নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের ভূমিকম্প

ড. মো: রফিকুল ইসলাম : ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিষয়ে আলোচনা ও ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার আগে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে প্রচলিত ‘মহাদেশগুলোর চলমানতা’ (Continental drift) নামের একটা মতবাদের সাথে পাঠকের ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ মতবাদ অনুযায়ী ‘পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশ পরস্পর স্থির নয়, বরং একে অপরের সাপেে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলমান রয়েছে।’ এ ধারণাটি ১৫৯৬ সালে সর্বপ্রথম ব্যক্ত করেন আব্রাহাম অরটিলিয়াস নামে এক ভূবিজ্ঞানী। উল্লিখিত ধারণার ৩১৬ বছর পর ১৯১২ সালে জার্মানির বিজ্ঞানী ও ভূপদার্থবিদ আলফ্রেড ওয়েগনার (১৮৮০-১৯৩০) পৃথিবীপৃষ্ঠে মহাদেশগুলোর চলমান প্রক্রিয়াকে একটা হাইপোথিসিস আকারে উন্নীত করার চেষ্টা করেন। তিনি ধারণা দেন, পৃথিবীর বর্তমান মহাদেশগুলোÑ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দণি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এন্টার্টিকা সৃষ্টির আদিতে পান্গিয়া (Pangaea) নামের একটা একক ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে তা ভেঙে উত্তরাংশে লরেশিয়া (Laurasia) ও দণিাংশে গন্ডোয়ানা (Gondwana) নামের দু’টি পৃথক ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর অত্যন্ত ধীরগতিতে লরেশিয়া ও গন্ডোয়ানা ভূখণ্ডদ্বয়ের মধ্যেও ভাঙনের ধারা অব্যাহত থাকে এবং কালের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীর বর্তমান সাতটি মহাদেশীয় ভূখণ্ড সৃষ্টি হওয়ার পর এগুলো আবার একে অপর থেকে ধীরগতিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ভূখণ্ড থেকে সংগৃহীত জীবাশ্ম বা ফসিলের পারস্পরিক তুলনা করে এসব ভূখণ্ডের অখণ্ডতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া মহাদেশীয় ভূখণ্ডগুলোর প্রান্ত বরাবর মাঝখানের নিচু অংশে রয়েছে সাগর-মহাসাগর। কিন্তু তিনি তার জীবদ্দশায় এ ধারণাটি উপযুক্ত প্রমাণসাপেে উপস্থাপন করতে পারেননি বিধায় বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। এরপর ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে একটা জোরালো মতবাদ, ‘পৃথিবীর সাগরগুলোর তলদেশ সম্প্রসারিত হচ্ছে’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আলফ্রেড ওয়েগনারের ‘কন্টিনেন্টাল ডিফ্ট’ হাইপোথিসসটিকে বিশ্বের সব ভূবিজ্ঞানী একবাক্যে মেনে নেন। এ হাইপোথিসিসের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬০ সালে প্লেট টেকটোনিক থিওরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ থিওরি মতে পৃথিবী নামের গোলকটি (মহাদেশ ও মহাসাগর মিলে) সাতটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এগুলো হলো- (১) প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট, (২) ইউরেশিয়ান প্লেট, (৩) ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট, (৪) আফ্রিকান প্লেট, (৫) উত্তর আমেরিকান প্লেট, (৬) দণি আমেরিকা প্লেট ও (৭) এন্টার্টিক প্লেট। এসব প্লেটের মধ্যে কিছু সাব-প্লেট রয়েছে, যেমন- বৃহত্তর ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের ভেতর অ্যারাবিয়ান প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেট, বৃহত্তর দণি আমেরিকা প্লেটের সর্ব দেিণ স্কোশিয়া প্লেট ও উত্তরাংশে ক্যারিবিয়ান প্লেট, বৃহত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটের পূর্বাংশে নাজকা প্লেট ও ককোজ প্লেট, পশ্চিমাংশে ফিলিপাইন প্লেট এবং উত্তর-পূর্বাংশে যুয়ান-ডি-ফুকা প্লেট অবস্থিত।

