৯৫ বছরে ঢাবি : ভিন্নমতশূন্যতা নিপীড়ন সাম্প্রদায়িকতায় চাপা পড়ছে সব অর্জন

খোমেনী ইহসান :

প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫তম জন্মদিন। আর এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান ঘটেছে।

নতুন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াও বিগত ৯৪ বছরে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার মতো মহান অর্জন রয়েছ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।

তবে এসব গৌরব এখন অনেকটাই স্মৃতি যেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সঙ্কটকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আর চেনা যাচ্ছে না। ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় পার করছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ভিন্নমত উৎখাত করে স্বৈরতন্ত্র কায়েমই নয় শুধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ আর নারী নিপীড়নের এক বনবাঁদাড়ে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বেদনার ব্যাপার হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অতীত ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে এখন নির্লজ্জ চাটুকারিতায়ও লিপ্ত হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে আবার খোদ বাংলাদেশই অপমানিত হয়েছে।

এমন একটি ঘটনা ঘটল গত জুন মাসের ৭ তারিখে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক উন্মুক্ত বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মুহুর্মুহু করতালি ও আনন্দধ্বনিতে সিক্ত নরেন্দ্র মোদি তার বক্তৃতার এক পর্যায়ে দাবি করে বসলেন, “ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সৈন্যরা সারেন্ডার করেছে।”

এই কথা বলার সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ উপস্থিত অতিথিরা করতালি দিয়েছেন। কেউ মোদির কথার প্রতিবাদ জানাননি। অথচ এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর ভূমিকা উধাও হয়ে যায় এবং এদেশের কয়েকটি দলের মানুষ যে মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে বিরোধিতা করেছিল তাদের কথারও ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়।

পরবর্তীতে এনিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হৈচৈ হয়েছে এবং দুয়েকজন বুদ্ধিজীবী খবরের কাগজে লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ এখন পর্যন্ত নীরব সম্মতি অবলম্বন করছে।

অথচ আট বছর আগে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করায় তাকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল আখ্যা দিয়ে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। তারা ইউনূসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অতিথি করার বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিংও করেছেন। অথচ ইউনূস এই ক্যাম্পাসেরই ছাত্র ছিলেন।

মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সত্য, কিন্তু তিনি মৌলবাদী দল বিজেপির নেতা, কট্টরপন্থী আরএসএস সদস্য ও গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে দুই হাজার সংখ্যালঘু মুসলমানকে হত্যার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। তারপরেও নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রতিবাদ হয়নি। বরং অতীতের যেকোনো ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চেয়ে বেশি সম্মানই পেলেন তিনি।

অবশ্য মোদিকে ঘিরেই দেখা গেল, বিক্ষোভ হয়েছে ৬ জুনেই, তবে কেন্দ্রটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরে গেছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। এই বিক্ষোভ করতে গিয়ে ছাত্র ফেডারেশন নেত্রী দীপা মল্লিক, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক জাকী সুমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেত্রী প্রগতি বর্মন প্রমা রায়, বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী সায়মা আফরোজা ও তরিকুল আসলামসহ বেশ কয়েকজন আটক হয়েছেন।

সাধারণতঃ ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্যাম্পাসেই কর্মসূচি পালন করা। কিন্তু তাদের যেতে হল প্রেসক্লাবে, এর বাস্তবতা খুঁজতে গিয়েই জানা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করুণ দশার কথা। এখানে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন আর তাদের আদর্শিক সমর্থকরা আর কারোরই এখন পাত্তা নেই।

অতীতে আর কখনোই এই পরিস্থিতিই দেখা যায়নি যে বছরের পর বছর ভিন্নমতের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহাবস্থান করতে পারে না, আবাসিক হলে থাকতে পারে না। লুকিয়ে ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সময় তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে সহিংস আক্রমণ করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

কিছু বামছাত্র সংগঠন ছাড়া আর কেউই ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করতে পারে না।

২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের শিক্ষার্থীরা বিতাড়িত হয়। তাদের বই-কম্পিউটার-জামাকাপড় লুট হয়ে যায়।

এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে যাতায়াত ও মিছিল করতে পারত। কিন্তু ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালহউদ্দিন টুকুকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকদের সামনেই ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ হামলা করে মাথা ফাটিয়ে দেয়।

এই ঘটনার পর পাঁচ বছর পার হতে চলল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছাত্রদলকে সহাবস্থান করতে দেয়া হয়নি।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে একপেশে ও একদলীয় করতে ক্যাম্পাসে সরকার বিরোধী সংবাদপত্রগুলোর প্রবেশও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় বা আবসিক হলের লাইব্রেরিতে এখন বিরোধী দলীয় পত্রিকা রাখা হয় না। এমনকি পত্রিকার হকাররাও বিরোধী পত্রিকা বেচতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বিরোধী পত্রিকা আমার দেশ (ছয় বছর আগে থেকে বাধার শিকার পত্রিকাটির দুবছর ধরে ছাপা বন্ধ আছে), নয়াদিগন্ত, দিনকাল ও সংগ্রাম পড়ার সুযোগ নাই।

