কতদূর যেতে পারবেন পুতিন?

ক্রিমিয়ায় রাশিয়া তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর যে প্রশ্নটি এখন অনেকেই করছেন তা হচ্ছে, কতদূর যেতে পারবেন পুতিন? মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পর মূলত দুটি প্রশ্নকে ঘিরে আলোচনা চলছে এখন- এক. ক্রিমিয়া ‘অধিগ্রহণ’ করার পর রাশিয়া কি তার সীমান্তবর্তী অন্যান্য দেশে যেখানে রুশ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেসব অঞ্চলও ‘অধিগ্রহণ’ করবে? দুই. রাশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মনোভাব কি আমাদের স্নায়ুযুদ্ধের যুগে নিয়ে যাচ্ছে? যে প্রশ্নটি এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে তা হচ্ছে, মলদোভার ট্রান্স দানিয়েস্টার অঞ্চলের কী হবে? কিংবা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল? পুতিনের নজর এড়িয়ে এসব অঞ্চল কি টিকে থাকতে পারবে? রাশিয়া কি এসব অঞ্চলকেও উৎসাহিত করবে ক্রিমিয়ার পথ অবলম্বন করতে? ক্রিমিয়াতেই যে রুশ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তা নয়। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে, যেখানে রুশ ভাষাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে অঞ্চলও রয়েছে একই ঝুঁকির মুখে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ, দনেৎস্ক ও লুগা রুশ জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চল। আবার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওদেসা, খেরসন ও মিকোলায়েভেও রয়েছে রুশ জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য। পুতিন এ ক্ষেত্রে কী করবেন?
ইউক্রেনে আগামী দিনে বসনিয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কি-না, সে ব্যাপারেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, পুতিন রাশিয়ার সীমান্ত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। আর এ লক্ষ্যেই রাশিয়া কাজাখস্তান ও বেলারুশের সমন্বয়ে একটি ‘ইউনিয়ন স্টেট’ গঠন করেছে। এর মাধ্যমে এক ধরনের ‘কাস্টম ইউনিয়ন’ গঠন করে এ দুটি দেশের অর্থনীতি তথা বাণিজ্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। এ ‘ইউনিয়ন স্টেটে’ এ অঞ্চলের আরও অনেক রাষ্ট্র আগামীতে যোগ দিতে পারে। সুতরাং রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার সংযুক্তিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
ক্রিমিয়ার ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।

গেল সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইউরোপ সফর করেছেন। ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনায় ক্রিমিয়ার বিষয়টি যে প্রাধান্য পেয়েছে, সে বিষয়ে একরকম নিশ্চিতই ছিল সবাই। এরই মধ্যে জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ন্যাটো রাশিয়ার সীমান্তবর্তী পোল্যান্ডে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। সব মিলিয়ে ক্রিমিয়ার ঘটনাবলী ‘øায়ুযুদ্ধ-২’-এর সূচনা করলেও যে প্রশ্নের সমাধান এখনও হয়নি তা হচ্ছে, রাশিয়াকে ‘বয়কট’ করে পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাবে কীভাবে? সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে বটে, কিন্তু পুরো ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে কীভাবে? কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে? পাঠক জানেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে সমগ্র পূর্ব ইউরোপ- যে দেশগুলো এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রভাবাধীনে ছিল, তারা এখন স্বাধীন দেশ হিসেবে আÍপ্রকাশ করলেও তারা পরিপূর্ণভাবে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটা পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের রিজার্ভ রাশিয়াতে। মূলত তিনটি পথে এ গ্যাস যায় ইউরোপে। সাবেক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্লকে ছিল, তারা এখনও জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। তিনটি পাইপলাইন, নর্ড স্ট্রিম পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বছরে ৫৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম), বেলারুশ লাইনে সরবরাহ করা হয় ৩৬ বিসিএম, আর ইউক্রেন লাইনে সরবরাহ করা হয় ১০৭ বিসিএম। এখন ইইউ’র নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া যদি এ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এক বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়বে ইউরোপ। যদিও রাশিয়ার বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে এ গ্যাস বিক্রি। এটা সত্য, রাশিয়া অত্যন্ত সস্তায় বেলারুশ ও ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করে।

মজার বিষয় হচ্ছে, এ দেশ দুটি আবার রাশিয়ার গ্যাসের রিজার্ভ গড়ে তুলে সরাসরি পশ্চিম ইউরোপে তা বিক্রি করে কিছু ‘আলাদা অর্থ’ আয় করে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, ২০০৯ সালে ইউক্রেন ও বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হয়েছিল ‘গ্যাস ওয়ার’। অর্থাৎ গ্যাসযুদ্ধ। ইউক্রেনে অত্যন্ত সহজ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করত রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেন অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইউরোপে একটি সংকট তৈরি করে। শুধু গ্যাস নয়, রাশিয়া বেলারুশকে সস্তা দামে তেলও দেয়। ওই তেল আবার বেলারুশ অধিক মূল্যে ইউরোপে বিক্রি করে। ‘দ্রুঝভা’ বা ‘মৈত্রী’ পাইপলাইনের মাধ্যমে এ গ্যাস ও তেল সরবরাহ করা হতো। বেলারুশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হয়েছিল। তারা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল।

