জনগণের মুরোদ অপরিসীম

দ্রুত একটি অবাধ নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। সে অবরোধ চলছে। এর মধ্যে কয়েক দফা হরতালও পালিত হয়েছে। সরকারের মদদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শুরু করেছে। কখনো এমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে যে সরকার পরিচালনা কে করছে, র‌্যাব পুলিশ বিজিবি, নাকি বেসামরিক কোনো প্রশাসন? ঢাকার সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সন্দেহ নেই, অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করার সঠিক পথ গণতন্ত্রের চর্চা। সে পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। বিগত ৪৬ দিন ধরে যে অবরোধ চলছে তাতে ২০ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতাকে। বিভিন্ন মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। আর সরকারের বাগাড়ম্বরপ্রিয় নেতারা অবিরাম হুমকি দিচ্ছেন যে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবিকে নির্বিচারে হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। তার দায় নিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। ফলে ক্রসফায়ারের নামে প্রতিদিনই বিনাবিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অনেক তরুণ যুবককে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে পুলিশ অকারণেই পায়ে গুলি করে তাদের চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। নির্বিচারে চলছে গ্রেফতার বাণিজ্য। টাকা না দিলে ক্রসফায়ার। টাকা দিলে ৫৪ ধারা। জেলহাজতের সামনে প্রতিদিন শত শত উদ্বিগ্ন অভিভাবক ধরনা দিচ্ছেন। হয়তো তাদের নিখোঁজ সন্তানদের আদালতে হাজির করা হবে। মর্গে একটি লাশের খবর পাওয়া গেলে শত শত মানুষ ভিড় করছে। হয়তো তাদের কোনো স্বজনের লাশ। অর্থাৎ শত শত মানুষ গুম আছে।

খালেদা জিয়া কার্যত তার কার্যালয়ে স্টাফসহ বন্দী হয়ে আছেন। প্রায় ১০ দিন ধরে ওই কার্যালয়ে কোনো খাদ্য প্রবেশ করতে দিচ্ছে না সরকার। এর আগে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, ডিস কানেকশন কেটে দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ পুনরায় চালু হলেও অন্যসব সেবা বন্ধই রয়েছে যেন সরকার বেগম খালেদা জিয়া ও তার স্টাফদের ভাতে পানিতে মারতে চাইছে।

দেশব্যাপী যে অবরোধ চলছে তাতে কার্যত কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছে না। সে কর্মসূচি জনগণ নিজস্ব উদ্যোগের বাস্তবায়ন করছে। সরকারি দলের লোকদের টিটকারি দিতে শুনেছি যে, ২০ দলীয় জোট আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে ঘরে বসে থাকছে, রাস্তায় নামছে না। রাস্তায় নামবে কী, সবাই তো কারাগারে। আর রাস্তায় নামা তো দূরের কথা, কাউকে কোথায়ও দেখা গেলেই গ্রেফতার করে ফেলা হচ্ছে। তারপরও হরতাল-অবরোধ পালিত হচ্ছে। প্রথম দিকে সরকারের লোকদের হুমকি শুনছিলাম যে, বিএনপির আন্দোলনের কোনো মুরোদই নেই। তারপরও যখন কর্মসূচি চলতে থাকল তখন এলো, পেট্রলবোমা কালচার। পেট্রলবোমা ভয়াবহ নাশকতা, সন্দেহ নেই। তাতে সীমাহীন মানবিক বিপর্যয়ও ঘটেছে। পুড়ে মারা গেছে মানুষ। দগ্ধ হয়ে হাসপাতাল বেডে এখনো কাতরাচ্ছে মানুষ।

প্রথম দিন থেকেই সরকার হল্লাচিল্লা শুরু করে, এই পেট্রলবোমা মারছে আন্দোলনকারী ২০ দলীয় জোট। জোট ধারাবাহিকভাবেই তা অস্বীকার করে আসছে। পেট্রলবোমা হামলার দায় যদি ২০ দলীয় জোটের ওপর চাপানো যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবে মানুষ জোটের আন্দোলনের ওপর ভীত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ পেট্রলবোমা মেরে আন্দোলনকারীদের কোনো লাভ নেই। লাভ সরকার দলেরই। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তা প্রমাণিত হলো। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী সব নেতা একসাথে বার্ন ইউনিট বার্ন ইউনিট বলে হল্লা করতে শুরু করলেন। প্রধানমন্ত্রী বার্ন ইউনিটে গিয়ে অঝোরে কাঁদলেনও। সে বড় প্যাথেটিক দৃশ্য!

কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যে প্রমাণিত হতে শুরু করল যে, পেট্রলবোমা তৈরির কারখানা বসেছে আওয়ামী লীগ অফিসে, আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে। পেট্রলবোমা ছুড়তে গিয়ে আহত হতে থাকল আওয়ামী লীগের কর্মীরা। আটক হলো শত শত আওয়ামী লীগ কর্মী। আর তাদের ছাড়িয়ে নিতে আওয়ামী এমপি-নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ওই বোমাবাজদের ‘সৎ ও মেধাবী’ বলে সার্টিফিকেট দিতে থাকলেন, যাতে পুলিশ কিংবা আদালত তাদের ছেড়ে দেয়। এর মধ্যেই আওয়ামী চোঙ্গাবাজেরা সমস্বরে চেঁচিয়ে ‘ওরা পুড়িয়ে মানুষ মারে’ এমন একটা সেøাগান চালু করে ফেলল। আর আলোচনা বা সংলাপের প্রশ্ন উঠলেই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে হাইব্রিড নেতারা পর্যন্ত বলতে থাকলেন, কাদের সাথে আলোচনা করব, খুনিদের সাথে? যারা পুড়িয়ে মানুষ মারে তাদের সাথে? ক্রমেই জনমনে বিভ্রান্তি দূর হতে থাকল। তারা প্রায় নিশ্চিত হলো যে, পেট্রলবোমা হামলার জন্যও সরকারই দায়ী।

বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকারের তরফ থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হলেও দেখা গেল দেশব্যাপী তাদের আন্দোলন ক্রমেই আরো গতিময় হয়ে উঠছে। নেতা নেই। জনতাই সরকারকে রুখে দেয়। সংগ্রামে নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। এই সরকার প্রথম থেকেই জনগণকে ভয় পেয়ে আসছে। তাদের কুকীর্তি, তারা সরকারেই থাকুক বা বিরোধী দলেই থাকুক ত্রাস সৃষ্টি ও বলপ্রয়োগ তাদের বৈশিষ্ট্য। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুুষ মারা, হরতাল-প্রতিরোধের নামে কুপিয়ে বিশ্বজিৎসহ আরো অনেক নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হত্যা, মানুষকে প্রকাশ্যে দিগম্বর করা, এসবই আওয়ামী চরিত্র। সরকারের সব কর্মকাণ্ড ওই জনগণের বিরুদ্ধেই। ফলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনগণ।

জনগণকে ভয় পায় বলেই তারা করেছে একদলীয় নির্বাচনী প্রহসন। পৃথিবীর কোথায়ও সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। দেশের মানুষসহ সারা বিশ্ব দাবি করেছে অবিলম্বে আরো একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা হোক। এসব চাপের মুখে প্রথম দিকে সরকার অবশ্য বলেছিল, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন। শিগগিরই আরো একটি নির্বাচন দেয়া হবে। এখন বলছে, ২০১৯ সালের নির্ধারিত তারিখের এক দিন আগেও নির্বাচন হবে না। শুধু কি তাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক প্রধানও বলে বসলেন যে, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না। সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না যে, কী দানবকে প্রশ্রয় দিয়ে কাঁধে তুলছে তারা। এসব বাহিনী যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে এখন গ্রামে গঞ্জে গভীর রাতে হানা দিয়ে গ্রামের বাড়িঘর তছনছ করছে। সাধারণ মানুষকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ আইলাপুর ইউনিয়নের কয়েকটি বাড়িতে যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় পুরুষ না পেয়ে নারীদেরই ব্যাপক মারধর করেছে। যৌথবাহিনীর পিটুনিতে অন্তঃসত্ত্বা ও সত্তরোর্ধ্ব মহিলাদেরও বেধড়ক পিটিয়েছে। কিন্তু এ দানবদের দায়মুক্তি দিয়ে রাখা হয়েছে। সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না যে, এ দানবই একদিন তাদের ঘাড় মটকাবে। অতএব সরকার নির্বাচিতও নয়, জনপ্রতিনিধিত্বশীলও নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বড় দুই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে সব সময় সাধারণ মানুুষ বলি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। পক্ষান্তরে পুলিশ অন্যায়ভাবে যাকে খুশি তাকে গ্রেফতার করে, গুলি করে মারছে। আমরা সব হত্যাকাণ্ডেরই তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা দেখেছি, বার্ন ইউনিটে মমতাময়ী মায়ের কান্না। আমার প্রশ্ন পুলিশ যখন সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে নির্বিচারে হত্যা করছে, তখন সেই মমতাময়ীর কান্না কোথায় থাকে?’

