মিয়্যার ব্যাট্যা! আইলেই বা কী না আইলেই বা কী?

একপক্ষ বলছেন দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা! আমাদের দুর্বল পেয়ে যা ইচ্ছা করছেন আর উল্টো টনটনে গলায় সকাল-সন্ধ্যায় আমাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেন। জনগণকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। আর বোকার দল জনগণ অত বোকা নয়, আপনারা যা করছেন তা সবই আপনাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। কিছু ভাড়া করা লোক এনে গলাবাজি করাচ্ছেন এবং গণতন্ত্রের নিত্যনতুন সংজ্ঞা হাজির করছেন এবং তা ট্যাবলেট বানিয়ে জনগণকে গিলতে বাধ্য করছেন। ভয়াবহ এই অনাচার নিরীহ জনগণ এবং অত্যাচারীর চাপে কার্যত বন্দী বিরোধী দল সৈহ্য করলেও মিয়ার ব্যাটা কিন্তু সৈহ্য করবেন না। তিনি আপনাদের ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে ইতিমধ্যেই আমাদের দেশের দিকে রওনা দেওয়ার জন্য ইরাদা করেছেন। সময় থাকতে সাবধান হোন, নইলে খবর আছে!

একপক্ষের আর্তি শুনে অপরপক্ষ ধমকের সুরে বলছে, মিয়্যার ব্যাটা- আবার ক্যাঠারে! আমরা তো এক মিয়্যার ব্যাটারে চিনতাম। তার নাম ছিল ফেলুমিয়্যা। আমাদের শমি কায়সারের বাবা শহীদুল্লাহ কায়সার একটা বই লিখেছিলেন। সেখানে রমজান নামের এক গ্রাম্য টাউট এবং একই গ্রামের জমিদার ফেলুমিয়ার চরিত্র অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেই বইতে কিন্তু রমজানের লগে ফেলুমিয়া পারে নাই, ফেল মারছে। আর সেই ফেল্টু মার্কা ফেলুমিয়া ওরফে মিয়্যার ব্যাটাকে এনে আমাদের ঠ্যাঙ্গাইবা দাঁড়াও একটু হাইস্যা লই- হু-হা-হা! উ-হু-হু! আ-হা-হা!

আরে রাখেন! হাসি থামান! মানুষকে তাচ্ছিল্য করতে করতে আপনাদের অহংকার এখন হিমালয় পর্বতমালার মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ছাড়িয়ে গেছে। আপনারা যে একটি ফানুস বা ফুলানো বেলুন তা ফুটুস হলেই বুঝবেন। কথায় কথায় লুঙ্গি ড্যান্স দেওয়ার হুমকি মারেন। ভেংচি কাটেন আর প্রতিপক্ষকে নির্বোধ বাচ্চাকাচ্চা মনে করেন। ছোট ছোট বাচ্চাদের যেমন তাদের বাবা-মা বলেন, এই বাবু! ঠিকমতো পড়, খেলতে যাবে না, বাইরের খাবারের দিকে নজর দেবে না। আর যদি কথা না মান তবে আজ রাতে কিন্তু ভাত নেই। আপনারাও আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন ওইসব অবোধ বালক-বালিকাদের মতো করে। বলছেন, বাসা থেকে অফিস যেতে পারবা কিন্তু পল্টন যেতে পারবা না। যদি যাও তবে আমাদের অনুগত ট্রাক বাহিনী বালু ও খোয়া নিয়ে তোমাদের বাধা দেবে। আমরা যখন অফিসে ঢুকলাম তখন বললেন, বাসায় যেতে পারবা না। বেশ ভালো কথা- আমরা কষ্ট করে অফিসেই থাকতে শুরু করলাম। এরপর হুকুম হলো- কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবা না। বললে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেব। গেটে তালা মেরে বলা হলো- ভেতরে বসে টিভি সিরিয়াল দ্যাখ আর খানাপিনা কর। মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলবা এবং স্কাইপেতে আড্ডা মারবা। এরপর আবার যেন কি হলো- বলা হলো টিভি দেখা বন্ধ, বিদ্যুৎ বন্ধ এবং ফোনে কথা বলা একদম বন্ধ। দুই-তিন দিন পর দয়া করে আবার ওইগুলো চালু করা হলো। এখন বলা হচ্ছে, তোমাদের অফিসের সবাই অফিসে বসে খানা খাইতে পারবা না। অফিস তো কাজের জায়গা। ওখানে এত্তসব কিসের খানাপিনা। গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা তো কর্মক্ষেত্রকে পিকনিক ক্ষেত্র বানাতে পারি না। এমনিতেই অবরোধ করছ, তারপর আবার হরতাল করছ। টিভিতে সেসব দৃশ্য দেখছ এবং বিরিয়ানি খাচ্ছ! সঙ্গে দেশি মুরগির রান! কী সাহস! আবার সালাদও খাওয়া হচ্ছে- সঙ্গে তাজা তাজা কাঁচা মরিচ এবং পিয়াজ! উফ! কাহাতক সৈহ্য করা যায়! খাওয়া বন্ধ! মনোযোগ দিয়ে কাজ কর এবং গণতন্ত্র সুরক্ষায় গবেষণা কর।

