দরকষাকষি করছেন।

সুযোগ ছিল এই মুহূর্তে প্রকৃত বাম গণতান্ত্রিক ধারার একটি শক্তিশালী সংগঠন অথবা মোর্চা গড়ে তোলার। কিন্তু দেশে বাম রাজনীতির শিবির এখন বিপর্যস্ত। অধিকাংশ বামদল নানাভাবে বিভক্ত। এর একটা বড় কারণ, দেশের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর এক সময় অভ্যাস ছিল নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে চীন অথবা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীল রাজনীতি করা। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় এবং চীন কার্যত মাওবাদ থেকে সরে আসতেই বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে এই দুই দেশের ওপর নির্ভরশীল বামদলগুলোতে বিভক্তি ও শক্তিহীনতা দেখা দেয়। এই অবস্থার ধকল তারা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

এককালের শক্তিশালী জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এখন ত্রিধারাবিভক্ত। দলের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে এখন বর্তমান সরকারের অংশ। আসম আবদুর রব এখন হারাধনের একটি ছেলে। জাসদ ভেঙে যে বাসদ হয়েছিল তারও ঐক্য টেকেনি। দেশের বাম রাজনীতিতে আরও এটি বামদল গুরুত্ব অর্জন করেছিল, সেটি ওয়ার্কার্স পার্টি। এই পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন এখন বর্তমান সরকারের মন্ত্রী এবং তার দলের ঐক্যও টেকেনি। তার দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সহচর হায়দার আকবর খান রনো; এককালে কট্টর চীনপন্থী বলে যার খ্যাতি ছিল, তিনি এখন সাবেক সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিতে। সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান আওয়ামী লীগ বিরোধিতাই রনোকে এই পার্টির দিকে টেনেছে।

আওয়ামী লীগ বর্তমানে মধ্য বাম রাজনীতির ধারায় নেই। মধ্য ডান রাজনীতিতে সরে এসেছে। একসময় মনে হয়েছিল, দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ ও একটি শক্তিশালী মিডিয়া গোষ্ঠীর প্রচারণা ও সমর্থনে কোনো কোনো প্রবীণ ও তরুণ নেতার উদ্যোগে হয়তো মধ্য বাম রাজনীতির ধারায় একটি শক্তিশালী দল গড়ে উঠবে। যে দল স্বাধীনতার মূল আদর্শের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান রাজনীতির বিরোধিতা করবে। নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলের শূন্যতা পূরণ করবে এবং দেশে দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির শুভ সূচনা ঘটাবে।

আমাদের অনেকের এ আশা পূর্ণ হয়নি। তথাকথিত সুশীল সমাজ বা তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যারা তৃতীয় ধারার রাজনীতি প্রবর্তনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, দেখা গেল তারা ওই সুশীল সমাজ ও নিরপেক্ষ মিডিয়ার মতোই গণতান্ত্রিক রাজনীতির চেয়ে হাসিনা-উৎখাত রাজনীতিতেই অধিক আগ্রহী এবং উৎসাহী। তাদের কথাবার্তা ও কার্যকলাপ প্রকারান্তরে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তারা নিজেদের পায়ের নিচে আর জমি পাননি।

গোটা ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে উপকথার বিড়াল ও ইঁদুরের গল্পের মতো। এক বাড়িতে একটি বিড়ালের অত্যাচারে ইঁদুররা জর্জরিত। রোজই সে হঠাৎ হানা দিয়ে ইঁদুর ধরে ধরে খায়। ইঁদুররা তাই একদিন গোপন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিল, বিড়াল যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তার গলায় একটি ঘণ্টা বেঁধে দিতে হবে। ফলে সে যখন আসবে তখন তার গলার ঘণ্টাধ্বনি শুনে তারা পালানোর সুযোগ ও সময় পাবে। সিদ্ধান্ত তো হল, কিন্তু সমস্যা দেখা দিল বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? কোন ইঁদুর প্রাণবাজি রেখে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে যাবে?

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেক বড় বড় আন্তর্জাতিক মদদপ্রাপ্ত নেতা পর্যন্ত ধরাশায়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে ড. কামাল হোসেন আছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস আছেন, এমনকি বঙ্গবীর কাদের

সিদ্দিকীও আছেন। হাসিনা নেতৃত্ব বলতে গেলে এই মুহূর্তে অপরাজেয়। তার দলও একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতায়। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় এবং সঠিক কর্মসূচিসহ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো এখন দেশে কে আছেন? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার হিম্মত তো কারও মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তরুণ প্রজন্মের গণজাগরণ মঞ্চ কি এই হিম্মত অর্জন করতে পারবে?

সেদিনের লন্ডনের আড্ডার আলোচনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান শান্ত অবস্থা আমাদের প্রত্যাশিত; কিন্তু তাতে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই শান্তির সঙ্গে রয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক শূন্যতা। এই শূন্যতা পূরণে যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের অশুভ শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এ ব্যাপারে হাসিনা সরকারেরও সচেতন ও সক্রিয় হওয়া উচিত। নেহেরু যেমন ভারতের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই জয়প্রকাশ নারায়ণকে বলেছিলেন, আপনি একটি নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠন করুন। কংগ্রেসের একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়। তাতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হবে।

আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতায়। বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী রাজনীতি আওয়ামী লীগ সরকার কঠোর হাতে দমন করুন; কিন্তু একটি নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক বিরোধী দল যাতে দেশে গড়ে ওঠে তাতে সহায়তা দিন। নইলে দেশে গণতন্ত্র টেকসই হবে না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে যারা বিশ্বাসী এবং সেক্যুলার রাজনীতিতে আস্থাবান, এমন একটি ডান অথবা বাম শক্তিশালী দল গড়ে ওঠা উচিত। যাদের কাজ হবে জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করা এবং জনগণের সমর্থন পেলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া। ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো দ্বিদলভিত্তিক সংসদীয় গণতন্ত্র বাংলাদেশেরও দরকার।

লন্ডন, রোববার, ২ আগস্ট ২০১৫।

You Might Also Like