স্বাধীনতা গণতন্ত্র বিচার ও নির্বাচন, স্বাধীনতা দিবসের কিছু ভাবনা

থাইল্যান্ডে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের কথিত দশম সংসদ নির্বাচনের প্রায় এক মাস পরে। দেশটির সাংবিধানিক আদালত গত শুক্রবার (২১ মার্চ) সে নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে নতুন নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছে। বাহ্যত থাই আদালত দু’টি বাস্তবতার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। প্রথমত, নির্বাচন হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে এবং বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জন করেছিল; দ্বিতীয়ত, সরকার একই দিনে দেশের সর্বত্র নির্বাচন করেনি এবং তাতে থাই সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে।

আদালতের রায়ের ফলে থাইল্যান্ডে নতুন করে নির্বাচন হতে হবে এবং এতে দেশটির গোলমেলে রাজনীতি আরো বেশি জটিলতার আবর্তে পড়বে। সংক্ষেপে এর পটভূমি এ রকম : বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের বড় ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা ব্যবসায়-বাণিজ্যে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ও আইটি ব্যবসায়ে সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন। একই সাথে তিনি থাই র‌্যাক থাই নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন। ২০০১ সালে থাকসিন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পল্লী অঞ্চলের উন্নতির ক্ষেত্রে এবং কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে থাকসিন সরকারের ভূমিকা ও সাফল্য খুবই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু রাজধানীতে ব্যবসায়ী মহল এবং শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে থাকসিন পরিবারের বিশাল সমৃদ্ধি তীব্র অসন্তোষ ও রাজনৈতিক বৈরিতা সৃষ্টি করে। বাস্তবতা হচ্ছে গ্রামীণ ভোটারের সংখ্যা শহুরে ভোটারদের কয়েক গুণ বেশি। তাই নির্বাচন যতবারই হোক, শহুরে মধ্যবিত্তদের বিরোধী জোটের বিজয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

থাকসিন সিনাওয়াত্রা দ্বিতীয় মেয়াদেও বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করেছেন। কিন্তু তার সমর্থন ছিল মূলত পল্লী অঞ্চলভিত্তিক। রাজধানী ব্যাংককে তিনি গরিষ্ঠ ভোট পাননি। দ্বিতীয় দফা বিজয়ের পর থেকে শহুরে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত সমাজ থাকসিন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সে আন্দোলনে একটা বড় উপাদান ছিল, থাকসিন তার স্ত্রীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্যবান জমি সস্তায় সংগ্রহ করতে সাহায্য করে দুর্নীতি করেছেন। থাই সুপ্রিম কোর্ট ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে থাকসিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তার পরেও তিনি পদত্যাগ করতে রাজি না হলে ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানে থাকসিন গদিচ্যুত এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। ফলে থাকসিনের বোন ইংলাক থাই র‌্যাক থাই পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। কিছু দিন পর দলের নাম পরিবর্তন করে তিনি ফেউ থাই পার্টি নাম দেন। তাতে কেউ প্রতারিত হয়নি। ফেউ থাই যে আসলে বর্ণচোরা থাই র‌্যাক থাই পার্টি, সে সম্বন্ধে কারো মনে সন্দেহ ছিল না।

দলের নেতৃত্ব গ্রহণের কিছুকালের মধ্যেই ইংলাক নতুন সাধারণ নির্বাচন দেন এবং তাতে বিপুল গরিষ্ঠতায় জয়ী হন। কিন্তু এ নির্বাচনেও গ্রামীণ ও শহুরে ভোটের বৈপরীত্য থেকেই যায়। পল্লী অঞ্চলের ভোট তার পক্ষে গেলেও শহুরে বুদ্ধিজীবীরা একযোগে তার বিরোধিতা করেন। গত বছর ইংলাকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন দফায় সড়ক অবরোধ এবং সরকারি অফিস ও ভবন দখল করে রাখে। সর্বমোট ২৩ জন আন্দোলনকারী পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়। ম্যান্ডেট নবায়নের উদ্দেশ্যে ইংলাক ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ডাকেন। তখন থেকে বিরোধী দলের আন্দোলন ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের আন্দোলনে পরিণত হয়।

