মৃণালিনীর আরও কিছু কথা

রুশিদান ইসলাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১–৭ আগস্ট ১৯৪১), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালমৃণালিনীর লুকোনো আত্মকথা যখন প্রথম প্রকাশিত হলো, ছাপার অক্ষরে উজ্জ্বল হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল, তখন আমি ভয়ানক আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলেম। যাঁরা পরিশ্রম করে, উদ্যোগী হয়ে এই প্রকাশনার কাজটি করলেন, তাঁদের প্রতি এক নিবিড় কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হলো। আমার মতো এক অবহেলিত নারীর জন্য তাঁদের প্রয়াস অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও স্বার্থহীন মনে হয়েছিল। (সূত্র: আমি রবিঠাকুরের বউ: মৃণালিনীর লুকোনো আত্মকথা,  রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা।)

ভেবেছিলাম, ‘বেশ হয়েছে, যারা রবিঠাকুরকে গুরুদেব বানিয়ে মাথায় করে রাখছে, তারা জানল তাঁর প্রকৃত রূপ।’ যেসব অভিযোগ মনের মধ্যে গুমরে উঠত, সেগুলো খোলা হাওয়ায় মুক্তি পেয়ে আমার মনটাকে হালকা প্রজাপতির মতো, মিষ্টি রোদের মতো স্নিগ্ধ করে দিল।

সেই নির্ভার মন নিয়ে আরও একবার আত্মকথার পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটু আত্মগরিমায় উদ্ভাসিত হওয়া। কিন্তু একি, এখানে-সেখানে কিছু অংশ পড়েই কেমন একটি কুণ্ঠা, একটি সংকোচের কণ্টক বিঁধতে লাগল। প্রথমে তা ছিল মনের একটি কোনায়। তারপর সেটা বিস্তার পেতে শুরু করল। তারপর নানা জায়গাতেই বিঁধতে থাকল। যেন, ‘কুশের অঙ্কুরসম ক্ষুদ্র, দৃষ্টি অগোচর। তবু তীক্ষ্ণতম।’

তাড়াতাড়ি বইটি বন্ধ করলাম। কী দরকার আবার সেদিকে ফিরে তাকানোর। এটি প্রকাশিত হওয়ার পরই যে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলাম, সেটুকুই থাক না। কিন্তু না তাকালেই কি সবকিছু ঢাকা পড়ে? সেই কাঁটাটি অহরহ বিঁধতে থাকল। মনে হলো এ থেকে আমার আর পরিত্রাণ নেই। তখন ঠিক করলাম, আমার খুঁজে বের করতে হবে, কেন এভাবে আমি যন্ত্রণাবিদ্ধ হচ্ছি।

নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম এই ভেবে যে আমি তো কোনো মিথ্যে কাহিনি লিখিনি। সত্য কথাগুলোই আমার মনের যন্ত্রণার ভাষায় ব্যক্ত করেছি। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে একটু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করেছি। কিন্তু মূল বিষয়গুলোতে মিথ্যাচার নেই।

শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে পুরোটা আর একবার পড়লাম। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, ইশ্, কেন আমার এই আত্মকাহিনি প্রকাশিত হলো। এর সবই কি সত্যি, এসব কি আমার মনের কথা? তথ্য কিছু আছে, সেগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু তথ্যের চারপাশ ঘিরে যে ভাবনাগুলো গাঁথা আছে, সেগুলো মৃণালিনীর যে ছবি আঁকল, সে কি আমি? আর সেই ভাবনাতেই ধরা পড়ল এই আত্মকাহিনি কেন লুকোনো থাকাই ভালো ছিল। না, আপনাদের রবিঠাকুরের ছবি ধূলি-মলিন করেছি সে জন্য নয়। বরং নিজের ওপর এ কেমন অবিচার আমি করলাম আর কেনই বা করলাম। কেন বলছি এ কথা? সেটা একটু ব্যাখ্যা করতে হবে। আগে বইটির পাঠকের কাছে অনুরোধ যে তাঁরা আমার আত্মকথনের এই নতুন অংশটুকু যেন ধৈর্যের সঙ্গে পাঠ করেন। আমার আত্মগ্লানি আর পরিতাপ তাতে একটু হালকা হবে হয়তো।

