স্বাস্থ্যকর জীবনশৈলী

আমাদের জীবনশৈলীতে ‘ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র’ বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। এক্সটেরিয়র-ইন্টেরিয়র যাকে বাংলায় বহিরাঙ্গন ও অন্দরমহল হিসেবে অভিহিত করতে পারি। সাদামাটাভাবে আমাদের ঘরদোরের ভিতর এবং বাহিরকে স্থাপত্যবিদ্যার প্রভাবে আমরা এক্সটেরিয়র-ইন্টেরিয়র বলি। বসবাসযোগ্য পরিসরকে কার্যকর ও নান্দনিক করার উদ্দেশ্যেই এই বিষয়টির প্রয়োগ ঘটে। বাহ্যিকভাবে এর মধ্যদিয়ে আমাদের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও সামর্থের বহিঃপ্রকাশ ফুটে ওঠে। বিশাল বিত্ত-বৈভবের মাঝে জীবন যাপন করা ধনাঢ্য থেকে শুরু করে কুঁড়ে ঘরে বসবাসকারীর মধ্যেও এই বিষয়টির চর্চার প্রমাণ মিলে।
সৃষ্টির আদিতে মানুষ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নিরাপদ চৌহদ্দিতে প্রবেশ করে। পাহাড়ের গুহা, গাছের ডাল, পানিতে ভাসমান ভেলা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সৃজনশীল মানুষ শুধু প্রয়োজন মিটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি উদ্ভব ঘটিয়েছে নানা মাত্রিকতার। সেই ধারাবাহিকতায়ই আমরা উত্তীর্ণ হয়েছি বর্তমান আধুনিক এক্সটেরিয়র-ইন্টেরিয়র ডিজাইনে। নান্দনিকতা ও নির্মাণ কৌশলে স্থাপতি ও প্রৌকশলীদের মুন্সিয়ানা আমাদের অভিভূত করছে প্রতিনিয়ত। বিশ্বে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে উঁচু থেকে উঁচুতর, সুন্দর থেকে সুন্দরতর বিভিন্ন বাড়ি-ঘর-দালান-কোঠা। এসবের চমৎকারিত্বে সাধারণ মানুষ বুঝেই উঠতে পারছে না নির্মাতাদের কর্মকৌশল। প্রতিযোগিতায় তৈরি হচ্ছে একের পর এক আজব সব কাঠামো, যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন এক্সটেরিয়র-ইন্টেরিয়র ভাবনা।
আমাদের মতো সাধারণ মানুষই না, ভাবনা শিরমণি লালনও অভিভূত হয়েছেন কদাচিৎ। “কী আজব কলে রসিক বানাইয়াছেন কোঠা, শূন্য ভরে পোতা করে তার উপরে ছাদ আঁটা…”, অথবা “কে বানাইলো এমন রঙমহলখানা…?”- লালনের এই দ্বন্দ্বের বা প্রশ্নের উত্তর কোন স্থপতি প্রকৌশলী যেভাবেই দিক না কেন এই ভাবনার অবতারণা আমাদের নতুন সৃষ্টির পথকেই প্রসারিত করেছে বহুলাংশে। ইট-কাঠের নাগরিক জটিলতায় সাধারণের ভাবনরার ফুসরত নেই, তাই লালন বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছেনÑ “আপন ঘরের খবর নেনা, অনাশে দেখতে পাবি কোন খানে শাইর বারামখানা…”।
এই আপন ঘরের খবরের সন্ধানে ছুটতে ছুটতে আমরা আবিষ্কার করেছি আদ-সামুদ জাতির গুহাবাসের বিশাল স্থাপত্য বা তারও আগে গুহাবাসীদের বাস্তুজীবনের চিত্র। মিশরের পিরামিড বা সে সময়ের স্থাপত্য নিদর্শন আধুনিকতার নির্দশন হয়ে আজো আমাদের সামনে রহস্য ছড়াচ্ছে।
জানা যায় নূহ, আদ, সামুদ, সাদ্দাদ, কারুন, ফেরাউনদের জীবনযাত্রায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে স্থাপত্য ও বাস্তুবিদ্যার উৎকর্ষতার। সে সময়ের যে ছিটেফোটা স্থাপত্য নির্দশন দেখি তা থেকে স্থাপত্য ও বাস্তুবিদ্যার একধরনের এক্সটেরিয়র ইন্টেরিয়রের ধারণা নেয়া যায়। সেই থেকে শুরু করে আমাদের এখানেও গুহা বা প্রস্তর যুগের নানা নির্দশন, সম্প্রতি আবিষ্কৃত নাগরিক স্থাপত্য প্রমাণ করে আমরা ‘প্রাচীন সভ্য জাতি’। আমাদের স্থাপত্য ও বাস্তুজ্ঞান কোন অংশেই খ-িত না।
এ অঞ্চলের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য নির্মানের একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ‘সাইজ’। সমসাময়িক বিভিন্ন স্থাপনার দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো আফ্রিকা, আমেরিকা, ইউরোপসহ আরবীয় ভূমিতে যে মাপের ঘর-বাড়ি দালান-কোঠা সে তুলনায় আমাদের এখানটায় অপেক্ষাকৃত ছোট। উচ্চতায় উল্লেখযোগ্য স্থাপনা এদিকে খুঁজে পেতে কষ্ট হলেও চীনের প্রাচীরের দৈর্ঘ্য নিশ্চয়ই ছোট না। অবশ্য এখানকার মোঘল এবং ইউরোপিয়ান ঘারানার কাজগুলো আমাদের ‘ম্যানস্কেল’র সাথে খাপ খায় না। এটা অনুকরণ বা ডিজাইনের প্রতিস্থাপনের কারণে হওয়া স্বাভাবিক। শ্রমঘন বিশাল কাজের চাইতে সৃজনশীল উদার কাজ আমাদের বৈশিষ্ট্য।
