তিস্তা বিষয়ে আস্থা রাখতে বললেন মমতা ব্যানার্জি

‘অনেকের মনে প্রশ্ন আছে তিস্তা নিয়ে। আমার ওপর আস্থা রাখুন। ভরসা রাখুন। আমাদের কিছু সমস্যা আছে। আপনাদেরও কিছু সমস্যা আছে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি হাসিনাদির সঙ্গে আলোচনা করব। সব বাধা ঘুচে যাবে।’

শুক্রবার রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশ এবং ভারতের ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে এ আশ্বাস দেন। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘বৈঠকি বাংলা’। এতে একটি কবিতাও আবৃত্তি করেন মমতা।

অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতায় ছিটমহল বিনিময় ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে জটিলতার দিকে ইঙ্গিত করে নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, দুই দেশের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ভুল বোঝাবুঝির অবসানে মমতার এই সফর ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশা করি। নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকেরও একই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আপনার মধ্য দিয়ে বাংলা খুঁজে পাই, বাঙালি খুঁজে পাই। আপনি রাজনৈতিক মতপার্থক্য ঘোচানোর চেষ্টা করবেন, আপনি সেতু হিসেবে কাজ করবেন। সবার বক্তব্যের পর জবাব দিতে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, নিশ্চয়ই রাখব। আমি সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখব। আমি অতি ক্ষুদ্র লোক, মাটির মানুষ। আমার দিক থেকে এলবিএর (স্থল সীমান্ত চুক্তি) প্রবলেম সলভ করে দিয়েছি। তিস্তায়ও আস্থা রাখুন।

মমতা ব্যানার্জি আস্থা রাখতে বললেও তার বিরোধিতার কারণেই ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হয়নি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সফরে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এই চুক্তিকে তিনি সমর্থন করতে পারেন না বলে জানান তখন। মনমোহনের ওই সফরে স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল সই হয়, যার মধ্য দিয়ে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের ১৬২ ছিটমহল বিনিময়ের পথ খোলে। কিন্তু এই প্রটোকল কার্যকর করতে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে থাকে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণেই। ভারতের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি বিষয় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করলে জট খোলার আশা তৈরি হয়। সম্প্রতি স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে মমতা সরকারের সায় পাওয়া যায়। বিষয়টি এখন ভারতের পার্লামেন্টে অনুমোদনের অপেক্ষায়। গত বছর শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে তিস্তা চুক্তি সইয়ের বিষয়েও জোর চেষ্টা চালানোর আশা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে মমতা ব্যানার্জি বলেন, আগেরবার আসতে পারিনি। অনেক বাধা ছিল। এবারও অনেক বাধা ছিল। ব্যাগ গোছানোর আগ পর্যন্ত বুঝতে পারছিলাম না আসতে পারব কিনা। চিন্তা ছিল। কিন্তু সব বাধা ভেঙে যেহেতু এসেছি, তখন সব বাধা ঘুচে যাবে। আজ থেকে এটা একটা নতুন সূত্রপাত। দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো জায়গায় চলে যাবে। মমতা বলেন, টিভি চ্যানেল নিয়ে একটি দাবি আছে। আমাদের দিক থেকে কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের (ভারত) এখানে চাইলে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো ব্যবসায়িকভাবে আসতে পারে। বৈঠকি বাংলা অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দুই দেশে প্রবহমান পদ্মা, মেঘনা, গঙ্গা, যমুনাকে ‘আমাদের সবার নদী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কেউ ভাগাভাগি করতে চাইলেও পারবে না।

Momota innerকলকাতার রাজারহাটে জমি দেবেন উল্লেখ করে মমতা ব্যানার্জি বলেন, আমরা চাই সেখানে বাংলাদেশ সরকার একটি ভবন করুক; যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থাকবে। তিনি বলেন, দুই দেশের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে অনেক জট রয়েছে। আমি সেগুলো খোলার চেষ্টা করছি। এই জট খুলতে তিনি বাংলাদেশ থেকে তিনজন ও ভারত থেকে তিনজন নিয়ে একটি কমিটি করারও প্রস্তাব দেন। কমিটির চেয়ারম্যান বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে করার প্রস্তাব দেন। তিনি (নূর) বাংলাদেশের তিনজন প্রতিনিধি ঠিক করবেন। আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিন প্রতিনিধি হলেন- চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষ, অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কর্ণধার শ্রীকান্ত মোহতা।

মমতা ব্যানার্জি জানান, তার লেখা ৫৩টি বইসহ বাংলাদেশ বইমেলা কর্তৃপক্ষকে মোট ৫০০ বই উপহার দেবেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে বিমানবন্দরের নামকরণ ও একটি ফেলোশিপ চালু করার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি চেয়ার করারও ঘোষণা দেন তিনি। আর এটি উদ্বোধন করতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাবেন।

মমতা বলেন, আমাদের সম্পর্ক খুব সুন্দর, একেবারে সাজানো সম্পর্ক। কোনো বাধা আমাদের থাকবে না। মনের বাঁধন কখনও আটকে রাখা যায় না। মনের দরজাটা খুলে দিতে হবে। সবাইকে নমস্কার, সালাম ও প্রণাম জানিয়ে অভিবাদন জানানোর পাশাপাশি ‘জয় বাংলা’ বলে দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে খোলামেলা মতবিনিময়ে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ছাড়াও মমতার সফরসঙ্গী হিসেবে ঢাকায় আসা চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ, চলচ্চিত্র তারকা প্রসেনজিৎ, তৃণমূলের এমপি অভিনেতা দীপক অধিকারী দেব এবং কণ্ঠশিল্পী নচিকেতা অনুষ্ঠান মঞ্চে মমতার পাশে ছিলেন। আর তৃণমূলের এমপি অভিনেত্রী মুনমুন সেন, অভিনেতা ইন্দ্রনীল সেন, কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতি অরিন্দম কাজীর স্ত্রী কল্যাণ কাজী, কবি সুবোধ সরকার, পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনমন্ত্রী চলচ্চিত্র পরিচালক ব্রাত্য বসু ছিলেন সামনে অতিথিদের সারিতে।

বাংলাদেশের ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ররীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর।

সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ। দুই দেশের শিল্পীদের কণ্ঠে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতে শেষ হয় মমতার ‘বৈঠকি বাংলা’।

মমতা মীমাংসায় আসবেন, আশা রাষ্ট্রপতির : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। মমতা ব্যানার্জি শুক্রবার বিকালে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে গেলে আবদুল হামিদ এ আশা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ৩৫ মিনিট দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন আবদুল হামিদ। সাক্ষাতের সময় রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, মমতা ব্যানার্জির এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে।

প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাণিজ্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের উদ্যোগের কথা রাষ্ট্রপতি বৈঠকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এর ফলে বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পারস্পরিক অধিকতর উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্রপতি তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেশী দেশটির আতিথেয়তারও প্রশংসা করেন বলে ইহসানুল করিম জানান। আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস এবং খুলনা-কলকাতা ট্রেন চালুর আগ্রহের কথাও রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেন মমতা। সাক্ষাৎ শেষে মমতা ব্যানার্জি রাষ্ট্রপতির বাসভবনে যান এবং আবদুল হামিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি মুক্তি আন্দোলনের তীর্থস্থান : ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরকে (বঙ্গবন্ধুর বাড়ি) মুক্তি আন্দোলনের তীর্থস্থান বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা সফররত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। শুক্রবার বিকালে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন তিনি। বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে মমতা ব্যানার্জি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। সেখানে ২৫ মিনিট অবস্থান করেন।

You Might Also Like