বান কি মুন আমাদের চাকরিজীবী, তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না : আব্দুল মোমেন

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন আমাদের চাকরিজীবী। তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। আমরা তার চাকরিদাতা দেশ হিসাবে একটি দেশ। একটি দেশের চাকরিজীবী হিসাবে তার রাজনৈতিক সংকট সমাধানের ব্যাপারে সরকারের উপর আগ্রাসী কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই। এই কারণে জাতিসংঘ সংকট সমাধানের কথা বলছে। সেটা নিয়মতান্ত্রিক ভাবেই।

তিনি আগ্রাসীভাবে সংকট নিরসনের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। এই কারণে তিনি বিভিন্নভাবেই অনুরোধ করছেন। তবে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন তখনই যখন জেনারেল এ্যাসেম্বলী, সিকিউরিটি কাউন্সিলে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাকে এই জন্য দায়িত্ব দেওয়া হবে ঠিক তখনই।

এই কথাগুলো বলেছেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আব্দুল মোমেন। তিনি বাংলাদেশ সময় ২ মার্চ সোমবার দুপুর সোয়া বারোটায় আমাদের সময়.কম ও দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি কথা বলেন আরো বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির উত্তরে কি লিখেছেন জানেন কি?

তিনি বলেন, তিনি ঠিক কি লিখেছেন এটা আমার জানা নেই। কারণ চিঠিটি আমার মাধ্যমে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যায়নি।

কেমন করে গেছে জানেন কি?

তিনি বলেন, আমি ঠিক জানি না। তবে এমনও হতে পারে ঢাকায় ইউএনডিপির প্রধানের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে। সেটা হলে তিনি পাঠিয়ে দিবেন। আর না হয় ডিএইচএল, ফেডেক্সসহ নানা কুরিয়ার ব্যবস্থা আছে যাতে দ্রুত চিঠি পৌঁছায়। সেইভাবেও সরাসরি যেতে পারে। আমি ঠিক জানি না।

প্রধানমন্ত্রীর চিঠি পাওয়ার পর জাতিসংঘ থেকে আপনাকে কিছু বলা হয়েছে?

তিনি বলেন, এখনও কিছু বলা হয়নি।

আপনার সঙ্গে কি অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর কোন কথা হয়েছে?

হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। তিনিও যোগাযোগ করেন, আমিও করি।

কি কথা হয়েছে?

তিনি বাংলাদেশে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর সেটা করে তিনি বলেছেন, আগামীতে বাংলাদেশে কোন এক সময়ে নির্বাচন হবে। আর এই নির্বাচনটাকে সুষ্ঠু করার জন্য কি করা যায় সেটাও জানতে চেয়েছেন। সহিংসতা হচ্ছে এটা কিভাবে বন্ধ করা যায় সেই বিষয়েও কথা বলেছেন।

তিনি বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে আপনার কাছে কোন কিছু জানিয়েছেন?

মোমেন বলেন, এখনও পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে আসার মতো কোন কথা আমাকে জানাননি। তিনি যেতে চাইলে সেটা জানালে আমি সরকারকে জানাবো। তবে আমার মনে হয় এখন তিনি যেতে চাইবেন না। সরকারের তরফ থেকে তার সহায়তাতো চাইতে হবে। সেটাতো চাইছে না। আর এই কারণে তিনি যেতে পারছেন না।

আচ্ছা আমরাতো দেখছি বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘ ভীষণ উদ্বিগ্ন, সংকট নিরসনে সংলাপ করার কথাও বলছে, এই কারণে প্রায়দিনই মহাসচিবের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলছেন?

তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব ও তারানকো যতটা না উদ্বিগ্ন তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হচ্ছে গণমাধ্যম। এখানে একজন সাংবাদিক এসেছেন জাস্ট নিউজের। তিনি বিএনপির ফরেন রিলেশনের একজন হয়ে কাজ করছেন। তিনি জাতিসংঘকে জানিয়েছেন তার অনলাইনটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি পাঠকের অনলাইন নিউজ পোর্টাল। তিনি এখানে আসার পর আমাদের কোন সহায়তা চাননি ও নেননি। জাতিসংঘের এ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নিয়েছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন।

