মিয়ানমারে গণতন্ত্র কি আসবে?

মিয়ানমারের জন্য ২০১৫ সালকে মনে করা হয়েছিল পূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের বছর হিসেবে। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এই আশাবাদে চিড় ধরতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে অবাধ ও মুক্ত করতে যেসব সংস্কারের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল সেই প্রতীক্ষিত সাংবিধানিক সংস্কারের খসড়া প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেই খসড়ায় কাক্সিক্ষত সংস্কারের অনেক কিছুই স্থান পায়নি। এসব সংস্কার আনা হলেও বিরোধী দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সু কি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। সেনাবাহিনীর সম্মতি ছাড়া কার্যত শাসনতন্ত্রে কোনো পরিবর্তনও আনা যাবে না। প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না কিন্তু সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য এমপি মনোনীত হলে তিনি প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধাও থাকবে না।

সংসদের আগামী অধিবেশনে পাসের জন্য গত সপ্তাহের শেষের দিকে সংস্কারের এই প্যাকেজের খসড়া প্রকাশ করার পর তা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা দেখা দেয়। সামরিক জান্তা প্রণীত সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত অনুচ্ছেদ ছিল কয়েকটি। এর মধ্যে ৪৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে সংবিধানের সংশোধনী আনার জন্য সংসদে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। আবার সংসদ সদস্যদের এক-চতুর্থাংশ সংরক্ষিত করা হয় সেনাবাহিনীর জন্য। এর ফলে এ ব্যবস্থাই কার্যত করা হয় যে সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। প্যাকেজে সংবিধান সংশোধনের জন্য ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭০ শতাংশ সংসদ সদস্যের সমর্থনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনে ৫ শতাংশ এমপির সমর্থন কমানোয় কার্যত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে খুব একটা নয়ছয় হয়নি। কারণ ২৫ ভাগ এমপি পদ সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকার পর সেনাবাহিনী ও জান্তার উদ্যোগে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) সমর্থন ছাড়া কোনো সংবিধান সংশোধনী কার্যকর করা যাবে না। একবারে মুক্ত নির্বাচন হলেও ইউএসডিপি ১০/২০ শতাংশ আসন পাবে। এতে সেনা ও সেনাপন্থী দুই পক্ষের মিলে সংসদে আসন দাঁড়াবে ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। ফলে তারা ক্ষমতায় না থাকলেও নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাদের হাতছাড়া হবে না। দুই কক্ষ মিলিয়ে মিয়ানমার সংসদের ১১ শ সদস্য রয়েছেন। আঞ্চলিক ও রাজ্য আইনসভাগুলোতেও পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবার। ২০১১ সালে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই এই নির্বাচনের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি বিশেষভাবে নিবদ্ধ রয়েছে। সেটি আগামী নভেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত থাকবে।

সংবিধানের আরেকটি আলোচিত অনুচ্ছেদ হলো ৫৯(এফ)। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়, কোনো নাগরিকের সন্তান যদি বিদেশী হয় অথবা নাগরিকের কোনো সন্তান যদি বিদেশিনীকে বিয়ে করে তাহলে সেই ব্যক্তি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারবেন না। প্যাকেজ প্রস্তাবে এই অনুচ্ছেদ সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্যতা থেকে কেবল বিদেশিনী বিয়ে করার বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে। এতে কোনো এক প্রভাবশালী সাবেক জেনারেল প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারবেন কিন্তু ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অং সান সু কির পক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।

