বাংলাদেশে যুদ্ধাবস্থা : জনগণ কি আত্মসমর্পণ করবে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

শুরু হয়েছে যুদ্ধ :

বাংলাদেশে এখন লাগাতর যুদ্ধ। দিন দিন এ যুদ্ধ আরো তীব্রতর হচ্ছে। জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া এ যুদ্ধটির মূল লক্ষ্য,বিক্ষুব্ধ জনগণের হাত থেকে অবৈধ সরকারের গদী বাঁচানো। গদীতে আসীন থাকার ফায়দাগুলি তো বিশাল।এতে রাষ্ট্রীয় ভান্ডারের উপর অবাধ লুন্ঠনের লাইসেন্স মেলে। তখন অর্থ লুন্ঠনে ঘরে ঘরে হানা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। লাইসেন্স মেলে রাজনৈতীক বিরোধীদের হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ি,ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইজ্জত-আবরুর উপর খেয়ালখুশি মত হামলার।সে সাথে অধীকার মেলে রাষ্ট্রের পুলিশ,প্রশাসন,র‌্যাব,বিজিবী,সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারকদের চাকর-বাকরের ন্যায় ইচ্ছামত ব্যবহারের। এমন অবাধ দখলদারি কি কোন দুর্বৃত্ত সরকার সহজে ত্যাগ করে? তাছাড়া বাংলাদেশের মত দেশে গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে কি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট,সংবিধান বা ন্যায়নীতির সমর্থণ লাগে? তাঁবেদার পুলিশ,বিজেবী,র‌্যাব,সেনাবাহিনী, মিডিয়া ও প্রশাসনই তো সে অবৈধ দখলদারিকে দীর্ঘায়ু দেয়ার জন্য যথেষ্ট।স্বৈরাচারি এরশাদ তো জনসমর্থণ ছাড়াই ১১ বছর ক্ষমতায় থেকে গেছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার তাই গদী ছাড়তে রাজী নয়।

সিরিয়ার স্বৈরাচারি শাসক বাশার আল আসাদ এবং মিশরের স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল সিসি যেমন নিজেদের স্বৈরাচারি শাসন বাঁচাতে নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে পুলিশ,সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী নামিয়েছে এবং হাজার হাজার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে, বাংলাদেশের স্বৈরাচারি সরকারও তেমনি জনগণের বিরুদ্ধে প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু করেছে। পুলিশ, বিজেবী, র‌্যাব ও র‌্যাবের পোষাকে সেনাসদস্যদের বন্দুকের নল এখন দেশবাসীর দিকে। তাদের গুলিতে নিরস্ত্র মানুষেরা প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে। যুদ্ধ কোন দেশেই সুবাতাস বয়ে আনে না। আনে বোমা,আগুন,মৃত্যু ও ধ্বংস। চলমান যুদ্ধাবস্থায় বাংলাদেশেও ভিন্নতর কিছু হচ্ছে না। আগুণ জ্বলছে প্রতিদিন। তাতে বাস ও গাড়ি জ্বলছে,মানুষও জ্বলছে। দিন দিন সে আগুণ আরো তীব্রতর হচ্ছে। তবে দেশের শত্রু নির্মূলে ও সমাজ বিপ্লবে যুদ্ধের বিকল্পও নাই। মহান নবীজী (সাঃ)যুদ্ধ পরিহার করতে পারেননি। বরং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর লাগাতর যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর পরও সিরিয়ার জনগণ তাই স্বৈরাচারি বাশার আল আসাদের সামনে আত্মসমর্পণ করছে না। বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ এই প্রথম নয়। ২০১৩ সালের ৫ই মে’র মধ্যরাতে হিফাজতে ইসলামের সমাবেশ পন্ড করতে সরকার ১০ হাজারের বেশী সেনা-সদস্য,বিজিবী সদস্য,র‌্যাব ক্যাডার ও পুলিশ দিয়ে শাপলা চত্ত্বরে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং হতাহত করেছিল বহু হাজার নিরস্ত্র মুসল্লিকে।

বাসপ্রেম না গদিপ্রেম?