সিনাওয়াত্রা ভাইবোনের বিরুদ্ধে ব্যাংককবাসীর আন্দোলনে কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব আন্দোলনে সেনাবাহিনী দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। থাই পুলিশও সংযত এবং মোটামুটি নিরপেক্ষ আচরণ করেছে। উচ্চ আদালত থাকসিনকে ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এবং গত ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। থাই আদালতের এ দুটি ন্যায্য ও নিরপেক্ষ রায় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই আদর্শস্থানীয় হয়ে থাকার যোগ্য। কিন্তু তাতে সে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের অবসান হবে বলে আশা করা যায় না। নতুন নির্বাচন হলেও গ্রামীণ ভোটের সংখ্যাধিক্যের কারণে ইংলাক সিনাওয়াত্রার ফেউ থাই পার্টিই জয়ী হবে বলে ধরে নেয়া যায়। সেজন্যই শহুরে বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচন চান না, তারা চান বিভিন্ন স্বার্থের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি প্রশাসনিক পরিষদ। অর্থাৎ আদালতের রায়ের অর্ধেক তাদের পক্ষে গেলেও শহুরে বুদ্ধিজীবীরা সে রায়ে ষোলআনা খুশি হতে পারেননি।

সেই দেশ এবং এই দেশ

বাংলাদেশে গ্রামীণ ও শহুরে ভোটের স্বার্থের মধ্যে আপাত কোনো সঙ্ঘাত নেই। বিগত দু’তিন বছরের আন্দোলনে দেখা গেছে, রাজধানীর বাইরে সরকারের বিশেষ সমর্থন নেই। প্রশাসনিক এবং পুলিশি নিয়ন্ত্রণও খুবই ঠুনকো। রাজধানী ঢাকাতেও বিরোধীদের ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে ‘ব্রুট ফোর্সের‘ জোরে। সে শক্তি প্রয়োগ করছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ আর পুলিশ ও র‌্যাব। বাংলাদেশে সমস্যা হচ্ছে ভোটের পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকে প্রশাসনের স্বরূপ সম্পূর্ণ বদলে দেয়া হয়েছে। প্রশাসন, র‌্যাব ও পুলিশে বেছে বেছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তার পর থেকে হাজার হাজার নতুন পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে বেছে বেছে আওয়ামী লীগ ক্যাডার ও সমর্থকদের মধ্য থেকে।

জেলা প্রশাসক এবং পুলিশের নির্বাহী পদগুলোতে আনুপাতিক হারের বহু গুণ অধিক সংখ্যায় সরকারের ভোটব্যাংক হিসেবে গণ্য একটি সম্প্রদায়ের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গোড়া থেকেই অনেক ভাষ্যকার ও কলাম লেখক হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন যে, পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় সুনিশ্চিত করাই এসব রদবদলের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসক ও অনুরূপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুলিশ-র‌্যাবের নির্বাহী কর্মকর্তারা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। নির্বাচন ত্রুটিমুক্ত হচ্ছে কি না, এটা তদারকের ভার তাদের ওপর। অনুরূপভাবে নির্বাচনে ‘দিনকে রাত’ আর ‘রাতকে দিন’ করে দেখানোও তাদের সাধ্যায়ত্ত।

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

তারপরও একজন বিতর্কিত এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির অত্যন্ত বিতর্কিত রায়ের অর্ধেককে অগ্রাহ্য করে যখন তড়িঘড়ি বিতর্কিত পন্থায় সংবিধান সংশোধন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনপদ্ধতি বাতিল করা হয়, তখন আর কারো মনেই সন্দেহ রইল না যে, ভোটের ভিত্তিতে নয়, প্রশাসনিক কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা বরাবরের জন্য আঁকড়ে থাকাই হচ্ছে সরকারের মতলব। আর যেহেতু সব বিভাগ সম্পূর্ণ দলীয়করণ হয়ে গেছে, সেহেতু ন্যায়বিচার কিংবা প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে জন্যই ২০১১ সাল থেকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এবং ১৮টি সরকারবিরোধী দল যখন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, তখন সারা দেশ সে আন্দোলনের পেছনে কাতারবন্দি হয়।

