আশা করছি নরেন্দ্র মোদি মনমোহন হবেন না

Modi-Mohan২২মাহফুজ আনাম 

ভারতের জন্য সময় এসেছে ২০১০ এর বাংলাদেশের মতো বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে যখন সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেছিলেন তখন আমরা সবাই বলেছিলাম তিস্তা ছাড়া ট্রানজিট মিলবে না। এইবারের সফরেও তিস্তা নিয়ে কিছুই ছিল না তারপরও আমরা কানেক্টিভিটির মোড়কে মোড়া ট্রানজিট দিতে রাজি হয়েছি। এই ফলাফলটি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্ররোচিত করার ক্ষমতার প্রমাণ নয়, বরং তার উপর আমাদের বিশ্বাসের অভিব্যক্তির প্রকাশ যে তিনি প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করবেন যে সব প্রতিশ্রুতি তার পূর্বসূরি পূরণ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। সত্য বলতে মনমোহন প্রস্তুতিমূলক সব কর্মকা-ই করেছিলেন।

পানি বণ্টন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং থাকবে। কিন্তু অপরদিকে ভারতের পক্ষ থেকে শুধু প্রতিশ্রুতিই এসেছে। মোদি বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি রাজ্য সরকারের সহায়তায় আমরা তিস্তা এবং ফেনী নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে ন্যায্য সমাধানে পৌঁছাতে পারব। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই শর্তযুক্ত প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। যেহেতু পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনরকম সাড়াই মেলেনি। তার বেশ কিছু শারীরি ভাষা থেকে ধারণা করা যায়, অতি শীঘ্রই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির সমাধান হবে। যদিও তিনি এ ব্যাপারে কোনরকম সাড়াশব্দ করেননি। কারণ তিনি জানতেন কিছু বললেই তার কাছে প্রশ্ন আসবে কেন? সত্য বলতে তার নীরবতা এবং অঙ্গভঙ্গিই বলে দেয় যে তিনি এই বিষয়ের সমাধান এখনই চান না।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউই কৃপণতা করেনি। সরকার সব ধরনের চেষ্টা করেছে। সব রাজনৈতিক দল মোদির সাথে দেখা করার জন্য চেষ্টা করেছে। বিএনপি এবং জামায়াতের মতো দলও খোলাখুলিভাবে বলেছে যে তাদের রাজনৈতিক দর্শন ভারতবিরোধী নয়। গণমাধ্যমগুলোও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর সমালোচনাহীন ও ফলাও করে প্রচার করেছে।

এই সবই হয়েছে আমাদের আবেগ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির উপর বিশ্বাসের কারণে যে তিনি সেইসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন যেগুলো অন্যরা করতে পারেনি। এই বিশ্বাসটি দু’টি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে : প্রথমত স্থলসীমান্ত চুক্তি করার ক্ষেত্রে তিনি সমগ্র ভারতকে এক করেছেন যেখানে লোকসভায় তার এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একটি ভোটও পড়েনি।

পরের ব্যাপারটি হলো তার উদ্ধৃত সবার আগে প্রতিবেশি নীতি। বিষয়টি আমাদের জন্য মধুর সুরের মতো, যে সুর আমরা আগে শুনিনি। এর আগে ভারত তার প্রতিবেশির প্রতি মনোযোগী হবে এই কথাই বলতেন প্রাক্তন সব প্রধানমন্ত্রীরা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আসলে প্রতিবেশি হিসাবে পাকিস্তানকে এবং কখনো কখনো চীনকে বোঝানো হত। যা সবাইকে ভাবতে বাধ্য করত যে, ভারতের মাত্র দু’টি প্রতিবেশি, পাকিস্তান ও চীন। বাকি সবাই ছিল শুধু ভৌগলিক সত্ত্বা।

এই সব কিছুই প্রধানমন্ত্রী মোদির হাতে পরিবর্তিত হবে বলে আমরা আশাবাদী এবং আমাদেরও তাকে এই বিষয়টি বাস্তবায়ন করার জন্য উৎসাহ দেয়া উচিত এবং সেটি অতিশীঘ্রই করা দরকার। মোদি যদি তার নীতির প্রতি অটল থাকেন তবে বাংলাদেশের উচিৎ হবে ভারতকে পাকিস্তান আবেশ থেকে বের করে নিয়ে আসা। তাহলেই বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবে চীনকে সরিয়ে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশিতে পরিণত হবে। যদি এমনটি ঘটে এবং এটি না হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ নেই, তবে আমরা অনেক কিছুই করতে পারব আমাদের মধ্যকার এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে।

ভারত আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং আমাদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ারাই খুলে দেয়। যদিও আমাদের মধ্যে কিছু মানুষ এটি বিশ্বাস করে না। তারা সব সময় ভারতবিরোধী মনোভাবে ভোগেন। আমরা এটিও বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশ-ভারত আঞ্চলিক সহযোগিতা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মাথা পিছু আয় বাড়াতে পারে এবং ভারতও একটি বড় ও আকর্ষণীয় বাজার লাভ করতে পারে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটি আমাদের বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জন্য, যার জন্য আমাদের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ দরকার সারা পৃথিবী থেকে, বিশেষত ভারত থেকে। দু’টি বড় প্রকল্প ভালো একটি সূচনা ঘটালেও এর বিস্তারিত নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দরকষাকষি করা দরকার। বাণিজ্য হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যা কানেক্টিভিটির ওপর নির্ভরশীল এবং যার জন্য দুই দেশের মাঝে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

মনে করা হয় যে, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিক-নির্দেশনা ছাড়া বাংলাদেশের লাভের বিষয়টি আসলে ভারতকেই সাহায্য করবে বাংলাদেশে নিজের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে। এখানেই মোদির ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কী ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলোকে দুর্বল করার নীতি, নাকি তাদের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার নীতি?

এখন সময় ভারতের পরিশোধ করার। এখন নরেন্দ্র মোদির সময় পরিশোধ করার। ২০১০ সালে শেখ হাসিনা যে বিশ্বাসে কাজ করেছিলেন ভারতের উচিত এখন সেই বিশ্বাসে কাজ করা।

ভাষান্তর : ওমর ফারুক সীমান্ত

You Might Also Like