রাজনীতি যখন ক্ষমতার লড়াই সুবচন তখন নির্বাসনে

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন উপজেলা পদ্ধতির কথা ঘোষণা করলেন, তখন সর্বমহল থেকে আপত্তি উঠেছিল। এরশাদ ছিলেন সেনাশাসক, জবরদখলকারী। তাই কেউ তাঁকে মেনে নিতে রাজি ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়েছিল তাঁর শাসনের অবসান করতে। উপজেলা নির্বাচন সে আন্দোলন নস্যাৎ করে দেওয়ার একটি চাল ছিল, এ বক্তব্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল ও জামায়াতে ইসলামী উপজেলা নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল।

দেশের সব কটি রাজনৈতিক দল মিলে এই ঘোষণা দেওয়ার পরও ১৯৮৫ সালের উপজেলা নির্বাচন প্রতিহত করা যায়নি। বিশেষ করে বামপন্থী দলগুলো মেনন ও ইনুর ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি তখন এ ব্যাপারে আন্তরিক ছিল। কিন্তু কার্যত দেখা গেল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচন প্রতিহত করবে কী, তাদের নেতারা উপজেলা পর্যায়ের এ নির্বাচনে সরাসরি নেমে পড়লেন। ১৫ দলে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সিদ্ধান্ত ভেঙে যারা এ রকম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো দলের পক্ষ থেকে এ রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচন হয়ে গিয়েছিল। উপজেলা এখন একটি বাস্তবতা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিশ্চিতভাবে একজন ক্ষমতা জবরদখলকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর আমলের ৯ বছরে দুটি ডাকসু নির্বাচন দিয়েছিলেন আর প্রবর্তন করেছিলেন উপজেলা পরিষদ। সেই সময় ১৫ দল ও ৭ দল যে দৃষ্টিভঙ্গি দেখাক না কেন পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো হিসেবে উপজেলাকে মানুষ মেনে নিয়েছিল। আজও অবশ্য কেউ কেউ আছেন, যাঁরা উপজেলা পরিষদকে এ অর্থে মানেন না। তাঁরা বলতে চান, স্থানীয় সরকার কাঠামোর শিকড় আরো নিচে প্রোথিত হতে হবে। কিন্তু সে বিতর্ক থাক। ১৫ দল উপজেলা মেনে নিয়েছিল এবং এরশাদ সরকারের পতনের পরও উপজেলা পরিষদ সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেও বিএনপিও শেষ পর্যন্ত উপজেলা পরিষদকে মেনে নিয়েছিল। একেবারে সর্বশেষে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ তার প্রমাণ।

এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটা সরকার আছে ক্ষমতায়। বাস্তবে বিরোধী দল বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট এ সরকারকে অবৈধ মনে করে। আসলেও ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে এক নিষ্ঠুর রসিকতা করা হয়েছে গণতন্ত্রের সঙ্গে, যা দেখে দেশ ও বিশ্ববাসী স্তম্ভিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ বলছে ফ্রেশ নির্বাচন দিতে, যা হবে অংশগ্রহণমূলক।

আমি এ লেখা যেদিন লিখছি, সেদিন ১ ফাল্গুন। ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত’- কবিতার এ পঙ্ক্তি এ লেখার সময় মনে পড়ছে। এ কবিতার প্রতিধ্বনি করে বলা যায়, ভোট পড়ুক আর নাই পড়ুক, এটাই নির্বাচন। এটাই সরকার। এ-ও এক ধরনের জবরদখল। মার্কিনরা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যতই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলুক, তারা বলছে, আমরা কারো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না। ৫ বছরই ক্ষমতায় থাকব।

৫ জানুয়ারির আগে মন্ত্রীদের কেউ কেউ, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এটা হবে সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। বাধ্যতামূলক দশম সংসদ। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দশম সংসদ নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। কথা বলতে হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে। অনেকেই মনে করেছিল, খুব তাড়াতাড়ি একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কথা বলবে সরকার। কিন্তু সেটা নাকচ করে দিল সরকার। এর বদলে খুবই চটজলদি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করল তারা এবং সেটাও ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন তারিখে। ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখ থেকে শুরু করে মার্চ মাসজুড়ে চলবে।

অনেকে ভ্রূ কুঁচকালেন। তার মানে ‘নির্বাচন’-এর পর যেন আন্দোলনকে দ্রবীভূত করা যায় তার জন্য এ নির্বাচন। এ রকম ভাবার কারণ অবশ্যই আছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হচ্ছে না এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। ডাকসুসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হয় না দুই যুগের মতো। সেগুলোর ব্যাপারে কোনো কথা নেই। উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের এত আগ্রহ ও দ্রুত পদক্ষেপ! মানুষ তো ভ্রু কুঁচকাবেই। আরো একটি কারণ আছে, উপজেলা পরিষদ এখন বাস্তবত একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। এমপিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উপজেলাগুলোতে। ফলে স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদের কোনো স্বকীয় উদ্যোগ থাকছে না। বহু নির্বাচনী এলাকা আছে, যেগুলো একটি মাত্র উপজেলা নিয়ে গঠিত। ভোটের দিক বিবেচনা করলে সেখানে এমপি ও চেয়ারম্যানের একই এলাকা। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছেন। সিভিল সোসাইটির লোকজন বলছেন, সারা বিশ্বে স্থানীয় সরকার মানে স্বায়ত্তশাসিত সরকার। এখানেও ব্যাপারটা তাই ছিল। সেটা বদলানো হলো কেন? এক ঘরে দুই পীর কেন? না, ভুল বললাম। এক পীরের পীরালি আর থাকছেই না। তাহলে তাকে রাখার দরকার কী? অদ্ভুত এক বৈরিতার মধ্যে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের স্তরটি। তার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ তড়িঘড়ি করে তারই নির্বাচন দেওয়া হলো কেন?

