রমজানের শিক্ষা এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব

আজকের কলামে পবিত্র রমজান নিয়ে, রমজানের শিক্ষা নিয়ে এবং সার্বিকভাবে দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতির দায়িত্ব নিয়ে কিছু কথা বলব। রমজানুল মোবারকের দিনগুলোকে তিনটি দশকে ভাগ করা আছে। প্রথম দশকে মুখ্য বিষয় রহমত তথা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য অধিকতর দয়া ও কল্যাণ বর্ষণ; দ্বিতীয় দশকে মুখ্য বিষয় মাগফিরাত তথা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাদের গুনাহ মাফ; তৃতীয় দশকে মুখ্য বিষয়, দুনিয়ায় কৃত অপরাধের জন্য শেষ বিচারে বান্দা যেন দোজখের আগুনে নিক্ষিপ্ত না হয় তার জন্য প্রার্থনা ও প্রার্থনা পূরণ। পাঠক যখন এই কলাম পড়ছেন, তখন তৃতীয় দশক শুরু হয়ে গেছে। আর কয়েকদিন পরই পবিত্র ঈদুল ফিতর। পবিত্র রমজানে আমরা ব্যক্তিপর্যায়ে চেষ্টা করেছি নিজ নিজ আওতায়; কিন্তু আমরা সম্মিলিতভাবে কতটুকু চেষ্টা করেছি, এটা অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে কে কী করছি সেটা নিয়ে আমরা কোনো কিছু বলতে পারব না; কিন্তু সমষ্টিগতভাবে আমরা যে পবিত্র রমজানকে যথেষ্ট সম্মান করছি না, এটা অবশ্যই বলতে পারব। পবিত্র রমজানের শিক্ষা আমরা সমষ্টিগতভাবে গ্রহণ করছি না। কেন করছি না বা কেন পারছি না, এর উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, বাংলাদেশের মিডিয়া ব্যবস্থা ইত্যাদির মধ্যেই নিহিত আছে। না পারার সামগ্রিক দায় অবশ্যই বাংলাদেশের রাজনীতিক সম্প্রদায়কে নিতে হবে। প্রত্যক্ষভাবে দায়িত্ব নিতে হবে ক্ষমতায় আসীন এবং দেশের শাসন কার্যে নিয়োজিত রাজনীতিক সম্প্রদায়কে। কেন, সেই প্রসঙ্গে সম্মানিত পাঠক যেন নিজের মনের ভেতর নিজেই উপসংহার টানতে পারেন তার জন্য আমি ইতিহাস থেকে দুটি উদাহরণ দেব। প্রথম উদাহরণটি আনুমানিক ১৩৮০ বা ১৩৮৫ বছর আগের। দ্বিতীয় উদাহরণটি মাত্র ২৪ বছর আগের।

প্রথম উদাহরণ। ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদা বা খোলাফায়ে রাশেদীন যাদের বলা হয়, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় হলেন হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)। বিশ্বনবী এবং শেষ নবী ও শেষ রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পরপরই দুই বছর খলিফার দায়িত্ব পালন করেছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তারপরই দায়িত্ব নিয়েছিলেন হজরত ওমর (রা.)। হজরত ওমরের (রা.) শাসনামলের একটি ঘটনা প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু আমার সন্দেহ, তরুণ ও নবীনদের মধ্যে জানেন না এমন লোকই বেশি। সে জন্যই আমি ঘটনাটি এখানে আবার উল্লেখ করছি।

