সাধক ফকির লালন শাহের ধাম, উপলব্ধি ও গণসংগীত

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামানিক

বিদগ্ধ ও পণ্ডিতজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে চাই আগেই। তাদের মতো লালন বিষয়ে পড়াশোনা, তত্ত্বতালাশ এবং সাঁইজীর জন্ম-মৃত্যু, জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে গবেষণা আমার নেই। সাঁইজীর পড়শী হিসেবে তাঁর ধামে আসা-যাওয়া থেকে যা শুনেছি-দেখেছি তা নিয়েই আমার এ লেখা। কুষ্টিয়া শহরের অদূরে ছেঁউড়িয়া একটি ছায়াঘেরা নিবিড় গ্রাম। একপাশে গড়াই অন্য পাশে কালিগঙ্গা দু’টি বহমান নদী। আজ থেকে প্রায় দুইশত কুড়ি বছর আগের একদিন ভোরবেলা ষোল-সতের বছর বয়সের অচেতন লালন ভাসতে ভাসতে কালিগঙ্গা নদীর তীরে এসে ভিড়ল। ছেঁউড়িয়া গ্রামের মওলানা মলম কারিকর নামাজি লোক। সেদিন ভোরবেলা মওলানা মলম ফজরের নামাজ পরে কালিগঙ্গা নদীর দিকে হাওয়া খেতে আসলেন, হঠাৎই দেখতে পেলেন এক অচেনা সংজ্ঞাহীন যুবক অর্ধজলমগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে, ছেলেটির মুখে ও শরীরে বসন্ত রোগের দাগ বিদ্যমান। তিনি কাছে গিয়ে দেখলেন ছেলেটি বেঁচে আছে, খুব ধীরলয়ে চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। নিঃসন্তান হাফেজ মলমের বুকের ভেতর হু হু করে উঠল, এ কোনো অচেনা যুবক নয়; খোদা যেন তাঁর সন্তানকেই ভাসিয়ে এনেছেন তাঁর কাছে। মলম তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরলেন এবং তাঁর অপর তিন ভাইকে সাথে নিয়ে আসলেন। এবার চার ভাইয়ে ধরাধরি করে অচেনা যুবককে নিজের বাড়িতে আনলেন। মলম ও তার স্ত্রী মতিজান দিনরাত সেবা-যতœ করতে লাগলেন। দিনে দিনে অচেনা যুবকটির মুখে জীবনের আলো ফিরে এলো। মতিজান জিজ্ঞাসা করল বাবা তোমার নাম কী? ………ফকির লালন।

আমৃত্যু ফকির লালন ছেঁউড়িয়াতেই ছিলেন, মৃত্যুর পর ছেঁউড়িয়ার আঁখড়াবাড়িতেই তার সমাধি নির্মিত হয়। ছেঁউড়িয়া ভিত্তিক লালনের জীবন বৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে খুঁজে পাওয়া যায় ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহের সম্পাদিত লালন সংগীত নামক গ্রন্থে। লালন কোথায় ছিল, কিভাবে কালিগঙ্গা দিয়ে ভেসে আসলো এসব বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া যায় তা সর্বজনগ্রাহ্য নয়। কথিত আছে গঙ্গা স্নান সেরে ফেরার পথে লালন বসন্ত রোগে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। রোগের প্রকোপে অচেতন হয়ে পড়লে সঙ্গীসাথীরা তাঁকে মৃত মনে করে রোগ সংক্রমণের ভয়ে তাড়াতাড়ি মুখাগ্নি করে নদীতে ফেলে দেয়।

