অবশেষে তারা মরেই প্রমাণ করলেন…

মাঝে মধ্যেই সরকার-জামায়াত সমঝোতা বা গোপন আঁতাত হওয়া না হওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল। জামায়াত-শিবির যখনই নীরব থেকেছে তখনই এ ধরণের কথা বেশি চাউর হয়ে উঠেছে।
কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যম বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ‘সরকার-জামায়াত’ আঁতাতের সংবাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করেছে। এমনকি ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতাও বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনারে ‘সরকার-জামায়াত’ আঁতাতের ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্যও দিয়েছেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আপিল বিভাগের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়ার পরও ব্যাপক গুঞ্জন উঠেছে যে সরকারের সঙ্গে জামায়াতের গোপন আঁতাত হয়েছে।
এদিকে জামায়াতের নেতারা বরাবরই এসব সংবাদ ও বক্তব্যকে অসত্য, মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সরকারের পক্ষ থেকে অপপ্রচার বলে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত যা করে আসছে সবই দেশ, গণতন্ত্র, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড। ফলে এ সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী হয়নি দলটি।
জামায়াতের নেতাকর্মীরা সব সময়ই বলে আসছেন, জামায়াতে ইসলামী নিছক প্রচলিত ধারার কোন রাজনৈতিক দল নয়। এটা একটি আদর্শিক দল। এক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য হলো, একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যই জামায়াত কাজ করে যাচ্ছে। দলটি এ সমাজে রাসুল (স.)-এর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের কর্মপরিকল্পনা, কর্মসূচি আর সিদ্ধান্ত সব কিছুই গ্রহণ করা হয় আদর্শের ভিত্তিতেই। আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জামায়াত কখনো কোন কর্মপরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
যদিও ইতিপূর্বে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক বৈঠকের খবরও প্রকাশিত হয়েছিলো বহুদিন আগে। একটি প্রভাবশালী দেশের ঢাকায় অবস্থিত দূতাবাসে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ সরকারের সিনিয়র কয়েকজন জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী সিয়িনর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ বেশ কয়েকজন নেতা ছিলেন। অবশ্য ওই বৈঠকে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক ছিলো না বলে দুই পক্ষ থেকেই দাবি করা হয়েছিলো।
এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান শীর্ষ নিউজকে (কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর করার আগে) বলেছিলেন যে, যেখানে জামায়াত নেতাদের হত্যার লক্ষ্যে একের পর এক মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হচ্ছে সেখানে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা প্রশ্ন আসে কেমন করে?
তিনি আরো বলেছিলেন, ‘সরকার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কামারুজ্জামানসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। আব্দুল কাদের মোল্লার রক্তের উপর দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।’
৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতকে নির্বাচনে আনতে তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে গেলে হয়তো সরকার আব্দুল কাদের মোল্লার ব্যাপারে ভিন্ন চিন্তা করতো বলেও ইঙ্গিত ছিলো দলটির কাছে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর থেকেই আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে সম্পর্কের খারাপের মাত্রা বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের মাঝামাঝি থেকেই তাদের সম্পর্ক দা-কুমড়ায় রূপ নেয়। যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে।
কিন্তু এত কিছুর পরও সরকার মাঝে মধ্যে জামায়াত-শিবিরকে সভা-সমাবেশ ও ঘরোয়া পরিবেশে সাংগঠনিক কার্যক্রমের সুযোগ দিতে দেখা গেছে। আর সরকারের দেয়া এই সুযোগকেই একদিকে গণমাধ্যম বলেছে জামায়াত-সরকার আঁতাত! ‘সরকার-জামায়াত’ আঁতাত অবিশ্বাসের কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি কেউ কেউ। তারা ৮৬’র নির্বাচনকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দলের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলে চূড়ান্ত রায়ে সাজা কমার পরও ‘জামায়াত-সরকার’ আঁতাতের গুঞ্জন উঠে। দলটির সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর পর তার জানাযায় বিপুল সংখ্যাক মানুষ উপস্থিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রকার বাধা না দেয়ায় আঁতাতের ডালপালার বিস্তৃতি ঘটে। অবশ্য খালেদা জিয়ার কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে শেষ দিকে বিএনপি নেতারা আঁতাত নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেন নি।
দলের আমির মাওলানা নিজামী ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ও কামারুজ্জামানের আপিলের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহালের পর আঁতাতের যে গুঞ্জন ছিলো তার ইতি ঘটে।
সর্বশেষ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের ঘটনাগুলোকে নাটকীয়তা বলে উল্লেখ করেন তার ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী। শনিবার কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাত শেষে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, সরকার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কয়েকদিন নাটক করেছে।
সব শেষ শনিবার রাতে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্রকর হওয়ার পর সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টি সব মহলে দৃশ্যমান হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা ড. রেজাউল করিম বলেন, ইসলামি আন্দোলনের কারণেই আমাদের নেতাকর্মীদের উপর নিপীড়ন করা হচ্ছে। জীবন দিতে হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা আল্লাহর ভরসা করে ধৈর্যের সঙ্গে সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাবে।
সূত্র: শীর্ষ নিউজ

You Might Also Like