অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার একদলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশ এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা করেছে। সামনে কোনো আলোর রেখা নেই। কোথায় যে যাচ্ছি, কোনো নিশানা নেই। এ নিয়ে সরকারের কোনো ভাবনাও নেই। যাচ্ছি কোথাও। যদি পথ হারিয়ে ফেলি, তাহলে ভারত এসে সঠিক পথের নিশানা দেবে। রাশিয়াও থাকবে সাথে। সরকারের আশা এটুকুই। ফলে রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, শিা, মূল্যবোধÑ সব কিছুই গোল্লায় যেতে বসেছে। কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা সরকার ভাবতে চাচ্ছে না। এর ফলে জনগণের জীবনমানে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা নিয়েও সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। জনগণের জীবনমান গোল্লায় যাক, কী যায় আসেÑ এই মনোভাব নিয়ে কেবল মতায় টিকে থাকার জন্য সরকার অনন্ত অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়েছে।
এখন পৃথিবীতে বাংলাদেশের বন্ধু বলে কেউ নেই। ভারত বা রাশিয়াকে বন্ধু বলে ভাবা হলে তা হবে মারাত্মক ভুল। কারণ ভারতের ল্য বাংলাদেশের বাজার। রাশিয়ারও তাই। রাশিয়া বাংলাদেশে ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করে হালে বন্ধু হয়েছে। এ দু’টি রাষ্ট্রের কোনোটার সাথেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনমানের কোনো যোগ নেই। ভারত বাংলাদেশে শুধু রফতানি করে। আমদানি করে সামান্য। রাশিয়ার অবস্থাও তাই। তবুও সরকারের ভরসা এই দুই রাষ্ট্র।যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীনÑ এরা আমাদের অর্থনীতির নিয়ামকশক্তি। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে বাকশালের মতো স্বৈরতান্ত্রিক একদলীয় শাসন কায়েমের পর সারা বিশ্বই স্তম্ভিত। এ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও বৈধ বলে মনে করেনি সারা বিশ্বে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো। মার্কিন সিনেটে বাংলাদেশ নিয়ে দুই দফায় বিতর্ক হয়েছে। তাদের প্রস্তাব একই, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নয়। ফলে তা গ্রহণের অযোগ্য। অতএব দ্রুত বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হবে। এর প্রাথমিক সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের রফতানির েেত্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে দিয়েছে। সেই সুবিধা পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী পরস্পরবিরোধী নানা কথা বলছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, এ সুবিধা পুনরুদ্ধারে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর সাথে যদি যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেয়, তাহলে কিছু করার নেই। আর ‘রাবিশ’ ও ‘স্টুপিড’খ্যাত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা তেমন কিছুই না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা না দিলেও সরকারের কিচ্ছু যায় আসে না। অবশ্য এর আগে তিনি সোনালী ব্যাংকের চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা চুরির ব্যাপারে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটা কোনো ব্যাপারই না। ‘চোরের সাী গাঁটকাটা’ প্রবাদের সৃষ্টি সম্ভবত এসব দায়িত্বহীন লোকদের আচরণ ও কথাবার্তার জন্য হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীকে বহু আগেই বাহাত্তরে পেয়েছে। কান টানলে যে মাথা আসে এটি তার স্মরণে নেই।
বাংলাদেশের এখন প্রধান রফতানি ত্রে হচ্ছে জনশক্তি ও গার্মেন্ট খাত। অত্যধিক ভারতনির্ভরতা এবং ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশই বাংলাদেশের জনশক্তি গ্রহণের েেত্র কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার সৌদি আরব। সেখানে জনশক্তি রফতানি এখন আর খুব সহজ নেই।

এ দিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এক্সপো ফেয়ার ২০২০-এর ভেনু নির্ধারণে বাংলাদেশ দুবাইকে ভোট না দিয়ে রাশিয়াকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ সম্ভবত আমাদের সরকার রাশিয়া থেকে ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনব, তার সাথে ভোটের কী সম্পর্ক? কী যে সম্পর্ক তা তাদের আগের মেয়াদের মিগ যুদ্ধবিমান কেনার সময় দেখা গেছে। সেখানে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাশিয়াকে ভোট দেয়ার আগে সরকারের অদূরদর্শী নেতৃত্ব ভেবে দেখতে চায়নি, এর পরিণতি কী হতে পারে। সে পরিণতি এখন শুরু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সে দেশে বাংলাদেশী জনশক্তি গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে। দুবাই বাংলাদেশীদের টুরিস্ট ও ট্রানজিট ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিণাম অপরিহার্য ছিল। রাশিয়া বেশি পণ্য কেনেও না। বাংলাদেশ থেকে কোনো জনশক্তিও নেয় না। তবুও সরকারের রাশিয়াকেই ভোট দিতে কেন হলো, সে রহস্য কোনো-না-কোনো দিন উন্মোচিত হবে।