রাশিয়া পাইপলাইনে গ্যাস ও তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আবার নতুন আঙ্গিকে এ ‘গ্যাস ওয়ার’ শুরু হবে।
ইউক্রেনের অংশ ক্রিমিয়া এখন রাশিয়ার অংশ। ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার পতাকা উঠেছে। সেখানে যে ইউক্রেনের নৌঘাঁটি রয়েছে, তা দখল করে নিয়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। ইউক্রেনের নৌঘাঁটিও তাদের দখলে। সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে রাশিয়া তার ইউক্রেন পাইপলাইন বন্ধ করে দিতে পারে। আর এটা ঘটলে বুলগেরিয়া, রুমানিয়া আর সার্বিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে এ তিন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ সংস্থা গ্যাসপ্রমের ইউক্রেনের কাছে পাওনা রয়েছে ২ বিলিয়ন ডলার। এ টাকা এখন ইউক্রেন কীভাবে শোধ করবে? এ সংকট এখানে যুদ্ধের আশংকা সৃষ্টি করেছে। রাশিয়া এরই মধ্যে ইউক্রেনকে বাইপাস করে কৃষ্ণ সাগরের নিচ দিয়ে একটি পাইপলাইন তৈরি করছে। সমগ্র ইইউ’র গ্যাসের চাহিদার ৩০ ভাগ জোগান দেয় রাশিয়া। আর জার্মানির ৪০ ভাগ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এ গ্যাস আগামী দিনে অন্যতম একটি ফ্যাক্টর হবে ইউরোপের রাজনীতিতে। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল, বিশেষ করে ইরাক ও লিবিয়ায়, তার পেছনের মূল কারণ ছিল তেল। ইরাক ও লিবিয়ায় তেলের সহজলভ্যতার কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর মদদে সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধে ইরাককে ধ্বংস করে দিয়ে এখন মার্কিন কোম্পানিগুলোই ওই তেল বিক্রির টাকায় ইরাক পুনর্গঠনের কাজ করছে।

আর লিবিয়ার তেল ও গ্যাস যায় ইতালিতে। গাদ্দাফিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এ তেল-গ্যাসের কারণেই। সুতরাং রাশিয়ার গ্যাসের ওপর পুরো ইউরোপের নির্ভরতা সেখানে নতুন করে ‘গ্যাসযুদ্ধে’র সূচনা করবে। তবে পার্থক্য একটাই- রাশিয়া ইরাক কিংবা লিবিয়া নয়। পুতিনের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। সুতরাং ওবামা এ অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে কোনো সুবিধা করতে পারবেন না। অনেকে স্মরণ করতে পারেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক পর্যায়ে পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ রাজনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। ব্রান্ট বুঝতে পেরেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাদ দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। আজ নতুন আঙ্গিকে সে প্রশ্নটিই উঠেছে- রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা অর্থহীন। রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়েই ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী ন্যাটোতে রাশিয়াকে পরামর্শকের ভূমিকা দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২৭ মে প্যারিসে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সেই সঙ্গে ন্যাটো সদস্যভুক্ত অন্য দেশের সরকারপ্রধানরাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়াকে একটি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দেয়। অনেকটা সেই ‘কনটেইনমেন্ট থিওরির’ মতো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণ সাগরের পশ্চিমে রুমানিয়ার মিখাইল কোগালনাইসেআনুতে রয়েছে ন্যাটোর বিমান ঘাঁটি। এ ঘাঁটির গুরুত্ব অনেক। আফগানিস্তানে সেনা ও রসদ সরবরাহের জন্য ট্রানজিট রুট হিসেবে এ বিমান ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণসাগরের গুরুত্ব আরও একটি কারণে। এখানে অবস্থান রয়েছে ন্যাটোর জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ইস্টের। কৃষ্ণসাগরভুক্ত ৩টি দেশ রুমানিয়া, বুলগেরিয়া আর তুরস্ককে নিয়ে ন্যাটো গেল বছর তাদের ৩ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছে। এটা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের স্নায়ুবিক চাপ। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন থেকেই কৃষ্ণ সাগরভুক্ত এলাকা, সেই সঙ্গে কাসপিয়ান সাগরভুক্ত অঞ্চলকে ‘হট এরিয়া’, অর্থাৎ উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন।