সরকার এখন বাস-প্রেমিক,গাছ-প্রেমিক,মানব-প্রেমিক ও অর্থনীতির প্রেমিক সেজেছে।অথচ আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তাদের রাজনীতির হাতিয়ার ছিল বাঁশ,বৈঠা ও গান পাউডার। হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিল এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলার। তখন দলটি শতাধিক দিন হরতাল ডেকেছে। বাসে ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। হরতালের দিনে রিকশায় চড়াতে বাকশালী ক্যাডারগণ যাত্রীকে রাস্তায় উলঙ্গ করে কাপড় কেড়ে নিয়েছে। এবং গদীতে বসার পর প্রচুর লাশ ফেলেছে শাপলা চত্ত্বরে,তেমনি পিলখানায়। অথচ এখন তারা ভোল পাল্টিয়েছে। দেশ ও দেশের অর্থনীতি অচল হওয়ার জন্য হাসিনা সরকার বিরোধী দলের ডাকা অবরোধকে দায়ী করছে। কিন্তু সরকার ভূলে যায়,২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দেশে অবরোধের রাজনীতি ছিল না। নির্বাচনের নামে আওয়ামী বাকশালীগণ যে ভোট ডাকাতি করেছে সেটি না হলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোথাও কি কোন অবরোধই হতো? অবরোধ তো এসেছে রাজপথে শান্তিপূর্ণ মিটিং-মিছিলের রাজনীতি অসম্ভব করার কারণে।

ভোট ডাকাতির মাধ্যমে গদীদখল কোন সভ্যদেশে হলে সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের দিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হতো। কোন দেশের আত্মসম্মানি জনগণই ভোট-ডাকাতদের এক বছর গদীতেও থাকার অবকাশ দিত না। কারণ, ডাকাতদের দ্রুত ধরা ও শাস্তি দেয়াই তো সভ্যসমাজের রীতি। ডাকাতগণ দর্প ও গর্ব দেখায় একমাত্র ডাকাত পাড়াতেই। মন্ত্রী বা এমপি রূপে মেনে নেয়া দূরে থাক,যে কোন সভ্যদেশে এরূপ ভোট-ডাকাতদের দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেল হতো। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হতো সারা জীবনের জন্য। ইসলাম তো চোরডাকাতদের আদালতে সাক্ষি দেয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়। তবে বাংলাদেশের মানুষ যে চোর-ডাকাতদের শাস্তি দিতে জানে না তা নয়। দিবারাত্র পুলিশ প্রহরায় তারা যেরূপ দুর্গে আশ্রয় নিয়েছে তা থেকে একটু বেরিয়ে রাস্তায় নামলেই টের পেতো জনগণ তাদের ন্যায় ভোট ডাকাতদের কীরূপ ভাল বাসে!

দেরীতে হলেও বাংলাদেশের জনগণ আজ প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। অবিরাম প্রতিরোধ শুরু হয়েছে সমগ্র দেশ জুড়ে। আর তাতে প্রচন্ড ভয় শুরু হয়েছে বাকশালী ডাকাতদের মনে। তারা সঙ্গিরূপে পেয়েছে এমন একপাল বিবেকশূণ্য মানুষদের যাদের নাই চুরিডাকাতি,দমননীতি, হত্যা ও নির্যাতনকে নিন্দা করার সামান্যতম সামর্থ। ডাকাতপাড়ায় নৃশংস ডাকাতিও বিশাল কর্ম রূপে প্রশংসিত হয়,এবং বীর রূপে নন্দিত হয় ডাকাত সর্দার। তেমনি এদের কাছেও ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির ভোট-ডাকাতি,শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লি-হত্যা ও রাজপথে বিরোধী দলের মিছিল পন্ড করাও অতি মহান কর্ম মনে হয়। বাংলাদেশে এমন বিবেকহীন মীর জাফরদের সংখ্যা বিশাল। ফলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের ১৯০ বছর মেয়াদী ডাকাতিতে কলাবেরটর পেতে কোনরূপ অসুবিধা হয়নি। ব্রিটিশদের জন্য এরা শুধু ভারতে নয়,বিদেশের মাটিতেও বিশ্বযুদ্ধ লড়ে দিয়েছে। এরূপ বিবেকহীন মানুষগণই আজ আদালতের বিচারক পদে আসীন। তাদের প্রবেশ ঘটেছে দেশের  সেনাবাহিনী,পুলিশ,প্রশাসন,কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়াতে।