আমাদের এশিয়ার এই অঞ্চলের আরো একটা প্রকৃষ্ট বৈশিষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি নির্ভর ভাবনা। এক্সটেরিয়রের পুকুর, বাগান, গাছগাছালি আর ইন্টেরিয়রের বনসাই, বোতল-শিশিতে মানিপলান্ট, পাতাবাহারেরডাল তার বলিষ্ঠ নিদর্শন।
ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে আমাদের এই অঞ্চলের সাথে অন্যান্যদের জীবনযাত্রার পার্থক্য সহজেই অনুমেয় প্রাচীন চিত্রকলা থেকে। আমাদের পাহাড়-পর্বতে বসবাস করা একটা বড় অংশের জীবন যাপনেও লক্ষ্য করা যায় প্রকৃতির নৈসর্গিক প্রভাব। বিশেষভাবে বলা যায় আমাদের চিন্তা-চেতনায় বাহ্যিক চাকচিক্য যতটা না প্রভাব রাখে সে তুলনায় ভাবনা বা দর্শনের চমৎকারিত্ব বিরাজ করে।
বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে এখানে যে ডিজাইন ট্রেন্ড প্রবেশ করেছে তার ব্যতিক্রম কাজও আছে। ওয়ারী বটেশ্বর, মুন্সিগঞ্জ বা সংস্কারক খানজাহান আলীর নগর ভাবনা থেকে শুরু করে ঢাকার সংসদ ভবন পর্যন্ত এ রকম অনেক উদাহরণই দেয়া যাবে যেখানে বিশালত্ব নয় বরং মানবিক চিন্তার আধুনিকতা যেমন স্পষ্ট তেমনই প্রাকৃতিক-নৈসর্গিক সহাবস্থানও স্পষ্ট।
এক্সটেরিয়র-ইন্টরিয়র ডিজাইনিং এখন একটি সময়পযোগী পেশা। যেহেতু টেকনিক্যালি আমরা এখনও পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারিনি তাই জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে এই পেশাকে খুব একটা জনপ্রিয় বলা যাবে না। বর্তমান প্রজন্ম যেহেতু একই সঙ্গে টেকনিক্যাল এবং ক্রিয়েটিভ তাই এই পেশা জনপ্রিয় হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিশ্বদরবারে ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র ডিজাইনিং নিয়ে উপস্থাপিত হওয়ার মতো কাজ আমাদের এখানেও হচ্ছে। আগে ম্যাটেরিয়ালের অপর্যাপ্ততার কারণে কিছুটা সিমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমানে আমাদের এখানে প্রায় সবধরনের ম্যাটেরিয়ালই পাওয়া যাচ্ছে। তাই কাজগুলো হচ্ছে বিশ্বতালের।
কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই ফাংশনাল দিকটিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী তাকে তার স্পেসের সর্বোচ্চ ব্যবহার উপযোগিতার মাধ্যমে একটি নতুন শিল্পকর্ম হিসেবে প্রজেক্ট শেষ করার চিন্তা এবং চেষ্টা থাকতে হবে। প্রতিটি প্রজেক্টে বিশেষ একটি শৈল্পিক কাব্য উপহার দেয়া কাজের বিশেষত্ব। যে কোন প্রজেক্টেই প্রাথমিকপ্রাধান্য দিতে হবে ব্যায়িত অর্থের সর্বোচ্চ নান্দনিকতার প্রতি।
এই পেশায় কাজ করে মানুষ ও তার প্রতিবেশ সম্পর্কে আমার যে প্রাপ্তি তা সত্যিই অভূতপূর্ব। আমার মনে হয়েছে শুধু প্রতিবেশ নয় মানুষের নিজের ইন্টেরিয়র-এক্সটেরিয়র ডিজাইনিং এর জন্য অনেক কিছু করার আছে। মানবদেহে সুস্থ চিন্তা তার ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের অংশ। আর সে চিন্তার বহিঃপ্রকাশ-কর্মকা- এক্সটেরিয়র ডিজাইনিংয়ের অন্তর্ভূক্ত। দেহের বিন্যাস সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন সামান্য ভুলের কারণে সুঠাম দেহটিও অকার্যকর হতে পারে। এখন আর অন্ধ অনুকরন-অনুসরন নয়, ইট কাঠের শৈল্পিক বিন্যাস নয়, বৃহৎ থেকে বৃহত্তর নয়, শুধু সৌন্দর্য আর নান্দনিকতা নয়, একমাত্র নিরাপদ আর ব্যতিক্রম চৌহদ্দি নয় স্বাস্থ্যকর মানবিক জীবনের আবাসই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিৎ।
বর্তমানে স্থাপত্য ও বাস্তুবিদ্যার বিস্তার ঘটছে দ্রুত। মানুষের রুচি, মানসিকতা ও বৈশ্বিক প্রভাবে কাজের ধরন পাল্টাচ্ছে। ডিজাইনে, উপাদান-উপকরণে বৈচিত্র আসছে। এর ধারাবাহিকতা আমাদের আলোচনায়ও থাকবে।

You Might Also Like