সংকট সমাধানে থেমে নেই কূটনৈতিক উদ্যোগ, আশাবাদী বিএনপি

চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও থেমে নেই কূটনীতিকরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে ‘ঘরোয়া’ আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন তারা। সংকট উত্তরণে পর্দার আড়ালে পশ্চিমা ও এশিয়ার প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকরা খুঁজছেন নানা উপায়। কূটনীতিকদের উদ্যোগ শিগগির সাফল্য না পেলেও আশাবাদী আন্দোলনকারী বিএনপি জোট। দলটির নেতারা মনে করেন, প্রকাশ্যে কঠোর মনোভাব দেখালেও অচিরেই সরকার সংকট সমাধানের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখাতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সংকট উত্তরণের উপায় হিসেবে নির্ধারিত সময়েই একাদশ জাতীয় নির্বাচন একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হতে পারে কি-না, সে বিষয়টি নিয়ে কূটনীতিকরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বন্ধুরাষ্ট্রের কূটনৈতিকদের উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শুক্রবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে আবারও তার দল ও জোটের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেশ, গণতন্ত্র ও অর্থনীতির কল্যাণ চাইলে দ্রুত বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসবে বলে তারা আশাবাদী। এ পরিস্থিতি বেশি দিন চলতে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে দেশ অনেক পিছিয়ে যাবে।
সূত্র আরও জানায়, বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং দেশের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং একাধিক দেশের কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য ‘স্থিতিশীল’ পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা থেকেই কূটনীতিকরা সংকট সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। চলতি সপ্তাহের শেষে এবং আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকে কূটনীতিকরা একাধিক ঘরোয়া বৈঠকে বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সরকার এবং বিএনপি জোট দুটি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। সরকার কোনো অবস্থাতেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেতে চায় না, এ নিয়ে সংলাপেও বসতে চায় না। আর বিএনপি যে কোনো মূল্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়। বিষয়টি এমন যে, এক বছর কিংবা ছয় মাস আগে হলেও নির্ধারিত মেয়াদের আগেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায় বিএনপি।
সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। দেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদসহ আরও কয়েকজন নেতা কূটনীতিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে সংকট উত্তরণে বাধাগুলো বিশ্লেষণ করছেন। কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই নেতারাও খালেদা জিয়াকে বলছেন, কিছুদিনের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগের কিছুটা সাফল্য দৃশ্যমান হতে পারে।
একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা সাক্ষাৎ করে একটি ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত পেয়েছেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব থেকে সরে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনেও আপত্তি নেই বিএনপির। কূটনীতিকরা সরকারকে বিএনপির এই মনোভাবের কথাও জানিয়েছেন নানাভাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হতে পারে, কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরকার সম্মত হবে না। জটিল এই ‘অনড় অবস্থানের অঙ্ক’ শেষ করে একটি সমাধানের সমীকরণ খোঁজা এখনও অনেকটাই দুরূহ, তবে অতীতেও অনেক জটিল রাজনৈতিক সংকটেরও সমাধান হয়েছে, এবারও হবে- এমন আশাবাদ এই সূত্রের।
সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের জানানো হচ্ছে, বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য জামায়াতসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সহায়তায় যে সহিংস আন্দোলন শুরু করে, তা ৫ জানুয়ারি নির্বাচন-পূর্বর্বর্তী ও পরবর্তী কোনো সময়েই জনসমর্থন পায়নি। এখনও পাচ্ছে না; বরং এ বছর ৫ জানুয়ারি থেকে নজিরবিহীন সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে জঙ্গি তৎপরতার নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। ফলে বিএনপি আরও জনসমর্থন হারিয়েছে। এ কারণে বিএনপির দাবিকে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন না সরকারের দায়িত্বশীলরা। একই সঙ্গে সরকারপক্ষের আশঙ্কা, সরকার কোনোভাবে নমনীয় আচরণ করলে বিএনপির সহিংস কর্মকাণ্ড আরও বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে সরকারও নমনীয়তা দেখাতে চায় না। দুই দলের ভেতরে এই আস্থার অভাবই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে- মন্তব্য এই সূত্রের।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রাশিয়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হলেও অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তারা কোনো প্রকাশ্য তৎপরতায় আগ্রহী নয়। রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থনও রয়েছে সরকারের বর্তমান অবস্থানের প্রতি। চীন ও জাপান বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেছে। তবে দুটি দেশের পক্ষ থেকেই সহিংস পরিস্থিতিতে উদ্বেগের কথা সরকারকে জানানো হয়েছে বলে সূত্র জানায়। এ মুহূর্তে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো সমাধানের তৎপরতার মধ্যেই ভারতের কূটনীতি দৃশ্যমান বলে সূত্র জানায়। সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন স্পষ্ট।
অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে পারে, এটা পশ্চিমের দেশগুলোর আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সর্বশেষ মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড এ উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতসহ ধর্মান্ধ সংগঠনগুলোর জোটবদ্ধ অবস্থানের কারণে বিএনপি পশ্চিমা দেশগুলোর আস্থায় আসতে পারছে না। তারা বারবার বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে বলেছে।
এর কারণ হিসেবে সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ধর্মান্ধ, জঙ্গি মতবাদ জামায়াতের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত ও বিস্তৃত হচ্ছে, এমন তথ্য পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে রয়েছে। চলমান সহিংসতার পেছনেও জামায়াতের ভূমিকা মুখ্য। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটাও তাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। এ কারণে কূটনীতিকদের তৎপরতায় সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি বিএনপির জামায়াত ছাড়ার বিষয়টি সমধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউরোপীয় একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বিএনপি-জামায়াতসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্ব নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব অনুযায়ী বিএনপিকে জামায়াত-হেফাজত ছাড়ার আহ্বানে এখনও স্পষ্ট অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর। জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধের ব্যাপারেও সরকারের প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আহ্বানও বাস্তবায়িত হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

You Might Also Like