তোমাগো উচিত আমাগোরে বন্ধু ভাবা। কারণ আমরা দয়া করে মাঝে মধ্যে তোমাগো সুযোগ কইরা দিতাছি- যেন একটু আধটু লাফালাফি করতে পার। মাঠ মাঝেমধ্যে গরম না হইলে আমাগোও ভালো লাগে না- আবার পাবলিকেরও ভালো লাগে না। আর তাই সার্বিক চিত্তবিনোদনের জন্য আমরা তোমাগোর মডেল বানাইয়া সুতা ধইরা টান মারি। ফলে নতুন কইরা রচিত হইতে থাকে পুতুল নাচের ইতিকথা। কিন্তু যখন অতিরিক্ত বিনোদনে ত্যক্ত বিরক্ত হইয়া পড়ে তহন সুতা ঢিল কইরা দিই- আর তখনই খেলা শ্যাষ। বর্তমানের খেলাও শ্যাষ হইয়া যাইব- মনে অয় খুব তাড়াতাড়ি।

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধযাত্রার আগে রাজা-মন্ত্রী-সেনাপতিরা অশ্বমেধযজ্ঞ করত। এতে তাদের সাহস শক্তি বৃদ্ধি পাইত। বন্ধু হিসেবে বলছি- তোমরাও ওমনটি করবার পার। শুনেছি ইদানীংকালে কোয়ান্টাম মেথড ভালো ফল দিতাচ্ছে- দয়া কইরা একটু প্রস্তুতি নাও- তারপর মাঠে নামো। একজন সত্তর বছর বয়স্ক নারীকে সম্মুখ সমরে একলা ফেইল্যা পালাইয়া বেড়াও আর ফুকফাক কইরা অন্ধকার রাইতে ককটেল বোমা মারো এবং ধরা খাইলে বল- আমি ছাত্রলীগ করতাম- উফ! তোমাদের নিয়া আর পারলাম না। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বীর বীরত্বের যতটুকু মানসম্মান ছিল সব কিছুর চাকা পাংচার কইরা দিলা।

মহারাজ মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনলাম। ক্ষমতা যে মানুষকে কতটা অধপতনের দিকে নিয়ে যায় তা আপনার বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায়। সাধু ও চলিতর মিশ্রণ ছাড়াও আপনি অহংকারবশ্ত নিজস্ব স্টাইলের আঞ্চলিকতার মিশ্রণ ঘটিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে যা মুখে আসে তাই বলে গেলেন। আমাদের ভীরু, কাপুরুষ, রাজনীতির শিশু ইত্যাদি তাচ্ছিল্যমূলক উপাধি দিলেন। আপনাকে আপনি বলে সম্বোধনের পরও আপনি আমাদের তুই তোকারি উপহার দিলেন। শুধু একটি কথা বলে এবং একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি আজকের মতো জবান বন্ধ করব।

