তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও আলোচনা হতে পারে

বিরোধী দলের অবরোধ–হরতালের দেড় মাস পার হলো। জনজীবনে চরম উৎ​কণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উপায় নিয়ে বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন। সম্প্রতি তিনি দৈনিক প্রথম আলো’কে্ একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি এখানে হুবহু পুন:প্রকাশ করা হল।

প্রশ্ন : দেড় মাস ধরে অবরোধ চলছে। সংকট সমাধানের পথ কী?

খন্দকার মাহবুব হোসেন :সংকটের শুরু ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে। সরকার ১৫৩ জন সাংসদকে বিনা ভোটে নির্বাচিত করিয়ে এনেছে। বাকি আসনে যে নির্বাচন হয়েছে, তাতেও মানুষ ভোট দেয়নি। নির্বাচন কমিশন অন্যায়ভাবে ক্ষমতাসীন জোটকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন : তখন আপনারা এর আইনি প্রতিকার চাইলেন না কেন?

খন্দকার মাহবুব : সর্বক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও ভন্ডুল হয়ে গেছে। নিম্ন আদালত এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। নামমাত্র সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে নীতিমালা করা হয়নি। এ ব্যাপারে আগের একটি রুল ছিল, তাও মুলতবি রয়েছে।এ অবস্থায় মামলা করে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে বলে মনে হয় না। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।

প্রশ্ন : এক বছর তো আপনারা চুপচাপ ছিলেন। হঠাৎ​ লাগাতার কর্মসূচি কেন?

খন্দকার মাহবুব : বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। নির্বাচনের অব্যবহিত পর প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একাদশ সংসদ নির্বাচন করা হবে। বিরোধী জোট প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে এক বছর অপেক্ষা করেছে। এরপর তারা আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন জেলায় জনসভা করলেও সরকার তাতে ভ্রূক্ষেপ করেনি। বরং বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে, গ্রেপ্তার করে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোট ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জনসভার কর্মসূচি নিলেও তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। অথচ পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় সরকারি দল মিছিল-সমাবেশ করেছে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারির বাইরে গিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখার প্রকাশ্য হুংকার দিতে থাকে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলে। অন্যদিকে সরকার রাজনৈতিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে প্রচার চালাতে থাকে।

প্রশ্ন : বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কি নাশকতার ঘটনা ঘটছে না?

খন্দকার মাহবুব : ঘটছে। এগুলো বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা করছেন না। করছে দুর্বৃত্তরা। সরকার তাদের ধরুক। তাই বলে গয়রহ গ্রেপ্তার বা পাইকারি মামলা তো কোনো সমাধান দেবে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে না পারার কারণেই দেশে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ-হরতাল হচ্ছে এবং অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারকে স্বীকার করতে হবে আন্দোলনটি রাজনৈতিক। মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে লাভ নেই। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দেশের মানুষের সমর্থন আছে, তারা রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান দেখতে চায়। সরকার বৈধ বা অবেধ যাই-ই হোক না কেন, জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব তাদেরই। যেই মুহূর্তে সরকার জনগণের সম্মতিতে একটি সরকার গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসবে, সেই মুহূর্তে দেশে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করি।

প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি বিএনপির নেত্রী যে লাগাতার অবরোধের কর্মসূচি দিলেন, তা কি পরিকল্পিত ছিল? এ নিয়ে দলে বা জোটে আলাপ হয়েছিল?

খন্দকার মাহবুব : আমরা এক বছর ধরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করেছিলাম, সরকার সংলাপের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করবে, কিন্তু তারা তা করেনি। কর্মসূচির বিষয়ে আগেই আমাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছিল। প্রস্তুতি ছাড়া ঢাকা থেকে সারা বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতো না; ৪৭ দিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যেত না।

প্রশ্ন : যেকো​নো আন্দোলন ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হয়। কিন্তু এবার বিরোধী দলের কর্মসূচি হঠাৎ করেই কি দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি?

খন্দকার মাহবুব : সরকারের একগুঁয়েমির কারণেই এটি ঘটেছে। আমাদের দাবি ছিল, সংলাপে বসুন। সংলাপ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। অবরোধের পর হরতাল এল। কিন্তু সরকার অনমনীয়। তারা একটি ন্যায্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে চিহ্নিত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনারা এর দায় নিচ্ছেন না। কিন্তু যখন আপনাদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে, তখন কি সেটি প্রত্যাহার করা উচিত নয়?

