রমজান ও নৈতিকতা

 

ড. মাহফুজ পারভেজ

বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাময় ও গুরুত্বপূর্ণ রমজান মাস এসেছে। ইসলামী দুনিয়ায় পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজানের আগমনে সূচিত হয়েছে ঐশী প্রণোদনা। স্বীয় কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে আত্মসংযম আর কৃচ্ছ্রতার পরমব্রতের মাধ্যমে মুসলমানগণ নিজের আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টায় দিনে রোজা আর রাতে নামাজের মাধ্যমে সদা-নিবেদিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও রূঢ় সত্য এটাই যে, এমনই একটি পবিত্র সময়েও আমরা বাংলাদেশে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি আর ভেজাল খাদ্যের দাপটে প্রচণ্ডভাবে হিমশিম খাচ্ছি। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ রমজান উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম কমিয়েছে এবং সরবরাহ বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশে বইছে উল্টো স্রোত। অবাধে দাম বাড়ানো হচ্ছে এবং সৃষ্টি করা হচ্ছে কৃত্রিম সঙ্কট। মুনাফার লোভে অমানবিক ও প্রাণহানিকর ভেজালে আক্রান্ত খাদ্যে সয়লাব করা হচ্ছে বিভিন্ন হাট-বাজার-মার্কেট। এমনকি, অন্যান্য ধর্ম যেমন খ্রিস্টানরা ক্রিসমাসে বা হিন্দুরা পূজায় মূল্যছাড়  দিলেও বাংলাদেশে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে দফায় দফায় দাম বাড়ানোর হিড়িক লাগে। রমজানের শুরুতেই পত্রিকায় খবর বের হয়েছে, ভেজাল ও অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ-মিশ্রিত খেজুর আনা হচ্ছে। কিছু পাকড়াও করা হলেও অধিকাংশই বাজারে প্রবেশ করেছে। মুড়ি, ছোলা, ডাল ইত্যাদিতেও বিরাজ করছে একই দুরবস্থা। এতে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর ধর্ম ও নৈতিকতা চরমভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ব্যবসার নামে যদি এহেন অনৈতিকতা ও অমানবিকতা প্রদর্শন করা হয়, তাহলে যে রমজান উচ্চ নৈতিক চরিত্র, উন্নত মানবতাবোধ, ত্যাগ, পরহিত, কৃচ্ছ্রর শিক্ষা দেয়, সেই পবিত্র মাসের আমল-ইবাদতের সঙ্গে চরম অবমাননাই করা হয়। পক্ষান্তরে, লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, পবিত্র কুরআনের সুরা আল বাকারার ১৮৩-১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেছেন: ‘রমজান মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে আল কুরআন। যা মানব জাতির জন্য সঠিক পথপ্রদর্শনকারী। সঠিক পথে চলার জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী, হক/সত্য ও বাতিল/মিথ্যকে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপনকারী। তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে সে পুরো মাসটিতে রোজা রাখবে।’ পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী : মানুষের মধ্যে ‘তাকওয়া’র গুণ সৃষ্টির লক্ষ্যে রোজা পালনকে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘তাকওয়া’-এর অর্থ হলো আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার প্রতি ভালোবাসা ও ভয়ের অনুভূতি। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার প্রতি ঈমান বা পূর্ণ বিশ্বাস এবং তার সীমাহীন অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার প্রতি মানুষের ভালবাসা জাগ্রত হয়। আর তার অন্যান্য গুণাবলী, যেমন রাগ-ক্ষোভ ও শাস্তিদানের ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস লালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে তার প্রতি ভয়ের ও মান্যতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। ভালবাসা ও ভয়ের এ মিলিত মানসিক অবস্থার