নিজেদের ভয়ানক অপরাধগুলি ঢাকতে স্বৈরাচারি আওয়ামী বাকশলীদের মিথ্যাচারের আয়োজনটি বিশাল। পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার নামে গড়ে তুলেছে বিশাল প্রপাগান্ডা নেটওয়ার্ক। দেশের মানুষ দেশে বিদেশে গায়ে গতরে খেটে অর্থ উপার্জন করছে, আর সরকার সেটিকে নিজেদের অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে বাহাদুরি রূপে জাহির করছে। সরকার ২০১৪ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে বলছে বৈধ নির্বাচন। জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে নিরস্ত্র মানুষের প্রতিবাদকে বলছে সন্ত্রাস। নির্বাচনের দাবী নিয়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল-মিটিং করতে দিতেও সরকার রাজি নয়। বাকস্বাধীনতা রুখতে বিরোধী পত্র-পত্রিকা ও টিভি নেটওয়ার্কে ইতিমধ্যেই তালা ঝুলিয়েছে। এটিকে আবার বলছে গণতন্ত্র। নিত্যনতুন আইন গড়ছে স্রেফ গদী বাঁচানোর নৃশংসতাকে আইনগত বৈধতা দিতে।নিজের স্বৈরাচার বাঁচাতে দোহাই দিচ্ছে সংবিধানের। অথচ বার বার সংবিধান বদলিয়েছে স্রেফ বাকশালী স্বৈরাচারকে জায়েজ করতে।

শান্তি আসবে কি আত্মসমর্পণে?

গ্রামে যখন ডাকাত পড়ে বা হিংস্র পশুর প্রবেশ ঘটে,তখন জানমালের নিরাপত্তা থাকে না। সুস্থ্য ও সভ্য মানুষ তখন ঘরে দরজা লাগিয়ে ঘুমায় না। তাতে কি প্রাণ ও ইজ্জত বাঁচে? সভ্য সমাজে তখন ডাকাত বা পশু হত্যার লড়াই শুরু হয়। কিন্তু হিংস্র পশু বা নৃশংস ডাকাতের চেয়েও ভয়ানক কাজটি করে স্বৈরাচারি শাসকেরা।ডাকাতেরা গ্রামের সকল গৃহে হানা দেয় না। ডাকাতদের হাতে কিছু লোকের ক্ষতি হলেও সমগ্র দেশ ধ্বংস হয় না। দেশে দুঃর্ভিক্ষও আসে না। হিংস্র পশুরা পেট পূর্ণ থাকলে শিকার ধরে না। কিন্তু রাজনৈতীক হিংস্র জীবদের পেট কখনোই পূর্ণ হওয়ার নয়। তাদের নখর থেকে গরীবের নিরীহ সন্তান যেমন বাঁচে না,তেমনি গণতন্ত্রও বাঁচে না। মৌলিক মানবাধিকার তখন কবরে স্থান পায়। দেশকে তারা বিদেশের গোলামে পরিণত করে। সেরূপ অবস্থা যেমন মুজিবের আমলে সৃষ্টি হয়েছিল। এখন হাসিনার আমেলেও সৃষ্টি হয়েছে। এমন হানাদারদের কাছে আত্মসমর্পণে কি শান্তি আসে?

এজন্যই কোন সভ্যদেশ স্বৈরাচারি শাসকের দ্বারা অধিকৃত হলে বা বিদেশী শক্তির হামলা হলে সে দেশের জনগণ তাই যুদ্ধ শুরু করে। যুগে যুগে তাই স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহদের গলাকাটা পড়েছে;এভাবে নির্মূল হয়েছে স্বৈরাচার। এমন দস্যুদের নির্মূলে ইসলামে জিহাদ তাই ফরজ। ডাকাত দল যেমন ডাকাতিলব্ধ অর্থ নিয়ে বাঁচে,স্বৈরাচারি জালেম শাসকও তেমনি জনগণের বিরুদ্ধে লাগাতর যুদ্ধ ও লুন্ঠন নিয়ে বাঁচে।বিরামহীন ডাকাতির স্বার্থেই বাংলাদেশের জনগণের উপর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ দস্যুগণ ১৯০ বছর মেয়াদী এক লাগাতর যুদ্ধ চাপিয়ে রেখেছিল।সে যুদ্ধে মুসলমানদের শক্তিহীন,অস্ত্রহীন ও যুদ্ধহীন রাখাই ছিল ব্রিটিশের রাষ্ট্রীয় নীতি। সে দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াইকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ডাকাতেরাও সন্ত্রাস বলতো। ডাকাতপাড়ায় যেমন বিচার-আচার থাকে না,তেমনি সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারি শাসনে নিরপেক্ষ আইন-আাদালত ও ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকে না। বিচারকগণও তখন সরকারের আজ্ঞাবহ সেবাদাস ও জল্লাদে পরিণত হয়। বিচারের নামে এসব বিচারকগণ স্বৈরাচার-বিরোধী যে কোন লড়াইকেই সন্ত্রাস বলে। স্বৈরাচার বাঁচাতে এরূপ বিচারকগণ প্রতিবাদি নিরস্ত্র মানুষদের প্রাণদন্ড দেয়াকে ন্যায়বিচার মনে করে। মিশরে এরূপ বিচারকগণ মাত্র কয়েক ঘন্টার এজলাসে স্বৈরাচারি বিরোধী শত শত নিরস্ত্র মানুষকে ফাঁসির হুকুম শুনাচ্ছে। এমন কি স্কুল ছাত্রছাত্রীদের দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী জেল।