বিতর্কিত দশম সংসদ নির্বাচন হয়েছে এ পটভূমিতে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি ভোটদাতাকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে ৩০০ আসনের সংসদের ১৫৩ জন সরকারদলীয় প্রার্থীকে ‘নির্বাচিত’ ঘোষণা করা হয় নির্বাচনের তারিখ ৫ জানুয়ারির প্রায় দু’সপ্তাহ আগেই। অবশিষ্ট ১৪৭ আসনের নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি এবং ১৯ দলের জোট। তাদের নির্দেশে প্রায় সর্বত্রই ভোটদাতারা নির্বাচন কেন্দ্রে অনুপস্থিত ছিলেন। সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতাসীনেরা প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অবশ্যই এসব ‘ভোট‘ আবিষ্কার হয়েছে কমিশনের অফিসে এবং কিছু মন্ত্রীর উপস্থিতিতে। বাস্তবে এবং সাদা চোখে দেশের মানুষ বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রেই নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের ছাড়া তেমন কোনো জনপ্রাণী দেখেনি। বিশ্বসমাজ আগেই জানত, ৫ জানুয়ারি হবে প্রহসনের নির্বাচন। তাই তারা পর্যবেক্ষক পাঠানোকে অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা করেছে। বাংলাদেশের আদালত যদি থাইল্যান্ডের আদালতের মতো ভূমিকা রাখতে পারত, তাহলে দুটি-চারটি নয়, কয়েক ডজন বিবেচনায় এ নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করা সম্ভব হতো।

কিন্তু কোথায় পাবো বৈচারিক নিরপেক্ষতা? বিরোধীদের প্রাপ্য গণতান্ত্রিক অধিকার এ সরকার কখনোই দেয়নি। অবশ্যই তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে এবং নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে পথে বেরিয়ে এসেছে। এই ব্যাপক গণসমর্থনকে বৃদ্ধি পেতে এবং অব্যাহত থাকতে দেয়া হলে শাসকদের রাতারাতি বিদেশে পাড়ি দিতে হতো। তারা হাস্যকর অভিযোগে বিরোধী দল ও জোটের নেতাকর্মীদের ধরে ধরে জেলে পুরছে। এ ধরনের কয়েক হাজার রাজনৈতিক বন্দী আছেন এখন বাংলাদেশে। কারাগারে তাদের স্থান সঙ্কুলানের জন্য খুনের আসামিসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিরোধী নেতারা জামিনের আবেদন করেন; বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনেক ধানাইপানাই করে পরে সে আবেদন নাকচ করা হয়।

হাস্যকর কাণ্ডকারখানা

অত্যন্ত হাস্যকর কাণ্ডকারখানা ঘটছে আজকের বাংলাদেশে। কোথাও সরকারের জন্য বিব্রতকর কিছু ঘটল। পুলিশ বিরোধী দলের সক্রিয় নেতাদের কয়েকজনসহ শত শত, এমনকি হাজার হাজার গায়েবি ‘অপরাধীর‘ বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করল। সরকার চায় সক্রিয় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিতে। যেসব নেতা এখনো গ্রেফতার হননি, পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। সরকার আশা করে, অভিযুক্ত বলে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে সে অঞ্চলের সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী গা ঢাকা দেবেন। অন্য দিকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ‘চাঁদা’ আদায় করা বর্তমান বাংলাদেশের পুলিশের জন্য অত্যন্ত ‘লাভজনক বাণিজ্য’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরো একটি প্রবণতা ক্রমেই বেশি লক্ষণীয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিরোধী জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কিছু মামলা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া আন্দোলনে নামলে দেশ জেগে ওঠে, দেশের মানুষ পথে নামে। তারেক রহমান বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে তার সাংগঠনিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের উভয়কেই আওয়ামী লীগের ভীষণ ভয়। সরকার আশা করে, গ্রেফতার এবং ভুয়া মামলার হয়রানির ভয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইবেন না। সরকার আশা করছে মামলার দড়ি টানাটানিতে (যেমনটা এরশাদের বিরুদ্ধেও করা হয় মাঝে মাঝে) হয়তো খালেদা জিয়াও আন্দোলনে ভাটা দেবেন। এ দুটো অবস্থাই সরকারের জন্য সুবিধাজনক। বেগম জিয়া আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন যে, উপজেলা নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেই তিনি আবার আন্দোলনে নামবেন। তার পরেই আবার তার বিরুদ্ধে সাজানো মামলাগুলোর দড়িতে টান পড়ল। কোনো রকম শুনানি ছাড়াই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, সেটাকে আইনের নামে ভেলকিবাজি ছাড়া আর কী বলব?