লালনের জন্ম আসলে কোথায় তা আজো নিশ্চিত করে বলা যায়না। কোন কোন লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। এই মতের সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন এই বলে যে, ছেঁউড়িয়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের ভাড়ারা গ্রামের ষোল-সতের বছরের একটি যুবক নিখোঁজ হলো অথচ তার দীর্ঘ জীবদ্দশায় তাঁকে তার কোন আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতন জন কেউ চিহ্নিত করতে পারলোনা-তা এক বিস্ময়কর ব্যপার। ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মাদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামের মুসলিম পরিবারে বলে উল্লে¬খ করা হয়। অন্যদিকে পানজু শাহের ছেলে খোন্দকার রফিউদ্দিন তাঁর ভাবসংগীত নামক গ্রন্থে ফকির লালনের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন ফকির লালন শাহের জন্মভূমি যশোর জেলার হরিণাকুন্ডু থানার অধীন হরিশপুর গ্রামেই ছিল, ইহাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। লালনের জন্ম স্থান সম্পর্কে লালন গবেষক ড. আনোয়ারুল করিমের ধারণাটি ছিলো অনবদ্য,

“আমি দীর্ঘ ১০ বছর লালন ফকিরের জীবনী সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান করে বেড়িয়েছি।

কিন্তু তাঁর জাতিত্ব পরিচয় রহস্যময়। আসলে লালন নিজও তাঁর জন্ম পরিচয় প্রদান করতে উৎসাহবোধ করেননি, তা তাঁর গানেই স্পষ্টমান-

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

লালন কয় জাতের কিরূপ

দেখলাম না এই নজরে।।

সত্যিই তাই, জাতপাতের উর্দ্ধে উঠে লালন নিজেকে শুধুই মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে গেছেন।

লালন হিন্দু কি মুসলমান এ নিয়েও বিস্তর মতামত পাওয়া যায়। কারো মতে লালন কায়স্থ পরিবারের সন্তান যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী; পরে লালন ধর্মান্তরিত হন। গবেষকদের মতে বেশির ভাগই মনে করেন লালন মুসলিম পরিবারের সন্তান। লালন ফকির নিজের জাত পরিচয় দিয়ে গিয়ে বলেছেনÑ

সব লোকে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে।

কারে বা কী বলি আমি

দিশে না মেলে।।

লালন মুখে মুখেই গানের পদ রচনা করতেন। তাঁর মনে নতুন গান উদয় হলে তিনি শিষ্যদের ডেকে বলতেন, ‘পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে’। লালন গেয়ে শোনাতেন, ফকির মানিক ও মনিরুদ্দিন শাহ সেই বাঁধা গান লিখে নিতেন। লালনের জীবদ্দশাতেই তাঁর গান বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। ফকির মানিক শাহ সেই সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ গায়ক ছিলেন। লালনের শিষ্যদের ধারণা তার গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশী। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এতো বিপুল সংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায় লালনের কোন কোন শিষ্যের মৃত্যুর পর গানের খাতা তাদের কবরে পুঁতে দেয়া হয়। এছাড়াও অনেক ভক্ত গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি।

ছেঁউড়িয়ায় কয়েক বছর থাকার পর লাল তাঁর শিষ্যদের ডেকে বললেন, আমি কয়েক দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি তোমরা আমার সাধনকক্ষটার দেখাশুনা করো। সপ্তাহ তিনেক পর তিনি একটি অল্পবয়স্কা সুশ্রী যুবতিকে নিয়ে ফিরলেন । মতিজান ফকিরানী জিজ্ঞাসা করলেন, মেয়েটা কে বাবা?

Ñতোমাদের গুরুমা। একথা শোনার পর আঁখড়াবাড়ির সকলেই গুরুমাকে ভক্তি করলেন। বিশখা নামের এই মেয়েটি সারাজীবন লালনের সাথে ছিলেন। লালনের মৃত্যুর তিনমাস পর সেও মারা যান। বিশখা ফকিরানী প্রায় একশো বছর ধরে ছেঁউড়িয়ায় ছিলেন কিন্তু তাঁর প্রকৃত নাম পরিচয় জানা যায়নি। এমনকি মৃত্যুর পরও তার কোন আত্মীয় বা পরিচিতজনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অচিন মানুষ ফকির লালনের মতোই বিশখা ফকিরানী আজো এক অচিন নারী।