ভূমিকম্পের ব্যাখ্যা করার আগে এখানে আরো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজনÑ ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে পৃথিবীর অভ্যন্তরে অংশ তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত বলে ধারণা করা হয়। এগুলো হলো যথাক্রমে- ০১. ক্রাস্ট (Crust), যা শক্ত পাথুরে অংশ এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূগর্ভের দিকে প্রায় ৫-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত মহাসাগরের তলদেশ বরাবর এই ক্রাস্টের পুরুত্ব ৫-১০ কিলোমিটার এবং মহাদেশগুলোর তলদেশে এর পুরুত্ব ৩৫-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত, ০২. ম্যান্টল (Mantle), যা ক্রাস্টের চেয়ে তুলনামূলকভাবে নরম এবং ভূগর্ভের দিকে ৩৫-৭০ কিলোমিটার থেকে ২৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অংশের মধ্যে বিস্তৃত; এবং ০৩. কোর (Core) বা কেন্দ্রীয় অংশ, যা মূলত খুবই উত্তপ্ত (প্রায় ৫০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং যা ২৯০০ কিলোমিটার থেকে পরবর্তী ৫২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো ক্রাস্ট অংশ ও ম্যান্টলের ওপরের দিকের শক্ত অংশ মিলে তুলনামূলকভাবে যে শক্ত ও কঠিন পাথুরে স্তর গঠিত তা আবার লিথোস্ফিয়ার নামেও পরিচিত। টেকটোনিক প্লেটগুলো লাখ লাখ বর্গকিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এবং ভূগর্ভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। টেকটোনিক প্লেটগুলোকে ভূবিজ্ঞানের ভাষায় লিথোস্ফেরিক প্লেটও বলা হয়। আরো সহজভাবে বলাnepal_earthquake_624 যায়, মহাদেশীয় লিথোস্ফেরিক প্লেটগুলো হলো লিথোস্ফিয়ার নামের শক্ত ও কঠিন পাথুরে স্তর, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই লিথোস্ফিয়ার স্তরটি আবার অ্যাসথেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) নামের আরেকটি অতি উত্তপ্ত, গলিত, অধিক ঘনত্ববিশিষ্ট ও চটচটে ম্যাগমা স্তরের ওপর বিদ্যমান, যার অবস্থান ভূগর্ভের ৮০ কিলোমিটার গভীরতা থেকে পরবর্তী ২৫০-৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ৭০০ থেকে পরবর্তী ২৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্তরটির নাম মেসোস্ফিয়ার। অ্যাসথেনোস্ফিয়ার স্তরটি কিন্তু মোটেও স্থির নয়, বরং অধিকতর উত্তপ্ত হওয়ার পরিপ্রেেিত ঘন চটচটে ও অর্ধ-তরল এই স্তরটি ভূগর্ভে অতি ধীরগতিতে স্রোতের আকারে সার্বক্ষণিক ঘূর্ণনরত রয়েছে। আর এ কারণেই অ্যাসথেনোস্ফিয়ার স্তরটির ওপরে ভাসমান লিথোস্ফেয়ার স্তরটিও সাথে সাথে নড়াচড়া করছে। এর ফলে মহাদেশীয় লিথোস্ফেরিক/টেকটোনিক প্লেটগুলো তাদের প্রান্ত রেখা বরাবর সক্রিয়ভাবে ধীরগতিতে চলমান রয়েছে। এ প্লেটগুলো কোথাও বা পরস্পর মুখোমুখি (কনভারজেন্ট), আবার কোথাও বা পরস্পর আড়াআড়িভাবে (ট্রান্সফরম) সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। তবে সাগরের তলদেশে দু’টি প্লেট তাদের সংযোগস্থল বরাবর সম্প্রসারিত হয়ে পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে (ডাইভারজেন্ট)। ভূবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, লিথোস্ফেরিক/টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রান্ত রেখা বরাবর সক্রিয়ভাবে নড়াচড়া করার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে।

