মন্ত্রীর ‘শিষ্টাচার’ ও ‘রাবিশ’ প্রসঙ্গ

আমাদের বাহাত্তরে পাওয়া অর্থমন্ত্রীর নাম আবুল মাল আব্দুল মুহিত। নামটা তার বেশ বড়। ফলে এই নামের যেকোনো অংশ ধরেই তাকে সম্বোধন করা নিশ্চয়ই ‘শিষ্টাচার’ বহির্ভূত হবে না। কেউ তাকে আবুল ডাকতে পারেন। কেউ তাকে মাল ডাকতে পারেন। কেউ ডাকতে পারেন আব্দুল, কেউ বা মুহিত। যেমন আমার নাম রেজোয়ান সিদ্দিকী। আমার সহকর্মীদের কেউ কেউ আমাকে ডাকেন রেজোয়ান সাহেব, কেউ ডাকেন রেজোয়ান। কেউ ডাকেন ড. সিদ্দিকী, কেউ বা সংক্ষেপে রেসি। এর সব ডাকেই আমি সাড়া দিই। আমি বুঝতে পারি, তারা আমাকেই ডাকছেন। ফলে আশা করি, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে ‘মাল’ বলে ডাকা কোনো অন্যায় কাজ হবে না। কেননা তিনি কখনো ঘোষণা করেননি যে, তাকে কোন নামে ডাকতে হবে। খবরের কাগজের শিরোনামে ব্যবহারের জন্য আমাদের অনেক সময়ই শব্দ-সাশ্রয় করতে হয়। সেই কারণে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে আমরা যেকোনো অংশে প্রকাশ করি। পাঠকেরা ঠিক ঠিকই বুঝে যান, আমরা কী বলতে চাচ্ছি বা কার সম্পর্কে বলতে চাচ্ছি। এখন এই আবুল মাল সাহেব এক বিরাট ‘শিষ্টাচার’ সঙ্কটে পড়েছেন।

তার ‘শিষ্টাচারের’ কী মাত্রা এটা এখনো আমরা ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। আবোল-তাবোল বকা তার একটা মারাত্মক বদভ্যাস; যা কিছু তার বিরুদ্ধে যায়, তাকেই তিনি ‘রাবিশ’, ‘স্টুপিড’, ‘ননসেন্স’ বলে অভিহিত করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এসব বলেটলে আবার কখনো কখনো এমন কথাও বলেন যে, আমি বুড়ো মানুষ কখনো কখনো ভুল হয়ে যায়, আপনারা ‘মাইন্ড’ করবেন না। এ নিয়ে আমরা সাধারণ নাগরিকেরা এক উত্তেজনাকর অবস্থায় আছি। বাংলাদেশে এখন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার বলে কিছু নেই। শেখ হাসিনা যা বলেন, সেটাই আইন, সেটাই সংবিধান, সেটাই নির্বাচন, সেটাই নীতিনির্ধারণের বিষয়। ফলে আবুল মাল সাহেব কোন চিপায় কী বললেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়।

কিন্তু হঠাৎ করেই তা ইস্যু হয়ে দাঁড়াল। পরিকল্পনামন্ত্রী আ ফ ম মুস্তফা কামাল গত ১ এপ্রিল এডিপি সংশোধন নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সম্পর্কে একধরনের কটূক্তি করেন। তিনি সংবাদিকদের সাথে বলেন যে, ‘উনি (অর্থমন্ত্রী) আমাকে অনুধাবন করতে বলেছেন। আমি তো উনার সহকর্মী, অধীনে না। উনি বিশাল বাজেট দেন, হাজার হাজার কথা বলেন। অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেন না। বাজেট বক্তৃতা দিতে গিয়ে শুয়ে পড়েন। আমি হলে ১৫ পাতায় বাজেট শেষ করে দিতাম।’ তিনি বলেন, ‘তবে এটা ঠিক যে, উনার বয়স হয়েছে। অনেক ভুল-ভাল করেন। আমরা মাফ করে দেই।’ পরিকল্পনামন্ত্রী আরো বলেন, ‘আবুল মাল সাহেব বিশ্বব্যাংকের পেনশন খান। ফলে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কিছু বলার ক্ষমতা তার নেই।’