এই প্রশ্ন গোটা দেশবাসীর। এক দিকে সরকার বার্ন ইউনিটের কথা বললেও টুঁ শব্দটিও করছে না নির্বিচার খুন গুমের বিরুদ্ধে। ক্রসফায়ারের নামে যখন বিনাবিচারে খুন, গুম কি হত্যাকাণ্ড নয়? পেট্রলবোমা মেরে যারা মানুষ হত্যা করে তারাও খুনি। ক্রসফায়ারের নামে বিনাবিচারে যারা মানুষ খুন করে তারাও খুনি। সরকার যে ২০ দলীয় জোটকে খুনি অভিহিত করে তাদের সাথে আলোচনায় বসতে অস্বীকার করছে, আসলেই কি তাই? সরকারের পত্রপত্রিকাগুলোর রিপোর্ট তো বলছে অন্য কথা। উভয় পথেই হত্যা মানবাধিকারের চরম ব্যত্যয়। সব ক্ষেত্রেই আসল দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এমন মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে সরেজমিন অবহিত হওয়ার জন্য, ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অবসান এবং রাজনৈতিক সঙ্কটের সুরাহার পথ বের করতে ঢাকায় চার দিনের সফরে এসেছিল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার উপকমিটির একটি প্রতিনিধি দল। তারা সঙ্কট নিরসনে সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন। একই সাথে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দলটি ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈঠক করেছিল পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী মো: শাহরিয়ার আলমের সাথে।

বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ে ইইউ প্রতিনিধি দল কিছু না বললেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মানবাধিকার নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ জানায়নি প্রতিনিধিদল। তার এই বক্তব্যে ১৯ তারিখেই ওই প্রতিনিধিদল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আর সে কারণেই আমরা এ দেশ সফরে এসেছি। বৈঠকে গণগ্রেফতার নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ছাড়ার আগে তারা এক বিবৃতিতে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সুশীলসমাজের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অধিকারের বিনিময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাদের এই উদ্বেগ ইইউর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রতিমন্ত্রীর অসত্য বক্তব্য বাংলাদেশকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

এ দিকে বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট নিয়ে জাতিসঙ্ঘও তৎপর রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন। তা নিয়েও সরকারের তরফ থেকে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।

মিথ্যা বলা ও বাগাড়ম্বর এ সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কে যে কখন কোন কথা বলবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মাঝে মধ্যে শুনি দেশে কোনো হরতাল-অবরোধ কিছুই হচ্ছে না। গাড়ি-ঘোড়া চলছে। সারা দেশের দোকানপাট সব খোলা। সব কিছু স্বাভাবিক। সে পরিপ্রেক্ষিতে এক সহযোগী ‘সব যদি স্বাভাবিক হবে?’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। লেখাটি হুবহু তুলে দেয়া হলো।