ফকির লালনকে নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। একবার লালন তাঁর শিষ্যদের নিয়ে গঙ্গানদী পার হয়ে নবদ্বীপ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূর ধামে পৌঁছালেন। মন্দিরের লোকজন আগন্তকদের বেশভূষা দেখে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো, লালন শিষ্য শীতল শাহ বললো আমরা কুষ্টিয়া থেকে এসেছি, সকলেই ফকির মতবাদের সাধক। তখন মহাপ্রভূর কাছে গিয়ে বলা হলো যে কুষ্টিয়া থেকে কিছু সংখ্যক ফকির এসেছে যাদের বেশির ভাগ মুসলমান। মহাপ্রভূ সবশুনে তাদের বসার ব্যবস্থা করতে বললেন। আঙিনার একপাশে বড় নিমগাছের তলায় তাদের জায়গা করে দেয়া হলো। সারারাতের অনুষ্ঠান শেষে সাধুগুরু এবং বোষ্টমিদের সেবা দেয়ার পর যুবকরা পিতলের থালায় করে সোয়াসের চুন নিয়ে এলো এবং সবাইকে বলা হলো পাতুন, মহাপ্রভূর প্রসাদ গ্রহণ করুন। চুনে মুখ পুড়ে যাবে এই ভয়ে শিষ্যরা কেউ হাত পাতলো না। বরং একযোগে ক্ষমা চাইলো। যুবকেরা বলল- আপনারা কেমন সাধু! চুনে মুখ পুড়ে যাবার ভয়ে কেউ হাত পাতলেন না। প্রকৃত সাধুদের তো মুখ পোড়ার কথা নয়! লালন এক কোণায় বসেছিলেন, যুবকদের এই কথা শুনে বলল-

তোমরা কি চাও?

-তোমরা কেমন সাধু হয়েছো তা দেখতে চাই।

লালন যুবকদের কলার পাতা এবং একটি চাড়ি আনতে বলল। অতঃপর তিনি খানিক চুন কলার পাতা রেখে বাকি চুন চাড়ি ভর্তি পানিতে গুলিয়ে দিলেন। এবার তিনি নিজেই কলারপাতার চুনগুলো খেয়ে ফেললেন এবং শিষ্যদের চাড়ি থেকে গ্লাসে করে চুনগোলানো শরবত খাওয়ালেন। তাঁরা সকলেই শরবত পানের তৃপ্তি লাভ করলো। এই শরবত পান চুন সেবা নামে পরিচিত।

লালন ঘোড়ায় চড়তেন, মাঝে মাঝে গভীর রাতে চাঁদের আলোতে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন, কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন তা তাঁর শিষ্যরা কেউ বলতে পারতোনা।

লালন একাডেমির খাদেমকে লালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় আমার দাদাগুরু ভোলাই শাহের কাছে শুনেছি লালন রাতের বেলায় দুধ দিয়ে খই ভিন্ন অন্য কোন খাদ্য খেতেন না। প্রায় সারারাত জেকের আসকার ও এবাদত করতেন, একটু পর পর পান খেতেন। তখন আঁখড়াবাড়িতে পানের বরজ এবং অনেক ঝোপজংগল ছিলো। ভক্তরা ভারতের গয়া থেকে ফকির লালনের জন্য চুন নিয়ে আসতে, সেই চুনে তিনি পান খেতেন। এই প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান যে, নবদ্বীপ থেকে এখনো কিছু কিছু লালনভক্ত আঁখড়ায় আসে, তাদের কাছে সে শুনেছে যে নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ধামে লালন ও তাঁর শিষ্যদের যে চুনসেবা দেয়া হয়েছিলো সেই চুনসেবায় লালনের যে আসন পাতা ছিলো তা এখনো সংরক্ষিত আছে। ওই খাদেমের ধারণা, হয়তো দোল পূর্ণিমার তিথিতে জন্ম গ্রহন করেছিলেন বলেই লালন তাঁর জীবদ্দশায় ফাগুন মাসের দোল পূর্ণিমার রাতে খোলা মাঠে শিষ্যদের নিয়ে সারারাত ধরে গান বাজনা করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো লালন একাডেমি প্রতি বছর ফাগুন মাসের দোল পূর্ণিমার রাতে তিনদিন ব্যাপী লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করে থাকে। লালন চত্বর ছাড়াও আঁখড়ার অভ্যন্তরভাগসহ সর্বত্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার বাউলরা ছোট ছোট দলে সারারাত ধরে গান করে। এছাড়াও প্রতি বছর ১লা কার্তিকে লালনের মৃত্যু দিবস উপলক্ষে অনুরুপ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশ বিদেশের হাজার হাজার বাউল যোগ দেয় সেই উৎসবে, দোল পূর্ণিমার জোসনায় বাউলরা আকাশের দিকে হাত তুলে গান ধরে………..

