যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের নির্বাচনে পরিবর্তন এলো না। জনমত জরিপে বলা হয়েছিল, একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু তা হয়নি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই কনজারভেটিভ পার্টি আবারও ক্ষমতায় থেকে গেল আগামী পাঁচ বছরের জন্য। ২০১০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভরা যে ফলাফল করেছিল, এবার তাদের ফলাফল গেলবারের ফলাফলকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ সালে কনজারভেটিভরা পেয়েছিল ৩০৬ আসন। এবার এ সংখ্যা ৩৩১। অন্যদিকে লেবার পার্টির ভরাডুবি হয়েছে। গেলবার তারা পেয়েছিল ২৫৮ আসন, আর এবার পেল ২৩২ আসন। ভরাডুবি ঘটেছে লিবারেল ডেমোক্রেটদের। গেলবার তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৫৭, এবার তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮-এ। তবে অবাক করা ঘটনা ঘটেছে স্কটল্যান্ড ন্যাশনালিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে। সর্বশেষ নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র ৫টি আসন। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।

যুক্তরাজ্যের এই নির্বাচন এখন অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিল। এক. যুক্তরাজ্যের গত ৯৩ বছরের যে গণতন্ত্র (১৯২২ থেকে), যেখানে মূলত দুটি প্রধান দলই ক্ষমতা পরিচালনা করে, এই ধারা থেকে দেশটি এবারও বেরিয়ে আসতে পারল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এরাই সরকার গঠন করে। ২০১০ সালে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছিল বটে। সেবার সরকার গঠনের জন্য কনজারভেটিভ দলের প্রয়োজন ছিল তৃতীয় একটি দলের সমর্থনের। লিবডেম বা লিবারেল ডেমোক্রেটরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরনের প্রতি সমর্থন দিয়ে যৌথভাবে একটি সরকার গঠন করেছিলেন এবং লিবডেম নেতা নিক ক্লেগ উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার লিবডেমের বড় ধরনের পরাজয় হয়েছে। এটা স্পষ্ট, ডেভিড ক্যামেরন এককভাবেই সরকার গঠন করবেন। তিনি এবার আর কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন না। চারটি জাতি নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত এবং হাউস অব কমন্সের আসনও সেভাবে নির্ধারিত। যেমন ইংল্যান্ডের রয়েছে ৫৩৩ আসন, ওয়েলসের ৪০, নর্থ আয়ারল্যান্ডের ১৮ ও স্কটল্যান্ডের ৫৯। সব মিলিয়ে ৬৫০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য দরকার হয় ৩২৬টি আসন।

দুই. এই নির্বাচন প্রমাণ করল যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে সম্ভাবনা ছিল, সে সম্ভাবনা এখন আর নেই। সাধারণ মানুষের আস্থা দুই বড় দলের প্রতিই। তবে যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের এটা একটা সৌন্দর্য যে, দল যদি হেরে যায়, তাহলে দলনেতা পরিবর্তন করে। এড মিলিব্যান্ড এখন আর লেবার পার্টির নেতা থাকবেন না। একই সঙ্গে লিবডেমের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসবে। নিক ক্লেগের পরিবর্তে আমরা এখন অন্য কাউকে দেখব লিবডেমের নেতৃত্বে। যুক্তিটি হচ্ছে, দলের নেতৃত্ব যে ‘নীতি ও আদর্শ’ নিয়ে নির্বাচনে গেল, ভোটাররা তা গ্রহণ করেনি। ফলে দলকে এখন নয়া নীতি ও আদর্শ খুঁজে বের করতে হবে।

তিন. স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) এখন হাউস অব কমন্সে তৃতীয় শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ দলটি ৫৯টি আসনের মধ্যে ৫৬টি পেয়েছে। অথচ এ দলটি স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বের করে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ গড়তে চায়। এটা ছিল তাদের স্লোগান। যদিও গেল সেপ্টেম্বরে (২০১৪) স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছিল, তাতে যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষেই ভোট পড়েছিল বেশি। এখন এসএনপির নেত্রী নিকোলা স্টারজিওন কী ভূমিকা নেন, সেদিকে অনেকের দৃষ্টি থাকবে। যদিও এরই মধ্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আবারও একটি গণভোটের উদ্যোগ নেবেন। ফলে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকলই।

চার. প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কিনা, এটা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা যাচাই করে দেখার জন্য ২০১৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে একটি গণভোটের আয়োজন করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা, না থাকা নিয়ে ব্রিটেনে একটা বিতর্ক আছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে আছে বটে; কিন্তু ইউরোপীয় মুদ্রা ‘ইউরো’তে কখনোই যোগ দেয়নি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৬টি রাষ্ট্র নিয়ে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিটি (ইইসি) যাত্রা শুরু করে আজ তা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য তৎকালীন ইইসিতে যোগ দেয়। আর ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের মাঝে ১২টি দেশ অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু করে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশ ইউরো গ্রহণ করে। কিন্তু যুক্তরাজ্য তাদের মুদ্রা পাউন্ডকে ধরে রেখেছে। তুলনামূলক বিচারে ব্রিটেনের মানুষ কিছুটা কনজারভেটিভ। তারা মনে করে, ইইউ বা ইউরোতে যোগ দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া। তাই তারা বারবার ইউরো গ্রহণ করার বিপক্ষে মত দিয়ে আসছে। এখন কনজারভেটিভদের বিজয় এ প্রশ্নটাকেই সামনে নিয়ে এলো যে, যুক্তরাজ্য কি অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন একের পর এক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে থাকে, তখন এই দেশে ব্যাপক হারে পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন ঘটতে থাকে। আইনবলে এরা তখন যুক্তরাজ্যে থাকার ও চাকরি করার অধিকার রাখেন। ফলে দেখা গেছে, আদি যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। এর ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও ক্ষোভ জন্ম হয়েছে। কনজারভেটিভরা বরাবরই অভিবাসন নীতির বিরোধী। নির্বাচনের ফলে এরই প্রতিফলন ঘটেছে।