এমনকি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও সরকারবিরোধী ছাত্রদরের দৈহিক নির্যাতনে শিকার হতে হয়। দেখা গেছে, কেউ যদি ফেসবুকে সরকার বিরোধী স্ট্যাটাস দেন, তা জানাজানি হলে তাকে রড-স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

এমন ঘটনাও ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের কোনো কোনো ছাত্রী বিরোধী দল সমর্থিত বই পড়ছেন, এই অভিযোগে তাদের গভীর রাতে ঘুম থেকে তুলে হলের গেস্ট রুমে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্ধারিত রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে আলাদা আদর্শের বই পাওয়া যাওয়ার কারণে শামসুন্নাহার হলের তিন জন ছাত্রীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে ।

অনেকটা পশ্চিমা দুনিয়ার বর্ণবাদের মতো ঘটনাও ঘটছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিহ্ন-প্রতীক দেখে শিক্ষার্থীদের ক্ষমতাসীন সংগঠনের ক্যাডাররা মারধর করছে। মানসিক নির্যাতন করছে এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করছে।

এর মধ্যে ছাত্রীদের বোরকা পরা ও আবাসিক হলের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার অভ্যাস দেখে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ছাত্রদের দাঁড়ি-টুপি বা পায়ের গোড়ালির উপরে ছেড়ে দেয়া ঝুলের প্যান্ট পরার কারণে সরকার বিরোধী আখ্যা দেয়া হচ্ছে।

সম্ভবতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতিকারহীন সাম্প্রদায়িকতার শিকার হচ্ছেন সরকারি খরচের আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পাশ করে আসা ছাত্র ও ছাত্রীরা। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থানসহ তুলনামূলক ভাল ফলাফল করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে দেয় না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এক্ষেত্রে অদ্ভুত একটা আইনী-কালচারও তৈরি হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকেই মাদ্রাসা ছাত্ররা হাইকোর্টে রিট করে ভর্তির অনুমতি পান আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপিল বিভাগে গিয়ে হাইকোর্টের আদেশ ‘স্টে’ করে ফেলেন। এরপর আর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা নিষিদ্ধ বিষয়ে পড়ার সুযোগ পান না।

অথচ সংবিধান, জাতিসংঘের মানবাধিকার আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট- সব কিছুই মাদ্রাসা ছাত্রদের পক্ষে। কিন্তু ছয় বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাম্প্রদায়িক ও আদর্শিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবিচার চলছেই।

লজ্জার ঘটনাও ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের প্রধান নেতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ, স্বৈরাচার আইয়ুব খান ও রক্তপিপাসু স্বৈরাচার এরশাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল; সেখানেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তরুণি-কিশোরীরা। আড়াই মাস পার হলো আজ পর্যন্ত একজনও বিচারের মুখোমুখি হলো না।

এই যখন পরিস্থিতি তখন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রাণবান সত্তা হিসেবে হাজির থাকে না। বরং রাজধানীর কেন্দ্রে বিশাল খোলামেলা জায়গা হওয়ার সুবিধা নিয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে একধরণের বড়াই করে টিকে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

এতে করে বিদ্যমান হেজিমনির জন্য মানবসম্পদ সরবরাহ করা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো গুরুত্বও নাই। গণমুখী শিক্ষাদর্শন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা অনুযায়ী বিদ্যমান জ্ঞানের পর্যালোচনা করে নতুন জ্ঞান সৃজনের কথাও এখন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যায় না।

এমন হীনবল বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ ও তিনটি আবাসিক হলে মাত্র ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও মনোবলে সমগ্র উপমহাদেশেই সমীহ অজর্হন করেছিল।

এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ১ হাজার ৯২৬ ও শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৪ জন। অনুষদ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে, চালু রয়েছে ৮০টি বিভাগ। রয়েছে ১১টি ইনস্টিটিউট, ৫২টি গবেষণা ও ব্যুরো কেন্দ্র। আর আবাসিক হল সংখ্যা ১৯টি আর হোস্টেল ৪টি।

কিন্তু এর মনের আলো এত কমেছে যে, রাজধানীর মধ্যবিত্ত পরিবারের বিয়ে বাড়ির মতো বিজলি বাতি জ্বালিয়ে নিজেকে জানান দিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।উৎসঃ   অনলাইন বাংলা

You Might Also Like