বঙ্গভূমি থেকে ব্রিটিশদের ডাকাতি ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগষ্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন চলছে স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী ডাকাতি। ডাকাতগণ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ হোক আর বাঙালী হোক –ভাষার ভিন্নতায় তাদের চরিত্র পাল্টায় না। সভ্য জনগণ কি এরূপ নৃশংস ডাকাতদের সামনে আত্মসমর্পণ করে? আত্মসমর্পণে কি ইজ্জত-আবরু ও প্রাণ বাঁচে? ব্রিটিশ ডাকাতদের সামনে ১৯০ বছরের আত্মসমর্পণে বাঙালী মুসলমানদের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু কোনটাই বাঁচেনি।জগৎখ্যাত মসলিন শিল্পিরা হারিয়েছে তাদের আঙ্গুল।ব্রিটিশ দস্যুদের নির্মম ডাকাতিতে বাংলার মাটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল দুইবার। প্রথমবার এসেছিল বাংলা ১১৭৬ সালে (ইংরাজি ১৭৭০সালে) -যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মনন্তর রূপে পরিচিত। বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছিল। আর দ্বিতীয় বার এসেছিল ১৯৪৩ সালে।সে দুর্ভিক্ষটি এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিজয়ী করার কাজে বিপুল অর্থ ও রশদ জোগানোর পরিণতিতে। বাংলার বহুলক্ষ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে পথে-ঘাটে কুকুর বিড়ালের ন্যায় প্রাণ হারিয়েছিল। জালেমের সামনে আত্মসমর্পণ এভাবেই অপমানকর মৃত্যু ডেকে আনে। রোমান ও পারসিক –এ দুই বিশাল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে,বিশাল ইসলামি রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানে মুসলমানদের বহুযুদ্ধ লড়তে হয়েছে।কিন্তু বাংলার বুকে ব্রিটিশসৃষ্ট দুটি দুর্ভিক্ষে যত মানুষের প্রাণনাশ হয়েছে সে আমলের সকল যুদ্ধে তার সিকি ভাগ প্রানহানিও হয়নি। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশের কাছে মুসলমানদের রণেভঙ্গ ও পরাজয় এবং পরাজয় শেষে ১৯০ বছর যাবত আত্মসমর্পেণের এই হলো করুণ শাস্তি। অথচ ইসলামের শরয়ী বিধান হলো, কোন মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের হামলা হলে বা সে ভূমির উপর তাদের অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পেলে সে শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ তখন আর ফরজে কেফায়া থাকে না,ফরজ নামায-রোযার ন্যায় ফরজে আইনে পরিণত হয়। অথচ বাংলার মাটিতে সে ফরজ ১৭৫৭ সালে পালিত হয়নি। শুধু তাই নয়,সে ফরজ তিতুমীর ও ফকির বিদ্রোহের ন্যায় কিছু বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছর যাবত পালিত হয়নি। অথচ ফরজ পালিত না হলে কি পাপমোচন বা দোয়া কবুল হয়? তখন তো আযাব নেমে আসে।