আমি অবশ্য এ কথা বলব না যে বিএনপি বা ১৯ দলীয় জোটের আন্দোলনের ভয়ে সরকার এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন যে রকম দেখছি, বিএনপির তো অবস্থা কাহিল। ২৯ ডিসেম্বর গণতন্ত্র অভিযাত্রার নামে তারা যা করল, তাতেও হতবাক দেশের মানুষ। একটা দলের নিজের শক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকবে না? সেই শক্তি কতখানি তারা প্রদর্শন করবে, কতখানি প্রয়োগ করবে- সেটা নিশ্চয় তাদের কৌশলের ব্যাপার। জামায়াত সে অর্থে একটি কৌশলী দল। বিএনপি সে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র অভিযাত্রা ঘোষণা করল, তখন কি তারা মনে করেছিল যে সরকার তাদের জামাই আদরে গ্রহণ করবে অথবা মাওলানা শফীর মতো শাপলা চত্বরে বা অন্য কোথাও জায়গা করে দেবে? আন্দোলনসহ সব রাজনীতির হেডকোয়ার্টার যে রাজধানী ঢাকা, তা যে একেবারে বীর্যহীন হয়ে পড়েছে, তা তারা বুঝতেই পারেনি? যাক গে সে কথা। বিএনপি নিজের সমস্যা নিজে বুঝুক। নিজেদের মতো করে সামাল দিক। আমার আজকের লেখার প্রতিপাদ্য সেটা নয়। আমি শুধু বলতে চাইছি, আন্দোলনের ভয়ে ভীত হয়ে সরকার উপজেলা নির্বাচন দিয়েছে, সে কথা ভাবলে ভুল করা হবে। বিএনপি যে কত দূর কী করতে পারবে, সে কথা বেগম জিয়া না-ও বুঝতে পারেন। কিন্তু শেখ হাসিনা বুঝেছিলেন। এ জন্য এত বড় কঠিন পদক্ষেপ তিনি নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি ভুল করলেন উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি কী করতে পারে তা বুঝতে।

বিএনপি যে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে, আমার ধারণা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সেটা ভাবেননি। পাঠকবৃন্দ, খেয়াল করে দেখুন, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছিল। মন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, বিএনপি মাটিতে থুতু ফেলে সে থুতু আবার চেটে খাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বেগম জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রথমে বলেছেন, ‘গোলাপিরে গোলাপি, ট্রেন তো মিস করলি!’ তারপর বলেছেন, ‘সংসদ নির্বাচনের ট্রেন ফেল করে গোলাপি এখন উপজেলা নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে।’

৫ জানুয়ারির পরে বিএনপি যখন আবার নির্বাচনে ফিরে আসছে, তখন তাদের সাদর সম্ভাষণ জানানোর কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, তাঁরা চাইছেন যেন বিএনপি এ নির্বাচনে না আসে। কেন? যেসব ভাষা তাঁরা ব্যবহার করছেন, তা মানুষ পছন্দ করছে না। বেগম জিয়াকে গোলাপি ডাকলেই কি আর তিনি জনগণের কাছে অপ্রিয় হয়ে যাবেন? তাঁর গায়ের রং তো সত্যি সুন্দর। হিংসা করলেই কি আর সেটা কালো হয়ে যাবে? সে সুন্দরী মহিলা যখন আবার কাউকে গোপালি বলেন, রেগে যান এবং বলেন, গোপালগঞ্জের নামই রাখব না; তখন গোপালগঞ্জের মানুষ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মাইন্ড করতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে তাঁকে গোলাপি ডাকলে তাঁর কোনো ক্ষতি হয় না; ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমাটির নাম প্রচার হয়। নিশ্চয় আমজাদ হোসেন প্রীত বোধ করেন।

সিভিল সোসাইটি, বিশেষ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বলে। তাদের কথার মধ্যে যুক্তি আছে, কিন্তু রাজনীতি যখন প্রধানত ক্ষমতার লড়াই হয়ে যায়, তখন সুবচন নির্বাসনে যায়, বিবেক-বিবেচনা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। সাধারণত উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীর ছড়াছড়ি হয়, এই দেখে প্রথম সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। নির্দেশ দিয়েছেন, যেন কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকে। এর গুরুত্ব বুঝতে বিএনপির দেরি হওয়ার কথা নয়। তারাও বিদ্রোহী প্রার্থী না রাখতে তৎপর হয়েছে। সর্বাংশে উপজেলা নির্বাচন এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপির নির্বাচনী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যাতে জামায়াতও যোগ দিয়েছে। এটি আগামী দিনের নির্বাচন-আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশবাসী ও পর্যবেক্ষকরা সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন।

লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য
(কালের কন্ঠ, ১৭/০২/২০১৪)

You Might Also Like