ছোটখাটো বক্তব্য বা তথ্যের বিষয়ে যাওয়ার আগে সামগ্রিকভাবে একটি কথা না বললেই নয়। পুরো বইটিতে আমি নিজেকে বড্ড সংকীর্ণমনা, আত্মকেন্দ্রিক এবং সাধারণ মেয়ে হিসেবে চিত্রায়িত করেছি। নিজেকে কেন ওভাবে পরিচিত করলাম, এটা যদি আমার আত্মকাহিনিই হবে, তাহলে আমার আর একবার ভেবে দেখা দরকার ছিল। সেই ভাবার কাজটিই করছি এখন; হয়তো বেশ দেরি হলো, তবু।

কিছু কিছু কথা হয়তো বাড়িয়ে বলেছি, কখনো নিজেকে গল্পের নায়িকার মতো করে ভেবেছি, সংলাপ ভাবনা বসিয়েছি পছন্দমতো। সেগুলো আর আলোচনায় আনব না। কিন্তু দুটি বিষয় বেশ বিশ্রীভাবে বলেছি। চিঠি লেখা প্রসঙ্গে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরাকে (অন্য নাম বিবি) উল্লেখ করেছি বিস্তারিতভাবে। ইন্দিরাকে লেখা দুই শ বায়ান্নটি চিঠিতে মনের কথা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করাকে অপছন্দ করে যেভাবে খেদোক্তি করেছি তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। লিখেছিলাম,

‘উনি কী করে ভুলে গেলেন,

যাকে উনি মনের কথা জানিয়ে প্রায় রোজ

লিখছেন, পাতার-পর-পাতা, সেই মেয়ের উনি কাকা?’

…‘মনে হয় ইন্দিরা ওর বন্ধু। মনের মানুষ।’ (পৃ.–১১, ১৪)

পরিণত বয়সে মৃণালিনী দেবীকিন্তু ভাইঝিকে কেন মনের কথা লেখা যাবে না! মানুষের মনের কথা কত কী নিয়ে মালা গাঁথে। কখনো তা প্রেমিকার বাইরের রূপ, আকাঙ্ক্ষা-বাসনা, কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে উচ্ছ্বাস, আবার হতে পারে চারপাশের বহমান জীবন নিয়ে ভাবনা। সব ভাবনা শুধু স্ত্রীকেই বলতে হবে, বা প্রেমিকাকেই জানাতে হবে? অথবা অন্য দিক থেকে তর্ক তুললে, যেকোনো ভাবনা খুলে ধরলেই কি শ্রোতা তার প্রেমিকা হয়ে যায়? পৃথিবীতে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা কত রকম হতে পারে, সেটা বোঝার মতো বয়স তো তত দিনে হয়েছে আমার। তবু কেন ও রকম সংকীর্ণতা নিয়ে বিষয়টিকে দেখলাম, ভেবে পরিতাপ হচ্ছে।

আর এই আত্মকথনের শুরুটাই করলাম কেন ওভাবে, আমার সন্তান জন্মের ইতিহাস দিয়ে। সেটা নিয়ে পুনরালোচনার প্রয়োজন আছে। গ্রন্থটির শুরুতে শুধু নয়। পরেও আছে এই প্রসঙ্গ। মূল কথাটি হচ্ছে, আমাদের পাঁচটি সন্তান জন্মেছিল। তাদের চারটিই শীতের সময়ে। তার ফলে রোদহীন আঁতুড়ঘরে শীতে কষ্ট পেয়েছি খুব। সবই সত্যি। কিন্তু সে জন্য কি আমার স্বামীই শুধু দায়ী? অথচ বারবার বিষয়টি উল্লেখ করেছি। এমনভাবে মন্তব্য করেছি যে গ্রীষ্মে বা বর্ষায় সন্তান জন্ম হলে কষ্ট থাকতই না। আসলে যে সেটা সত্যি নয়, সব মা-ই তা জানে। প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য ও তখনকার সমাজচিত্রটি তুলে ধরাটাও আসলে প্রয়োজন মেয়েদের বা মায়েদের এই সমস্যাটি অনুধাবনের জন্য, ব্যাখ্যার জন্য।