হজরত ওমর (রা.) প্রায়ই রাত্রিকালে সাদামাটা পোশাকে ও পরিচয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ও বিভিন্ন জনপদে ঘুরে বেড়াতেন। উদ্দেশ্য, কোনো অনিয়ম বা অন্যায়ের ঘটনা নিজের চোখে দেখা বা নিজের কানে শোনা। একদিন রাতে তিনি এরূপ অবস্থায় একজন বৃদ্ধার ঘরের পাশে অগোচরে উপস্থিত হয়েছিলেন। বৃদ্ধা তথা সংসারের কর্ত্রী চুলায় পানি গরম করছেন। ঘরের মধ্যে শিশুরা কান্নাকাটি করছে ক্ষুধার জ্বালায়। বৃদ্ধা শিশুদের আশ্বাস দিচ্ছেন, খাবার এখনই হবে, তোমাদের এখনই খেতে দেব। আসলে বৃদ্ধার চুলার ডেকচিতে গরম পানি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। শিশুদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছিলেন যেন কান্নাকাটি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে শিশুরা একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। হজরত ওমর (রা.) বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই নাটক কেন? বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, তিনি দরিদ্র, তার ঘরে কোনো খাবার নেই, কিন্তু শিশুরা তো এটা বুঝবে না। খলিফা ওমর নিজের পরিচয় না দিয়ে প্রস্থান করলেন। রাষ্ট্রীয় খাদ্য ভাণ্ডার থেকে বস্তায় করে কিছু আটা নিলেন, নিজের পিঠে সেটাকে বহন করলেন এবং সেই বৃদ্ধার কাছে পৌঁছে দিলেন। ওই বৃদ্ধা আশ্চর্য হলেন, অভিভূত হলেন। খাদ্যদ্রব্যের বাহককে দোয়া করলেন। বৃদ্ধা বললেন, জনৈক ওমর নামক ব্যক্তি আমাদের দেশের শাসনকর্তা; তুমি যেন ওমরের জায়গায় শাসনকর্তা হও এই দোয়া করছি। ওমর তো আমাদের খোঁজখবর নেয় না, তুমি শাসনকর্তা হলে খোঁজখবর নেবে, এটাই আমি বিশ্বাস করলাম। নিজের পরিচয় গোপন রেখে আবারও প্রস্থান করলেন ওমর (রা.)।

আমাদের দেশের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ইসলামের সোনালি যুগের শাসন ব্যবস্থার মতো নয়, এটাই বাস্তব। এর জন্য আমি অভিযোগের পাহাড় উপস্থাপন করছি না। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের দেশের বর্তমান শাসক, সাফল্যের জন্য বা তথাকথিত সাফল্যের জন্য যদি কৃতিত্ব পেতে পারেন বা কৃতিত্ব নিতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই ব্যর্থতাগুলোরও ভাগীদার হতে হবে।

এবার দ্বিতীয় উদাহরণ। আমি সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা এখানে উপস্থাপন করছি। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। লক্ষাধিক লোক মারা গিয়েছিল। সহস্র কোটি টাকার ওপরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। চট্টগ্রাম মহানগরের দক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের তীরে পতেঙ্গায় অবস্থিত বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি জহুরুল হক অবস্থিত; সেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান তুফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বাঁধা অবস্থায় ছিল অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ; একাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের সন্নিকটে, কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর স্থাপনা বিএনএস ঈসা খান; সেই নৌ-ঘাঁটিতে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর যুদ্ধজাহাজের ক্ষতি হয়েছিল। বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান কেন বা কী পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হল, তা তদন্ত করার জন্য বিমান বাহিনীর বিধি মোতাবেক তদন্ত হয়েছিল। নৌ-বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ কেন বা কী পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হল, সেটি তদন্ত করার জন্য নৌ-বাহিনীর বিধি মোতাবেক তদন্ত হয়েছিল। তদন্তের ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীর একাধিক জ্যেষ্ঠ অফিসার, যারা ওই সময়ে চট্টগ্রামে নিজ নিজ দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছিল। তবে এ মুহূর্তে তৎকালীন বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী এবং তৎকালীন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানদের সম্পর্কে দুটি কথা উপস্থাপন করছি। ওই আমলের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকার নৌ-বাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এএ মোস্তফা এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মমতাজকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। কাজটি সঠিক কী বেঠিক ছিল, আমি সে প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করছি না। কিন্তু বাস্তবতা হল, বাহিনীর প্রধানরা তো ঢাকায় বসেন, ঢাকায় কাজ করেন। ঘূর্ণিঝড়ের দিনও তারা ঢাকাতেই ছিলেন। তাহলে তাদের চাকরি কেন চলে গেল? তৎকালীন সরকারের বিবেচনায় তাদের আওতাধীন কর্মে তথা তাদের কর্মকাণ্ডে যেহেতু দুর্ঘটনা হয়েছে, সেহেতু তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।

এবার আমার মন্তব্য : বাংলাদেশ সরকার যে নিয়মে দেশ শাসন করে, সেটি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের নিয়ম নয়। সামরিক বাহিনীর রেওয়াজ অনুযায়ী সব কৃতিত্বের জন্য প্রশংসার মুখ্য দাবিদার হচ্ছেন অধীনস্থরা, গৌণ দাবিদার হচ্ছেন অধিনায়ক। সামরিক বাহিনীর রেওয়াজ অনুযায়ী সব ব্যর্থতার একক দায়িত্ব বিভিন্ন স্তরের অধিনায়কের; অধীনস্থদের দায়ী করার কোনো সুযোগ সেনাবাহিনীর রেওয়াজে নেই।

