রাষ্ট্র, ছিটমহল ও মানুষ

ছিটমহলে দেশ পাওয়ার উল্লাসগত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। দুটি দেশের মধ্যে ৬৮ বছর ধরে যে ক্ষত ছিল, তার নিরাময় করা কোনো ছোট কাজ নয়। এই কাজটির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে শুধু ছিটমহলের ৫০-৬০ হাজার অধিবাসী নন, দুই দেশের সব মানুষ কৃতজ্ঞ। ভারতের আইনি জটিলতার কারণেই দীর্ঘদিন ছিটমহল বিনিময় আটকে ছিল। এবার ভারতের পার্লামেন্ট স্থলসীমান্ত চুক্তি, যার ইংরেজি নাম দ্য ল্যান্ড বাউন্ডারি অ্যাগ্রিমেন্ট (এলবিএ), সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করে। আমরা ভারতের পার্লামেন্টের সব সদস্যের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আরও দুজন নেতাকে স্মরণ না করলে তা হবে তাঁদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা। তাঁরা হলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁরা ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লিতে স্থলসীমান্ত রেখাসংক্রান্ত যে চুক্তি করেন, সেই চুক্তি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত কাজটি সম্পন্ন হলো ৩১ জুলাই। শান্তিপূর্ণভাবে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত নির্ধারণ একটি বিরল ঘটনা।

প্রায় সাত দশক ঝুলে থাকার পর ছিটমহল বিনিময় ছিটমহলে বসবাসকারীদের জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। রাষ্ট্রের মূলধারায় যুক্ত হওয়া অতি আনন্দের কথা। তারা শুরু করতে যাচ্ছে একটি নতুন জীবন। কিন্তু এই মুহূর্তটি নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ার যে ‘বাঁধভাঙা উল্লাস’ তা খুব মানানসই বলে মনে হয়নি। অতি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উপলক্ষটি দাবি করে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। সব ব্যাপারে কাব্য ও সাহিত্য চলে না। বিশেষ করে যেসব প্রশ্নে আইনি জটিলতা বা সংবিধির মারপ্যাঁচ, যা দাবি করে প্রশাসনিক দক্ষতা, সেখানে অলংকারবহুল ভাষা অবশ্যপরিত্যাজ্য। জীবনের অনেক অস্বাভাবিক ও জটিল বিষয় নিয়ে কথাসাহিত্য রচনা করে পাঠককে আনন্দ দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে জীবনের জটিলতা ও সমস্যা দূর হয় না। বাস্তববাদীদের কর্তব্য সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে জটিলতা ও সমস্যার মীমাংসা করা।

সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন বা লেখালেখি করছেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, তাঁরা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিটি পাঠ করার বা দেখার সুযোগ পাননি। তার ফলে বিষয়টির গভীরতা সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি এবং হাসিনা-মনমোহন-মোদি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কী কী জটিলতা দেখা দিতে পারে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ারের মধ্যে অনেকেরই নেই।

হতভাগ্য ছিটবাসী স্রেফ রাজনীতির শিকার। তারা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার শিকার। কোনো অপরাধ না করে রাজনীতিকদের ব্যর্থতার কারণে তারা ৬৮ বছর অনেকগুলো উন্মুক্ত কারাগারে বন্দী রইল। জেলখানায় সাজা ভোগ করার চেয়ে তাদের এই শাস্তি কম কঠোর ছিল না। হাজার হাজার মানুষ স্বাধীন মানুষের জীবনযাপন করেনি। তাদের দু-তিনটি প্রজন্ম এর মধ্যেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে মুক্ত মানুষের জীবনের স্বাদ না নিয়েই।

অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ এক ধাক্কায় সব দোষ স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের ঘাড়ে চাপিয়ে আনন্দ পান। তাঁদের মতে, উপমহাদেশের মানুষ সাধু অতিশয়, যত খারাপ ব্রিটিশ। ১৯৪৭-এর আগস্টে ভারত-পাকিস্তান সীমারেখা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ আইনজ্ঞ র্যা ডক্লিফকে। তাঁকে যাঁরা আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তাঁরা ভুলে যান যে তাঁর টিমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কয়েকজন দক্ষ ভূগোলবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। এই ছিটমহলের প্রশ্নে কারও দায় থাকলে সে দায় তাঁদেরও নিতে হবে।