নয়া বাকশালী নৃশংসতা

ব্রিটিশের কাছে আত্মসমর্পণ ও গোলামী ১৯৪৭য়ে শেষ হলেও বাঙালী মুসলমানের জীবনে আত্মসমর্পণ ও গোলামী পুণরায় শুরু হয় ১৯৭১য়ে। সেটি যেমন ভারতীয় দখলদারদের কাছে,তেমনি ভারতীয় সেবাদাস স্বৈরাচারি শেখ মুজিব ও তার দলীয় দুর্বৃত্তদের কাছে। মুজিব বিলুপ্ত করে দেয় ভারতের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতীক,সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত। সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত দেয় মুসলমানদের নিজ ধর্ম ও নিজ তাহজিব তমুদ্দন নিয়ে বেড়ে উঠার নিরাপত্তা। অর্থনৈতীক ও রাজনৈতীক স্বাধীনতার চেয়ে সে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক নিরাপত্তার গুরুত্বটি একজন ঈমানদারের কাছে অধীক। তেমন এক স্বাধীন ও নিরাপদ ভূগোল সৃষ্টির লক্ষ্যেই ভারতীয় মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে ভারত ভাঙ্গাকে অপরিহার্য মনে করে। কিন্তু মুজিব সে প্রকল্পকেই ব্যর্থ করে দেয়, এবং বিলুপ্ত করে পৃথক সীমান্ত। এভাবে সফল করে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় হিন্দুদের প্রকল্প। অপর দিকে ভৌগলিক সীমান্ত একটি দেশের অর্থনৈতীক ভান্ডারের তলার কাজ করে। কিন্তু ভারতের স্বার্থপূরণে শেখ মুজিব দেশের সে তলাকেই ধ্বসিয়ে দেয়। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ফলে বাংলাদেশের সম্পদ গিয়ে উঠে ভারতের ভান্ডারে। এমনকি বিদেশীদের দেয়া রিলিফের মালামালও বাংলাদেশে থাকেনি। ভারতীয়দের কাছে মুজিব এত প্রিয়। সে সাথে মুজিবের কাজ হয়,পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানাগুলোকে ত্বরিৎ ধ্বংস করা। মুজিবের সে বিনাশী প্রকল্প থেকে আদমজী জুটমিলের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল ও বহু লাভজনক প্রতিষ্ঠানও বাঁচেনি। পরিণতিতে বাংলাদেশে নেমে আসে চরম অর্থনৈতীক ধ্বস ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাংলার মানুষ তখন ক্ষুধার তাড়নায় উচ্ছিষ্ঠ খাবার খুঁজতে কুকুর-বিড়ালের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তখন কাপড়ের অভাবে নারীরা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। বাংলার নর-নারীর জীবনে মুজিব এভাবে অসহনীয় অপমান ও দুঃখ ডেকে আনে।ভারতের প্রতিটি সরকার চায়,মুজিবের সে ভারতসেবী নীতিই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পাক।

মুজিবামলের ন্যায় বাংলাদেশ আবার একপাল দস্যুদের হাতে অধিকৃত। শেখ মুজিব হলো তাদের অনুকরণীয় আদর্শ। ফলে মুজিবের ন্যায় তারাও চায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আগ্রাসী ভারতের হাতে তুলে দিতে। বাংলাদেশে বাজার তাই ভারতের বাজার। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট হলো ভারতের ট্রানজিট।অথচ বাংলাদেশী ট্রাক ট্রানজিট পায় না নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার। বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাঁধে দায়িত্ব পড়েছে ভারতীয় যানবাহন,পণ্য ও নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া। বাকশালী মুজিবের ন্যায় মুজিবকণ্যা হাসিনাও কেড়ে নিয়েছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। এখন চায়,সমগ্র দেশের উপর লাগাতর ডাকাতিকে আরো দীর্ঘায়ীত করতে। দস্যুবৃত্তির স্বার্থে চায়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উপর পূর্ণ দখলদারি।

কবরে গণতন্ত্র

গণতন্ত্রের রীতি হলো,জনগণকে ভোটকেন্দ্রে হাজির করা এবং তাদের রায় নিয়ে সরকার গঠনের ব্যবস্থা করা। জনগণ ভোটকেন্দ্র বর্জন করলে বা তাদের ভোটকেন্দ্রে আসার ব্যবস্থা না করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। খেলার মাঠে প্রতিদ্বন্দি একটি দল যদি মাঠে না নামে, কোন পক্ষে যদি একটি গোলও হলো না –তবে সে খেলায় হার-জিত নির্ধারিত হয় কীরূপে? স্বভাবতঃই সে খেলা তখন পরিত্যক্ত হয়। এ সহজ বিষয়টি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? অথচ দেশের সংসদীয় নির্বাচন ফুটবল খেলা নয়,সমগ্র দেশবাসীর জন্য এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু হাসিনা সরকারের কাছে সকল দলের অংশদারিত্বমূলক নির্বাচন গুরুত্ব পায়নি। নির্বাচনের নামে সরকারের আয়োজনটি ছিল ভোট ডাকাতির, নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়। পরিকল্পিত ভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে বিরোধগুলি নির্বাচন বয়কট করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিলে সে ডাকাতিকেই বরং বৈধতা দেয়া হতো। তাই সরকারের দায়িত্ব হলো,এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায় এবং নিজেদের রায় প্রয়োগ করে। নইলে গণতন্ত্র কবরস্থ হয়।শেখ হাসিনা জেনে বুঝেই নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।কারণ সে জানতো,ভোটকেন্দ্রে জনগণের উপস্থিতির অর্থ তার নিশ্চিত পরাজয়। তাই বেছে নেয় ভোটারবিহীন নির্বাচন।সে ডাকাতির লক্ষ্যেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে নিজ হাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল দায়দায়িত্ব কুক্ষিগত করে। ফলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীরিতে বাংলাদেশে কোন নির্বাচন হয়নি। হয়েছে নিরংকুশ ভোট ডাকাতি। ১৫১টি আসনে কোন ভোট কেন্দ্রই খোলা হয়নি। দেশজুড়ে শতকরা ৫ ভাগও মানুষও ভোট দেয়নি। নির্বাচনের নামে বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় জঘন্য অপরাধ কি আর কোন কালে ঘটেছে?

