তিস্তাচুক্তি  কি দূরাশার আশাবাদ নয়!

তিস্তা চুক্তি নিয়ে সমানতালে চলছে বাংলাদেশের আশাবাদ আর ইন্ডিয়ার প্রতারণা। বাংলাদেশে  পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরের আশাবাদ ব্যক্ত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর পানি আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পগুলো নতুন করে সক্রিয় করছে ইন্ডিয়ার সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ৮০০০ কোটি রুপি ব্যয়ে পরিকল্পিত তিস্তা হাইড্রোপাওয়ার প্রজেক্ট। তিস্তানদীর পানি আটকে ইন্ডিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষিপ্রকল্পেও ব্যবহার করছে। ইন্ডিয়ার এই প্রকল্পগুলোর জন্যই বাংলাদেশে তিস্তার পানি প্রবাহ অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে তিস্তার পানি আটকে রেখে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ইন্ডিয়া। এছাড়া, দেশটি নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে তিস্তার পানি ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নিয়েছে। অথচ, বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সাথে তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি সাক্ষরের নামে কালক্ষেপণ হয়েছে।

তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি সাক্ষর কিংবা বাস্তবায়ন করলে থমকে যেতে পারে শত কোটি টাকা বিনিয়োগে বাস্তবায়ন করা ইন্ডিয়ার একরোখা উন্নয়ন নীতি। ফলে, তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে কর্মকাণ্ডগুলো শেষ পর্যন্ত কালক্ষেপণের পর্যায়েই থেকে যাবে। আর, তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের নামে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আশার বাণীগুলো পরিণত রয়ে যাচ্ছে দূরাশায়।

পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম রাজ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই দুটো রাজ্যই তাদের নিজ নিজ অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে তিস্তার পানি ব্যবহারের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এছাড়া, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে তিস্তার পানি ব্যবহারকে কেন্দ্র করে বাড়াছে বিনিয়োগ। ফলে, বাংলাদেশের সাথে তিস্তার পানি বন্টন তো দূরের কথা, কমে যেতে পারে বাংলাদেশে তিস্তার পানির প্রবাহ।

এখনও পর্যন্ত তিস্তা চুক্তি সাক্ষরের প্রধান বাঁধা হিসেবে ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকেই সামনে তুলে আনা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও বড় বাধা হচ্ছে সিকিম রাজ্য সরকার। এবং এই দুই রাজ্যেই তিস্তার পানি আটকে রেখে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নাটেরগুরুর ভূমিকা নিচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তাই, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র সরকার ও রাজ্য সরকারের বিরোধ নয়, ইন্ডিয়া রাষ্ট্র হিসেবেই তিস্তা চুক্তি সাক্ষর ও বাস্তবায়ন বিরোধী।

পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৫-৭৬ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের’ মাধ্যমে শুরু হয় নদীটির পানি প্রত্যাহার। ইন্ডিয়া এই প্রকল্পটিকে আরও সম্প্রসারণ করেছে। এর আওতায় আরও অধিক খাল খনন করে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেবে ইন্ডিয়া। উদাহরণ স্বরূপ, তিস্তা জলঢাকা মেইন খাল খননের কাজ এখনও চলছে। পুরো খনন কাজটি শেষ হলে, তিস্তা থেকে আরও অধিক পরিমাণ পানি প্রত্যাহার করতে সক্ষম হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এছাড়া, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের অধীনেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাও বাড়ানর কাজ পুরো দমে চালাছে দেশটির সরকার।

অপরদিকে সিকিমেও তিস্তার উৎস নদীগুলোতে বাধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার। প্রচন্ড জ্বালানী সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অংশ হিসেবে ইন্ডিয়া চাইছে, সিকিমকে জ্বালানী উৎপাদনের `আঁতুড় ঘরে` পরিণত করতে। এরই অংশ হিসেবে তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে ইন্ডিয়ার। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার সিকিম অংশের তিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সমস্ত বাধাকে থোড়াই পাত্তা দিয়েছে।

তিস্তার উপর বাঁধ নির্মাণ না করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করা থেকে শুরু করে, সুশীল সমাজ, স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে দ্বন্দ্বে যাওয়ার মতো ঝামেলা নিঃসংকোচে নিয়েছে সরকার। তারা সিকিম অংশে তিস্তা নদীর উপর ১৬৮টি বাঁধ নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। গত বছর পর্যন্ত কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র।

বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষতি হলেও, ইন্ডিয়া সেই প্রকল্পগুলোর সুবিধা পেতে শুরু করেছে মাত্র। এই পরিস্থিতিতে, তিস্তাচুক্তি সাক্ষর ও বাস্তবায়ন করে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ও উন্নয়নের সুযোগ হারানর কথা ঘুণাক্ষরেও ভাববে কি ইন্ডিয়া সরকার !

You Might Also Like