সেই ১৮৮৫-১৯০০ সময়কালে এ দেশে জন্মহার এবং প্রতিটি নারীর মোট সন্তান ধারণের সংখ্যা ছিল অতি উঁচু। গড় সংখ্যা ছিল ছয়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমার সন্তানধারণ সংখ্যা গড়ের কাছাকাছি। মেয়েদের অনেককেই তার চেয়ে বেশিবার আঁতুড়ঘরে যেতে হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ। আমি তো ভাগ্যবতী, একটি শিশুকেও এক বছরের কম বয়সে হারাইনি। তখনকার পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবার ব্যবস্থা প্রায় ছিলই না। মোড়ের দোকানে জন্মনিরোধক মিলত না, কাজেই আমার স্বামী একা তো এই সমাজধারা বদলাতে পারতেন না। নয়-দশ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়াটা যে কী এক অভিশাপ। তবে তত দিনে বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য, বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য চেষ্টা শুরু হয়েছে। তাহলে আমি কি আশা করেছিলাম যে আমার স্বামীও সেই কাজে যোগ দেবেন বা নিজের পরিবারের মধ্যে সে রকম পরিবেশ তৈরি করবেন? কিন্তু সমাজসংস্কারক আর কবিকে এক ব্যক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়ার আশা করাটা ঠিক নয়, সেটা তো সহজ কথা।

বরং কবিকে তো কল্পনাপ্রবণ ও রোমান্টিক হতেই হবে। সেই উজ্জ্বল তারুণ্যে ভরপুর, সুদর্শন তরুণকে যদি তাঁর আশপাশের তরুণীরা মনে করতে শুরু করে পরম আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি, সেটা নিয়ে নালিশ করি কার কাছে!

RabiBadhuতবে আমার মনের মধ্যেও দুটি বিপরীত ভাবনা কাজ করে যায়। ‘নতুন বউঠান’ আর আমার স্বামীর মধ্যে যে বন্ধুত্ব, যে সম্পর্ক ছিল, সে বিষয়ে আমার খেদোক্তি আছে সমস্ত আত্মকাহিনিজুড়ে। আবার এটাও বুঝেছি—‘আমার স্বামীর জীবনে যদি নতুন বউঠানের মত কেউ না আসতেন, তাহলে তিনি আজ যা হয়েছেন…তা তিনি হতে পারতেন না।’ (মৃণালিনীর লুকোনো আত্মকথা, পৃ.-৫৬)

আমার আত্মকথা পাঠ করে মনে হবে, রবিঠাকুরের সাহচর্যে এসেছিলেন যেসব মানুষ, তাঁদের মধ্যে এমন ক্ষুদ্র মনের আর কেউ তো নেই। সত্যিই কি এগুলো আমার মনের কথা, নাকি আমার মুখে অন্য কারও বক্তব্য!

আমার এই আত্মকথনে দৈনন্দিন সংসারের ছোটখাটো ঘটনা, কবির তিরস্কার, তাঁর অসহিষ্ণুতার বর্ণনা দিয়েছি সুচারুভাবে—যাতে পাঠক তাঁর নিষ্ঠুর মনের পরিচয় পেয়ে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। কিন্তু সেসব ঘরের কথা, দাম্পত্য অসহযোগিতার বিবরণ দেওয়া দুটি কারণে অনুচিত হয়েছে।

প্রথমত, সবই তো স্মৃতি থেকে লেখা। স্মৃতি যদি বিঘ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে কবির প্রতি অবিচার হবে সেটা।