এনএলডি এখনো মিয়ানমারে সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। দলটির সদস্য রয়েছে ২০ লাখের ওপরে। সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে ২০১০ সালের নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারেনি। ২০১২ সালের উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে ৪৫ আসনের মধ্যে ৪৩টিতে বিজয়ী হন সু কি ও দলের অন্য সদস্যরা। এবার সু কির পিতা ও মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা জেনারেল অং সানের শততম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নির্বাচনের বছরকে সামনে রেখে নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে সু কির দল। সারা দেশে তার জনপ্রিয়তাও রয়েছে ব্যাপক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই জনপ্রিয়তা নির্বাচনে কতটা কাজে লাগে সেটি নিয়েই রয়েছে সংশয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না বলে জানিয়েছেন। ইউএসডিপি প্রধান ও সংসদের স্পিকার সুয়ে মান হতে পারেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। সংসদের উচ্চ পরিষদের স্পিকার খিন অন মিন্ট এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং লেইন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী ব্যক্তি। সাবেক প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে অবসরে গেলেও নেপথ্য থেকে তিনি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও অনেকে মনে করেন। রাজনৈতিক সংস্কারের অনেক কিছুই তাদের পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমান প্রেসেডেন্টের আমলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সমঝোতায় আসতে অনেক আলোচনা ও বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকেই তিনি যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টার আড়ালে বিবদমান এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে ওঠায় আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। এর ফলে শেষ পর্যন্ত টেকসই যুদ্ধবিরতি হচ্ছে না। এ সবকিছুর পেছনেও আন্তর্জাতিক শক্তির যোগসূত্র রয়েছে। তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারলে এসব সমস্যার সমাধানও হতে পারে।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে দেশটির নৃতাত্ত্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতার সক্রিয়তা রয়েছে কম-বেশি। ১৯৬২ সালের মার্চের পর থেকে সামরিক শাসন চলে আসছে দেশটিতে। অং সান সু কির পিতা অং সান স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও তিনি নিজেও ছিলেন একজন জেনারেল। অং সানের পর জেনারেল নে উইনের জান্তা শাসনামলে সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে দমন করার চেষ্টা করা হয় শক্তি প্রয়োগে। নে উইনের পর নির্বাচনে অং সান সু কি জয়ী হলেও সেনাবাহিনীর জেনারেলরা তার হাতে ক্ষমতা না দিয়ে উল্টো রাজনৈতিক দমন-নিপীড়নের পথ বেছে নেন। এর পরের দুই দশকের ইতিহাস অনেকের জানা।

পাশ্চাত্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য সম্ভবত মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে তাদের স্বার্থ দেখতে পায়। এ কারণে দীর্ঘ অবরোধের মাধ্যমে দেশটির জান্তা শাসকদের নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা করে। অবরোধে এক ঘরে জান্তা সরকার বৃহৎ প্রতিবেশী চীনের দিকে অধিক মাত্রায় ঝুঁকে পড়ে। পাশ্চাত্য বলয়ের দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুর ও জাপান সম্পর্ক বজায় রেখে চলে মিয়ানমারের সাথে। গণতন্ত্রের ব্যাপারে একসময় উচ্চকণ্ঠ ভারতও জান্তা সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। এসব দেশ চেষ্টা করে মিয়ানমারকে এককভাবে চীননির্ভরতা হ্রাস করে ভারসাম্যমূলক নীতির দিকে ফিরিয়ে নিতে। জেনারেল থান শোয়ে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কোকাং বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হলে বর্মি সরকার সংস্কারের বিষয়টি মাথায় আনে। সামরিক সরকার সংস্কারের অংশ হিসেবে সামরিক স্বার্থকে একটি রাজনৈতিক দলের অবয়বে বিন্যাস করে। গঠিত হয় ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি।

সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানের আওতায় ২০১০ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে। এ নির্বাচনে সু কির এনএলডি যাতে অংশ নিতে না পারে তা সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। এর পরও আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যবলয় তাদের চাপ ও যোগাযোগ দু’টি অব্যাহত রেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারীকরণ ও সংস্কারে উদ্বুদ্ধ করে জান্তা সরকারকে। এর পথ ধরে ২০১১ সালে কিছু রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৩ সালে ৪৫টি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনের মাধ্যমে সু কির নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় আরো গণতান্ত্রিক সংস্কারের।

পাশ্চাত্য চাইছে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে সু কিকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়া হোক। সর্বশেষ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে স্পষ্ট যে সরকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে কোনোভাবেই সু কি ও তার দলকে গ্রহণ করতে রাজি নয়। প্রস্তাবিত প্যাকেজ সংস্কার কার্যকর হলে সু কি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু তার দলের কোনো প্রার্থী এ পদে প্রার্থী হতে পারেন। কিন্তু সু কির দলে তিনি ছাড়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার মতো বিকল্প কোনো নেতা দেখা যায় না। ৬৯ বছর বয়সী সু কির জন্য এবার বলা যায় শেষ সময়। প্রেসিডেন্ট হতে না পারলে তার পক্ষে ক্ষমতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি আরো সংস্কারের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