তিনি এর আগে বেগম খালেদা জিয়া উপ প্রেস সচিব ছিলেন। তিনি জাতিসংঘের কাছে সব সময় বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলছেন। আর এই কারণে তারাও উত্তর দিচ্ছেন। একজন বিদেশি সাংবাদিক আমাকে জানিয়েছেন বিএনপির ওই সাংবাদিক নাকি সব সাংবাদিকদেরকে বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারটি নিয়ে প্রশ্ন করতে। ওই বিদেশি সাংবাদিক তাকে বলেছেন আমি বাংলাদেশ এর চলমান অবস্থা সম্পর্কেতো কিছু জানি না। তাহলে আমি কি বলবো। ওই সাংবাদিককে তিনি বলেছেন, আপনি তুলবেন আর বাকিটা আমি আপনাকে বলবো। তার কারণেই বাংলাদেশের বিষয়টি প্রায় দিনই আলোচনা হচ্ছে। এটা কোন সমস্যা নয়।

তার মানে পুরো বিষয়টি একজন সাংবাদিকের কৃতিত্ব বলতে চাইছেন, আসলে বান কি মুনের কোন উদ্বেগ নেই?

তিনি বলেন, বান কি মুনের উদ্বেগ নেই সেটা আমি বলতে চাই না। কারণ তারও উদ্বেগ আছে। তিনি বাংলাদেশের চলমান অবস্থায় উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে এখন যে সহিংসতা চলছে এটা নিয়ে। এই সহিংসতা তিনি পছন্দ করছেন না। এটা বন্ধ হোক সেটাও চাইছেন। এই জন্য বলছেনও।

এটাতো বন্ধ হচ্ছে না, আপনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে তাদেরকে কেমন করে আশ্বস্ত করছেন?

তিনি বলেন, দেখুন আমি তাদেরকে এটাই বলার চেষ্টা করছি, বাংলাদেশে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সরকার সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণেও এসেছে। কিন্তু পুরোপুরি নয়। এখন বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ও নির্বাচনের সুষ্ঠু অবস্থা যারা আন্দোলন করছে তারা রাখছে না। এই কারণে তারা আন্দোলনে সফল হওয়ার জন্য সহিংসতা করছে।

বিএনপি করছে এটাতো প্রমাণ নেই, কারণ ঘটনা ঘটার পর বিএনপির নেতা কর্মী সমর্থকরা করছেন কিনা এটাতো প্রমাণিত নয়, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখনও পুরোপুরিভাবে প্রমাণ করে বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছেন না, যতক্ষন না পারছেন, তখনতো তা প্রমাণ হচ্ছে না, তাহলে প্রমাণ ছাড়া কেন বলছেন?

তিনি বলেন, দেখুন এটা তারাই করছে কারণ তারা হরতাল অবরোধ ডেকেছে। আর এই কারণেই এইসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। হরতাল অবরোধ না থাকলেতো এই সব ঘটনা হতো না। আজকে যদি এগুলো বন্ধ হয়ে যায় সব সহিংসতার ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে।

বিএনপি এই সব ঘটনা ঘটাচ্ছে না দাবি করছে সেই সঙ্গে তারা এটাও বলছে, সরকারের মদদেই এই সব ঘটনা ঘটছে, এই ব্যাপারে জাতিসংঘ কিছু বলে না?

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকারের মদদে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে এটা বিএনপি অভিযোগ করে। কিন্তু এটা জাতিসংঘ প্রশ্নও তুলে না। কারণ তারা জানে যে বাংলাদেশে এখন যে উন্নতি ধারা চলছে, সেই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে, সেই ভাবমূর্তি সরকার এই সব ঘটনা ঘটানোর জন্য কোন ধরনের ম“ দিবে না। কারণ সরকার এই সব ঘটনার ম“ দিলে সরকারেরই লোকসান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখেই সরকারকে এগুতে হবে।

তার মানে আপনি বলতে চাইছেন জাতিসংঘ সরকারের উপর পুরোপুরি আস্থা রেখেছে?