১৯৪৭-এর ১৪-১৫ আগস্টের পূর্ববর্তী ১৫ দিন এই উপমহাদেশে যা ঘটেছে তার অনেকটাই পৃথিবীর মানুষ জানে, তবে কিছু কিছু ঘটনা এখনো অজানা। বেচারা র্যাডক্লিফ যা করেছেন তার বেশি বিশেষ কিছু তাঁর করার সাধ্য ছিল না। তবে একটি কাজ তিনি করতে পারতেন, তা হলো তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে হঠাৎ ঘোষণা দিতে পারতেন যে ‘আমার বুকের বাঁ দিকে প্রচণ্ড ব্যথা, তাড়াতাড়ি আমাকে লন্ডনে পাঠাও।’ তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি বহুদিন পর কিছু কথা লিখে গেছেন। দুই রাষ্ট্রের সীমান্ত নির্ধারণ করে দলিলে, যাকে বলা হয় র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ, স্বাক্ষর করে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহরুর হাতে দিয়ে সৈনিকদের পাহারায় তিনি যেভাবে পালাম বিমানবন্দরে গেছেন এবং বিমানের সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে প্লেনে গিয়ে উঠেছেন, তা বিধাতা ছাড়া আর কেউ জানে না।

উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর ‘রাজনৈতিক ভূগোল’ গত আড়াই শ বছরে যে কতবার পরিবর্তিত হয়েছে, তা জানা যায় পশ্চিমবঙ্গ সেক্রেটারিয়েট লাইব্রেরি, ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভে ডিরেক্টরেট, ন্যাশনাল আর্কাইভসের দলিলপত্র থেকে। কিছু কিছু আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে জেলাগুলোর ভূগোলের যত পরিবর্তনই হোক, সেখানকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা থেকে গেছে ভাগ্যবিড়ম্বিত।

রায় বাহাদুর মনমোহন চক্রবর্তী বাংলার জেলাগুলোর রাজনৈতিক ভূগোল বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁর কিছু রচনা আমি পশ্চিমবঙ্গ সেক্রেটারিয়েট লাইব্রেরিতে পাঠ করেছি। তাঁর ‘আ নোট অন দ্য জিওগ্রাফি অব ওল্ড বেঙ্গল’ প্রাচীন বাংলা সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। ওটি প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়। তাঁর অবিস্মরণীয় ও সবচেয়ে মৌলিক গ্রন্থ আ সামারি অব দ্য চেঞ্জেস ইন দ্য জুরিসডিকশন অব ডিস্ট্রিক্টস ইন বেঙ্গল ১৭৫৭-১৯১৬। ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট প্রেস থেকে ১৯১৮ সালে বইটি প্রকাশ করে। রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং জেলার বারবার পরিবর্তিত ভূগোল সম্পর্কে ধারণা না থাকলে ’৪৭-এর ছিটমহল সমস্যার মূল কারণ বোঝা যাবে না। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামন্ত রাজ্যগুলোর রাজাদের মর্জিমতো বারবার বদল হয়েছে বিভিন্ন জায়গার প্রশাসনিক সদর দপ্তর। ১৯৪৭-এ যখন ভারত-পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারিত হয় তখন সামন্ত রাজ্যগুলোর কারণে ছিটমহলগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। সেই সমস্যার একধরনের নিষ্পত্তি হলো গত শুক্রবার।

গত দু-তিন দিনে কেউ কেউ না জেনে আন্দাজে আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম নিয়ে কথা বলছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। এই দুটি ছিটমহল ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে হলেও ওগুলো বাংলাদেশের। এই জন্যই শুরুতে আমি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির কথা উল্লেখ করেছি। ওই চুক্তিতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ বেরুবাড়ির ২ দশমিক ৬৪ বর্গমাইল এলাকা ভারতকে দেওয়া হয়, তার বিনিময়ে দহগ্রামে যাতায়াতের জন্য তিন বিঘা জমি (১৭৮ মিটার X ৮৫ মিটার) বাংলাদেশকে ‘চিরকালের জন্য’ ইজারা দেয় ভারত (… in exchage Bangladesh will retain the Dahagram and Angarpota enclaves.) আঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের তিন দিকে কোচবিহার, এক দিকে তিস্তা নদী এবং নদীর ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ড। এই ‘তিন বিঘা’ প্রবেশপথ নিয়ে বহু বছর জটিলতা গেছে, ২০১১ থেকে এটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় ওখানকার অধিবাসীর যাতায়াতে অসুবিধা আছে, কিন্তু তারা অবরুদ্ধ ছিল না।