চোর-ডাকাতেরা চুরি-ডাকাতির মালকে সব সময়ই নিজের মাল রূপে দাবি করে।তেমনি বাকশালী ভোট ডাকাতেরাও ভোট ডাকাতিতে অর্জিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ধরে রাখাকে তারা নিজেদের বৈধ অধিকার রূপে দাবী করছে। তাদের ঘোষণা,যে কোন মূল্যে তারা পুরা মেয়াদ ক্ষমতায় থাকবে। এরপর তারা যে আবার ভোট ডাকাতিতে নামবে তা নিয়েও কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? শুধু হাসিনাকে নয়, তার পুত্র জয়কেও তখন ডাকাতির অধিকার দিতে হবে। কারণ ডাকাতির শাস্তি না হলে সে ডাকাতেরা যে বার বার হানা দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এ ভোট ডাকাতগণ এখন লাগাতর যুদ্ধ শুরু করেছে। লক্ষ্য,যুদ্ধ করে তাদের ডাকাতিলব্ধ শাসন ক্ষমতাকে ধরে রাখা। তাতে দেশ যদি পুরাপুরি ধ্বংসও হয়ে যায় তাতেও তাদের আপত্তি নাই। কারণ,তাদের কাছে রাষ্ট্র হলো ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত মাল। আর ডাকাতির মালে আগুণ লাগলে তো ডাকাতদের কোন ক্ষতি হয় না। ক্ষতি তো তাদের যারা সে মালের প্রকৃত মালিক। স্বৈরাচারি শাসকেরা এজন্য গদি বাঁচাতে দেশবাসীর মাথার উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। গদীর তুলনায় দেশের মূল্য তাদের কাছে অতি নগন্য। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধ্বংস নিয়ে শেখ হাসিনার বাকশালী সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই। শত শত মানুষের মৃত্যু নিয়েও তার মনে কোন দুঃখবোধ নেই। বরং অতীতে নিছক ক্ষমতা লাভের লোভে দলীয় কর্মীদেরকে এক লাশের বদলে ১০ লাশ ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই চলমান আন্দোলনে যত জীবননাশই ঘটুক বা যত বাস-ট্রেনই জ্বলুক,তাতে শেখ হাসিনার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি গদি ছাড়তে রাজি নন।বাংলাদেশের চলমান আন্দোলনে মাত্র একদিনে যত মানুষ প্রাণ দিচ্ছে,১৯৬৯ সালে সমগ্র আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তার অর্ধেক মানুষেরও প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু তাতেই আইয়ুব খান পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি সিরিয়ার স্বৈরাচারি শাসক বাশার আল আসাদের পথ ধরেছেন।বাশার আল আসাদ সিরিয়ার বুকে নিরস্ত্র জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অসম্ভব করে দিয়েছে। এবং দেশকে এক ভয়ানক যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। তার বোমারু বিমানগুলো নিরস্ত্র মানুষের গৃহের উপর বোমা ফেলছে। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। আলেপ্প,হোমস,হামাসহ সিরিয়ার বড় বড় শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। শহর ছাড়িয়ে যুদ্ধ এখন গ্রামে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ক্ষমতালোভী বাশার এরপরও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নয়।