খন্দকার মাহবুব : সরকার যে মুহূর্তে সংলাপে রাজি হবে, সেই মুহূর্তে এসব সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার বলুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে। আপনারা আসুন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কীভাবে নির্বাচন হবে, নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে, সেসব নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত আছি, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে।

প্রশ্ন : আপনারা চাইছেন সরকারের পক্ষ থেকে আগে ঘোষণাটি আসুক, কিন্তু আপনারাও তো কর্মসূচি স্থগিত করে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে পারেন।

খন্দকার মাহবুব  : আমরা বারবার বলেছি, সাত দফা প্রস্তাবেও সংলাপে বসার কথা আছে। কিন্তু সরকার তো অনড় অবস্থানে। প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো আমাদের প্রস্তাব সুনির্দিষ্ট নয়। এরপর আমরা সাত দফা দিলাম। সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলেই আমরা কর্মসূচি বন্ধ রাখতে প্রস্তুত আছি। তখন দুর্বৃত্তরাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না।

প্রশ্ন : দুই পক্ষই যার যার জায়গায় অনড়। তাহলে সমাধানটি কীভাবে হবে? এই অবস্থা চলতে থাকবে?

খন্দকার মাহবুব :না, এভাবে চলতে পারবে না। এ জন্যই আমরা বলছি, সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার আমাদের অভিভাবক। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতি তথা জনগণের জানমাল রক্ষায় তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা বলছি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন।

প্রশ্ন : বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা উঠেছে। কেবল দেশের ভেতরে নয়, বাইরেও। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, নিউইয়র্ক টাইমসও বলেছে, বিএনপির উচিত জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

খন্দকার মাহবুব  : এই দলটি নিয়েই কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৫-৯৬ সালে আন্দোলন করেছে। ১৯৮৬ সালে একসঙ্গে তারা নির্বাচন করেছে। আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? আমরা বলেছি, তাদের সঙ্গে আমাদের ঐক্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা যখন জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তখন এসব কথা ওঠেনি কেন। জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল বলা হয়। অথচ দলটির ৬৫ শতাংশ নেতা-কর্মী বাংলাদেশ প্রজন্মের।

প্রশ্ন : বর্তমান সংবিধানে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই। আওয়ামী লীগ যদি সংবিধান পরিবর্তনে রাজি না হয়?

খন্দকার মাহবুব : সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। জনগণের কল্যাণের জন্যই সংবিধান। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছিল, সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে দেশে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে। তারা যেকোনো সময় সংবিধান পরিবর্তন করতে পারে। প্রয়োজনে গণভোটে দিতে পারে।

প্রশ্ন : বর্তমান সংবিধানের অধীনে কি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে?

খন্দকার মাহবুব  : সেটি আলোচনায় বসলেই একটা পথ বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সরকার তো আলোচনায়ই বসতে চাইছে না।

প্রশ্ন : কিন্তু ৫ জানুয়ারির আগে তো তারা আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন বিএনপি সাড়া দেয়নি।

খন্দকার মাহবুব :আমরা বলতে চাই, অতীত ভুলে যান। আওয়ামী লীগও ভুল করেছে। বিএনপিও ভুল করেছে। সরকারের কতটা জনসমর্থন আছে, তা পরীক্ষা করে দেখা হোক। জাপানে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল অভিযোগ আনায় প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে ফের ক্ষমতায় আসেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভয় পাচ্ছে কেন?

প্রথম আলো  : দৃশ্যত আমরা দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার লক্ষণ দেখছি না। পর্দার আড়ালে কিছু হচ্ছে কি?

খন্দকার মাহবুব  : আমি মনে করি জনস্বার্থে সরকারকে সংলাপে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি সরাসরি সংলাপে বসতে না চায়, তাহলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও আলোচনা হতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব আলোচনার কথা বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেছেন, তাঁরা সহায়তা করতে রাজি আছেন। আমি আশাবাদী এ কারণে যে, জনমতকে উপেক্ষা করে কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। বর্তমান সরকারও পারবে না।

প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।

খন্দকার মাহবুব : ধন্যবাদ।

You Might Also Like