আমাদের ভাষা আন্দোলন ॥ সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবার্তা

দু’শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নেয়ার আগে এই উপমহাদেশকে দ্বিখ-িত করে পাকিস্তান নামক একটি কৃত্রিম ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র যার জন্ম হয়েছে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের জন্য। পাকিস্তানের পর ইসরাইলকে ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও গত ৬৫ বছরে তা সফল হয়নি।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে (১৮৭৬-১৯৪৮) সাধারণভাবে দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তানের জনক বা প্রতিষ্ঠাতা বলা হলেও এই উপমহাদেশের আরও দুজন মুসলমান নেতা ও চিন্তাবিদ ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের কৃতিত্বের দাবিদার। এঁদের একজন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮), অপরজন স্যার মোহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮); যিনি আল্লামা ইকবাল নামে অধিক পরিচিত। স্যার সৈয়দ উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। স্যার ইকবাল ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি প্রথম জানিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী (১৮৯৫-১৯৫১) ভারতবর্ষের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমের পাঁচটি মুসলমানপ্রধান প্রদেশ ও রাজ্যÑপাঞ্জাব, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বা আফগান প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের নামের অংশ একত্র করে ‘পাকিস্তান’ নামটি তৈরি করেছিলেন। বিশ্বের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের পিতৃত্বের কৃতিত্ব এঁরা চারজনই দাবি করতে পারেন।
চৌধুরী রহমত আলী যেহেতু তাঁর কর্মজীবন ইংল্যান্ডেই অতিবাহিত করেছেন, পাকিস্তানের নামকরণ এবং এর পক্ষে প্রবাসে জনমত গঠন ছাড়া উপমহাদেশের রাজনীতিতে তাঁর অন্য কোন ভূমিকা নেই। পক্ষান্তরে সৈয়দ আহমদ, ইকবাল ও জিন্নাহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষভাবে মুসলিম জাগরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। লক্ষ্য করবার মতো বিষয় হচ্ছে, এঁরা তিনজনই প্রথম জীবনে অসাম্প্রদায়িক ও উদার মতের অনুসারী ছিলেন। স্যার সৈয়দ আহমদ ভারতীয় মুসলমানদের পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন যার ভেতর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে এক বিশাল জনসভায় প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দু ও মুসলিম ভাইয়েরা! আপনারা কি ভারত ছাড়া অন্য কোন দেশের বাসিন্দা? আপনারা কি এই মাটিতে অবস্থান করেন না? মৃত্যুর পর কি এই মাটিতেই আপনাদের সমাহিত বা শেষকৃত্য করা হয় না? যদি আপনাদের জন্ম ও মৃত্যু এই মাটিতেই হয় তাহলে মনে রাখবেন, হিন্দু ও মুসলিম শুধু দুটি ধর্মীয় শব্দ। এই দেশে অবস্থানকারী সকল হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টান এক জাতি।’১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ভীত হয়ে ইংরেজ শাসকরা ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিভক্ত করার প্রথম উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল হিন্দী-উর্দু ভাষা বিতর্ক। ইংরেজরা ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের আগে মুঘল দরবারের ফার্সি ছিল সরকারী ভাষা। ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজী ও স্থানীয় ভাষা প্রচলন করেছিল। বিরোধ দেখা দেয় ১৮৬৭ সালে উত্তর ভারতের আগ্রা ও আউধ যুক্তপ্রদেশে, যেখানে স্থানীয় নবাব ও অভিজাতদের ভাষা উর্দু হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল হিন্দী। বেনারসের বাবু শিবপ্রসাদ প্রথম উর্দুর পরিবর্তে হিন্দীকে সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন।

উত্তর ভারতের উর্দু ও হিন্দী ভাষা বিতর্ককে কেন্দ্র করে অনেক ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িক সংগঠনের জন্ম হয়েছিল, যাদের ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘নাগরিক প্রচারিণী সভা’, ‘হিন্দী সাহিত্য সম্মেলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি’ এবং ‘আঞ্জুমান তারাক্কি-ই-উর্দু’। এসব সংগঠনের উদ্যোক্তারা উর্দুকে মুসলমানের ভাষা এবং হিন্দীকে হিন্দুর ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, যদিও উভয় ভাষার সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয় ধর্মের অনুসারীদের অবদান রয়েছে। একই সময়ে (এপ্রিল ১৮৬৭) কলকাতায় নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ ‘হিন্দুমেলা’ গঠন করে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। উত্তর ভারতে উর্দু-হিন্দীর বিরোধ তখন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তখন থেকে ইংরেজ শাসকরা দক্ষতার সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতায় ইন্ধন জুগিয়েছে।