সন্ত্রাসকবলিত উপজেলা নির্বাচন

আর উপজেলা নির্বাচন? ভোটকেন্দ্র দখল, নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিন ভুয়া ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরাট করা, সন্ত্রাস সৃষ্টি করে বিরোধীদলীয় এজেন্টদের বিতাড়িত করা, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ব্যালট পেপারে আগুন লাগানো ইত্যাদি হচ্ছে এবারের কিস্তিবন্দী উপজেলা নির্বাচনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক। আপনারাও কি মিডিয়ায় দেখেননি এসব খবর? সাতক্ষীরার কলারোয়ায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী চতুর্থ দফার ভোটের আগে ঘোষণা করেছেন যে, কেউ ভোট দিতে গেলে তার আঙুল কেটে দেয়া হবে। অন্যত্র প্রচার চলেছে, ভোট যাকেই দেন চেয়ারম্যান হবেন উনিই। আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভোটারদের বলেছে, আপনার কষ্ট করে আসার দরকার ছিল না, আপনার ভোট আমরাই দিয়ে দিয়েছি। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

চতুর্থ দফা নির্বাচনের আগে বহু প্রিজাইডিং অফিসারকে সরিয়ে তাদের পরিবর্তে দলীয় লোকেদের প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন পুলিশের ছয়জন সুপার এবং আরো প্রিজাইডিং অফিসারকে হঠাৎ বদলি করা হলো। মোট কথা, এ যাবৎ যে চার দফা উপজেলা নির্বাচন হয়েছে তার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সহিংসতা যত বেড়েছে আওয়ামী লীগ দলের নির্বাচনী ফলাফলও ততই ‘ভালো’ হয়েছে। তার অর্থ কি স্পষ্ট নয়?

উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে দু’টি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার গুরুতর হানি হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নিরপেক্ষ প্রহরী বলে সম্মানিত। তাদের মর্যাদার আরেকটা কারণ, মুক্তিযুদ্ধে তাদের গৌরবময় ভূমিকা। উপজেলা নির্বাচনে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাদের দেয়া হয়েছিল। শুনেছি, গ্রেফতারের ক্ষমতাও তাদের দেয়া হয়। তাদের চোখের সামনে ভোটকেন্দ্রগুলোতে যাবতীয় দুর্বৃত্তপনাই হয়েছে, কিন্তু একজন দুর্বৃত্তকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে শুনিনি।

নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী নিযুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। অন্তত সেটাই উচিত। কিন্তু এ কমিশনও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সুনাম বজায় রাখতে সক্ষম হয়নি। উভয় কমিশনই অন্ধভাবে সরকারের হুকুম তামিল করে চলেছে বলে মনে করা হয়। ৫ জানুুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে রীতিমতো ন্যক্কারজনক বলতে হবে। উপজেলা নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদির অজস্র অভিযোগ করা হয়েছে কমিশনে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোনো প্রতিকার চোখে পড়েনি। জনৈক কমিশনারের মন্তব্য যেন কমিশনের সরকারি অবস্থান : ‘সামান্য অশান্তি হয়েছে কিন্তু নির্বাচন সুুষ্ঠু হয়েছে।’ তবে মনে হচ্ছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কিছুটা বিবেক এখনো অবশিষ্ট আছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী তামাশা এবং প্রথম দুই দফার উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে তিনি হঠাৎ বিদেশে। সম্ভবত সেখানে তিনি নিজের বিবেকের সাথে বোঝাপড়ার চেষ্টা করছেন।

কোন্ দেশে বাস করছি?