উভয় উদাহরণের পর আমার উপসংহার হল, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কৃতিত্ব যদি সরকার নেয়, তাহলে অপশাসন, দুর্নীতি ও দুর্ঘটনাগুলোর জন্যও দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আমাকে এ কথা বলতে বাধ্য করেছে বর্তমান প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের একটি চিন্তা বা একটি অভিব্যক্তি। ৩ জুলাই দৈনিক পত্রিকাগুলোয় এই প্রসঙ্গে খবর বের হয়েছে। তবে নির্ভুল রেফারেন্সের জন্য আমি অন্তত একটি পত্রিকার উল্লেখ করছি। ৩ জুলাই যুগান্তরের দ্বিতীয় সংস্করণের পৃষ্ঠা ২০, কলাম ৫ দ্রষ্টব্য। একটি সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে, তারা সহিংসতার দায় এড়াতে পারেন না। সংবাদটির বর্ধিত অংশ ১৫ নম্বর পৃষ্ঠার প্রথম কলামে গিয়েছে। খবরটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের জামিন সংক্রান্ত। দু-চার মাস আগের কথা। বিএনপি বা ২০ দল যে কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল, সেই কর্মসূচি চলাকালে কে বা কারা বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কাজ করেছিল। যথা- গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ইত্যাদি। এটার জন্য বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে দায়ী কী দায়ী নন- এটাই বিবেচ্য বিষয়। প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের অভিব্যক্তি হল, আজকে দেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, গাড়িতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগও নেই। যখনই রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়া হয়, তখনই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ হয়। এগুলোর দায় তো আপনারা এড়াতে পারেন না। অর্থাৎ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর ইত্যাদি করে থাকুন বা না থাকুন, এর দায়িত্ব তাকে নিতে হবে; এটাই হল প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের অভিব্যক্তি। সম্ভবত শুধু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নন, এই অভিব্যক্তি সবার জন্যই প্রযোজ্য। মির্জা ফখরুলের থেকে জ্যেষ্ঠ বা কনিষ্ঠ যারাই কর্মসূচির আহ্বানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের সবার জন্য প্রযোজ্য।

তাহলে পবিত্র রমজান মাসে যত ধরনের অশোভন কাজ হচ্ছে, যত ধরনের অপবিত্র কাজ হচ্ছে, এসব বন্ধ করতে না পারার জন্য কে দায়ী হবেন? যিনি শাসন কার্যের দায়িত্বে আছেন তিনি। অথবা দেশে রমজান মাসে মজুদদারি বৃদ্ধির জন্য কে দায়ী হবেন? যিনি এটাকে রোধ করতে পারেননি তিনি। অথবা পচা গম আমদানির জন্য কে দায়ী হবেন? তিনিই দায়ী হবেন, যিনি আমদানির আদেশ দিয়েছেন। খাদ্যমন্ত্রী যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে থাকেন, তাহলে অদক্ষ ব্যক্তিকে মন্ত্রী বানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী কি দায়ী থাকবেন না?

পবিত্র রমজানুল মোবারকে আমাদের সমষ্টিগত উপলব্ধি, সমষ্টিগত শিক্ষাগ্রহণ, সমষ্টিগত চরিত্র সংশোধন- এই তিনটি পরিপ্রেক্ষিতকেই সামনে রেখে আমি উপরের আলোচনাটি করেছি। আমরা কি অস্বীকার করতে পারব, পবিত্র রমজানুল মোবারকে এবাদতের দুটি আঙ্গিক আছে- একটি আঙ্গিক হল ব্যক্তিগত এবাদতকারী ও মহান আল্লাহর মধ্যে গোপন। আরেকটি আঙ্গিক হল সমষ্টিগত; যেটি দৃশ্যমান, যেটি দেখা যায়, অনুভব করা যায়। পবিত্র রমজানের ওই শিক্ষাগুলোও আমাদের গ্রহণ করা প্রয়োজন, যেগুলো সমষ্টিকে স্পর্শ করে।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

www.generalibrahim.com

You Might Also Like