আবার এ ধরনের প্রমাণও আছে যে, একই টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে অনেক সাব-প্লেট থাকলে এবং এগুলো হঠাৎ করে একে অপর থেকে বিচ্যুতি ঘটলেও ভূমিকম্প হতে পারে। পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ড/টেকটোনিক প্লেটগুলো স্থির রয়েছে, না চলমান রয়েছে, তা বর্তমানে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) প্রযুক্তির সুবাদে জানা সহজ হয়েছে। UNAVCO-এর ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রতিটি বিন্দুই চলমান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেটের উত্তর-পূর্বাংশ বরাবর বিদ্যমান আমাদের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিমিটার (৪ সে.মি.) বেগে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান সাব-প্লেটটি আবার ইউরেশিয়া প্লেটের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার কারণে উভয় প্লেটের প্রান্তরেখা বরাবর ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য, দু’টি প্লেটের সংযোগস্থল বরাবর অবিরত মুখোমুখি সংঘর্ষ চলতে থাকলেও সংযোগস্থল বরাবর ওপরিভাগে অতিকায় বিশাল পর্বতমালাগুলোর অবস্থানের কারণে ভূমিকম্পের তীব্রতা কমছে এবং জনবসতি ও দালানকোঠা তীব্র ভূমিকম্পের প্রকোপ থেকে রা পাচ্ছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটছে পৃথিরীর সববৃহৎ পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে। পৃথিবীর প্রতিটি বড় পর্বতমালা কোনো না কোনো টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল বরাবর অবস্থিত, যেমন- ইউরেশিয়া প্লেটের দণি প্রান্তের ওপর পৃথিবীর বড় আকারের হিমালয় পর্বতমালা দাঁড়িয়ে আছে। ইউরেশিয়া প্লেটের কেন্দ্রভাগের দেিণ আল্পস পর্বতমালা অবস্থিত। এ ছাড়াও এ প্লেটে অবস্থিত পিরেনিজ, অ্যাপেনাইজ, উরাল ও বলকান পর্বতমালার নাম উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৭ কিলোমিটার উঁচু ও ৭২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্দিজ পর্বতমালা দণি আমেরিকান প্লেটের পশ্চিম উপকূল বরাবর অবস্থিত। উত্তর আমেরিকান প্লেটের কানাডা থেকে নিউ মেক্সিকো পর্যন্ত প্রায় ৪৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রকি পর্বতমালা বিদ্যমান। এ ছাড়াও এ প্লেটে অ্যাপালাচিয়ান, সিয়েরানেভাদা, লরেনটিডস পর্বতমালা অবস্থিত। আফ্রিকান প্লেটের কিলিমানজারো ও অ্যাটলাস পর্বতমালা এবং পূর্ব আফ্রিকার উচ্চভূমি ও ইথিওপিয়ান উচ্চভূমি উল্লেখযোগ্য। অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের ম্যাকডোনেল, গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের নাম সর্বজনবিদিত। এ ছাড়াও শত শত পর্বতমালা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যমান রয়েছে যেসব পর্বতমালা না থাকলে ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থাপনাই টিকে থাকতে পারত না। পৃথিবীতে সংঘটিত মোট ভূমিকম্পের শতকরা ৮০ ভাগ ঘটে প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় বলয় বরাবর, যে বলয়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০,০০০ কিলোমিটার এবং এ আগ্নেয় বলয়ের বিভিন্ন স্থানে ৪৫২টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ১৫ শতাংশ ভূমিকম্প ঘটে ভূমধ্যসাগর-এশিয়াটিক বেল্ট বরাবর এবং শতকরা ৫ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের ভেতরের দিকে।

পৃথিবীর কোনো স্থানই ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে পৃথিবীর বেশ কিছু জায়গা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন- দুই বা ততোধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অধিক উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প পরিলক্ষিত হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশের যাবতীয় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়া প্লেটের সংযোগস্থলের লাইন বরাবর অবস্থিত। এ দু’টি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ লাইনটি বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণ বরাবর অবস্থিত। নেপালের মতো দু’টি টেকটোনিক প্লেটের প্রান্তদেশ বরাবর বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ার কারণে আমরা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি।

লেখক : বিজ্ঞানী ও শিক্ষক, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট

You Might Also Like