বাস্তবে সামরিক বাহিনী প্রভাবিত সরকার সু কিকে প্রেসিডেন্ট পদে মেনে নিচ্ছে না তাই নয়, একই সাথে এটিও বোঝা যায় যে এ পদে বর্তমান বা সাবেক কোনো জেনারেলকেই তারা প্রত্যাশা করেন সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষার জন্য। গত ৫৩ বছরের সেনাশাসনে সামরিক বাহিনীর বিরাট অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয়েছে। দেশটির বড় বড় ধনী ব্যক্তিরা হয় সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল অথবা তাদের সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গ। তারা কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুরোটা ছাড়তে চাইবেন না। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর মধ্যে সার্বিকভাবে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হয়ে আছে যে নানামুখী বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ দেশটির অখণ্ডতা রক্ষা করতে হলে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব বজায় রাখার বিকল্প নেই। এ জন্য তারা দুই দশকে এমন কিছু সংস্কার এনেছেন যাতে এই কর্তৃত্বকে গণতান্ত্রিক শাসনের কাঠামোর মধ্যেও বজায় রাখা সম্ভব হয়। এর অংশ হিসেবে তারা দেশটির নাম, বড় বড় রাজ্য ও শহরের নাম পরিবর্তন এবং সর্বশেষ রাজধানীও দূরবর্তী জনবিরল এলাকা নেইপিডোয় স্থানান্তর করেছে। জান্তা সমর্থিত রাজনৈতিক দলের ভিত্তি সমাজের তৃণমূলপর্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগও নিয়েছে। যদিও এই উদ্যোগের পরও আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সু কির দলের জয়লাভের সম্ভাবনা একপ্রকার নিশ্চিত বলা যায়। এর একটি প্রধান কারণ হলো সামরিক শাসকেরা জনগণের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে দমন নিপীড়নের মাধ্যমেই বরাবর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সামরিক শাসনে দেশটি বরাবরই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয় লাভ করেছে প্রতিবেশী চীন থেকে। মিয়ানমারের সামরিক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে প্রধানত চীনকে অবলম্বন করে। চীন দেশটির প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ৬০ ভাগের যোগানদাতা। দেশটির বড় বড় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রকল্পে প্রধান বিনিয়োগকারীও হলো চীন। ১৯৮৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার সময়ে দেশটিতে যে ৩৩.৬৭ বিলিয়ন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে তার ৪২ শতাংশ একা করেছে চীন। এর মধ্যে তেল গ্যাস, বন্দর, বিদ্যুৎ ও সেচের প্রকল্পও রয়েছে। এসব প্রকল্পের কোনো কোনোটির জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণকে অন্যত্র পুনর্বাসনও করতে হয়েছে, যেটি তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর মধ্যে ইরাবতী নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ তৈরির বহুল আলোচিত প্রকল্প মেইথসুন বাঁধও রয়েছে। কিছু এনজিওর বিক্ষোভের পর জান্তা সরকার ২০১১ সালে এটি স্থগিত করে। প্রকল্পটি স্থগিত করার পর কার্যত ভুল সঙ্কেত যায় বেইজিংয়ে। এরপর চীনা সীমান্তের অভ্যন্তরে নিক্ষিপ্ত গোলায় পাঁচ চীনা নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের বেশ অবনতি হয়। পরে অবশ্য মিয়ানমার সরকার এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।

চীন বরাবরই সরকারের সাথে সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্য দিকে পাশ্চাত্য বলয় মিয়ানমারে নানা ধরনের এনজিও গঠন এবং রাজনৈতিক দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সামাজিক প্রভাব বিস্তৃত করতে চেয়েছে। এর ফলে চীনের রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব যতটা প্রবল ছিল ততটা থাকেনি জনগণ এবং সামাজিক পর্যায়ে। আর চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বৃহত্তম পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে এনজিও ও রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একধরনের গণবিদ্রোহ গড়তে সমর্থ হয় পাশ্চাত্যবলয়।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন সেই কোণঠাসা অবদান কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। সেনাবাহিনীর জেনারেলরাও এখন পুরো কর্তৃত্ব রাজনৈতিক শক্তির কাছে সমর্পণের বিপক্ষে মতামত রাখতে শুরু করেছে। এর ফলে আজীবন চীনবিরোধী অং সান সু কি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য চীনের সাথে বোঝাপড়া করার প্রয়োজন অনুভব করছেন। তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এক ব্যতিক্রমধর্মী আমন্ত্রণে গত ১০ জুন বেইজিং সফর করেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শিসহ শীর্ষ চীনা নীতিনির্ধারকদের সাথে তিনি বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সু কি ক্ষমতায় গেলে চীনা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চেয়েছে বেইজিং। সু কি ভালো করেই জানেন যে চীনের সাথে বোঝাপড়া ছাড়া মিয়ানমারের ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকা অনেকটাই অসম্ভব। সেনাবাহিনীর শীর্ষপর্যায়ে এখনো চীনা প্রভাব প্রবল। এর আগে নির্বাচনে জয়ী হয়েও সু কি ক্ষমতায় যেতে না পারার অভিজ্ঞতা ভোলেননি। ফলে তিনি এবার সব পক্ষের সাথে বোঝাপড়া নির্বাচনের আগেই করে ফেলতে চান।