নিরেট ধর্মীয়

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট স্রেফ রাজনৈতীক নয়। তাছাড়া যা কিছু রাজনীতির বিষয়,সেটি মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার বিষয়ও। এটি ধর্মীয়। ব্যক্তির দেহ থেকে তার মাথা বা হৎপিন্ডকে আলাদা করা যায় না। আলাদা করলে দেহ বাঁচে না। তাই যা কিছু মাথা বা হৃৎপিন্ডের বিষয় তা ব্যক্তির দেহের বিষয়ও। তেমনি মুসলমানের ধর্মকর্ম থেকে তার রাজনীতিকে পৃথক করা যায়না।তার রাজনীতির মধ্যেই প্রকাশ ঘটে তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস বা আক্বীদা। তাছাড়া রাজনীতি হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর নির্দেশিত আইন ও হিদায়েত প্রতিষ্ঠার মূল হাতিয়ার। তাই মুসলমানের জীবন থেকে রাজনীতিকে পৃথক করলে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার মিশনটি মাঠে মারা পড়ে। রাজনীতির ময়দানে তখন সে দর্শকে পরিণত হয়। অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র নিজে কখনোই রাজনীতির দর্শক ছিলেন না। তাঁর জীবনে ইসলাম কি শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমাবদ্ধ ছিল? তিনি স্বয়ং ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান;এবং যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন নিজে। তাঁর ন্যায় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন তাঁর মহান সাহাবাগণও। সে সূন্নতকে মানতে হয় তো প্রতি যুগের প্রতিটি ঈমানদারকেই। তবে ঈমানদারের কাছে রাজনীতিতে অংশ নয়ার অর্থ স্রেফ ভোটদান নয়।শুধু মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দেয়াও না। মু’মিনের জীবনে রাজনীতি তো পূর্ণাঙ্গ জিহাদ; সেটি ইসলামের শত্রু নির্মূলের এবং শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। মুসলমান তো সে কাজে তার জানমালের বিশাল কোরবানীও পেশ করে। দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনীতি হলো মূল ইঞ্জিন। চাষাবাদ,ব্যবসা-বাণিজ্যে,শিল্প ও শিক্ষা-চিকিৎসায় যতই বিনিয়োগ হোক তাতে দেশের রাজনীতির ইঞ্জিন ডিরেকশন পাল্টায় না। মসজিদের জায়নামাজে বসে দোয়াদরুদ পাঠেও তাতে পরিবর্তন আনা যায় না। খোদ নবীজী (সাঃ) তাই ইঞ্জিনের ড্রাইভিং সিটে বসেছেন। নবীজী (সাঃ)ইন্তেকালের পর সে সিটে বসেছেন হযরত হযরত আবু বকর (রাঃ),হযরত উমর(রাঃ),হযরত ওসমান(রাঃ),হযরত আলী (রাঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিবর্গ। প্রতিদেশে ও প্রতিমুহুর্তে মুসলমানদের তো সে নীতিই অনুসরণ করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সে ড্রাইভিং সিটে কি তাই ইসলামের শত্রুদের বসানো যায়? তাতে কি ইসলাম বাঁচে? হাসিনা ও তার মন্ত্রীগণ যে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠার বিরোধী –সেটি কি কোন গোপন বিষয়? শরিয়তের বিরোধীতা করলে সে ব্যক্তি যে মুরতাদ হয়ে যায় তা নিয়ে কি আলেমদের মাঝে কোন দ্বিমত আছে? শুধু যাকাত দেয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় সে মুরতাদদের হযরত আবু বকর হত্যা করেছিলেন। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের বিদ্রোহ তো সমগ্র শরিয়তের বিরুদ্ধে। এমন মুরতাদদের কি মুসলিম দেশের শাসন ক্ষমতায় বসানো যায়? তাই হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানো আর একজন হিন্দুকে বসানোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

