আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে ২ সম্পাদক ও ৭ সাংবাদিকদেরকে অব্যাহতি

হাই কোর্ট থেকে পদত্যাগকারী বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়জীর ‘এলএলবি সনদ’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে প্রথম আলোর সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রতিবেদককে অব্যাহতি দিয়েছে আপিল বিভাগ।

একই ঘটনায় ভোরের কাগজের প্রকাশককে অব্যাহতি দেয়া হলেও আপিল নাকচ হয়েছে পত্রিকাটির তখনকার সম্পাদক ও প্রতিবেদকের। অবশ্য ভোরের কাগজের ওই প্রতিবেদককে হাই কোর্ট যে সাজা দিয়েছিল, আপিল বিভাগ তা কমিয়ে দিয়েছে।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এই রায় দেয়।

এলএলবি সনদে জালিয়াতি ও ১৮০টি মামলার রায় না দেয়ার বিষয়ে তদন্ত শুরুর পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছিলেন ফয়সল মাহমুদ ফয়জী।

আপিল মঞ্জুর হওয়ায় অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ওই সময়ের প্রকাশক মাহফুজ আনাম (ডেইলি স্টার সম্পাদক), প্রতিবেদক একরামুল হক বুলবুল ও মাসুদ মিল্লাত। হাই কোর্ট তাদের সবাইকে একহাজার টাকা করে জরিমানা করেছিল। ভোরের কাগজের প্রকাশক সাবের হোসেন চৌধুরীকেও হাই কোর্ট একহাজার টাকা করে জরিমানা করেছিল। আপিল বিভাগ তার আপিল মঞ্জুর করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে প্রতিবেদক সমরেশ বৈদ্য ও পত্রিকাটির ওই সময়ের সম্পাদক আবেদ খানের আপিল মঞ্জুর করেনি আপিল বিভাগ।

এর মধ্যে সমরেশ বৈদ্যকে হাই কোর্টের দেয়া দুইমাসের কারাদণ্ড ও একহাজার টাকা জরিমানার দণ্ড কমিয়ে একহাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দিয়েছে।

হাই কোর্ট আবেদ খানকে একহাজার টাকা জরিমানা করেছিল। তার আপিলও নামঞ্জুর হয়েছে।

আদালতে প্রথম আলোর সাংবাদিকদের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। সাবের হোসেন চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন এ এম আমিন উদ্দিন। আর আবেদ খান ও সমরেস বৈদ্যর পক্ষে শুনানি করেন রোকনউদ্দিন মাহমুদ।

হাই কোর্টে অভিযোগকারী ফয়জীর বাবা সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফয়েজের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি।

২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান ফয়জী। এরপর তার এলএলবি সনদ নিয়ে ওই বছরের ৩০ অক্টোবর ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দুই প্রতিবেদনেই ফয়জীর মার্কসিটে এলএলবি বিষয়ের নম্বর ঘষামাজা করার অভিযোগ আনা হয়।

এরমধ্যেই ফয়জীর বাবা মোহাম্মদ ফয়েজ হাই কোর্টে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন। এই অভিযোগের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২১ মার্চ দুই পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রতিবেদককে দণ্ড দেয় হাই কোর্ট।

পরের বছর ২২ অগাস্ট তখনকার প্রধান বিচারপতির সুপারিশ উপেক্ষা করে ফয়জীকে হাই কোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এদিকে পরীক্ষায় ফল জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৭ সালের ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফয়জীর এলএলবির সনদ বাতিল করে।

ওইদিন ফয়জীসহ মোট দুই হাজার ৪০০ জনের সনদ বাতিল করা হয়। ১৬ মার্চ এ সংক্রান্ত গেজেটে প্রকাশ হয়। তবে এর মধ্যেই ৪ মার্চ থেকে ফয়জীকে বিচারকাজ থেকে প্রত্যাহার করে নেন প্রধান বিচারপতি।  এরপর ফয়জী সনদ বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন।

হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ ১৯ মার্চ তার এলএলবি সনদ বাতিলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার পাশাপাশি রুল দেয়। ওইদিনই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতি ফয়জীর এলএলবি সনদ জালিয়াতি সংক্রান্ত প্রথম রেফারেন্স রাষ্ট্রপতি বরাবর পাঠায়। ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে এ অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন।  পরে তার বিরুদ্ধে ১৮০টি মামলার রায় না দেয়ার মাধ্যমে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও ওঠে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ওই বছরের ২৬ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে বিচারপতি ফয়জীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় রেফারেন্স পাঠালে রাষ্ট্রপতি অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর এ ব্যাপারে দুই দফা নোটিস পাঠানো হলেও ফয়েজী তা গ্রহণ করেননি। পরে তার আদালতের ব্যক্তিগত সরকারী এবং বাসার কেয়ারটেকার ওই নোটিস গ্রহণ করেন।

নোটিস অনুযায়ী দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে ১৫ জুলাই ফয়জীকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। অবশ্য কাউন্সিলের সামনে হাজির হওয়ার আগেই ২০০৭ সালের ১২ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন। পরে ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি করে ওই বছরের ৬ অগাস্ট হাই কোর্ট ফয়জীর এলএলবি সনদ বৈধ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়।  পাশাপাশি ফয়সল মাহমুদ ফয়জীকে বিশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত।

রায়ে বলা হয়, ফল প্রকাশের ১৭ বছর পর তা বাতিল করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এতো বেশি সময় পার করার বিষয়ে আদালত বলে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হয় অযোগ্য, নয়তো তারা অবহেলা করেছে।

You Might Also Like