“সময়ের ব্যবধান দু’ঘণ্টার মতো। দূরত্ব অবশ্য অনেক। ঢাকায় সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সিনিয়র মন্ত্রী আমির হোসেন আমু জানালেন, সব কিছুই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ঘণ্টা দুয়েক পর সিলেটে আরেক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানালেন, বুধবারের এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিরোধী জোটের হরতালের কারণেই এ পরীক্ষা পেছানো হয়। আমির হোসেন আমু ছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, দেশের সব কিছু স্বাভাবিক। কোথাও হরতাল হচ্ছে না।

কয় দিন ধরেই এ প্রচারণা চলছে, সব ঠিক আছে। কোথাও কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু এ নিয়ে অন্তত ১০টি প্রশ্ন উঠেছে

১. সব যদি স্বাভাবিক হবে তবে দফায় দফায় কেন এসএসসি পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে? সর্বশেষ আজকের এসএসসি পরীক্ষা কেন পেছানো হলো। ‘কোনো কারণ’ ছাড়াই কেন শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করা হচ্ছে? রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। রাজধানীর বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুক্র ও শনিবার ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। তা কেন?

২. বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় অভিমুখে প্রতিদিনই সরকারপন্থী বিভিন্ন সংগঠন যাত্রা করছে। খালেদা জিয়ার কাছে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন তারা। দেয়া হচ্ছে আলটিমেটাম। হরতাল-অবরোধ যদি না-ই হয় তবে তা প্রত্যাহারের দাবি উঠছে কেন?

৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবিতে সব ব্যবসায়ী সংগঠনই রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে হিসাব দিচ্ছেন তাদের কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ সত্ত্বেও কেন তারা তা করছেন?

৪. অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সোমবারও বলেছেন, টানা অবরোধের কারণে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। তারা পথে বসে গেছেন। মফস্বল এলাকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর আগেও তিনি বলেছিলেন, জেলা শহরগুলোর পরিস্থিতি মারাত্মক। কেন তিনি এসব কথা বলছেন?

৫. নিরপেক্ষ সূত্রগুলো দাবি করছে, মহাসড়কগুলোতে ২৫ ভাগের বেশি যানবাহন চলাচল করছে না। সরকারই রাত ৯টার পর গাড়ি না চালাতে পরিবহন মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সব কিছু যদি স্বাভাবিক হবে তবে মহাসড়কে কেন স্বাভাবিক যানবাহন চলছে না?

৬. বার্ন ইউনিটে মানুষের আর্তনাদ দেখে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই স্থির থাকতে পারছে না। কেন এখনো বার্ন ইউনিটে মানুষ আসছে। কেন পঙ্গু হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ মানুষের ভিড় বাড়ছে? কেন পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হচ্ছে মানুষ? কেন মারা যাচ্ছে তারা। কেন আগুন জ্বলছে বাসে। কেন ককটেল বিস্ফোরণ হচ্ছে যত্রতত্র। কেন ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে আদম সন্তান। কেন পায়ে গুলি করা হচ্ছে নিরীহ মানুষের।

৭. সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি কেন হরতাল-অবরোধে বিচারকার্যক্রমে অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। কেন বিঘœ ঘটছে বিচারকার্যক্রমে। কেন প্রতিদিন মিছিল হচ্ছে উচ্চ আদালতে।

৮. সরকারপ্রধানের তাগাদা দেয়ার পরও বেশির ভাগ সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় যাননি। কেন কয়েকটি জায়গায় তাদের সমাবেশ হামলার শিকার হয়েছে।

৯. কারাগারগুলো কেন বন্দীদের ভিড়ে ঠাসা? কেন ৪০ দিনে ১৪ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেন অভিযানের নামে মানুষের ঘরবাড়ি তছনছ করা হচ্ছে। কেন প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে মানুষ?

১০. কেন বহু মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে? কেন তারা দেশত্যাগের চেষ্টা করছে?”

আওয়ামী মন্ত্রী-নেতাদের ভাষায় ২০ দলের হয়তো ‘মুরোদ’ নেই। কিন্তু এই শিক্ষা তাদের হওয়া উচিত যে জনগণের মুরোদ অপরিসীম।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

You Might Also Like