আজ আপনারা কিছুতেই স্মরণে আনতে পারবেন না আপনাদের দুঃসময়ের সেই স্মৃতিগুলো। রাষ্ট্র শক্তির প্রয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে ব্যারোমিটার ব্যবহার করা হচ্ছে তখন কিন্তু শতকরা পাঁচভাগও প্রয়োগ করা হয়নি। তখনকার মিডিয়া প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন, ড্রাইভার ছাত্র-শিক্ষক এবং বিশাল বিশাল সুশীলেরা একই ভাষায় এবং একই স্বরে কথা বলেনি। তারপরও আপনারা দাঁড়াতে পারেননি। আপনাদের বড় বড় নেতাদের কান্নায় ছোট ছোট অবোধ শিশুরাও অবাক হয়ে ভেবেছে- ওরা এত কান্না শিখল কী করে। কেউ কেঁদেছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে- কেউ বা কেঁদেছে আহাজারি করে। প্রশাসনের ছোট ছোট কর্তাবাবুদের যেভাবে হাতে-পায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করেছেন তাতে ওইসব কর্তা অবাক হয়ে নিজেরা বলত হায়রে পোড়া কপাল! এই ফানুস লোকগুলোকে আমরা নেতা ভেবে আসছি! তাদের সাহস শক্তি তো দেখছি একেবারেই নেই। যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা সবাই প্রাণ খুলে দরাজ দিলে দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে এমন সব আপত্তিকর তথ্য-উপাত্ত পরিবেশন করেছে যা ইউটিউবে দেখার পর আমরা বিরোধী দলের লোকজনও অবাক বিস্ময়ে ভাবি হায়রে রঙিন মানুষ! এতকিছু খেলে- এত কিছু পেলে যার কল্যাণে আজ তাকেই কবর দেওয়ার আয়োজন করে নিজেরা বাঁচতে চাচ্ছ!

অন্যদিকে আমাদের লোকও তো ব্যাপক হারে গ্রেফতার হয়েছিল। শত জুলুম নির্যাতনের পরও তো তারা কেউ দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে একটি টুঁ-শব্দ উচ্চারণ করেনি। কাজেই যেসব কথা বলছেন তা কেবল গায়ের জোরেই আমাদের ওপর চালাচ্ছেন। আজ আমাদের ওপর যে চাপ দিচ্ছেন তার অর্ধেক চাপ আপনাদের ওপর পড়লে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না- যেভাবে অতীতেও বহুবার পাওয়া যায়নি। কাজেই শান্ত হন এবং অপেক্ষা করুন নিয়তির নির্ধারিত ফয়সালার জন্য।

আমাদের খাবার বন্ধ করে দিয়ে আপনারা হয়তো বগল বাজাচ্ছেন এবং বলছেন- এবার কচিবাবুদের একটা উচিত শিক্ষা হবে? খাদ্যের অভাবে অফিস থেকে বের হওয়ার জন্য চিৎকার করবে। তখন আমরা বলব- এক হাতে খাবার অন্যহাতে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার। আর যদি রাজি না হও, তখন আব্বা-ডাব্বা-জাব্বা! অর্থাৎ না খেয়ে মর। আপনাদের এসব কাণ্ড দেখে আপনাদের দেশীয় পণ্ডিত, সুধীজন বলছেন- ধন্য ধন্য ধন্য! তারা এখন নতুন করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রামের সুমতি পড়ছেন এবং নিজেদের টাক এবং নুন্দিতে (মেদবহুল বিশাল পেট) হাত বুলিয়ে মহাসুখে হাই তুলছেন। অন্যদিকে মিয়্যার-ব্যাটা আপনাদের এসব কর্মকাণ্ড একদম পছন্দ করছেন না। তিনি শীঘ্রই আসবেন এবং এক দফার রফা না করে ফিরবেন না। তিনি না আসা পর্যন্ত আমরা মরে যাব- কিন্তু কর্মস্থল ছাড়ব না।

