যে কারণে বিলম্বে এলো বান কি মুনের চিঠি

বান কি মুনের চিঠি প্রস্তুত থাকলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনকে পাঠানোর নির্দেশ ছিল জাতিসংঘের মহাসচিবের দপ্তর থেকে। এ কারণেই চিঠি ঢাকাস্থ আবাসিক সমন্বয়কের দপ্তর থেকে প্রায় ১৫ দিন পর প্রাপকের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে চিঠি আসতে কেন দুই সপ্তাহ বিলম্ব হলো তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সমকালকে জানান, প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে যে তারিখের স্বাক্ষর আছে তার দু’সপ্তাহ পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তগত হয়েছে। চিঠি আসতে কেন এত সময় লাগল, তা জাতিসংঘের কাছে জানতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী চিঠির জবাব দেবেন।যে কারণে বিলম্বে এলো বান কি মুনের চিঠি

তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠির বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের অবহিত করলেও গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিএনপির তরফে দায়িত্বশীল কেউই খালেদা জিয়াকে লেখা চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমকে জানাননি। খালেদা জিয়া চিঠির জবাব দেবেন কি-না, তা জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, জাতিসংঘ থেকে কোনো দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন কোনো চিঠি দেওয়া হয়, তখন তার প্রভাব কী হবে সে বিষয়ে আগাম পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ কারণে এর আগে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠি বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর প্রকাশ করা হয়েছে। এটা জতিসংঘের সাধারণ প্রক্রিয়া, নতুন কিছু নয়। সূত্র জানায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি চিঠি দুটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে পেঁৗছানো হয়। তবে বান কি মুনের চিঠি কোনো রাজনৈতিক পক্ষকেই সুবিধা দেয়নি; বরং কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক পক্ষগুলোও চিঠিটি প্রকাশ করতে চায়নি।যেমন_ বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে লেখা চিঠিতে জীবনহানি ঘটছে, এমন সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে সরে এসে নমনীয় মনোভাব দেখানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ করার জন্য সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করারও পরামর্শ দিয়েছেন। সেখানে বিএনপির দাবি অনুযায়ী, এখনই সরকারের পদ্যতাগ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই; বরং চলমান সহিংসতার দায় যে বিএনপিরই, তাও স্পষ্ট মহাসচিব বান কি মুনের আহ্বান থেকেই।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠির প্রথম অধ্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসা থাকলেও শেষ অধ্যায়ে জীবনহানিকর সহিংসতা বন্ধে আগামী নির্বাচনের আগেই বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এ আহ্বানও এ মুহূর্তে সরকারের জন্য এক ধরনের চাপ। এ কারণেই কোনো পক্ষই চিঠির বিষয়টি যতটা সম্ভব চেপে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার পক্ষ চিঠির বিষয়টি স্বীকার করেছে। গত বুধবার জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হকও ওই চিঠির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন সাংবাদিকদের কাছে।

প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে যা আছে

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। বিশেষ করে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জন খুবই ইতিবাচক। চিঠিতে তিনি বলেন, ২০১৫ সাল জাতিসংঘের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ বছরই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি অধ্যায়ের শেষ হয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এ জন্য বাংলাদেশের মতো দেশে উন্নয়ন-সহায়ক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা খুবই জরুরি। চিঠিতে তিনি বর্তমান সহিংসতা, বিশেষ করে জীবনহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এ ধরনের সহিংসতা বন্ধে উদ্যেগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে উপযুক্ত সময়ে একটি সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করার ব্যাপারেও আহ্বান জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, জাতিসংঘের মহাসচিব একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপের কথা বলেছেন। এ মুহূর্তে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি জাতিসংঘের অগাধ আস্থার বিষয়টি চিঠির একাধিক স্থানে জোর দিয়ে বলেছেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।

বান কি মুন চিঠিতে আরও বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার বিষয়ে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। এ জন্য সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।চিঠির জবাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী :জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের চিঠিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে আওয়ামী লীগ। এ জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের চিঠির জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খুব কম সময়ের মধ্যেই এ চিঠির জবাব দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোল বোমায় মানুষ খুন ও নাশকতার চিত্র থাকবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিরার আলম সমকালকে জানিয়েছেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠিকে সরকার খুই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ওই চিঠিতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের কিছু নেই। এ প্রসঙ্গে সমকালের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, আজকালের মধ্যেই চিঠির ড্রাফট তৈরি করবেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।আওয়ামী লীগ নেতারা সমকালকে বলেছেন, অবরোধ ও হরতালের ডাক দিয়ে পেট্রোল বোমায় মানুষ খুন করছে বিএনপি। তাদের সঙ্গে সংলাপের কোনো সুযোগ নেই। নেতারা নাশকতার রাজনীতি বন্ধ করার জন্য বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছেন।

খালেদাকে পাঠানো চিঠিতে কী আছে?

