জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে অধিক গ্রন্থ চাই

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মিছিলে চলেছিল পুলিশের গুলি। ছাত্ররা ভঙ্গ করেছিল ১৪৪ ধারা। আন্দোলন দেশজুড়ে নিয়েছিল গণ-আন্দোলনের রূপ। কোনো বিশেষ দল এই আন্দোলনের কৃতিত্বের দাবি করতে পারে না। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ৬২ বছর আগে। তখনকার পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী রাজনৈতিক দিক থেকে এক নয়। তখন বাংলাদেশ বলে কোনো পৃথক রাষ্ট্র ছিল না, কিন্তু এখন তা বাস্তবতা। এখন বাংলা হলো একটি জাতিরাষ্ট্রের (Nation-state) রাষ্ট্রভাষা। আজ আমাদের ভাবতে হবে এই ভাষার প্রকর্ষ সাধন নিয়ে। কেবল অতীতের ভাষা আন্দোলনের কথা ভেবে আজ আর কোনো লাভ নেই। সেটা হবে কেবলই অতীত নিয়ে অনাবশ্যক ঘাঁটাঘাঁটি করা মাত্র। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষার স্থান কারো কারো মতে চতুর্থ, আবার কারো কারো মতে সপ্তম। বাংলা এখন ২০ কোটির বেশি মানুষের মাতৃভাষা। কী করে এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তোলা যায়, সেটাই এখন হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য, যাতে করে এই ভাষার মাধ্যমে আমাদের তরুণেরা সহজেই শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু বাংলা ভাষার বিভিন্ন জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে গ্রন্থের অভাব এখনো প্রকট হয়েই আছে। যেটা নিয়ে আমাদের বিশেষভাবে করতে হবে ভাবনাচিন্তা। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি সাহিত্যের হাত ধরে ঘটতে পেরেছিল বাংলা ভাষায় রস-সাহিত্য চর্চার লক্ষণীয় অগ্রগতি। কিন্তু বাংলা ভাষায় জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে আলোচনার জন্য সেভাবে প্রয়োজনীয় শব্দসম্ভারে সমৃদ্ধ হতে পারেনি। বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিতে হলে জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে অধিক গ্রন্থ রচিত হতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেটা এখনো হতে পারছে না। প্রতি বছর বইমেলায় গেলে এ কথার সত্যতা সহজেই যাচাই হতে পারে। গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই বিভিন্ন স্টলে যে হারে দেখা যায়; জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে তা হতে দেখা যায় না।বাংলা ভাষাকে হতে হবে গ্রহণপটু ভাষা, অর্থাৎ তাকে গ্রহণ করতে হবে বিদেশী ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ। ইংরেজি ভাষা খুবই গ্রহণপটু ভাষা। তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটতে পেরেছে তার বিপুল সমৃদ্ধি। ইংরেজি ভাষায় এখন বিদেশী ভাষা থেকে অনূদিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গ্রন্থ। কিন্তু আমরা চাচ্ছি না বিদেশী ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে। একটি হিসাব অনুসারে পৃথিবীতে এখন জীবন্ত ভাষার সংখ্যা হলো তিন হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু পৃথিবীর ১৩টা প্রধান ভাষা জানলে বর্তমান পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের চিন্তা-চেতনার সাথে পরিচিত হওয়া সম্ভব। আমাদের দেশে বিদেশী ভাষা শেখার তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিদেশী ভাষা শিখে ঘটাতে হবে আমাদের মাতৃভাষার প্রকর্ষ। ভাষা নিয়ে রাজনীতি করা আর কোনো ভাষার ওপর নিজের দখল প্রতিষ্ঠা করা সমার্থক নয়। ভাষার ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করতে গেলে প্রয়োজন হয় সেই ভাষাকে আয়ত্ত করার চেষ্টা।১৯৫২ সালে আমি ছিলাম ছাত্র। প্রথমে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ছাত্রদের মধ্যে, যাদের বলা হয় ভাষাসৈনিক, আমাকে তা বলা উচিত হবে না। কিন্তু অনেক ভাষাসৈনিকের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলাম, যাদের অনেককেই পরে দেখেছি বিদেশে যাত্রা করতে। তারা নিয়েছেন বিদেশের নাগরিকত্ব। ছেড়েছেন বাংলায় কথা বলা। অথচ এরা নিয়েছিলেন ছাত্রজীবনে ভাষা আন্দোলনে অংশ। আমরা এখন গান গাইÑ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। এই গানের রচক আবদুল গাফফার চৌধুরী এখনো বেঁচে আছেন বলেই জানি। কিন্তু তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছেন বিলাতে আর গ্রহণ করেছেন (যত দূর জানি) বিলাতের নাগরিকত্ব। আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাথে ১৯৭১ সালে আমার বিশেষ পরিচয় ঘটেছিল কলকাতায়। এ সময় গাফফার সাহেব আমাকে প্রশ্ন করেছিলেনÑ ইংরেজি ভাষা রফত করা কি খুব কঠিন? তিনি আমাকে বলেন, তিনি বিলাতে যাওয়ার এবং সেখানে থাকার সুযোগ পেতে পারেন। তার প্রশ্ন আমাকে বেশ বিস্মিত করেছিল। কারণ, বাংলায় এমএ পাস করার পর বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতা করে পেতে পেরেছিলেন দেশজোড়া খ্যাতি। আমি বুঝিনি, কেন বিদেশের প্রতি তার মনে জেগেছিল এই টান। আমার ধারণা, সবুজ ভিসা পেলে বহু মানুষই চলে যেতে চাইবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে; থাকতে চাইবেন না বাংলাদেশে। এসব কথা মনে আসছে এ জন্য যে, ক’দিন আগে একজন বুদ্ধিজীবী বলেছেন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই হতে পেরেছে বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্র। কিন্তু এই ভাষার প্রতি আসলে আমাদের টান কতটুকু?