এসব থেকে কী সাব্যস্ত করবে সাধারণ বুদ্ধির মানুষ? আমরা নিশ্চয়ই স্ট্যালিনের কিংবা অ্যাডলফ হিটলারের দেশে বাস করছি না। বাকশালী স্বৈরতন্ত্র আবার কি কায়েম হয়ে গেছে বাংলাদেশে? অথবা আমরা তো আরেকটা সিকিম হতে চাই না। এর মধ্যে স্বাধীনতা দিবস এলো আর গেল। অনেক অনেক স্মৃতি ভিড় করে আছে মনে, কেননা আমারো প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কিছু। স্বাধীনতা দিবস বিষয়ে কিছু লিখতে মনকে রাজি করাতে পারিনি। লন্ডনেও কিছু সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। যেতে পারিনি। কী লিখব, কী বলব? মুজিব ভাই পাকিস্তানে আটক ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমুরা ভারত সরকারের অতিথি ছিলেন। দেখা যাচ্ছে, যারা ময়দানে থেকে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মন্ত্রীদের কারো কারো বিচারে এরা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী’। রবীন্দ্রনাথের গানের প্যারোডি করে বলতে ইচ্ছে করে : ‘সখি, ভাবনা কাহারে বলে, চেতনা কাহারে বলে, স্বাধীনতা কারে কয়?’

আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের বলেছিলেন, গণতন্ত্রের জন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রয়োজন। ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে যা বলেছিলেন, সে কথাগুলো প্রায়ই আমার মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানে ডেমোক্র্যাসি কখনো সুযোগ পায় নাই। যদি ১৯৪৭ সাল থেকে সাধারণ নির্বাচন হতে আরম্ভ করত, তবে ডেমোক্র্যাটিক ট্র্যাডিশন এ দেশে গড়ে উঠত। আমি মনে করি, পাকিস্তানের জনসাধারণ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং তাদের সে ট্র্যাডিশন রয়েছে। ভবিষ্যতেও যদি এ দেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকার দেয়া হয়, যদি কেউ এর নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা না করেন, তা হলে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যারা বার বার ক্ষমতায় এসেছেন, তারা অনেকেই গণতন্ত্রের নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যে গণতন্ত্র দুনিয়ার কোনো ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কোনো কোনো স্বৈরশাসকের জন্য গণতন্ত্রের নিরীক্ষা ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জিনিসটি বাদ দিয়ে যদি নির্ভুল গণতন্ত্র দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলেÑ সে গণতন্ত্রের মধ্যে ভুল হতে পারে, গণতন্ত্রের মধ্যে দেরি হতে পারে, গণতন্ত্র এমন একটা জিনিস যেটা আস্তে আস্তে পূর্ণতা পায়, গণতন্ত্রের মাধ্যমেই তার ভুলত্রুটি দূর হয়ে দেশের মঙ্গল হয়, অমঙ্গল হয় না।’

মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিলাম শেখ মুজিবুর রহমানের এ আশ্বাসের ভিত্তিতে এবং এ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে যে, আমরা প্রকৃতই স্বাধীন হতে যাচ্ছি; প্রভু পরিবর্তন করতে নয়। বিবিসির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে মুজিবের সে মন্ত্র শোনানোর চেষ্টা করেছি, বিশ্ব মিডিয়াকে সে একই আশ্বাস দিয়েছি। আজ যদি কেউ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করে, কৈফিয়ত দাবি করে, কী জবাব দেবো তাহলে? স্বাধীনতা দিবসে সে জন্যই নীরবে গৃহবন্দী হয়ে থাকা শ্রেয় বিবেচনা করেছি।

বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান

serajurrahman34@gmail.com

(লন্ডন : ২৬.০৩.১৪)

You Might Also Like