স্যার সৈয়দ আহমদ উর্দু-হিন্দী বিরোধে উর্দুর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে বেনারসের গবর্নর শেক্সপীয়ারকে বলেছিলেন, ‘আমি এখন এ বিষয়ে নিশ্চিতÑ হিন্দু ও মুসলিম কখনও এক জাতি হতে পারে না। কারণ তাদের ধর্ম ও জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পূর্ণ পৃথক।’ সৈয়দ আহমদ এ সময়ের বহু লেখায় উর্দুকে মুসলমানের ভাষা এবং ভারতবর্ষে মুসলিম জাতীয়তাবোধের ঐক্যের প্রধান অভিব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৮ শতকের শেষ তিন দশকে ভাষাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের ধারাবাহিকতায় স্যার সৈয়দ আহমদ গঠন করলেন ‘মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন’ (১৮৭৮) এবং ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ এবং উত্তর ও পশ্চিম ভারতের মুসলিম নবাব ও সামন্ত প্রভুরা গঠন করলেন ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ (১৯০১)। ১৮৮৫ সালে উমেশচন্দ্র ব্যানার্জী, দাদাভাই নওরোজী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রমুখের নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলিম সম্প্রদায়কে কংগ্রেস থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যদিও তাঁর পরামর্শ উপেক্ষা করে বদরুদ্দীন তায়েবজী, রহিমতউল্লাহ সায়ানী, সৈয়দ হাসান ইমাম, হাকিম আজমল খান, মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা আবুল কালাম আজাদসহ বহু জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতা কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। জিন্নাহ্র রাজনৈতিক জীবনের সূচনাও কংগ্রেস থেকে।

গবেষক আসগর আলী ইঞ্জিনিয়ার একাধিক প্রবন্ধে লিখেছেন, কীভাবে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মওলানা কাসিম আহমেদ নানোতভি জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর স্যার সৈয়দ আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করে মুসলমানদের কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য ফতোয়া জারি করেছিলেন। এই ফতোয়ায় তিনি মুসলমান ও হিন্দুদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভারতের আলীগড়ের তুলনায় দেওবন্দ মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী অনেক রক্ষণশীল হলেও দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা আলেমরা ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন। বাংলাদেশের হেফাজতে ইসলামের প্রধান কট্টর মৌলবাদী ও জামায়াতবন্ধু আহমদ শফীর ওস্তাদ ছিলেন দেওবন্দের মওলানা হুসেন আহমেদ মাদানী, যিনি সৈয়দ আহমদ, ইকবাল ও জিন্নাহর ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলনের কট্টর সমালোচক ছিলেন।

আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত গান ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের পরই সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীত। সৈয়দ আহমদ ও জিন্নাহর মতো ইকবালও প্রথম জীবনে উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদী চিন্তার অনুসারী ছিলেন। ভারতবর্ষকে তিনি মনে করতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশ। অখ- ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ১৯০৮ সালে ইউরোপ থেকে ফেরার পর তিনি ক্রমশ ইসলামের দিকে ঝুঁকেছেন। ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ইসলামের দর্শন তিনিই প্রবর্তন করেছেন। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দশ বছর আগে ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ইকবাল বলেছিলেন, ‘আমি দেখতে চাই পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান একত্র হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরে অথবা বাইরে গিয়ে স্বশাসিত একটি রাজ্যে পরিণত হবে। ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমানদের চূড়ান্ত গন্তব্য হচ্ছে এই অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র ও সংহত মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

ইকবালের এই বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৩২ সালে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঞ্জাবী ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী শুধু ‘পাকিস্তান’ নাম প্রস্তাব করেননি, ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলে ‘বাঙ্গিস্তান’ এবং মধ্যভারতে ‘ওসমানিস্তান’ নামে দুটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনেরও প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর এই প্রস্তাবে ‘ইন্ডিয়া’র ইংরেজী ‘ডি’ অক্ষরটি সামনে এনে ‘দিনিয়া’ (উওঘওঅ) বা ধর্মরাজ্য রাখার কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, ভারতবর্ষ বহু ধর্মের মানুষের একটি মহাদেশ, এটি কোন এক জাতি বা এক দেশ নয়।