নাম ‘তাকওয়া’। বস্তুতপক্ষে, ‘তাকওয়া’ হলো সকল ভাল কাজের উৎস; সকল মন্দ কাজ থেকে বাঁচার সত্যিকার উপায়। ‘তাকওয়া’র গুণাবলী অর্জনকারী ‘মুত্তাকী’ নামে অভিহিত, যে নিজে সৎ কর্মশীল থেকে আপামর মানুষকে সৎ কাজের প্রতি আদেশে দিতে পারঙ্গম আর নিজে সর্ব প্রকার অসৎ কাজ থেকে বিরত থেকে তাবৎ মানব-প্রজন্মকে অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকবার কাজে নিষেধ প্রদান করতে  সক্ষম। এবং তিনি মানুষকে আহ্বান জানাবেন কল্যাণের পথে। আর একথা তো সকলে জানা যে, প্রকৃত প্রস্তাবে মুসলমানদের সৃজন করাই হয়েছে মানব জাতিকে সব ধরনের অকল্যাণ থেকে বিরত রেখে কল্যাণের পথ দেখানোর জন্য। এ মহান কাজেই পুরোটা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন রাহমাতাল্লিল ‘আলামীন নবী মুহাম্মদ মুস্তফা আহমাদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জাগতিক ধন-সম্পদ আহরণ বা পদ-পদবী গ্রহণের বদলে তিনি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা কর্তৃক একমাত্র মনোনীত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে  রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণকামী কাঠামোতে উপস্থাপনের ঐশী দায়িত্ব পালনের কাজে। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিষ্ঠাবান অনুসারী বা সাহাবা রাদি আল্লাহু আনহুমগণও একই কল্যাণব্রতী পথে চলে একদার অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব ও আযমে শান্তির ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ কাজে তাদের সামনে ছিল মাত্র দুটি অবলম্বন: ১. আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার প্রেরিত কিতাব আল কুরআন; এবং ২. নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন-কর্ম-কথার সমষ্টিতে বিনির্মিত তার অনুসৃত আদর্শ বা সুন্নাত। মাত্র দুটি অবলম্বন নিয়েই ইসলাম তার প্রাথমিক যুগে সকল প্রকার আক্রমণ ও প্রতিকূলতাকে পরাভূত করতে সক্ষম হয় এবং নিজেদের বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করতেও সমর্থ হয়। আর এখন বিশ্বের দেশে দেশে মুসলমানগণ নিপীড়িত, নির্যাতিত। কুশাসন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পশ্চাদপদতা, অশিক্ষা এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর নিত্যসঙ্গী। দুর্নীতি, মজুতদারি, মূল্যবৃদ্ধি, ভেজালসহ শত অনৈতিকতায় ছেড়ে গেছে মুসলমান সমাজ ও সম্প্রদায়। এই বাস্তব চিত্রকে আড়াল না-করে একে অপসারণে সচেষ্ট হওয়াই জরুরি। এবং রমজানের শিক্ষায় স্ব-স্ব তাকওয়া ও নৈতিকতাকে বিকশিক করার প্রচেষ্টা নেয়াই কাম্য। ইতিহাস থেকে আমাদের এই সত্য মনে রাখতে হবে যে, ইসলামের আবির্ভাবের পর প্রথম যে রমজান মাস এসেছিল, তার ১৭ তারিখ আরবের কাফেররা হামলা চালায় নতুন ধর্মকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। বদরের ময়দানে হাজার হাজার কাফেরের আগ্রাসী-আক্রমণকারী সুসজ্জিত বাহিনীকে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে ইসলামের শান্তি ও কল্যাণের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখেছিলেন এই ‘তাকওয়া’ বা খোদা প্রেম ও ভীতির মিলিত শক্তিতে। এই তাকওয়া অর্জিত হলেই নৈতিক ও জাগতিক ক্ষেত্রে বিজয় অর্জন করা সম্ভব। সম্ভব অনৈতিকতার দুষ্টচক্র ছিন্ন করা এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নিপীড়ন-নির্যাতন মোকাবেলায় সমুন্নতচিত্তে আত্মমর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকা। রমজানের পবিত্র দর্পণে আত্মসমালোচনা করে এবং রমজানের পবিত্র শিক্ষায় আত্মসংশোধনের মাধ্যমেই জাগতিক ও পারলৌকিক সাফল্য ও কল্যাণের পথ সন্ধান করতে হবে প্রতিটি মুসলমানকে।

You Might Also Like