চীনা নেতৃত্বও এখন কট্টর অবস্থান নিয়ে আঞ্চলিক প্রভাবকে হাতছাড়া করতে চান না। তারা সু কির ক্ষমতারোহণকে মেনে নেয়ার ইঙ্গিতই দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কয়েকটি দেশে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে চীন কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও সু কির সাথে বোঝাপড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতার বিষয়টি পাশ্চাত্য বলয়েরও অজানা নয়। এ কারণে তারা চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে বাধা দিয়েছে বলে মনে হয় না। তবে সু কির জন্য একটি সীমারেখা তারা তৈরি করে রেখেছে। এ সীমা অতিক্রম করে চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক গড়তে তিনি চাইবেন না। তিনি এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও পাশ্চাত্যের বিনিয়োগ সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবেন।

পাশ্চাত্যের বড় বড় তেল কোম্পানি ও ট্রান্সন্যাশনাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবেশ করেছে মিয়ানমারে। এখন ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় রাস্তায় কোকা কোলা, স্যামসাং, টেলিনর, টাটা এমনকি চীনের হাইয়র ব্রান্ডের পণ্যও দেখা যায়। এখানে ম্যককিনসে অ্যান্ড কোম্পানি এবং ইকোনমিস্ট যৌথভাবে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেরও আয়োজন করে। বিদেশী গণমাধ্যম একসময় এখানে নিষিদ্ধ ছিল। এখন হোটেলগুলোতে সিএনএন নিউজ এশিয়া দেখা যায়। এখান থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক মিয়ানমার টাইমস পত্রিকায় স্পষ্টতই সরকার বিরোধী খবর প্রতিবেদন স্থান পায়। একসময় দেশটির প্রধান নগরী ও দীর্ঘ সময়ের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে বিলাসবহুল কোনো গাড়ি দৃষ্টিগোচর হতো না। এখন নগরীর মোড়ে মোড়ে সৃষ্ট যানজটে পাজেরো মার্সিডিজের মতো গাড়ি দেখা যায় অনেক। এর মধ্যে পাঁচতারা হোটেলগুলোও জমজমাট হয়ে উঠছে। নতুন নতুন বিলাসবহুল বিপণিবিতান তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারকে বলা হচ্ছে বিশ্বের ১৩তম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশ।

পরিবর্তনের এই ঢেউ নগরীগুলোতে যতটা পড়বে ততটা গ্রামে পড়বে কি না বলা মুশকিল। দেশটির শহর গ্রাম এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য অনেক বেশি প্রকট। উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব শাসকদের আর তাদের আনুকূল্যপ্রাপ্তদের মধ্যে সীমিত। মুসলিম ও অন্য ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বঞ্চনার কোনো সীমা নেই। সংখ্যালঘুদের ধর্ম ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বারবার হুমকির মধ্যে পড়ছে। নাম, বিয়ে এবং সন্তানধারণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে শাসকগোষ্ঠী। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে সহাবস্থান ও সহমর্মিতার পরিবর্তে বিভাজনের নীতি অনুসরণ বেশি করছে শাসকেরা। নাগরিকদের জন্য শিক্ষাদীক্ষার সুবিধা একবারে সীমিত, সংখ্যালঘু হলে তো কথাই নেই। দেশটির অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় রাজ্য আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে তাদের বিতাড়নের কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে একধরনের উগ্র সম্প্রদায়গত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করছে এক শ্রেণীর চরমপন্থী বৌদ্ধভিক্ষু। আর প্রধান বিরোধী দল এনএলডি ও এর নেত্রী অং সান সু কি রহস্যজনকভাবে এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করেন।

মিয়ানমারের এখনকার সময়টা একধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে এটি একটি অবয়ব লাভ করবে হয়তো বা। এ ক্ষেত্রে নভেম্বরের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। তবে এ নির্বাচন কতটা শাসকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সেটি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে একটি পরিবর্তন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই আলোচিত দেশটিতে যে প্রবহমান রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার অন্তরালে রয়েছে চীন ও পাশ্চাত্য বলয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। যাতে ভারতও মাঝে মধ্যে পক্ষ হতে চেয়ে অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে ছিটকে পড়ছে। বাংলাদেশ এমন এক দুর্ভাগা দেশ যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করতে পারে না। মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও বারবার সুযোগ হাতছাড়া করে এখন এক অবিশ্বস্ত প্রতিবেশী দেশে পরিণত হয়েছে দেশটির বর্তমান সরকারের চোখে।

You Might Also Like