কুরআনের আলো

সূরা হাজ্জ; আয়াত ৭৭-৭৮ (পর্ব-১৬)

সূরা হাজ্জের ৭৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (77)

“হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর,সেজদা কর,তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর এবং সৎকাজ সম্পাদন কর,যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (২২:৭৭)

 

সূরা হাজ্জের শেষ কয়েকটি আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষকে ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক বিষয়ে কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ আয়াতে নামাজের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি- রুকু ও সিজদা করার ওপর বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে। এরপর সার্বিকভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে যে ইবাদতের মধ্যে নামাজসহ অন্যান্য সব বন্দেগি অন্তর্ভূক্ত।

অবশ্য কুরআনে ইবাদত শব্দটি বিশেষ ও সাধার এ দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নামাজ, রোজা ও হজ বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য এবং সব মুমিনকে তা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে মেনে চলতে হবে।

 

অবশ্য আল্লাহর ইবাদত করার জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান বা সময় নেই। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি স্থান মুমিনের জন্য ইবাদতের স্থান। ঈমানদার ব্যক্তি জীবিকা অর্জনের জন্য কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সময়ও আল্লাহর অর্থনীতি বিষয়ক দিক-নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য। অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামে সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র মসজিদ বা উপাসনার স্থানে সীমাবদ্ধ থাকেন না। ইসলাম ধর্মে আল্লাহ সব স্থানেই আছেন এবং বান্দাদের কাজকর্ম দেখাশুনা করছেন। এমনকি তিনি মানুষের কর্মস্থলেও উপস্থিত থাকেন এবং বান্দা হালাল নাকি হারাম উপায়ে উপার্জন করছে তার খবর রাখেন।

 

মুসলিম শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার সময় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে পড়াশোনা করবে। তারা এমন জ্ঞান অর্জন করবে যে জ্ঞান তার ও সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনবে। অবশ্য জ্ঞান অর্জনের জন্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এগুলোকে নফ্‌সের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।

 

মুসলিম মহিলারাও যেন নিজেদেরকে আল্লাহর বান্দা ও মর্যাদাপূর্ণ মানবীয় সত্ত্বা বলে মনে করে। তারা যেন কথিত আধুনিকতার নামে পোশাক ও জুতার ফ্যাশনের মোহে আকৃষ্ট না হয়। কারণ এগুলো অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় এবং তা সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, নগ্নতা ও অশ্লীলতা বাড়িয়ে দেয়।

 

আমরা দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য সব মিলিয়ে মাত্র আধা ঘণ্টা সময় ব্যয়  করব এবং বাকি সাড়ে ২৩ ঘন্টা সময়ে আল্লাহর কোনো স্থান থাকবে না- এটা হতে পারে না।

তাই আয়াতের পরবর্তী অংশে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহ বলেন: মুমিনদের সব সময়ের ধ্যান-জ্ঞান হওয়া উচিত সৎকাজের পাশাপাশি অপরের কল্যাণ করা। যারা তাদের বাধ্যতামূলক ইবাদতের পাশাপাশি মানুষ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে তারাই সফলতা অর্জন করবে এবং পরকালে জান্নাতে যেতে পারবে।

 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নামাজ দ্বীনের স্তম্ভ এবং ফরজ বা ওয়াজিব হলেও এটি ঈমানের একটি অংশ মাত্র; পুরোটা নয়।

২. আল্লাহর ইবাদত তখনই পূর্ণতা পাবে যখন তাতে মানবসেবা যোগ হবে।

 

সূরা হাজ্জের ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

) وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ (78)

“তোমরা আল্লাহর জন্য জিহাদ করো যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন। তিনি তোমাদের ধর্মে তোমাদের জন্য কঠিন কোনো বিধান দেননি। এই দ্বীন তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের দ্বীনের অনুরূপ। আল্লাহ এর আগে তোমাদের নামকরণ করেছেন- ‘মুসলিম’ এবং এই কিতাবেও তা করেছেন; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় এবং তোমরাও সাক্ষী হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা নামাজ কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে শক্তভাবে ধারণ করো। তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কতো উত্তম অভিভাবক এবং কতো উত্তম সাহায্যকারী তিনি!” (২২:৭৮)

 

এটি সূরা হাজ্জের সর্বশেষ আয়াত। আগের আয়াতের সঙ্গে মিল রেখে আল্লাহ এখানে মুমিনদের জন্য আরো কিছু নির্দেশনা তুলে ধরেছেন। আয়াতের প্রথমে আল্লাহ তার বান্দাদের উদ্দেশ করে বলেন: আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করে তার রাসূলের মাধ্যমে তোমাদেরকে হেদায়েত করেছেন, তাই তার পথে চল, নিজেদের ঈমানকে শক্তিশালী করে তার দ্বীন প্রচারের চেষ্টা করো। তবে এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমলের মধ্য নিষ্ঠা থাকতে হবে ও কাজকর্ম হতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

 

এ আয়াতে জিহাদ শব্দটি কাফের ও কুপ্রবৃত্তি উভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) একবার একটি যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে সাহাবীদের উদ্দেশ করে বলেন: আমরা জিহাদে আসগর বা ছোট জিহাদ থেকে জিহাদে আকবর বা বড় জেহাদে ফিরে এলাম। এ সময় সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন: বড় জেহাদ কি? তিনি বলেন: নফ্‌স বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জেহাদ।

 

এ আয়াতে আরো বলেন: আল্লাহ ইসলাম এবং আদিপিতা ইব্রাহিমের দ্বীনকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং এ দ্বীনে তোমাদের জন্য কঠিন কোনো দায়িত্ব নেই। যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য এতে আছে তা মানুষের সাধ্যের বাইরে নয়। যেমন নামাজ বাধ্যতামূলক হলেও একটি সহজ কর্তব্য। নামাজকে এতটাই সহজ করা হয়েছে যে, অসুস্থ ব্যক্তি শোয়া অবস্থায় সরাসরি রুকু-সেজদা না করে ইশারায় নামাজ আদায় করতে পারবে। এ ছাড়া, যারা অসুস্থ ও  শারিরীকভাবে অক্ষম তাদেরকে ইসলাম রোজা রাখতে বাধ্য করা হয়নি। আর যাদের অর্থনৈতিক ও শারীরিক সামর্থ্য আছে শুধুমাত্র তাদের উপর হজ ওয়াজিব করা হয়েছে।

 

খুব স্বাভাবিকভাবেই এ ধর্ম আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ধর্ম। এ ধর্মে আল্লাহর রাসূল মুমিনদের জন্য আদর্শ এবং প্রকৃত মুমিনরা গোটা মানবজাতির জন্য আদর্শ। এ মর্যাদা রক্ষা করতে হলে নির্দেশ অনুযায়ী নামাজ পড়তে ও জাকাত দিতে হবে এবং নিজেকে আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত করতে হবে।

 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সব ধরনের অবহেলা ও অলসতা থেকে দূরে থাকতে হবে।

২. ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এটিকে সহজ ও পালনযোগ্য করে তুলে ধরতে হবে, অপরকে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা বা এক্ষেত্রে কঠোর হওয়া যাবে না।

৩. শুধুমাত্র মুখে ঈমান এনে নামমাত্র মুসলমান হলে চলবে না, কারণ, আমল ছাড়া ঈমানের কোন গুরুত্ব নেই।#

You Might Also Like