বিএনপির তরফে এ চিঠি নিয়ে লুকোচুরি করা হচ্ছে। বিএনপির দায়িত্বশীল কেউই চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ কিংবা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হচ্ছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে লেখা চিঠির শুরুতেই চলমান সহিংসতায় অনেক মানুষ হতাহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি দেশে এ ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। চিঠিতে বিএনপিকে একটি ‘দায়িত্বশীল’ রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে দলের চেয়ারপারসনের প্রতি জীবনহানিকর সহিংস ও কঠোর কর্মসূচি থেকে সরে এসে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আগামী নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সবার অংশগ্রহণমূলক করতে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘ সহায়তা দিতে প্রস্তুত জানিয়ে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।এ ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সমকালকে বলেন, জাতিসংঘ থেকেই বলা হয়েছে, তারা দুই পক্ষকেই চিঠি দিয়েছেন। এ বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। চিঠির জবাব দেওয়া হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের হাইকমান্ড তা বলতে পারেন। তবে এ চিঠির জবাব দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

বিশিষ্টজনের দৃষ্টিতে?

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সি এম শফি সামি সমকালকে বলেন, এ চিঠির গুরুত্ব হচ্ছে জাতিসংঘ তার অবস্থানটি জানিয়ে দিল। এ চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে জাতিসংঘ সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ কারণেই তারা বিএনপি চেয়ারপারসনকে লেখা চিঠিতে সহিংস কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের প্রতিও একইভাবে সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। নির্বাচনকে ঘিরে যেন সহিংসতা না হয় সে জন্যও সংলাপও করতে বলেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠি পরিস্থিতি বদলাতে কতটা প্রভাব রাখবে, তা বলা মুশকিল। তবে এর মধ্য দিয়ে দু’পক্ষের ওপর একটা স্নায়ুচাপ তৈরি হবে সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, যে কোনো বিচারে আগে সহিংসতা বন্ধ হওয়া জরুরি। সহিংসতা বন্ধ না হলে সংলাপের পথও তৈরি হবে না।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান সমকালকে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব রেওয়াজ অনুযায়ী চিঠি দিয়েছেন। যখনই কোনো সদস্য রাষ্ট্রে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে চিঠি দেওয়া জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনকে চিঠি দিয়ে তিনি সেই দায়িত্বই পালন করেছেন। এখন এ চিঠি যাদের দেওয়া হয়েছে তারা জাতিসংঘের আহ্বান মানবেন কি-না সেটা তাদের বিষয়। তিনি বলেন, সহিংসতা কেউই সমর্থন করে না। জাতিসংঘও এর বিরুদ্ধে। সেটা এ চিঠি থেকে স্পষ্ট হয়েছে। জাতিসংঘের চিঠি পেঁৗছতে বেশি সময় লাগার ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। দায়িত্ব পালনের সময় দেখেছি জাতিসংঘ মহাসচিবের অনেক চিঠি এক মাস পরেও আসে। তার কারণ হচ্ছে জাতিসংঘ যে আহ্বান জানায়, তা কার্যকর হোক এটাও চায় তারা। এ কারণে বিশেষ পরিস্থিতির ভেতর চিঠি লেখা হলেও পরিস্থিতির প্রতি নজর রেখে উপযুক্ত সময় নির্বাচন করে চিঠি সংশ্লিষ্টদের পাঠানো হয়। ৩০ জানুয়ারির সময়টাতে সহিংসতা অনেক বেশি ছিল। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও বেশি ছিল। হয়ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই সহিংসতা কিছুটা কমে আসার পর জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বান কার্যকর হওয়ার উপযুক্ত সময় বিবেচনায় এ সময় চিঠিটি পাঠানো হয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দশম জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু হলে জাতিসংঘ মহাসচিব সমঝোতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন করেন এবং চিঠি দেন। পরে জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকায় এসে দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন। তবে তখনকার সে চেষ্টা সফল হয়নি। ফলে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশও নেয়নি।

উৎস: সমকাল

You Might Also Like