অনেক দিন আগে আমি যখন ফরাসি দেশে ফরাসি ভাষায় লেখাপড়া শিখছিলাম, তখন আমার পরিচয় ঘটে কলকাতা থেকে ফ্রান্সে যাওয়া একজন বাংলাভাষী হিন্দু ছাত্রের। সে একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলে, একজন গড়পড়তা ফরাসি ছাত্র ফরাসি ভাষায় যত সুন্দর গুছিয়ে কোনো বিষয়ে রচনা লিখতে পারে, আমরা বাংলা ভাষায় তা পারি না। শিক্ষার একটা উদ্দেশ্য হলো, ভাষার মাধ্যমে গুছিয়ে মনোভাব প্রকাশ করতে পারা। মানুষ ভাষার মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করতে পারে। এটা তার বৈশিষ্ট্য। অন্য প্রাণীরা তা পারে না। মানবশিশু ও শিম্পাঞ্জিসাবককে নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, শুরুতে তাদের মধ্যে বুদ্ধিতে পার্থক্য থাকে না বেশি। কিন্তু পার্থক্য শুরু হয় যখন মানবশিশু ভাষা শিখে ফেলে, যা তার বুদ্ধির প্রকর্ষ ঘটায়। মানুষ ভাষার মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করে। ভাষার মাধ্যমে চিন্তা করে এবং চিন্তাকে ভাষার মাধ্যমে ধরে রাখতে চায় তার স্মৃতির মণিকোঠায়। চেষ্টা করলে শিম্পাঞ্জিকে মাতাপিতা বলতে শেখানো যায়। কিন্তু মাতাপিতা বলতে কী বোঝায় তা তাকে শেখানো যায় না। তোতাপাখিরা মানুষের কথা শুনে অনেক কিছু বলতে পারে, কিন্তু তারা জানে না আসলে তারা কী বলছে। তারা কেবল মানুষের ভাষা শুনে অনুকরণ করতে চায় মাত্র। কিন্তু পারে না ভাষার মাধ্যমে ভাবকে উপলব্ধি করতে। আমার জীবন কেটেছে শিক্ষকতা করে। অনেক ছাত্রের খাতা দেখতে গিয়ে মনে পড়েছে তোতাপাখির কথা। তারা আওড়েছে অন্যের কথা। তাদের আচরণ হয়েছে তোতাপাখির মতো। আমাদের শেখানোর একটা গলদ হচ্ছে, ছাত্রদের ভাবতে না শেখানো। আর ভাবতে হলে মাতৃভাষা যতটা যেভাবে শেখা দরকার, সেটা তাদের শেখানো হচ্ছে না।