এলাহি আল আমিনগো আল্ল¬াহ বাদশা আলমপানা তুমি।

ডুবাইয়ে ভাসাইতে পারো, ভাসাইয়ে কিনার দাও কারোও

রাখো মারো হাত তোমার, তাইতো তোমায় ডাকি আমি। ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে লালনের যথেষ্ঠ সখ্যতা ও ভাববিনিময় ছিলো। জমিদারীর তাগিদেই রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের কুঠিবাড়ীতে থাকতেন, পদ্মার পাড়ের নির্জনতায় বসে কাব্য রচনা করতেন। ফকির লালনের সাথে যখন তাঁর পরিচয় ঘটে তখন তিনি বয়সে তরুণ। তিনি একবার লালনের আঁখড়ায় এসেছিলেন, গভীর অথচ সহজ ভাষায় বাধাঁ লালনের গান তাঁকে মুগ্ধ করেছিলো, সেই থেকেই তাদের মধ্যে ভাবের লেনদেন। রবীন্দ্রনাথ কোথাও যেতে হলে পালকি ব্যবহার করতেন, লালন ফকির ঘোড়ায় চড়তেন। লালন ফকির ঘোড়ায় চড়েই কুঠিবাড়িতে দু’একবার এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝেই তাঁর বোট নিয়ে পদ্মায় ঘুরে বেড়াতেন। রবীন্দ্রনাথের সেজদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বোটে বসা ভ্রমণরত ফকির লালনের একটি স্কেচ এঁকে ফেলেন যার একটি কপি এখনো লালন একাডেমির মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।

লালন ফকির ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে যে গভীর ভাববিনিময় ছিল তার একটি তথ্যবহুল বিবরণ পাওয়া যায় ড. আবুল আহসান চৌধুরী রচিত ‘লালন সাঁইয়ের সন্ধানে’ নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে। লালনের গান রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিলো তা কাঁর কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায়।

তরুণ যৌবনের বাউল

সুর বেঁধে নিলো আপন একতারাতে

ডেকে বেড়ালো

নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে

অনির্দেশ্য বেদনার খেপা সুরে।

লালন দর্শনের একটি অন্যতম দিক হলো গুরুবাদ। গুরুর প্রতি ভক্তি নিষ্ঠাই হলো তাদের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ধ্যান ছাড়া যেমন গুরকে ধারণ করা যায় না তেমন গুরুর প্রতি অসামান্য ভক্তি ছাড়া অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয় না। মানুষের প্রতি ভালবাসা, জীবে দয়া, সত্য কথা, সৎ কর্ম, সৎ উদ্দেশ্য- এই হলো গুরুবাদী মানব ধর্মের মূল কথা। মূলত ভক্তিই মুক্তিÑ

ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।

সর্ব সাধন সিদ্ধ  হয় তার।।

যারা হাওয়ার সাধনা করে তারাই মূলত বাউল, তাদের মতে সাধনার চারটি স্তর আছেÑ স্থুল, প্রবর্ত, সাধক ও সিদ্ধ। প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা হলো স্থূল, দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবর্ত, তৃতীয় পর্যায়ে সাধক এবং চতুর্থ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের শিক্ষা হলো সিদ্ধ। লালনের গানেও দেখা যায় সেই ভাবদর্শনÑ

ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে।

সেকি সামান্য চোরা

ধরবি কোণা কানচীতে।।

লালন তাঁর অসংখ্য গানের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন, তার গানে ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ

আপনার আপনি চেনা যদি যায়।

তবে তারে চিনতে পারি

সেই পরিচয়।।

লালনের ভাবশিষ্যরা বিশ্বাস করে যে, শারীরিক প্রেম ভালবাসার মধ্যে প্রকৃত শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তি আছে স্বর্গীয় ভালোবাসায়। গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর সাধনার বিশেষ স্তরে পৌঁছুলেই কেবল শিষ্যকে খেলাফত প্রদান করা যায়। লালনের অনুসারীরা বিবাহ এবং স্ত্রী সম্ভোগ করতে পারে কিন্তু তাদের বিশ্বাস সন্তান উৎপাদনের ফলে আত্মা খন্ডিত হয়, আর খন্ডিত আত্মা নিয়ে খোদার নৈকট্য লাভ করা যায় না। সেই কারণেই তারা সন্তান উৎপাদন থেকে বিরত থাকেন। তাছাড়া সন্তান উৎপাদনকে তারা বেদনাদায়ক বোঝা হিসেবেও বিবেচিত করে। খেলাফতের ধারণাটি ইসলামী সুফিজম থেকে এসেছে-যার মূলকথা আধ্যাত্বিক সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে খোদার নৈকট্য লাভ করা যায়। সুফিবাদে সাধনার দু’টি পর্যায় হলো বাকাবিল¬াহ এবং ফানাফিল¬াহ। বাকাবিল¬াহ মানে খোদার অপার ভালোবাসা, অন্যদিকে ফানাফিল¬াহ হলো আত্মার ভিতর খোদাকে ধারণ করা। বাকাবিল¬া ও ফানাফিল¬াহ অর্জন করার জন্য প্রয়োজন আত্মার পরিশুদ্ধ। খেলাফত অর্জনের পর একজন সাধক সকল পার্থিব বিষয় থেকে নির্মোহ হয়ে উঠেন। পুরুষেরা সাদা আলখেল¬া এবং সাদা লুঙ্গি পরে অন্যদিকে মেয়েরা সাদা শাড়ী পরে, যাকে তারা বলে খিলকা। খিলকা হলো কাফন সদৃশ পোষাক-তাদের ভাষায় জিন্দাদেহে মুর্দার পোষাক। খেলাফত প্রদানের সময় খেলাফত গ্রহণকারীকে চোখে সাদা কাপড় বেঁধে খিলকা গায়ে লালনের সামাধিকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। এ সময় তাঁরা লালনের একটি বিশেষ গান গাইতে থাকেÑ

কে তোমারে এ বেশ-ভূষণ পরাইল বল শুনি।

জিন্দাদেহে মুর্দার বেশ,

খিলকা তাজ আর ডোর কোপনী।।

লালন ফকিরের বসয় তখন ১১৬ বছর, একদিন তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, এই আশ্বিন মাসের শেষের দিকে তোমরা কোথাও যেওনা কারণ পহেলা কার্তিকে গজব হবে। গজবের বিষয়টি শিষ্যরা কেউ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারলেও আসন্ন বিপদের আশংকা করতে লাগলো। মৃত্যুর প্রায় একমাস আগে তার পেটের ব্যারাম হয়, হাত পায়ের গ্রন্থিতে পানি জমে। পীড়িতকালেও তিনি পরমেশ্বরের নাম সাধন করতেন, মধ্যে মধ্যে গানে উন্মত্ত হতেন। ধর্মের আলাপ পেলে নববলে বলিয়ান হয়ে রোগের যাতনা ভুলে যেতেন। এসময় দুধ ভিন্ন অন্য কিছু খেতেন না তবে ইলিশ মাছ খেতে চাইলে শিষ্যরা বাজার থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে আসে। দুপুরে সাধন ঘরের সামনে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়। বিকেল থেকে শুরু করে সারারাত লালন তাঁর শিষ্যদের শ্বাশ্বত বাণী শোনা, মাঝে মাঝে গাওয়া হয় তাঁর গান। রাতে আলোচনা শেষ করে লালন সাধন ঘরে ফিরে গেলেন বিশ্রাম নিতে। শিষ্যদের বললেন, আমি চললাম। লালন চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিলেন, শিষ্যরা মেঝেতে বসে থাকলেন। এক সময় লালন কপালের চাদর সরিয়ে বললেন, তোমাদের আমি শেষ গান শোনাবো। লালন গান ধরলেন, গভীর অপরূপ সুন্দর গানÑ

পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে।

ক্ষম হে অপরাধ আমার

এই ভবকারাগারে।

গান শেষ হলো, চাদর মুড়ি দিয়ে চিরদিনের জন্য নিরব হয়ে গেলেন ফকির লালন। ফকির লালনের জন্ম সাল জানা যায়নি, তিনি ১লা কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে মারা যান এবং তিনি বেঁচে ছিলেন ১১৬ বছর। সেই হিসেবে তিনি জন্মে ছিলেন ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে। ছেঁউড়িয়াতে ফকির লালনের সাথে তাঁর পালিত মা মতিজান ফকিরানী, পালিত বাবা মলম শাহ, ফকির মন্ডিত মানিক শাহ, শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, বিশখা ফকিরানী এবং ফকির মনিরুদ্দিন শাহসহ অন্যান্য আরো অনেক ভাবশিষ্যের সমাধি আছে। প্রতি বছর ১লা কার্তিক এখানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার বাউল সমবেত হয়ে উদযাপন করে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।

লালনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ৩১ অক্টোবর কুষ্টিয়ার রাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত কাঙাল হরিণাথ মজুমদারের সম্পাদনায় পাক্ষিক হিতকারী পত্রিকায় ‘মহাত্মা লালন ফকির’ শিরোনামে একটি বস্তুনিষ্ঠ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটি পাঠ করলে লালন ও তাঁর শিষ্যদের জীবনধারার একটি পরিস্কার বর্ণনা পাওয়া যায়। নিবন্ধকার লিখেছেন, ফকির লালনের নাম এ অঞ্চলে কাহারো শুনিতে বাকি নাই। ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি, আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি। শুনতে পাই বঙ্গদেশ জুড়ে ইহার শিষ্য দশ হাজারের উপর। কুষ্টিয়ার অনতিদূরে কালিগঙ্গার ধারে ছেঁউড়িয়া গ্রামে ইহার একটি সুন্দর আঁখড়া আছে। আঁখড়ায় ১৫/১৬ জনের অধিক শিষ্য নাই। শিষ্যদের মধ্যে শীতল ও ভোলাই নামক দুইজনকে ইনি ঔরশজাত পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতেন, অন্যান্য শিষ্যগণকে তিনি কম ভালোবাসিতেন না। আঁখড়ায় ইনি সস্ত্রীক বাস করিতেন, সম্প্রদায়ের ধর্ম মতানুসারে ইহার কোন সন্তানসন্ততি হয় নাই। শিষ্যগণের মধ্যেও অনেকের স্ত্রী আছে, কিন্তু সন্তান হয় নাই। সম্প্রতি সাধুসেবা বলিয়া এই মতের এক নতুন সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইয়াছে। সাধুসেবা ও বাউলের দলে যে কলঙ্ক দেখিতে পাই, লালনের সে প্রকার কিছু নাই। লালন সকল নীচ কার্য হইতে দূরে ছিলেন ও ধর্ম জীবনে বিলক্ষণ উচ্চ ছিলেন বলিয়া বোধ হয়। মিথ্যা জুয়াচুরিকে লালন ফকির বড়ই ঘৃণা করিতেন। নিজে লেখাপড়া জানিতেন না. কিন্তু তাহার রচিত অসংখ্য গান শুনলে তাহাকে পরম পন্ডিত বলিয়া বোধ হয়।

ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। শিষ্যরা হয়তো তাঁহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞাত বসতঃ কিছুই বলিতে পারে না। ইহার মুখে বসন্ত রোগের দাগ বিদ্যমান ছিল।

লেখক: সাংবাদিক, লালন গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী  seraj.pramanik@gmail.com

You Might Also Like