ব্রিটেনে তিন কন্যার জয়জয়কার

ইউরোপ তথা বিশ্বের বহুল আলোচিত ব্রিটিশ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ৭ মে। ৬৫০ আসনের ঐতিহ্যবাহী হাউস অব কমন্সের এ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন-পূর্ব একাধিক জরিপ হয়েছে। প্রতিটি জরিপই এ নির্বাচনে কোনো বড় দলের নিরঙ্কুশ জয়ের আভাস দেয়নি। প্রতিটি জরিপের ফল ও পূর্বাভাস একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আভাস দিলেও ব্রিটেনের লেবার পার্টিকে এগিয়ে রেখেছিল এবং এই দলের নেতা এড মিলিব্যান্ডকে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখাও হচ্ছিল।

এমনটিই এ দেশের পত্রপত্রিকা ও রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে সরকারি দলের বড় নেতারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। কারণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েক প্রার্থীÑ যার মধ্যে শেখ রেহানার কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোনের কন্যা ও বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ রেজওয়ান সিদ্দিকও ছিলেন এবং ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম লেবার পার্টি এমপি রুশনারা আলী। আরও ছিলেন রূপা আশা হক। এই তিনজনের মধ্যে রুশনারা আলী এর আগেও লেবার পার্টির এমপি ছিলেন, ছিলেন ছায়া সরকারের মন্ত্রী। তবে তিনি ওই পদ ত্যাগ করেন ব্রিটেনের ইরাক নীতির বিরোধিতায়।

রুশনারা আলীর পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন বাকি দু’জন। তাদের সবাই কোনো না কোনো স্তরে লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রূপা হক সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সন্তান। তার পিতা মোহাম্মদ মসজুদ্দিন ছিলেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। বর্তমানে রূপা হক সিনিয়র লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন কিংসটন ইউনিভার্সিটিতে। ব্রিটেনের নামকরা পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে পরিচিত হন তিনি। দুটি বইও রচনা করেছেন। তিনি ব্রিটেনের ইরাক নীতির বিরোধী ছিলেন, ছিলেন লন্ডন বারা অব ইলিংয়ের ডেপুটি মেয়র। অপরদিকে টিউলিপের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় রিজেন্টস পার্কের কাউন্সিলর হিসেবে। উচ্চশিক্ষিত এই রাজনীতিবিদও ইরাক নীতির বিরোধী ছিলেন। তিনি বৃহত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসনে ২০১০ সালের লেবার পার্টির এমপি গ্লেন্ডা জ্যাকসনের পরিবর্তে লেবার পার্টির মনোনয়ন লাভ করেন। প্রসঙ্গত, ব্রিটেনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পার্টির ইলেকট্রোরেটদের দ্বারা প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হতে হয়। কাজেই ওই তিন নারী প্রার্থীকে প্রাথমিক প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।

২০১৫ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে ১১ প্রার্থী হয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ওই তিনজন বিজয়ী হন। এ তিনজনের মধ্যে রুশনারা আলী ছাড়া বাকি দু’জনের সংসদীয় আসন এলাকা বা কনস্টিটিউন্সিতে উপমহাদেশের বাসিন্দা কম ছিলেন। এখানকার সিংহভাগ ভোটার সাদা চামড়ার। এ দু’জনের প্রতিযোগিতা ও ফলাফলে প্রতীয়মান যে, তারা প্রথমবার বিজয়ী হলেও দারুণ প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। দু’জনের প্রতিযোগী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী।

টিউলিপের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সর্বসাকুল্যে ৭ জন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির সায়মন মার্কসে কন। তিনি পেয়েছিলেন ২২ হাজার ৮৩৯ ভোট। মাত্র ১ হাজার ১৩৮ ভোটের ব্যবধানে ২৩ হাজার ৯৭৭ ভোট পেয়ে হ্যাম্পসস্টেড ও কিলবার্ন থেকে জয়ী হন। টিউলিপ পান প্রদত্ত ভোটের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি ২০১০ সালের নির্বাচনে এই আসনের প্রাপ্ত ভোটের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ আসনের আগের এমপি গ্লেন্ডা জ্যাকসন ২০১৫ সালের নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা দিলে টিউলিপ রেজওয়ান সিদ্দিক মনোনয়নের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সময় তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বংশানুক্রমে ধারাবাহিকতা রক্ষায় যোগদান না করে ব্রিটেনের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কথা এক সাংবাদিক উল্লেখ করলে তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, তা প্রণিধানযাগ্য। তিনি বলেছিলেন, বংশধারায় সুবিধা নিয়ে নয়, নিজগুণে সংসদ সদস্য হতে চান, হতে চান ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ। তিনি তৃণমূলের ব্রিটিশ রাজনীতি থেকে উঠে এসে নিজগুণ ও পরিচয়ে সফল হয়েছেন। আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। আমরা যে ধরনের পরিবারতন্ত্র দেখতে অভ্যস্ত, এতে নিজগুণ থাকুক আর না থাকুকÑ তিনি বা তারা নেতৃত্বে চেপে বসেন।

দ্বিতীয় নারীÑ যিনি প্রথমবারের মতো এমপি হয়েছেন। সেই রূপা আশা হকও মূলধারার ব্রিটিশ রাজনীতির তৃণমূল থেকে এ পর্যায়ে এসেছেন। তার সংসদীয় আসন ইলিৎ সেন্ট্রাল ও এটকল থেকে দারুণ এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন। তার অঞ্চলেও সংখ্যালঘিষ্ঠের সংখ্যা কম। তিনি মাত্র ২৭৪ ভোটের ব্যবধানে কনজারভেটিভ প্রার্থী এমরি কনরেকে হারিয়েছেন। তিনি প্রদত্ত ভোটের ২২ হাজার ২ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ২১ হাজার ৭২৮ ভোট। পরিসংখ্যান থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কী ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তাকে নির্বাচিত হতে হয়েছে।