ইসরাইল নামে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৪ মে ১৯৪৮ সালে। ইসরাইলের রাষ্ট্রভাষা হিব্রু (এপরু)। এই হিব্রু ভাষা ইসরাইলের জন্মের দুই হাজার বছর আগে পরিণত হয় মৃত ভাষায়। কিন্তু ইহুদিরা এই ভাষাকে আবার সজীব করে তুলতে পেরেছে। ইসরাইল রাষ্ট্র চলেছে হিব্রু ভাষার মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় চলেছে হিব্রু ভাষাকে কেন্দ্র করে। ইসরাইলে প্রতি বছর হিব্রু ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে নানা জ্ঞানপ্রদ বিষয়ে গ্রন্থ। সেটা বাংলা ভাষায় এখনো হতে পারছে না। এক সময় ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়েতে চলত একই ভাষা। নরওয়ের ভাষাতাত্ত্বিক অধংবহ ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে একটি কৃত্রিম ভাষা, Landsmaal তৈরি করেন। নরওয়ে সরকার এই কৃত্রিম ভাষাটিকে গ্রহণ করেন জাতীয় ভাষা হিসেবে।

এখন তা হয়ে উঠেছে নরওয়ের জাতীয় ভাষা। যদিও এই ভাষাটির সাথে ড্যানিশ ভাষার যথেষ্ট মিল আছে। তথাপি এখন আর বলা চলে না নরওয়ের ভাষা হলো ড্যানিশ (Danish)। কথাটা আমার মনে আসছে এ জন্য যে, এখন বলা হচ্ছে বাংলাদেশে ‘প্রমিত’ বাংলা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এই প্রমিত বাংলা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। বোঝা যাচ্ছে না প্রমিত বাংলার ব্যবহার করে আমরা কিভাবে উপকৃত হব।
আমি জন্মেছিলাম রাজশাহী শহরে। রাজশাহী শহরে প্রচলিত ছিল একটা আঞ্চলিক বাংলা। আমি ছেলেবেলায় রাজশাহীর আঞ্চলিক বাংলায় কথা বলতাম। যে ভাষাটি এখন অচল হয়ে পড়েছে। যেমনÑ ‘কোথায় গিয়েছিলি’ বলতে আমরা রাজশাহীর বাংলায় বলতাম ‘কুনঠে গেলছিলি’। এখন এই ভাষাটা আর প্রায় নেই। আমরা এখন ব্যবহার করি চলতি বাংলা। চলতি বাংলায় কেউ বলেন ‘অভ্যেস’, আবার কেউ বলেন ‘অভ্যাস’। কেউ বলেন ‘ছিলাম’, আবার কেউ বলেন ‘ছিলেম’। কেউ বলেন ‘উপরে’ আবার কেউ বলেন ‘ওপরে’। প্রমিত বাংলা বলতে তার উচ্চারণ ঠিক কী দাঁড়াবে, আমরা তা ঠাহর করতে অপারগ। এক সময় রাবেন্দ্রিক কায়দায় এই শহরে কাউকে কাউকে বলতে দেখা যেত, গেলুম, খেলুম। কিন্তু সেটা এখন আর শোনা যায় না। রবীন্দ্রনাথের বাংলাকে আমরা আমাদের ক্ষেত্রে বলতে পারি না প্রমিত বাংলা। এক সময় লেখার ক্ষেত্রে ছিল সাধু ভাষার চল। যেটা এখন প্রায় উঠে যাওয়ারই মধ্যে। কিন্তু রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিক বলেছেন (১৯৭৫)Ñ ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ক গ্রন্থ এই ভাষায় অর্থাৎ চলতি বাংলায় লেখা সম্ভব বা সঙ্গত কি না, এ বিষয়ে এখনো গুরুতর মতভেদ বর্তমান। (বাংলা দেশের ইতিহাস; ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪৮৮)

এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বাংলা ব্যবহারে আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল, কলকাতা ও ভগীরথী তীরের ভাষা পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই সাধু বাংলা হতে হবে বাংলার মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। রমেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয় এক সময় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান এবং পরে হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। তিনি বাংলা দেশের ইতিহাস রচনা করেছেন সাধু বাংলা ভাষায়। তার সাধু বাংলা হতে পারে আমাদের অনুকরণীয়। কিন্তু এখন আমরা শুনছি, ব্যবহার করতে হবে প্রমিত বাংলা। প্রমিত বাংলার ব্যবহার সম্পর্কে যিনি বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাকে ক’দিন আগে দিল্লি থেকে দেয়া হলো পদ্মভূষণ খেতাব। দিল্লি ঠিক কী চাচ্ছে আমরা তা জানি না। হিন্দি ভাষা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে সব আরবি, ফারসি শব্দ। আর সেই স্থলে ঢোকানো হচ্ছে সংস্কৃত শব্দ। আমরা লক্ষ করছি ভারতে যেভাবে হিন্দি ভাষাকে সংস্কৃত শব্দবহুল করা হচ্ছে, বাংলা ভাষাকেও চেষ্টা চলেছে একই রকমভাবে সংস্কৃত শব্দবহুল করে তোলার।

বাংলা ভাষাকে যেন চেষ্টা হচ্ছে সংস্কৃত শব্দবহুল কৃত্রিম হিন্দি ভাষার কাছাকাছি করে তোলার। আমার মনে পড়ে, আমাদের বাড়িতে যে বাংলা ভাষা চলত, তাতে ব্যবহৃত হতো প্রচুর আরবি, ফারসি শব্দ। যেমন ছেলেবেলায় আমরা বলেছি, ‘খোশ আমদেদ’। কিন্তু এখন বলছি ‘স্বাগতম’। মুসলিম নৃপতিদের শাসনামলে এ দেশের সরকারি কাজকর্ম চলেছে প্রধানত ফারসি ভাষার মাধ্যমে। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনামলে আদালতে ফারসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা প্রবর্তিত হয়। একটি হিসাব অনুসারে বাংলা ভাষায় আড়াই হাজারের ওপরে ফারসি শব্দ প্রচলিত আছে। কিন্তু এখন একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা চলেছে যেন ফরাসি শব্দকে বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দকে গ্রহণ করার। জানি না, প্রমিত বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দকে বাতিল করা হবে কি না? এক সময় বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আরবি-ফারসি শব্দবহুল বাংলা ভাষা প্রচলিত ছিল। একে বলা হতো মুসলমানি বাংলা। এর একটি পৃথক লিখিত সাহিত্যও ছিল। ভাষাটি এতই প্রচলিত ছিল যে, খ্রিষ্টান মিশনারিরা বাংলার মুসলমানদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য এই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন বাইবেল। বিদেশী মিশনারি Rev. William Goldsack সঙ্কলন করেন এই ভাষার একটি অভিধান : A Mussalmani Bengali- English Dictionary। এই ভাষাটা এখন আর প্রচলিত নয়। ভাষাটা উঠে যায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। ভাষাটা পায় না বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা।
প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে জিন্না সাহেবকে নিয়ে করা হয় যথেষ্ট নিন্দাভাজন। কারণ তিনি বলেছিলেন, একমাত্র উর্দুই হতে হবে সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলার মুসলমান এক সময় দেখিয়েছিলেন উর্দু ভাষাপ্রীতি। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দুরা বলেছেন, ভাবি স্বাধীন ভারতে হিন্দি হতে হবে রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু মুসলমানেরা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রভাষা হতে হবে উর্দু। ব্রিটিশ শাসনামলে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছে, তা ছিল মূলত হিন্দি ও উর্দু নিয়ে। তখন কেউ ভাবেনি বাংলা ভাষা হতে পারে কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর All India Muslim Educational Conference-এর সভাপতির ভাষণে এ কে ফজলুল হক ঘোষণা করেছিলেনÑ হিন্দি নয়, উর্দু হতে হবে ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua franca)। বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি উঠেছিল সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলা ভাষা কোনো দিন কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হতে পারত বলে অনুমান করা যায় না। পাকিস্তান হতে পেরেছিল বলে বাংলা মর্যাদা পেতে পারে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অধিকার। সাবেক পাকিস্তান ভেঙে উদ্ভব হয়েছে বর্তমান রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হলো বাংলা। এখন বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের ওপরই নির্ভর করছে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ। আমাদের ওপর নির্ভর করছে এই ভাষার বিকাশ।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
(নয়া দিগন্ত, ১৭/০২/২০১৪)

You Might Also Like