`গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলে পুনর্গঠন প্রয়োজন’

গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলী খান। তিনি বলেছেন শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন।

‘বর্তমান বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় যে প্রচলিত রীতি রয়েছে তাতে ভোট জালিয়াতি হবেই’ উল্লেখ করে নির্বাচন ব্যবস্থার নতুন ফর্মুলা দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলী খান। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার সেমিনারকক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় তিনি নতুন এ ফর্মুলার কথা উল্লেখ করেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন নামের একটি সংগঠন।

একই সঙ্গে সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর না হয়ে তিন বা চার বছর করার কথাটিও বিবেচনা করা দরকার বলে অভিমত তুলে ধরেন তিনি।

নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু রয়েছে তাতে জালভোট হবেই। কারণ, আমাদের এখানকার সিস্টেম হল, তিনশ’টি আসনে নির্বাচন হয় এবং প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে যিনি এক ভোট বেশি পান তিনিই নির্বাচিত হন। সুতরাং সীমাবদ্ধ ভোটারের আসনে সবাই চেষ্টা করেন, জালিয়াতি করে হলেও কিভাবে নিজের প্রার্থীকে জেতানো যায়। আর এসব জালিয়াত ঠেকানোও অনেক সময় শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।’

নির্বাচন ব্যবস্থার কয়েকটি পদ্ধতির উল্লেখ করে আকবর আলী খান বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে ‘প্রোপরশনাল রিপ্রেন্টিভ’(আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতির ভিত্তিতে নির্বাচনের  ব্যবস্থা আছে। যে ব্যবস্থায় সারাদেশে যে দল বেশি ভোট পাবে তারাই সরকার গঠন করবে।’

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচনের কিছু সমস্যা রয়েছে উল্লেখ এর সমাধানও বাতলে দেন সাবেক এ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘আনুপাতিক নির্বাচনের সমস্যা হল, আমি যে এলাকার লোক, ওই এলাকা থেকে আমি এমপি মনোনীত না-ও হতে পারি। এর সমাধান হতে পারে পঞ্চাশ ভাগ আসনে আনুপাতিক নির্বাচন এবং বাকি পঞ্চাশ ভাগ আসনে সংখ্যাধিক্য পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন। আরেকটি সমাধান হতে পারে দুটি হাউজ করার মাধ্যমে। একটি হাউজ হবে আনুপাতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, অন্যটি সংখ্যাধিক্য-নির্বাচনের ভিত্তিতে।’

তিনি বলেন,  এরকম আরো সমাধান সম্ভব কিন্তু এসবের মধ্যে কোনটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য হতে পারে তা আলোচনা করে বের করা দরকার।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রেফারেন্ডাম বিধান প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রেফারেন্ডাম বিধান থাকলে দুটি লাভ হয়। একটি হল জনগণ সরকারের কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হলে এর বিরুদ্ধে ভোটাভোটির ব্যবস্থা করতে পারে। অন্যদিকে সরকারও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমুহতে সিদ্ধান্ত নিতে জনমত যাচাইয়ের জন্য রেফারেন্ডাম ব্যবহার করতে পারবে।’

আকবর আলী বলেন, তত্ত্ববধায়ক সরকার, আনুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন, রেফারেন্ডাম, স্থানীয় সরকার সরকার শক্তিশালীকরণ এ বিষয়গুলোর সঙ্গে আরো একটি বিষয় বিবেচনা করতে পারি। তা হল পাঁচ বছরের জন্য আমরা যখন কোনো দলকে নির্বাচন করি তখন তারা ধরে নেন যে পাঁচ বছর যা খুশি করার অধিকার তারা পেয়ে গেছেন। পাঁচ বছরের স্থলে যদি আমরা তিন বা চার বছর করি তাতে জনসাধারণের প্রতি তাদের যে দায়িত্ব সেটা আরো বাড়তে পারে। সে বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন উল্লেখ করে আকবর আলী খান বলেন, শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন। তা না হলে সংবিধানে যা-ই লেখা থাকুক না কেন ক্ষমতায় এসে তারা নিজেদের মত করে সরকার পরিচালনা করবে। তাতে জনগণের কোনো লাভ হবে না।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি জবাবদিহিতা, নিয়মিতভাবে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ না থাকে তাহলে শুধু সংবিধান সংশোধন করে সমস্যার সমাধান হবে না।

অধ্যাপক হারুন অর রশীদের সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখেন  হায়দার আকবর খান রনো, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান প্রমুখ।

You Might Also Like