জিন্নাহ প্রথমে চৌধুরী রহমত আলীর প্রস্তাবকে ‘ছেলেমানুষি’ ও ‘পাগলামি’ মনে করলেও আল্লামা ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের দ্বারা ধীরে ধীরে কীভাবে প্রভাবিত হয়েছেন তিরিশের দশকের শেষভাগে তাদের পত্রবিনিময়ে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। প্রস্তাবিত পাকিস্তানের সঙ্গে বেঙ্গল বা বাংলাদেশকে যুক্ত করার জন্য জিন্নাহই শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে দিয়ে ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে বিভক্ত করার জন্য প্রথমে ভাষা এবং পরে ভাষাকে কেন্দ্র করে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। যে কোন দেশে মানুষের ভেতর ভাষা, বর্ণ, জাতি (নৃ-অর্থে), বিত্ত, লিঙ্গীয় বা আঞ্চলিক পার্থক্য থাকে। ঔপনিবেশিক শাসকরা তাঁদের ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ নীতি অনুসরণ করে সমাজের এসব অবৈরী পার্থক্য ও বিভাজনকে বৈরিতায় রূপান্তরিত করেছে। যার কারণে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চার্চিল প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা থাকাকালে পাকিস্তান ও জিন্নাহর পক্ষে কীভাবে খোলাখুলি অবস্থান নিয়েছিলেন জিন্নাহ ও চার্চিলের জীবনীকাররা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আলেক্স ভন টুলজেলমান তাঁর ‘ইন্ডিয়ান সামার’ গ্রন্থে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, জিন্নাহ যদি পাকিস্তানের পিতা হন তাহলে চার্চিলকে পাকিস্তান ও রাজনৈতিক ইসলামের পিতৃব্য বলা উচিত। একইভাবে আমেরিকাও খোলাখুলি পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল কমিউনিজমের ভীতি থেকে। স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মাও সেতুঙের চীনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর সুসম্পর্কের কারণে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এবং সমাজতন্ত্রী চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একই নিদান আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব গ্রহণ করেছিল; যার নাম ‘রাজনৈতিক ইসলাম’।

ব্যক্তিগত জীবনে জিন্নাহ ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামী রীতিনীতি ও বিধান থেকে ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে অবস্থান করলেও রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ১৯৪৭-এর ১১ আগস্ট পাকিস্তানের আইনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে এবং কয়েকটি সাক্ষাতকারে জিন্নাহ যদিও বলেছিলেন, ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, পাকিস্তানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাস করবে, পাকিস্তান কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে না, কিন্তু এর চার মাস পরই উপজাতীয় অসন্তোষ ও বিদ্রোহের কারণে মুসলিম লীগ এবং অপরাপর সাম্প্রদায়িক দলের নেতাদের চাপে বলতে বাধ্য হয়েছেন: পাকিস্তান একটি ইসলামী রাষ্ট্র হবে এবং কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোন আইন পাকিস্তানে পাস হবে না।
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় ১৯৪১ সালে পাঞ্জাবে মওলানা আবুল আলা মওদুদী গঠন করেছিলেন ‘জামায়াতে ইসলামী’, যা ছিল রাজনৈতিক ইসলামের ওয়াহাবী অভিব্যক্তি। মওদুদী পাকিস্তান আন্দোলনের কট্টর সমালোচক ছিলেন এবং একই সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও বিরোধী ছিলেন। যে কারণে দল গঠনের জন্য ব্রিটিশ সরকার এবং হায়দ্রাবাদের নিজাম তাঁকে সবরকম সহযোগিতা করেছিল। মওদুদী পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘নাপাকিস্তান’ বলেছিলেন। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি ইকবাল ও জিন্নাহ্র পাশাপাশি নিজেকে পাকিস্তানের অন্যতম প্রবক্তা বলে দাবি করে পাকিস্তানে ইসলামী হুকুমত কায়েমের জন্য জিহাদ শুরু করলেন।
১৯৪৮-এ সূচিত ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের অখ-তা কিংবা ইসলামবিরোধী ছিল না। উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন আইনসভায় কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি গবর্নর জেনারেল ও আইনসভার সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যার ভেতর ৪ কোটি ৪০ লাখ বাংলা ভাষায় কথা বলে।

