বান্দরবানে দফায় দফায় পাহাড়ী-বাঙালী সংঘর্ষ, আহত ২০

বান্দরবানে পাহাড়ী ও সেখানে বসবাসরত বাঙালীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২০জন আহত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার বান্দরবান সফরকে কেন্দ্র করে জাগো পার্বত্যবাসীর ডাকা ৭২ ঘণ্টার হরতালের প্রথমদিন বুধবার দিনব্যাপী এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ে সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকে জাগো পার্বত্যবাসী নামে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্পটে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

এ সময় ট্রাফিক মোড়ে মং টিং মার্মা নামে এক আদিবাসী ছবি তুলতে গেলে তাকে লাঞ্চিত করা হয়। সে বান্দরবান প্রেসক্লাবে অবস্থান নিলে সেখানে হামলা চালায় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সন্তু লারমার গাড়ি বহর রাঙামাটি থেকে বান্দরবান শহরের বালাঘাটা দিয়ে প্রবেশ করার সময় স্বর্ণমন্দির এলাকার একটি ব্রিজের পাটাতন খুলে ফেলে হরতালকারীরা।

পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় ব্রিজটি ঠিক করে। ব্রিজটি ঠিক হলে সন্তু লারমা বান্দরবানে প্রবেশ করে শহরের সার্কিট হাউজে অবস্থান নেন। এ সময় বালাঘাটায় জেএসএসকর্মী ও হরতালকারীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনা, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল চালু রাখে।

বালাঘাটায় সংঘর্ষে মংবাথোয়াই কার্বারী (পাড়া প্রধান), উশৈথোয়াই মার্মা, পরিমল চাকমা, রকি তঞ্চঙ্গ্যা, রিপন তঞ্চঙ্গ্যা ও রাম বাবু মার্মাসহ ২০ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে গুরতর আহত মং মং চাকমা, পাইহ্লা অং, পুছো থোয়াই মারমাসহ পাঁচ আদিবাসীকে স্থানীয় সাংবাদিক,পুলিশ ও সেনা সদস্যরা উদ্ধার করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের মধ্যে দুইজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে  স্থানান্তর করা হয়।

শহরের বালাঘাটা এলাকার ব্যবসায়ী আলিম বলেন, প্রথমে জেএসএস কর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষের সূচনা হয়। পরে বাঙালিরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করে। এদিকে, সকাল থেকে পুলিশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেও শহরের জর্জকোর্ট এলাকায় পুলিশের গাড়ি লক্ষ করে হামলা করে হরতালকারীরা। এ ঘটনায় পুলিশ জর্জকোর্টের সামনে থেকে হুমায়ন নামে এক পিকেটারকে আটক করে। হরতালে জেলা শহরের সব রুটে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি।

জেলা শহরের সব ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। জাগো পার্বত্যবাসীর সংগঠনটির বান্দরবান শাখার আহ্বায়ক আবিদুর রহমান বলেন, পাহাড়ের জেএসএস সন্ত্রাস বন্ধ করতে আমাদের হরতাল ছিল শান্তিপূর্ণ। এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি দায়ি করেছে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবর রহমান ও পৌর মেয়র জাবেদ রেজাকে। তবে পার্বত্য জাগোবাসীর নেতারা বলেছেন ভিন্ন কথা। তারা জেএসএস কর্মীদের উস্কানিতে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘হামলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান সদর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক পুছো থোয়াই মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সদস্য পরিমল চাকমা, রকি তঞ্চঙ্গ্যা, স্বপন তঞ্চঙ্গ্যা, জনসংহতি সমিতির সদস্য মংবাথোয়াই মারমা ও রামবাবু মারমা গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নেতাকর্মীদের উপর হামলার  ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হামলাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান শাখার সাধারণ সম্পাদক ক্যাবা মং মার্মা বলেন, ‘বিশেষ রাজনৈতিক দলের দুই নেতার উস্কানিতে এ ঘটনা ঘটেছে। এতে আমাদের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছে।’

পাহাড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্ত্রাস, ব্যাপক চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যার প্রতিবাদে জাগো পার্বত্যবাসী নামের বাঙালীদের এই নতুন সংগঠনটি গত ১০ মার্চ বান্দরবান প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সন্মেলনে হরতালের ডাক দেয়। অন্যদিকে বান্দরবানের ফারুকপাড়ায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ১৩ মার্চের সন্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য বুধবার বান্দরবান সফরে আসেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা। একে কেন্দ্র করে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহম্মেদ বলেন, পরিস্তিতি শান্ত রাখতে সকাল থেকে পুলিশ শক্ত অবস্থানে ছিল।

You Might Also Like