অন্যদিকে রুশনারা আলী একবারের অভিজ্ঞ এমপি ও ছায়াসরকারের মন্ত্রী ব্যথনাল গ্রিন এন্ড বো-আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাথিও স্মিথকে বিপুল ভোটে হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যবধান ২৪ হাজার ৩১৭ ভোট। রুশনারা পেয়েছেন ৩২ হাজার ৩৮৭ এবং স্মিথ পেয়েছেন ৮ হাজার ৭০ ভোট। এ ব্যবধানেই প্রতীয়মান হয়, তিনি তার এলাকায় কতখানি জনপ্রিয়। তবে এ আসনেই বৃহত্তর লন্ডনের সবচেয়ে বেশি মুসলমান তথা বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও ভারতীয়দের বসবাস। তবুও তার এ বিশাল জয়কে কোনোভাবেই অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।

বাংলাদেশি বংশো™ূ¢ত ওই তিন কন্যার জয় বিশেষ কিছু কারণে ব্রিটেনের রাজনীতি তথা ব্রিটেনে বসবাসরত বাঙালি অভিবাসী ও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এ তিনজনই নিজগুণ, অধ্যবসায় ও নিজ পরিচয়ে তৃণমূলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে এমন জায়গায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। যদিও একজনের পেছনে একটি পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় দেশে রয়েছে, তবুও তিনি যেখান থেকে সদস্য হয়েছেনÑ এই পরিচয় খুব একটা প্রয়োজন হয়নি। তিনিও তার স্বকীয় পরিচয়ে উজ্জ্বল হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ওই তিনজন নয়Ñ মোট ১১ জন এবার বিভিন্ন দল থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। প্রায় প্রত্যেকেই ভালো করেছেন। এমনকি এক নারী প্রার্থী স্কটল্যান্ড থেকে লেবার পার্টির হয়ে প্রতিযোগিতা করেছিলেন। এর আগে এত প্রার্থী যেমন ছিল না, তেমনি একের অধিক হাউস অব কমন্সে প্রবেশ করতে পারেননি। রুশনারা সে পথ দেখিয়েছেন। আগামীতে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবেন এ তিনজনকে দেখে। চতুর্থত, এবারের এই সাফল্য একটি বিষয় পরিষ্কার করেছেÑ বিদেশে বসবাসরত, বিশেষ করে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা যেভাবে দেশের সংঘাতপূর্ণ বিভাজনের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির আবর্তে রয়েছেন, তারা ওই দেশের মূলধারার রাজনীতিতে মনঃসংযোগ করলে তাদের সংখ্যাও ভারত-পাকিস্তানের সমান হতে পারত। হয়তো তিনজন নয়Ñ অনেকেই হাউস অব কমন্সের আসন অলঙ্কৃত করতে পারতেন, বিশেষ করে ব্রিটেনে বসবাসরত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি বংশো™ূ¢ত নাগরিকরা।

ওই তিনজনের সাফল্য আমাদের রাজনীতিবিদ তথা দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়। প্রথমত, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শিক্ষা ও তৃণমূল থেকে নিজের পরিচয় তৈরি করলে পরিবারতন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত, সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার মাহাত্ম্য অন্য রকম। আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এখন তছনছ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যারা ব্রিটেনের স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্ববিনিদিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেনÑ তাদের চোখে আমাদের হালের নির্বাচনগুলো কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন জানতে ইচ্ছা হয়। প্রসঙ্গত, ব্রিটেনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দায়িত্ব লোকাল কাউন্সিলের। নির্বাচন কমিশন নীতিনির্ধারক ও নির্বাচনী বিচারিক ভূমিকায় থাকে মাত্র, থাকে না বিশাল নিরাপত্তাবহর। ভোট চুরি অচিন্তনীয় ব্যাপার। রাষ্ট্র জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষণীয় যত কিছু রয়েছে, তা বলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা ঘরে বসে যে নির্বাচন দেখলাম, এর ধারেকাছেও আমরা নেই। ছিল না কেন্দ্র দখলের মহড়া, অভিযোগ ছিল না ভোট বর্জন। অথচ আমরা ওয়েস্ট মিনিস্টার স্টাইলের সরকার ও সংসদের কথা গলা ফাটিয়ে বলতে থাকি। চর্চায় নেই, প্রচারে আছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোÑ যারা বিদেশের মাটিতেও এ রাজনীতির বীজ বপন করেছেন তারা বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রজন্মকে ওইসব দেশের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন। এমন না হলে দেশ আরও উপকৃত হতো। এমন হলে তিনজন নয়, এ রকম ত্রিশজনকে আমরা পেতে পারতাম।

আমরা আমাদের এ তিন কন্যাকে নিয়ে গর্ব করতেই পারিÑ হোক না তারা বিরোধী দলের। ব্রিটেনের মতো গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীরা সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সরকারদলীয় সদস্যদের থেকেও রাজনীতিতে অধিক প্রভাব রাখেন। তবে ভবিষ্যতে ব্রিটেনের কা-ারি যে লেবার পার্টি হবে, এতে সন্দেহ নেই। অবশ্য লেবার পার্টিকে আরও জনসম্পৃক্ত নেতা খুঁজতে হবে। এ নির্বাচনেই নয়, সব নির্বাচনেই দল হারলে নেতাই দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এটিই গণতন্ত্র।

পরিশেষে আরেকবার তিন অ্যাঞ্জেল কন্যাকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। আশা করব, ভবিষ্যতে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেককে সার্থক হতে দেখব। আমাদের সময়

লেখক : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলামনিস্ট

You Might Also Like