তোমাদের ওসব মিয়্যার ব্যাটার খোঁজখবর লিবার টাইম নাই। আমরা তোমগো বলবার চাই দ্যাশের দিকে তাকাও। মাগার ডিজিটাল হও- আবে এ্যানালগ চিন্তা দিয়া আমাগো লগে পারবা না। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে যাও- ধ্যানছে চিন্তা কর। তারপর লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাও আর ভুলেও বলবা না যে ইতা কিতা ওইলো বাহে! আমাদের দ্যাশ এহন এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো মিয়্যার ব্যাটার সাধ্য নাই আমাগো কিছু করে। তোমরা যারে সকাল-সন্ধ্যায় প্রণতি দাও আমরা তাকে ঘরেই ঢুকতে দিই না। তার ফোনও রিসিভ করি না। আগে মিয়্যার ব্যাটার ছোট ভাই বা ছোট বোনের দাপটে থাকন যাইত না। আর এখন মিয়্যার ব্যাটা নিজেই আমাগো লগে খায়খাতির করবার জন্য ইতিউতি করতাছে। কাজেই ওইসব মিয়্যার ব্যাটার রাজনীতি বাদ দিয়া আমাগো কথা শোন। আমাগো লগে লড়াই করণের জন্য শক্ত বুকের পাটা লাগবে। হাঁটুতেও জোর লাগব। আমাগো ছোট ভাই ব্রাদার বা কর্মচারীদের দেখলে তুমাগো কলিজা এমনভাবে কাঁপে তাতে মনে হয় বুকের মধ্যে ঢোল বা ডুগডুগি বাজতাছে। অনেকের হাঁটুতে এমন কাঁপন শুরু হয় সে হাঁটুর বাটিগুলা ঝুনঝুনির মতো বাজতে থাকে। আমাগো ভয় হয় কহন জানি হাঁটুর বাটি খুইল্যা পড়ে। এই জন্য আমরা নতুন একটি প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছি। যার নাম হবে- ডিজিটাল হাঁটুর বাটি প্রকল্প। তোমাগোর মধ্যে যাদের ভয়ের চোটে হাঁটুর বাটি খুইল্যা পড়ব তাদের আমরা বিনামূল্যে ডিজিটাল হাঁটুর বাটি সরবরাহ করব।

তোমাগোরে শাস্তি দিতে দিতে আমরা হয়রান হইয়া গেছি। এত নতজানু অসহায় প্রতিপক্ষকে মারধর কইরা কোনো মজা নাই। আমরা স্পষ্ট বুঝতাছি- তোমাগো লগে ফাইট করতে করতে আমরা এক সময় এমন দুর্বল হইয়া যামু যে দাঁড়াইয়্যা দাঁড়াইয়্যা কিছু করার চাইতে শুইয়্যা শুইয়্যা সব কিছু করণের খায়েশ হইয়্যা যাইব। এখন যেমন তোমাগো ধরার জন্য একটু-আধটু দৌড় মারি। আর হুমকি দেই এই দৌড় দিবি না, নাইলে গুলি করুম। আমাদের কথা শুইন্যা তোমরা তাড়াতাড়ি ফিরে আস এবং আমাদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়। আমরা তোমাদের ধরি আর খপাখপ গারদে ভরি। সেখানে তোমাগো একটু ছোটখাটো ডান্ডা দেখাইলেই কিল্লা ফতে- গপাগপ কইরা বলতে থাক সব, যা আমরা শুনবার চাই।

লেখক : কলামিস্ট।

You Might Also Like