অর্থনীতির এই গতি-প্রকৃতি বোঝার ইচ্ছা বা মুরোদ কোনোটাই বোধকরি বর্তমান সরকারের নেই। আমাদের রফতানির সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাদের ধারাবাহিক আহ্বান, বাংলাদেশে অবশ্যই অতি দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে। হ্যাঁ, এই চাহিদা রাজনৈতিক। এর কারণ গোটা বিশ্বই এখন একদলীয় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এ রকম স্বৈরশাসন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। জার্মান ফ্যাসিবাদীদের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গোটা পৃথিবী প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। পৃথিবী তার আর পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। ভারত ও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে এ রকমই একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। তাতে শেষ রা হয়নি। এখনো বিদেশের মদদেই বর্তমান সরকার একই ধরনের শাসন কায়েম করে বসেছে। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন মৃত।

শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, জনশক্তি রফতানির আরেকটি প্রধান বাজার হয়ে উঠতে পারত মুসলিমপ্রধান মালয়েশিয়া। কিন্তু সরকারের একচোখা পররাষ্ট্রনীতির কারণে সে বাজারও ভণ্ডুল হওয়ার পথে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য-সহযোগী। তারাও বলছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য। এখানে জনগণ কার্যত ভোট দেয়ার কোনো সুযোগই পায়নি। অর্ধেকের বেশি আসনে আওয়ামী প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এটি কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এবং অবশ্যই দ্রুত গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নতুন নির্বাচন দেয়া হোক। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ৫০৩ কোটি মার্কিন ডলারের। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকার আমদানি করেছিল ৬৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি। এর কোনো কিছুই সরকার বিবেচনায় নিলো না।

একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশে দ্রুত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি করেছে। ২০০৮ সালের পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছিল ৬৯ শতাংশ। ২০১৩ সালে সেখানে রফতানি হয়েছিল ৯২১ কোটি ইউরোর পণ্য। বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ১২ শতাংশ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে। এটিও সরকারের কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়নি। এরা কেবলই নিজেদের ভারতের পদতলে সমর্পণে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথে আমাদের দ্বিপীয় বাণিজ্য এখনো নি¤œতম পর্যায়ে। ২০১৩ সালে তা ছিল ৭০ কোটি ডলার। যদিও রাশিয়া তাদের অস্ত্র কেনার জন্য ১০০ কোটি ডলারের ঋণ মঞ্জুর করেছে এবং তারা বাংলাদেশে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। উল্লেখ্য, ইরান কিংবা ইরাক নিয়ে পৃথিবীতে যা ঘটেছে বা ঘটছে, তার পেছনে প্রধান কারণ রাশিয়ার সাথে পরমাণু চুক্তি। এইটুকু সাধারণ জ্ঞানেরও পরিচয় সরকার দিতে পারেনি। ভারতের মদদে কেবল একই বাকোয়াজি চলছে। আর তা হলো যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেই ছাড়ব। সে বিচারের প্রধান বাধা বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু পৃথিবীর কেউই যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে গঠিত আদালতের কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। তবু ওই একই ডামাডোল চলছে।

সরকার চোখ বন্ধ করে থাকলেও কিছু বাস্তবতা অবশ্যই তাদের মনে রাখা উচিত। জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশ আয় করে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যার ৩৫ শতাংশ আসে শুধু সৌদি আরব থেকে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তৃতীয়। আর যুক্তরাজ্যের অবস্থান পঞ্চম। মালয়েশিয়ায় অপার সম্ভাবনা থাকলেও রেমিট্যান্স আয়ের েেত্র তা এখন মাত্র ৩ শতাংশ। বিশ্বরাজনীতিতে ন্যাটো এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (জিসিসি) এক হয়ে কাজ করে। বাংলাদেশের অপরিণামদর্শী কূটনীতির কারণে এসব দেশে জনশক্তি রফতানি দ্রুত কমছে। কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে। তারা যদি বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন দেখতে না পায়, সরকার যদি বিরোধী দলকে দমনপীড়ন অব্যাহত রাখে তাহলে ধারণা করা হয়, এরা একযোগেই কাজ করবে। এ পরিণতিতে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় কমছে। কৃষিেেত্র উৎপাদন কমেছে ২.২ শতাংশ। অর্ধেক কৃষিশ্রমিক বেকার। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৬.১ শতাংশ। দুই হাজার ২০০ কোটি ডলারের গার্মেন্ট রফতানি খাত এখন কঠিন সঙ্কটে। এ বছরও হয়তো আরো কিছু দিন কারখানাগুলো চলবে। তারপর কী হবে বলা যায় না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ বাজার দখল করছে ভারত। বিদেশ থেকে ফিরে আসছে হাজার হাজার শ্রমিক। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বিনিয়োগ নেই। তাই কর্মসংস্থানের পথও রুদ্ধ। বিদেশী বিনিয়োগও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।

ভারতকে বন্ধু ভেবেই সরকারের যাবতীয় দেমাগ। কিন্তু ভারত এক আধিপত্যবাদী শোষক। বাংলাদেশে ভারতীয় রফতানি ২০১৩ সালে ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অবৈধ পথে প্রায় একই সমান পণ্য আমদানি হয়। সে েেত্র ভারতে বাংলাদেশ রফতানি করতে পেরেছে ৬০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ অভিন্ন নদীর পানি না পেলেও এবং ভারত এ দেশের সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করলেও সরকার বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করেছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের অনন্ত অন্ধকার যাত্রা।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

You Might Also Like