সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের তাগিদ ইইউ’র

ঢাকা সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রতিনিধি দলের প্রধান জিন ল্যাম্বার্ট বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন সম্ভব। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোট বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচন দেখতে চায় যা হবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক। সফরের প্রথম দিনে গতকাল সকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও ইইউ’র মূল্যায়ন তুলে ধরেন তিনি। জানান, নির্বাচনের পর তাদের অবস্থানে কোন পরিবর্তন হয়নি। ওই নির্বাচন ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হয়নি বলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাস হয় নির্বাচনের পরপরই। ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিনিধিত্বশীল পন্থায় নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার আহ্বান জানানো হয়। নির্বাচনের আগেও ইইউ পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রতিনিধি ঢাকা সফর করেছেন। সেই সময়ে তিনি তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন। নির্বাচনের ৭৯ দিন পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ও শ্রমমান দেখতে এসেছেন তিনি ও তার সফরসঙ্গীরা। নির্বাচনী সহিংসতা যে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়- এটি গতকালও পুনর্ব্যক্ত করেছেন  জিন ল্যাম্বার্ট। তার মতে, একটি দেশের গণতন্ত্র চর্চা কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা দেশটিতে নির্বাচন এলে বোঝা যায়। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে আহত ও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নির্বাচনের সার্বিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। ‘দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে ইইউ’র অবস্থান কোন হেরফের ঘটেনি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যই অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন প্রয়োজন। তবে এ জন্য সব দলকে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। সবাই আগ্রহী হলে আগাম নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আনা উচিত। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সহিংসতার কোন অবস্থান নেই। নির্বাচনে সহিংসতা বন্ধ করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। যে কোন লোক বা দলকে মুক্তভাবে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে ইইউ’র ওই সংসদ সদস্য বলেন, বাংলাদেশে এমন একটা রাজনৈতিক পরিস্থিতি দরকার যেখানে জনগণের কথা শোনা হবে। গণতন্ত্র  চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ থাকবে। বিচারবহির্ভূত  হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে নেয়ার কোন ইচ্ছা নেই তাদের। তবে বাংলাদেশের প্রতি তাদের নির্ভরতাকে ‘দুর্বলতা’ ভাবাও ঠিক হবে না। গ্রুপ অব দ্য প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স অব সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস নেতা জন অ্যাটার্ড-মনটালটো, ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির সালভাদর সেদোই অ্যালাবার্ট এবং অ্যালায়েন্স অফ ডেমোক্র্যাটস লিবারেলসের নিকোলো রিনালদি এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা ও তাদের অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকার, স্টেক হোল্ডার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারা নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়ে গতকালই পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠক সেরেছেন। আজ প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের আলোচনার কথা রয়েছে। আগামী মে মাসে ইইউ’র পার্লামেন্ট নির্বাচনের পরও বরাবরের মতো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাদের নজর থাকবে বলে জানান ল্যাম্বার্ট। তিনি বলেন, এখন দলগুলোকে রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারে যারাই থাকুক এবং বিরোধী দলের আকার যেমনই হোক, সবক্ষেত্রেই জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। নির্বাচনের পর বাংলাদেশের জনগণ ভাল  কিছুর প্রত্যাশা করছে উল্লেখ করে কেন এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে- সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়টি আমরা জানার চেষ্টা করবো। রানা প্লাজা ধসের পর ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহ বেড়েছে। তাদের নির্বাচনী প্রচারে অনেক উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সংগঠন রানা প্লাজা ঘটনার পর বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনাতে এখানকার কারখানার কাজের পরিবেশ উন্নত এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেয়া পদক্ষেপগুলো মূল্যায়নের চেষ্টা করা হবে বলে জানান ল্যাম্বার্ট।

খালেদার সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধি দলের বৈঠক

বিএনপি চেয়ারপারসন ও ১৯দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদীয় প্রতিনিধি দল। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। জন ল্যাম্বার্টের নেতৃত্বে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য গ্রুপ অব দ্য প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স অব সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস নেতা জন অ্যাটার্ড-মনটালটো, ইউরোপীয় পিপলস পার্টির সালভাদর সেদোই অ্যালাবার্ট, অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্র্যাটস লিবারেলসের নিকোলো রিনালদি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশের মিশন প্রধান উইলিয়াম হানা অংশ নেন। বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহ উদ্দীন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে কোন পক্ষই সাংবাদিকদের কাছে কিছু বলেনি। তবে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং পোশাক শিল্পের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদিকে আজ বিকাল চারটায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার।

You Might Also Like