পাঁচ. নির্বাচনের তিন বাঙালি নারীর বিজয় প্রমাণ করল বাঙালিরা আজ বিশ্ব আসরে প্রতিষ্ঠিত। আমি যখন টিউলিপ সিদ্দিকের বাংলায় দেয়া বক্তব্য শুনছিলাম, তখন আমার বারবার মনে হয়েছিল, সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলা ভাষাও জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হবে এবং বাংলা ভাষা অন্যতম একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। যুক্তরাষ্ট্র একদিন অভিবাসীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব আসরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করার পেছনে এই অভিবাসীদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। আজ যুক্তরাজ্যও ধীরে ধীরে সেই পথে যাচ্ছে। শুধু তিনজন বাঙালি নারী বলি কেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এবার মোট ২২ জন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

এর মাঝে ভারতের ১০ জন, পাকিস্তানের ৮ জন ও শ্রীলংকার একজন। আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে কোনো দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এমপি যদি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন, আমি তাতে অবাক হব না। আমি তিনজন বাঙালি নারীর ব্যাপারেও যথেষ্ট আস্থাশীল। এরা তিনজনই যথেষ্ট শিক্ষিত। টিউলিপ সিদ্দিক মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, আর রূপা হক একটি কলেজের শিক্ষক ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তারা আগামী দিনগুলোতে লেবার পার্টির মূলধারার রাজনীতিতে যে বড় অবদান রাখবেন, তা বলাই বাহুল্য। রুশনারা দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হলেন। তিনি শ্যাডো বা ছায়ামন্ত্রীও ছিলেন। এখন টিউলিপ সিদ্দিক কিংবা রূপা হকের জুনিয়র ছায়ামন্ত্রী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের জন্য এটা আরও বড় পাওয়া এ কারণে যে, তাদের দু’জনের (রুশনারা ও টিউলিপ) বাংলাদেশের ব্যাপারে বড় আগ্রহ রয়েছে। নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, মানবাধিকার নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্রিটেনে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ব্যাপক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তারা বড় অবদান রাখবেন, এ প্রত্যাশা এখন অনেকেই করবেন।

যুক্তরাজ্যের ভোটাররা ডেভিড ক্যামেরন তথা কনজারভেটিভ পার্টির প্রতি আবারও আস্থা রাখলেন। ইউরোপের সর্বত্র অর্থনীতিতে ব্যাপক মন্দাভাব দেখা দিলেও যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে তা তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। ডেভিড ক্যামেরনের সরকার বেশ কিছু মানুষের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। এটা ছিল তার জন্য প্লাস পয়েন্ট। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাও তিনি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এতেও মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের মানুষের জন্য একটা পরিবর্তন আনতে চান- ভোটাররা তা বিশ্বাস করেছে। ফলে তিনি আরও ৫ বছরের জন্য ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে রয়ে গেলেন। কিন্তু সমস্যা যে নেই, তা নয়। আগামী দিনগুলো তার জন্য সুখের না-ও হতে পারে। ২০১৭ সালে গণভোটের কথা বলছেন তিনি। এখন তিনি যদি সত্যি সত্যিই গণভোটের আয়োজন করেন এবং গণভোটে যদি মানুষ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয়, তখন কী হবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে যুক্তরাজ্য একাকী কি ইউরোপে থাকতে পারবে, কিংবা একাকী থেকে তার অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু শক্তিশালী হবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাটছাঁটের প্রস্তাব করেছেন ক্যামেরন। ভোটাররা তা সমর্থন করেছে। লেবাররা এর বিরোধিতা করেও জনসমর্থন পায়নি। এখন সত্যি সত্যি এ খাতে যদি বাজেট বরাদ্দ কমানো হয়, যদি এ খাতে আরও বেসরকারীকরণ হয়, তাহলে তা নিুআয়ের মানুষদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাবে না। আর্থিক সংস্থান না থাকায় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে। একটা বড় ধরনের শংকা রয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়া তথা ক্যারিবীয় অঞ্চলের অভিবাসীদের নিয়ে। তাদের অনেকেরই ভালো চাকরি নেই। আর্থিক সঙ্গতিও ভালো নয়। এরা বিপদে পড়তে পারেন আগামী দিনে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী নিয়েও সমস্যা আছে। ভাষাগত সমস্যার পাশাপাশি এরা নানা রকম অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আইন না মানার প্রবণতা এদের মাঝে বেশি।

যুক্তরাজ্যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই নির্বাচন যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ ৭৫০ বছরের গণতন্ত্রের ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই মাত্র। অনেক পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনটি এলো না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লেবার পার্টিকে এখন নয়া রাজনীতি ও নয়া দর্শন নিয়ে আসতে হবে।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

You Might Also Like