তিনি বলেন, তাতো রেখেছে। এটা তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যে চিঠি দিয়েছেন ওই চিঠিটি দেখলেই বুঝতে পারতেন। বান কি মুন প্রধানমন্ত্রীকে যে চিঠি দিয়েছেন সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। সরকারের উন্নয়নমূলক বেশ কয়েকটি কর্মকান্ডেরও প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশ রোল মডেল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাও বলেছেন। এছাড়াও আরো বেশ কিছু বিষয়েরও প্রশংসা করেছেন। এরপর তিনি তাকে তার নেতৃতেই ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। বেগম খালেদা জিয়াকেও তিনি সহিংসতা বন্ধ করার জন্য বলবেন সেটাও বলেছেন। তার চিঠিতে সরকারের উপর চাপ তৈরি হয় এমন কথা বলেননি।

আচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর চিঠি আসতে ওই সময়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল কেন?

তিনি বলেন, এটা অন্য একটি কারণ ছিল।

কি কারণ?

মোমেন বলেন, ওই চিঠিটি বান কি মুন যেদিন স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। আমরা পেয়েছি তার কয়েকদিন পর। এই কারণেই মনে হয়েছে দুই সপ্তাহ লেগেছে। আসলে জাতিসংঘ থেকে আমাদের দেরি করে দেওয়ার কারণে আমাদেরও বাংলাদেশে পাঠাতে দেরি হয়েছে। যদিও আমাদের ব্যাগে চিঠি দিলে সেটা অনেক সময় লেগে যায়। কারণ সেটা যেতেও দেরি হয়। তা প্রায় দুই সপ্তাহতো লাগেই। এই কারণেই এবার প্রধানমন্ত্রীর চিঠির উত্তর আমাদের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। সেটা দেওয়া হয়েছে অন্য মাধ্যমে। আমাদেরকে দিলে সেটাও পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ লাগতো।

আচ্ছা আপনি বলছিলেন, বান কি মুন বাংলাদেশের সংকট সমাধানের জন্য এগ্রিসিভ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, এই ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে বলবেন কি?

তিনি বলেন, বান কি মুন জাতিসংঘে চাকরি করেন। জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ এর সদস্য। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থে এটি পরিচালিত হয়। সদস্য রাষ্ট্র দ্বারা মহাসচিব নিযুক্ত হন। সেই হিসাবে আমরা তাকে নিযুক্ত করেছি। তিনি একজন চাকরিজীবী। এই কারণে তিনি সদস্য রাষ্ট্রের ব্যাপারে একক সিদ্ধান্তে কোন কাজ করতে পারবেন না। বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারবেন, চিঠি দিতে পারবেন, অনুরোধ করতে পারেন আরো কিছু কিছু কাজ করতে পারেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের সংকট নিরসের জন্য কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা দুই দলের উপর চাপিয়ে দিতে পারবেন না। সেটা পারতে হলে তাকে অবশ্যই এই জন্য জেনারেল এ্যাসেম্বলি কিংবা সিকিউরিটি কাউন্সিল থেকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। সেই ধরনের কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। হওয়ার মতো কোন পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। এই কারণে বান কি মুন তার প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন তারানকোকে কিন্তু তিনি চাইলেই বাংলাদেশে গিয়ে এই ব্যাপারে জাতিসংঘের কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কোন চাপ তৈরি করতে পারবেন না।

আপনার কি মনে হয়, জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংকট নিরসনের জন্য কতদূর অগ্রসর হতে পারে?

তিনি বলেন, বান কি মুন, অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো চেষ্টা করবেন যাতে করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। নির্বাচন আগামীতে যখনই হোক এই জন্য একটি সুস্থ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়। সেই জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি দিতে পারেন, চিঠি লিখতে পারেন, ফোন করতে পারেন। আর এরপরও যদি কোন কাজ না হয় সেই ক্ষেত্রে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে সেখানেও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে সেটা সবাইকে নিয়ে তাদের আলোচনা করতে হবে। কিন্তু তিনি সেটা করবেন কিনা এটা এখনও বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমি এটাই বলতে চাই আসলে জাতিসংঘ বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে যত কথা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আমরা দেখছি। এটা এখানে নেই। আসলে বাংলাদেশের সমস্যা বাংলাদেশকেই সমাধান করতে হবে। সেখানে জাতিসংঘ উদ্যোগ নিলেও তা হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ সরকার চাইছে অভ্যন্তরীণ সমস্যা অভ্যন্তরীণভাবেই সমাধান করতে। বিদেশি কোন সহায়তা নিবে না।  সূত্র: আমাদের সময়.কম

You Might Also Like