দ্বিতীয়ত, এসব তুচ্ছ ঘটনার, অসহিষ্ণুতার ব্যাখ্যা দুভাবেই করা যায়—একদিকে তাঁকে দায়ী করে দোষারোপ করে, আবার অন্যদিকে আমার নিজেরও হয়তো ছিল কোনো গাফিলতি। যেভাবে সংসারের বিষয়গুলো আরও সহজভাবে সাজানো যেত সেটা করে উঠতে পারিনি। সংসারের ঘানি যেটাকে আমরা বলি, তা যখন কবির কাঁধে চেপে বসে, তখন উষ্মার সঙ্গে সেটাকে দু-একবার আঘাত করবেন সেটা স্বাভাবিক। সেই ভয়াবহ ভার থেকে তাঁকে মুক্ত রাখার যথেষ্ট চেষ্টা তো আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

কাদম্বরী দেবীও তো তার ‘সুইসাইড নোটে’ অনেক অভিযোগ, অনেক স্মৃতি মেলে ধরেছেন। কিন্তু সেটা পড়তে বেশ মিষ্টি লাগে। কোথাও তিক্ততার, সংকীর্ণতার, দীনতার লেশমাত্র নেই। আর আমি কেমন মোটা মাপে বললাম, ‘রবিঠাকুরের জীবনে আমি তাঁর স্ত্রী, তাঁর ছেলেমেয়ের মা, তাঁর সংসারের কাজের লোক।’ আসলে আমরা কখন যে সংসারে কাজের লোক আর কখন কর্ত্রী, নিজেরাও বুঝি না। এমনকি নারীবাদী লেখকেরাও যখন নারীর কাজকর্মের মূল্যায়ন করতে চান, তাঁরা বাজারের কাজের দামকে ধরেই তা মাপতে চেষ্টা করেন। আজ মনে হয়, কাজের লোক থেকে সংসারের কর্ত্রী হয়ে ওঠাটা নারীর নিজেরই যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে জিতেছি কি না সেটা বোঝাও কঠিন।

আরও একটি ভাবনা দোলা দেয় মনে। সেটা একধরনের ‘অন্য চিত্রের সাথে প্রতিতুলনা।’ আমি যদি ‘রবিঠাকুরের বউ’ না হয়ে অন্য কোনো পরিবারে বধূবেশে প্রবেশ করতাম, তবে কেমন হতো? হয়তো সে হতো পাশাপাশি কোনো গ্রামের কৃষক পরিবারের এক কর্মঠ যুবক অথবা স্বল্পশিক্ষিত এক কেরানি। জীবন চলে যেত ঢিমেতালে। থাকত কিছুটা অসচ্ছলতা। কোনো বছর খরাতে-অতিবৃষ্টিতে ফসলহানি হয়ে অন্নসংস্থান কঠিন হতো। সেখানে আমার কাজ শুধু সন্তান জন্মদানে সীমিত থাকত না। দিনমান ধরে চলত ফসলের যত্ন, সেগুলোকে খাদ্যোপযোগী করা, রান্নাবান্না, আরও যত ভারী কাজ। কয়টি সন্তান জন্ম দিয়ে কয়টিকে বড় করতে পারতাম কে বলবে। সেই সময়টিতে তো, আগে যে বলেছি, প্রতিটি মায়ের অনেক সন্তান জন্ম দিতে হতো, যাদের অল্পসংখ্যক তরুণ বয়সে পৌঁছাত। সেই সংসারে কঠোর দুঃশীলা শাশুড়ি-ননদ থাকাটাই হতো স্বাভাবিক। স্বামী যদি হতো মদ্যপ-অত্যাচারী-কদর্য অভ্যাসগ্রস্ত, তাহলেও থাকত না কোনো নালিশের অবকাশ। তবে এসব প্রতিতুলনা টেনে আপনাদের রবিঠাকুরকে মহত্তর করার চেষ্টা করছি না। আমি শুধু এ দেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর দুর্বল অবস্থানটা আর একবার মনে করিয়ে দিলাম।