এরপর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, উর্দু রাষ্ট্রভাষা হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে কী ধরনের সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতি ও মর্যাদার কথা বলেছেন। পাকিস্তানের আইনসভার কার্যবিবরণীতে উর্দু ও ইংরেজী লেখার বিধান থাকলেও বাংলার কোন স্থান ছিল না। বাংলাকে তিনি আইনসভার কার্যবিবরণী লেখার অন্যতম ভাষা হিসেবে গ্রহণেরও প্রস্তাব করেছিলেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রস্তাব সমর্থন করে প্রেম হরি বর্মা, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত ও শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বলেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের গজনফর আলী খান, সরদার আবদুর রব নিশতার, মাহমুদ হাশিম গাযদার, পূর্ব বাংলার তমিজউদ্দিন খান, খাজা নাজিমউদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি এবং তাঁর দলের সদস্যরা মন্তব্য করেছেনÑ ১) পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে ভারতের ১০ কোটি মুসলমানের জন্য, যাদের ভাষা উর্দু, ২) ধীরেন দত্তের প্রস্তাব মুসলমানদের ঐক্যের শক্তি কেড়ে নেবে, ৩) পাকিস্তানে দুই অংশের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করবে, ৪) যেহেতু পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র সেহেতু মুসলিম জাতির বোধগম্য ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হতে হবে, ৫) পাকিস্তান সৃষ্টির আগে কেউ বাংলাকে সরকারী ভাষা করার প্রস্তাব করে নি, ৬) বাংলাকে ভাগ করে পাকিস্তানের অংশ করার ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচনা ছিল ইসলাম ধর্ম, ভাষা বা সংস্কৃতি নয় ইত্যাদি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, আইনসভার নেতা যখন বলেন পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র তখন আমি বেদনাবোধ করি। আমি যতদূর জানি পাকিস্তান একটি গণরাষ্ট্র এবং এখানে মুসলিম ও অমুসলিমদের অধিকার সমান। আজ যদি মাননীয় সংসদ নেতার বক্তব্য গ্রহণ করা হয় তাহলে অমুসলিম সদস্যদের জন্য এটি একটি গুরুতর বিবেচ্য বিষয় হবেÑ তাঁরা আদৌ এই রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না। পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হলে শুধু মুসলমানরাই এ দেশের সংবিধান প্রণয়নের অধিকার রাখে। সংসদ নেতা বিষয়টি পরিষ্কার করলে এই রাষ্ট্রে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে আমরা পরবর্তী করণীয় স্থির করতে পারব।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী বিচ্ছিন্নতার গন্ধ আবিষ্কার করেছিলেন। ধীরেন দত্ত ও তাঁর সহযোগীরা গণতন্ত্রের স্বার্থে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাব গ্রহণ না করায় ক্ষতি হয়েছে পাকিস্তানের। জন্মলাভের মাত্র ২৪ বছরের ভেতর পাকিস্তান দ্বিখ-িত হয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, পাকিস্তান আন্দোলনে বাংলার মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান ছিল। তবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী বছরগুলোতে বাঙালীত্বের জাগরণ ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত রচনা করেছে।

১৮৬৭ সালে উত্তর ভারতের হিন্দী-উর্দু বিরোধ জন্ম দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের। ১৯৪৮-এর বাংলা-উর্দু বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটেছে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের সমাধি রচনার মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় ঘটলেও স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত রাজনৈতিক ইসলাম আবার ব্রাম স্টোকারের পিশাচ কাহিনীর ড্রাকুলার মতো কবর থেকে উঠে এসেছে। রক্তপানের জন্য বেছে নিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মানবতার বোধকে। বাঙালীত্বের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ১৯৪৮-এ ভয় পেয়েছিলেন জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী, ১৯৭১-এ ভয় পেয়েছেন, ইয়াহিয়া ও গোলাম আযমরা সেই চেতনার আলোই বধ করবে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকারী অন্ধকারের ড্রাকুলাদের।
(জনকন্ঠ, ২২/০২/২০১৪)

You Might Also Like