এ কথায় আবুল মাল সাহেব ভয়ানক রুষ্ট হয়েছেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের পেনশন খান কি খান না, সে বিষয়ে তিনি বলেছেন যে, ‘পরিকল্পনামন্ত্রী ভুল তথ্যের ওপর বক্তব্য দিয়ে ফেলেছেন। আই ডোন্ট গেট এনি পেনশন ফ্রম অ্যানিওয়ান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, একসেপটিং (দি) গভর্মেন্ট অব বাংলাদেশ।’ পরিকল্পনামন্ত্রী কামাল অর্থমন্ত্রীর বিশ্বব্যাংক ঋণ বিষয়েও কথা বলেছিলেন। সে বিষয়ে আবুল মাল সাহেব বলেন যে, ‘এ বিষয়ে আমি এক দিন বলেছিলাম যে, পদ্মাকে অসম্মান করার কারণে আমি বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাই। তবে আমি এটাও বলেছি যে, মামলা হয়তো করব, যখন মন্ত্রী থাকব না এবং প্রাইভেট সিটিজেন হবো। কারণ বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের হাইয়েস্ট ডেভেলপমেন্ট পার্টনার। সুতরাং মন্ত্রী হিসেবে মামলা করাটা শিষ্টাচারবহির্ভূত।’

পিপিপি বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ ফ ম মুস্তফা কামাল আবুল মালকে অভিযুক্ত করেছিলেন। তার জবাবে জনাব মুহিত বলেন যে, ‘এটি তারই দুর্বলতা। এটি তারই সংশোধন করা উচিত। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। মুহিত বলেন, পিপিপি হচ্ছে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনসেপ্ট। আমি বাংলাদেশে এটা সৃষ্টি করিনি।’

এটা আমাদের আলোচনার মুখ্য বিষয় নয়। আমাদের আলোচনার মুখ্য বিষয় মুহিত সাহেবের ‘শিষ্টাচার’ প্রসঙ্গ। পরিকল্পনামন্ত্রী আ ফ ম মুস্তফা কামালের বক্তব্যের জবাবে আবুল মাল সাহেব এক চৌকস কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মন্ত্রীরা শুড মেইনটেন সাম লেভেল অব শিষ্টাচার।’ এর চেয়ে হাসির কথা বোধ করি সাম্প্রতিক রাজনীতিকে খুব বেশি একটা হয়নি। আবুল মালের আগে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। তা নিয়ে বছরভর সব মিডিয়া একযোগে বাবরের সমালোচনা করেছে। আমিও করি। কখনো কখনো আমরা বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে কথা বলি। সেখানে হুট করে ইংরেজি শব্দটি মনে না এলে বাংলা শব্দটি ব্যবহার করে ফেলি। যেমনÑ আমাদের পোলাপানেরা তাদের প্রেমিক-প্রেমিকাদের উদ্দেশে লেখে যে, ‘আই লাভ ইউ, জান’। তার বদলে তারা লিখতে পারত, ‘আই লাভ ইউ, সুইট হার্ট।’ এ বাক্যকে ভুল ধরে তুলকালাম কাণ্ড করার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষ যেভাবে তার মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করতে পারে, সেভাবেই তা করতে দেয়া উচিত। সে হিসেবে বাবরও কোনো দোষ করেননি। আবুল মাল সাহেবও কোনো দোষ করেননি।