সুতরাং ক্রিমিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাশিয়ানদের (জনসংখ্যার ৫৯ ভাগ, প্রায় ২০ লাখ) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই যে শুধু রাশিয়া হস্তক্ষেপ করেছিল, তা বিবেচনায় নিলে ঠিক হবে না। রাশিয়ায় ‘নয়াজার’ নেতৃত্ব রাশিয়ার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ক্রিমিয়ায় বসবাসকারী রাশিয়ানদের নিরাপত্তার পাশাপাশি, তাদের নিজেদের ভুখণ্ডগত নিরাপত্তার বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পুরো কৃষ্ণ সাগরভুক্ত অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব করার জন্যই ন্যাটোর দরকার জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেয়া। তাহলে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত থাকবে ন্যাটোর সেনাবাহিনী। এটা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের মনোস্তাত্ত্বিক চাপ। রাশিয়ার সমর নায়করা এটা যে মেনে নেবেন না, এটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, গেল বছর কৃষ্ণ সাগরে ন্যাটো ও জর্জিয়ার নৌবাহিনী যৌথভাবে একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা রাশিয়া খুব সহজভাবে নেয়নি। এখন ন্যাটোর নেতৃত্ব যদি তাদের আগ্রাসী মনোভাবের পরিবর্তন না করে, তাহলে রাশিয়াও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। মলদোভার (১৯৪০ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত) ট্রান্স দানিয়েস্টার অঞ্চলটির ব্যাপারে রাশিয়ার যে আগ্রহ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ হচ্ছে রুশ বংশোদ্ভূত। ২০০৬ সালে সেখানে যে গণভোট হয়, তাতে ৯৭ ভাগ মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে রায় দিয়েছিল, অনেকটা ক্রিমিয়ার পরিস্থিতির মতো। এমনকি ওই অঞ্চলের সংসদ সুপ্রিম কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির দাবি করলেও, রাশিয়ার নেতৃত্ব এ ব্যাপারে উৎসাহিত হয়নি। ১৯৯২ সালের দাঙ্গার পর সেখানে ১৫০০ রাশান সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল, তারা এখনও সেখানে আছে। সুতরাং ট্রান্স দানিয়েস্টারের রাজনীতি কোন দিকে যায়, সেদিকে লক্ষ্য থাকবে অনেকের। ২০০৮ সালের রাশিয়া তার সীমান্তবর্তী জর্জিয়ার দুটো অংশ দখল করে নিয়েছিল। তখন জর্জিয়ার আবখাজিয়া (২০০৮), কিংবা ইউক্রেনের ক্রিমিয়ার পর মলদোভার ট্রান্সদায়িস্টো ও অপর একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গাগাউজিয়াতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কাজাকিস্তান ও আজারবাইজান নিয়েও রয়েছে একই প্রশ্ন। ইউক্রেনের পর রুশ বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাস করে কাজাকিস্তানে। এসব অঞ্চল রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। যে কোনো ধরনের ন্যাটোর আগ্রাসন রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে উৎসাহিত করবে এসব অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে। তবে আমার ধারণা, ক্রিমিয়ার পর রাশিয়া একটা ‘স্ট্যাটাসকো’ অবলম্বন করবে। অর্থাৎ যে যেখানে আছে, সে সেখানে অবস্থান করবে। রাশিয়া এ মুহূর্তে তার সীমান্ত বাড়াবে না। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমা বিশ্বের প্রয়োজন রয়েছে রাশিয়াকে। বিশ্বের নবম অর্থনৈতিক শক্তি রাশিয়া। পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে রাশিয়ায় এখন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রাশিয়ার সম্পদ ‘ফ্রিজ’ করায় তা রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এটা কাটিয়ে উঠতে রাশিয়া এখন ‘ব্রিকস’ভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি অর্থনৈতিক ব্লক গড়ে তুলতে পারে। চীন ও ভারত এ ‘ব্রিকসে’র সদস্য। ক্রিমিয়া সংকটে চীন ও ভারত রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করেছে। এ সংকট রাশিয়া-চীন সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে।
অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সালে ‘ব্রিকসে’র অর্থনীতি গিয়ে দাঁড়াবে ১২৮ ট্রিলিয়ন ডলার (এক হাজার বিলিয়নে এক ট্রিলিয়ন)। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির পরিমাণ দাঁড়াবে মাত্র ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে রাশিয়া চীনকে সঙ্গে নিয়ে ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’কে শক্তিশালী করবে। আর সাবেক সোভিয়েত বলয়ভুক্ত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট ‘কালেকটিভ ট্রিটি অর্গানাইজেশন’কে বাস্তবে রূপ দেবে। এটা হতে পারে ওয়ারশ জোটের পরিবর্তিত সংস্করণ। প্রেসিডেন্ট ওবামার ইউরোপ সফর এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া হুশিয়ারি বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, পুতিন ও রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্ব এ বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন। রাশিয়ার নেতৃত্ব যদি রাশিয়ার সীমান্ত সম্প্রসারিত করতে চায়, তাহলে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে স্নায়ুযুদ্ধের নতুন এক রূপ।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(যুগান্তর, ০১/০৪/২০১৪)

You Might Also Like