যে শহরকে বলা হয় “পাপের শহর”

চীনের দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদন-কেন্দ্র বলে পরিচিত ডোংগুয়ানের ব্যবসায়ী হ্যান ইউলাই। তার বহু গ্রাহক যখন কারখানা সফর ও বাণিজ্যমেলায় অংশ নিতে সেখানে যান, তখন তিনি সব সময়ই তাদের কিছু একটার প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। তিনি একে বলছেন, ‘ডোংগুয়ান স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে। বিকালের দিকে তিনি তাদের নিয়ে যান কেটিভিতে। ডোংগুয়ানকে বলা হয় ‘চীনের পাপের শহর’। সেখানকার কেটিভি নামের কারাওকে বিনোদন কেন্দ্রটি মূলত যৌন-সেবারই নামান্তর। এসব পতিতালয় ব্যবসার দায়িত্বে থাকা নারীটির নাম মামাসান। তিনি ওই গ্রাহকদের বহু তরুণীকে দেখাবেন। তাদের বেশির ভাগই চীনা, তবে জাপানি ও কোরিয়ানও রয়েছে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামি হলো রাশিয়ান তরুণীরা।

হ্যান বলেন, আপনি একজন বা দুজন তরুণীকে নিয়ে গান গাইতে পারেন, কিছু পান করতে পারেন; কিছুটা মজাও নিতে পারেন। এরপর ওপরতলার একটি কক্ষে চলে যেতে হবে। সেখানে কোন ভালবাসা চলবে না, শুধু ব্যবসা চলবে। এ ‘ব্যবসা’ দিয়ে তিনি মূলত পতিতাবৃত্তিকেই বুঝিয়েছেন। কারণ, চীনে পতিতাবৃত্তি অবৈধ। তাই হ্যানদের অনেক রাখঢাক রেখে কথা বলতে হয়। এখন এ ধরনের ব্যবসা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডোংগুয়ানের যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে সরকার।

দুই সহস্রাধিক হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার সে সময় বন্ধ করে দেয়া হয়। হাজার হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে অনেকে ছিল পতিতা ব্যবসার সন্দেহভাজন পরিচালক। এ ছাড়া বহু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। শহরের সরকারি নিরাপত্তা ব্যুরোর প্রধান ও ভাইস মেয়রকে তখন পদচ্যুত করা হয়েছিল। এক বছর পরও সে অভিযানের প্রভাব এখনও অনুভূত হয় শহরটিতে। তাই বিভিন্ন হোটেলে ম্যাসাজ পার্লার এখনও বন্ধ। কোন সড়কেই চীনা পতিতাদের দেখা যাবে না। বিভিন্ন সেলুনে আগে যৌনসেবা দেয়া হতো। কিন্তু সেখানে এখন গ্রাহকদের চুল সম্পর্কিত সেবাই দেয়া হয়। অন্য কিছুর সেবার দেখা মিলে না। ধারণা করা হয়, চীন সরকারের ওই অভিযানে এ-সংক্রান্ত ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৮০০ কোটি ডলার! ব্যবসায়ী হ্যানও বিষয়টিতে একমত পোষণ করেছেন।

তিনি বলেন, এক বছর আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক কম গ্রাহক পাই আমরা। কিন্তু তাই বলে ব্যবসা তো থেমে থাকবে না। বিভিন্ন পতিতালয় ডোংগুয়ানে এখন অতীত। এর মানে এই নয়, পতিতা ব্যবসাও শেষ হয়ে গেছে! বরং ব্যবসাটি এখন চলছে গোপনে। হ্যান এখন তার গ্রাহকদের সরাসরি কেটিভিতে নিয়ে যাতে পারেন না ‘ডোংগুয়ান স্ট্যান্ডার্ডের’ জন্য। কিন্তু নজরদারি এড়িয়ে চলাচলের উপায়ও কম নেই। আমি যখন আমার হোটেলে ফিরে যাই, সেখানের ম্যাসাজ পার্লার বন্ধই দেখেছি। তবে এক রাতে এক লবি-বয় এসে আমায় জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ‘ম্যাসাজ’ পছন্দ করো? মাত্র ১৬০ ডলারের বিনিময়ে আমার কক্ষে এসে দুই ‘সুন্দরী’ চীনা নারী ৯০ মিনিট ম্যাসাজ করবে। সে আমাকে ওই দুই নারীর নম্বরও দিলো। হোটেলে আরেক ব্যক্তিও আমাকে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। এমনকি আমাকে সে তার কার্ডও দিয়ে গেল। একদিনেরও কম সময়ে আমি দুবার প্রস্তাব পেলাম।

যৌনসেবার চাহিদা ও জোগানের জন্য সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের প্রধান ইন্সট্যান্ট ম্যাসাজিংসেবা উইচ্যাট ব্যবহৃত হচ্ছে বেশি। কেটিভিতে যেহেতু নারীরা আর কাজ করতে পারছে না, তারা বিভিন্ন ভবনের ধারে দাঁড়িয়ে খদ্দের জোগাড়ের চেষ্টা করে। উইচ্যাটে ‘পিপল নিয়ারবাই’ ও ‘ফিমেল অনলি’ অপশনে গেলে আপনি ওই এলাকার অন্যান্য উইচ্যাট ব্যবহারকারীর তালিকা পাবেন। এদের প্রোফাইলের ছবিতে খেয়াল করলে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত নারীদের বুঝতে আপনার অসুবিধে হবে না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে এ সেবা অব্যাহত রাখাটা জটিল হয়ে উঠছে। কেননা, চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট থেকে যৌনতা সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নিয়মিত সরিয়ে ফেলে। চীনা গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যৌনসেবা এখন ঘরে ঘরে প্রচারণা চালিয়ে ও ফোন ব্যবহার করে চলছে।

ডোংগুয়ানে ২০১৪ সালের অভিযানের আগে ২৫ হাজার যৌনকর্মী ছিল বলে ধারণা করা হতো। ওই অভিযানের সমালোচকরা বলছেন, ব্যবসাটি এখন গোপন দিকে চলে যাওয়ায় যৌনকর্মীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছেন। পুলিশ ও খদ্দেররা প্রায়ই তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। ওই অভিযানের পর পরিস্থিতি একই অবস্থায় রয়েছে। এখনও যৌনকর্মীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত বছর বন্ধ হওয়া বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের বেশির ভাগ এখন খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এপ্রিলে আরও কঠোর নীতি প্রয়োগের পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্যক্তিগত তালাবদ্ধ কক্ষে কিংবা আলো নিভিয়ে ম্যাসাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাত্রিকালীন সময়ে অতিথিদের পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশকে জানানো এবং ম্যাসাজ পার্লারের প্রস্তাব দেয়া লোকদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন এলাকার দোকানের পাশে ভায়াগ্রা বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। এদের কিছু আসল; কিছু আবার নকল। একজন চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করা হলো, অভিযানের পর এখনও কি গর্ভধারণ-নিরোধক পিলের চাহিদা রয়েছে? তিনি হেসে জবাব দিলেন, হ্যাঁ। বিশেষ করে রাতে।

You Might Also Like