ছিটমহল বিনিময়ের পরবর্তী জটিলতাগুলো অতি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। ছিটমহলের অধিবাসীদের নাগরিক জীবনের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। দেশীয় রাজ্য কোচবিহারের রাজার কিছু কিছু অংশ পঞ্চগড়, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, দেবীগঞ্জ, ডিমলা, লালমনিরহাট, ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলায় ছিল। কোচবিহারের মহারাজা নারায়ণ ভুপ বাহাদুর ’৪৭-এর পরে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেন। তার ফলে পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি, লালমনিরহাটে ৫৯টি এবং নীলফামারীতে চারটি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়। কোনো কোনো ছিটমহল ছিল ক্ষুদ্র।

ভারতের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহল পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দা মনসুর আলি মিয়া বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমার জন্ম ১৯৪১ সালে। আমার বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ এই গ্রামেরই বাসিন্দা। ’৪৭ সালের আগস্টে ভারত স্বাধীন হলে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেল। ১৯৪৯ সালে কোচবিহারের রাজা ভারতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর তাঁরা হয়ে গেলেন ছিটমহলের বাসিন্দা। ১৯৭১ সালে আবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে জন্ম নিল বাংলাদেশ। দু-দুবার আমরা স্বাধীনতা দেখলাম, কিন্তু ছিটমহলে যারা থাকি, তারা তখনো প্রকৃত স্বাধীনতা পাইনি। ৬৮ বছর ধরে আমরা অন্ধকারের বাসিন্দা। নাগরিকত্ব নেই, প্রশাসন নেই, মিথ্যাকে আশ্রয় করে বাস করতে হয় আমাদের। স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য ভারতের হাসপাতালে নিয়ে গেলে স্বামীর নাম বদলাতে হয়। এভাবেই মামাকে বাবা বানিয়ে ভারতের স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করে আমাদের ছেলেপুলে।’

যে ৫১টি ছিটমহল ভারতে যাচ্ছে তারই একটি পোয়াতুরকুঠি। মনসুর আলি আরও বলেন, ‘এ রকমও হয়েছে, ১৯৬৬ সাল থেকে

প্রায় সাত বছর আমরা গ্রাম থেকে বেরোতে পারিনি। গ্রামে ফেরিওয়ালা আসত। আমরা গ্রাম থেকে বেরোলেই ভারতের পুলিশ তাড়া

করত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এই কড়াকড়িটা কমে যায়। আমার তো বয়স হয়ে গেল, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে যেন মনুষ্যেতর জীবন না কাটাতে হয়, তারা যেন নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারে—এটাই আমার আশা।’ আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘লম্বা

দাড়ি নেড়ে বলছিলেন মনসুর আলি, এই নিয়ে তিনটে স্বাধীনতা পেলাম আমরা। আর কেউ কি পেয়েছে তা? আগের দুটো স্বাধীনতা অন্ধকার এনেছে ছিটমহলবাসীর জীবনে। এই স্বাধীনতা আলো আনবে, আলো।’

আমাদের প্রত্যাশাও তা-ই। সাবেক ছিটমহলবাসীর জীবন আলোকিত হোক। তবে পৌনে এক শতাব্দী ধরে যারা বঞ্চনার শিকার, রাতারাতি তাদের জীবন আলোকিত হবে, তা মনে করা ভুল। যেখানে রাষ্ট্র রয়েছে, ধর্মীয় পরিচয় যে পৃথিবীতে খুবই প্রাধান্য পায়, সেখানে সমস্যা না থেকে পারে না। বাংলাদেশে আসা ছিটমহলের হিন্দু অধিবাসীদের এবং ভারতে পড়া ছিটমহলের মুসলমান অধিবাসীদের অনেকের পারিবারিক জীবনে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এই উপমহাদেশে সেটা বাস্তবতা।

এখন সাবেক ছিটবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দের অঙ্কটাই প্রধান নয়, টাকাটার সদ্ব্যবহারই বড় কথা। ওই টাকা কায়েমি স্বার্থ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পেটে যেন না যায়, সে দিকে কড়া নজর থাকা দরকার। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতিতে দৃষ্টি দিতে হবে। অর্থনীতির মূলধারায় তাদের সম্পৃক্ত না করলে অভাব থেকে ক্ষতিকর রাজনীতি ও অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে অনেকে। এ ব্যাপারে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ভূমিকা রাখবে—এই প্রত্যাশা করি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

You Might Also Like