কিন্তু আবুল মাল সাহেব যখন বললেন যে, ‘মন্ত্রীরা শুড মেইনটেন সাম লেভেল অব শিষ্টাচার’, তখন হাসবো না কাঁদবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বাবরের বিরাট অপরাধ হয়েছিল যে, তিনি বলেছিলেন, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। তখন মিডিয়ায় কী যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটল, সেই সময় আওয়ামী লীগের পা-চাটা মিডিয়াগুলো একেবারে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। বাবর মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছেন। কিন্তু বাহাত্তরে পাওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল যখন বললেন, ‘মন্ত্রীরা শুড মেইনটেন সাম লেভেল অব শিষ্টাচার’ তখন সেই একই মিডিয়া (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক) একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। বাবর খুব খারাপ। তিনি বাংলা-ইংরেজি গুলিয়ে ফেলেছিলেন। তবে কি মাল সাহেব খারাপ নন? তিনিও ইংরেজি বাংলা গুলিয়ে ফেলেছেন। সরকারের পদলেহী মিডিয়া এবারে একেবারে নিশ্চুপ। শুনেছি বাবর নাকি অশিক্ষিত ছিলেন। ফলে তিনি এসব হাবিজাবি কথা বলেছেন। তবে কি আবুল মালও অশিক্ষিত? কই, বশংবদ মিডিয়া কথা বলছেন না কেন? শিষ্টাচারের বদলে তিনি এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। বাবর যদি অশিক্ষিত হয়ে থাকেন, আবুল মাল তার চেয়েও অধিকতর অশিক্ষিত। কিন্তু মিডিয়া এখন নিশ্চুপ। বিএনপির মন্ত্রী অশিক্ষিত হলে দোষ। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী অশিক্ষিত হলে কোনো দোষ নেই।

সরকারের মুশকিল এখানেই। কিংবা আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মুশকিলও এখানেই। তারচেয়ে বয়োবৃদ্ধ কেউ আর মন্ত্রিসভায় নেই। জাতীয় সংসদে যখন বিএনপি, খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে আওয়ামী লীগের অর্বাচীন সদস্যরা মিথ্যা, অসঙ্গত, মনগড়া বক্তব্য দিতে থাকেন, তখন জাতীয় সংসদের প্রবীণতম সংসদ সদস্য হিসেবে আবুল মাল কোনো দিনও উঠে দাঁড়িয়ে বলেননি, এসব বক্তব্য অসঙ্গত, শিষ্টাচারবহির্ভূত। অর্থাৎ ওদের কাতারেরই লোক, তার বাইরে কিছু নন।

পরিকল্পনামন্ত্রী কামাল সাহেব এ রকম অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে দু-চার কথা বলেছেন। এখন পর্যন্ত শুনিনি যে, প্রধানমন্ত্রী কার পক্ষ অবলম্বন করেছেন। তার ভেদ বোঝা বড় দুষ্কর। তিনি আবুল মালের পক্ষেও দাঁড়াতে পারেন, আবার কামালের পক্ষেও দাঁড়াতে পারেন। তখন পরিষ্কার হবে কে তার গুডবুকে আছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী কামাল সাহেব যা বলেছেন, তার সাথে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু অর্থমন্ত্রী মূল প্রসঙ্গে না গিয়ে শিষ্টাচারের কথা বলেছেন। তিনি বয়োবৃদ্ধ মানুষ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন যে, বিএনপি যদি এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে তা নির্বাচনই হবে না। এই তিনি সে নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিনাভোটে ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। তার কোনো লজ্জাবোধ হয়নি। মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বয়স্ক লোক হিসেবে যদি তার ন্যূনতম আত্মমর্যাদা থাকত, তাহলে তিনি নিজের পদত্যাগ করতেন। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি আর মন্ত্রী থাকতে চান না। তারপর বিনাভোটে মনোনীত হয়ে তিনি আবারো অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর চেয়ে স্ববিরোধিতা আর যে কী হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

আমরা বারবার বলেছি, এই নির্বাচন নিয়ে শুভবুদ্ধির বিজয় হোক। কিছু সাহেব তা উপলব্ধিও করেছিলেন। কিন্তু শেষে বললেন কী, ‘মন্ত্রিত্বের অফার এলে চুপ করে কি থাকা যায়?’ এ ধরনের কথা যারা বলেন, তাদের ব্যক্তিত্বহীন মানুষ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বাবরের ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’ যদি অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে মুহিত সাহেবের ‘মন্ত্রীরা শুড মেইনটেন সাম লেভেল অব শিষ্টাচার’ও অন্যায়। জনাব মুহিতকে অনুরোধ করব, শিষ্টাচারটা আপনি মেইনটেন করার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগের নষ্ট রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না। তাহলে বুঝব আপনি শিষ্টাচারের একটি অর্থবহ সমাধান আনলেন। নইলে যাদের অপমান করতে চাইছেন, ‘অপমান হতে হবে তাদের সমান’।

সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

You Might Also Like