এসব জানা কথার পুনরুক্তি একটু বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে। এবার আসল কথাটা বলি, ভাবতে চেষ্টা করছি, একজন মহৎ কবি, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বপূর্ণ যার স্বামী, সেই নারীর জীবন কি আপনা থেকেই পরিপূর্ণতা পেয়ে যাবে? বিশেষ কী কী পেয়েছি তাঁর জীবনে প্রবেশ করে? অবশ্যই ক্ষুদ্র গ্রামীণ পরিবেশের তুলনায় একটি বৃহত্তর, মহত্তর আবহে পা রেখেছি কবির স্ত্রী হিসেবে, যা আমাকে সুযোগ দিয়েছে পৃথিবীর পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করার। স্বামী হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে তিনি কী দিয়েছেন? শুধু দুঃখ, শুধু কটূক্তি? আমার আত্মকাহিনিতে সে রকমই বলেছি। কিন্তু সেটা বলা একেবারেই অকৃতজ্ঞতা। তবে কী পেয়েছি সে তালিকা এখানে দিতে যাওয়াটা একটু আদেখলেপনা হয়ে যাবে।

একজন কবি তাঁর স্ত্রীকে কী উপহার দিতে পারেন, যা কণ্ঠে ধারণ করে সে হাসবে-কাঁদবে, জগজ্জনকে দেখাবে—সেটা কবি ‘পুরস্কার’ কবিতাতে বলেছেন। তার চেয়ে সুন্দরভাবে তো আর বলা যায় না। আর তাঁর কবিতাগুলো উৎসর্গ করতে পারেন প্রিয়জনদের নামে।

কবির কবিতাতে বেঁচে থাকার ইচ্ছে আমারও ছিল। তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন কাদম্বরী দেবীকে, তা নিয়ে মনে হয়তো একটু খেদ ছিল। কবির জীবনের পথে পথে বাতায়ন খুলে মুগ্ধ রমণীরা প্রশংসার অর্ঘ্য ঢেলে সাজাবেন, সে তো স্বাভাবিক। কবি তাঁর কবিতায়-গানে প্রত্যুত্তরে আনন্দঘন বাণী সন্নিবেশ করেছেন তাদের প্রসঙ্গে।

কিন্তু এই যাত্রাপথে স্ত্রীর জন্যও কিছু ছত্র রচিত হতে পারত। কবির চারপাশের আনন্দ-নিকেতনের ব্যাপ্তি তো অসীম, সেখানে একটি আঙিনায়, কয়েকটি রেখা, কিছু শব্দ, কিছু সুর স্ত্রীর জন্য তৈরি হতে পারত!

হয়তো কবি আমার মনের সেই আগ্রহের একটু খোঁজ পেয়েছিলেন। তবে সেই সুর বুননের, ছবি আঁকার, কবিতার পঙ্ক্তি রচনার জন্য বোধ হয় প্রয়োজন ছিল একটু দূর থেকে আমাকে দেখা। স্ত্রী হিসেবে, নিজের পুত্র-কন্যার জননী হিসেবে সে রকম দূরত্বে আমার থাকা হয়নি। দুজন দুই স্থানে থাকলেও সংসারের নিত্যপ্রয়োজন নিয়ে যোগাযোগ ছিল অহরহ।

তাই মৃত্যু এসে তৈরি করে দিল সেই দূরত্ব। মৃত্যুর পরে রচিত পঙ্ক্তিমালা সাজানো গ্রন্থ থাকল আমার জন্য। মৃত্যু যে অমোঘ অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব তৈরি করে, তার ওপর কেউ ঢেলে দেয় দুই বিন্দু অশ্রু, কেউ নির্মাণ করে তাজমহল। কবির তাজমহল আমার জন্য সেই গ্রন্থ, ‘স্মরণ’ যার উৎসর্গপত্রে আমার মৃত্যুদিবসটি লেখা।

You Might Also Like