তাই মু’মিনের ঈমানী দায়বদ্ধতা স্রেফ নামাযী,রোযাদার বা হাজি হওয়া নয়। রাজনীতির ময়দানেও তাকে বিশাল দায়ীত্ব পালন করতে হয়। প্রতিটি ঈমানদার তো সে দায়িত্বপালনে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা। বাংলাদেশের মুসলমানদের দ্বারা সে দায়িত্ব কি আদৌ পালিত হয়েছে? পালিত হয়নি বলেই দেশ আজ  আওয়ামী বাকশালীদের ন্যায় ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুদের হাতে অধিকৃত। চোর-ডাকাত ধরতে হলেও তাদের পিছনেও বহুদূর দৌড়াতে হয়। আহত বা নিহত হ্ওয়ার ঝুঁকিও নিতে হয়। সমাজ এবং রাষ্ট্র তো এমন সাহসী মানুষদের কারণেই চোর-ডাকাত মুক্ত হয়। আর রাষ্ট্রকে ইসলামের শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করার কাজ তো বিশাল। সে কাজে শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবীর প্রাণ গেছে। মু’মিনের জীবনে সে প্রয়াসই তো পবিত্র জিহাদ।মু’মিন মহান আল্লাহতায়ালা থেকে সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি পায় তো এ জিহাদে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালা চান,প্রতিটি ঈমানদার ব্যক্তি সে জিহাদে লাগাতর নিযুক্ত থাকুক। আর মু’মিনের জীবনে সেটি ফরজ করতেই পবিত্র কোরআনে “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থাৎ “ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়ের নির্মূল”কে মু’মিনের জীবনে মূল মিশন রূপে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর উপর ঈমান আনার সাথে সাথে মু’মিনের জীবনে জিহাদ তাই অনিবার্য কারণেই এসে যায়। ফরয নামায প্রতিদিন ৫ বার।প্রতি বছর এক মাসের জন্য আসে রোযা। সারা জীবনে মাত্র একবার মাত্র আসে হজ। কিন্তু মু’মিন ব্যক্তিকে “ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়ের নির্মূল”য়ের জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয় প্রতি দিন এবং প্রতিমুহুর্ত। জিহাদে কোন কাজা নাই। যারা সে জিহাদে অর্থ,শ্রম,মেধা ও প্রাণের কোরবানি দেয়,পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার তাদের গুনাহ মাফ ও নিয়ামত ভরা জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করার ওয়াদা করেছেন। শহীদদের তিনি বিনা বিচারে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় নির্মূলের সে ফরজ কাজটি পালিত হয়নি। বরং ঘটেছে উল্টোটি; ন্যায়ের বদলে বিপুল ভাবে বেড়েছে অন্যায়। ফলে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ১৯৭৫ সালে স্বৈরাচারি শেখ মুজিব নির্মূল হয়েছিল। কিন্তু মুজিবের গড়া অপরাধি সংগঠণ বাকশালী আওয়ামী লীগ বেঁচে গিয়েছিল। ফলে দলটি ভয়ানক চরিত্রের দুর্বৃত্ত উৎপাদনে দীর্ঘায়ু পায়।তারই ফল দাড়িয়েছে,বাংলাদেশ আজ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত। তাই শুধু হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকট কাটবে না। তাতে শান্তিও আসবে না। সে জন্য যা অপরিহার্য তা হলো,শুধু আওয়ামী বাকশালীদের নয়,সকল ইসলামবিরোধীদের শিকড় নির্মূল।আরবের ভূমি থেকে নবীজী (সাঃ)আবু জেহেল,আবু লাহাব ও ইহুদীদের শিকড় নির্মূল করেছিলেন বলেই সে ভূমিতে ইসলামের বিরুদ্ধে ভিতর থেকে কোন বিপ্লব হয়নি।ফলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ সেদিন সম্ভব হয়েছিল।নবীজী (সাঃ)র রাজনীতির এটিই ছিল বিশাল প্রজ্ঞা।সে প্রজ্ঞা নিয়ে বাঁচতে হবে বাংলার মুসলমানদেরও।

মুজিবের চেয়েও বর্বর

শাপ-শকুন ও গরু-বাছুর ইতর জীব। কিন্তু সে ইতর জীবদের চেয়ে অধীক ইতর হলো তারা যারা সে ইতর পশুদের দেবতা রূপে পুজা দেয়। কারণ,ভক্ত পুঁজারীগণ যত অর্থশালী বা ডিগ্রিধারিই হোক না কেন,যে দেব-দেবীকে তারা নিজেরা পুঁজা দেয় তার চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ হতে পারে? তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এরূপ কাফেরদের শুধু পশু নয়,পশুদের চেয়েও ইতর বলেছেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়,“উলায়িকা কা’আল আনয়াম বাল হুম আদাল” অর্থঃ তারাই হলো গবাদি পশু,বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতি নৃশংস ও স্বৈরাচারি চরিত্র ছিল শেখ মুজিবের। তার হাতে শুধু গণতন্ত্র হত্যা হয়নি।অগণিত মানব হত্যাও হয়েছে। সিরাজ সিকদারকে বন্দি অবস্থায় হত্যা করে সে খবরটির ঘোষণা শেখ মুজিব দম্ভ ভরে সংসদে এসে দেয়। মুজিবের তিন বছরের শাসনে ৩০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে রক্ষি বাহিনী দিয়ে হত্যা করা হয়। বহু লক্ষ বিহারীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেড়ে নিয়ে তাদেরকে বস্তিতে বসানো হয়। কোন সভ্য দেশে কি এমন নৃশংসতা ঘটে? মুজিবের জীবনে মূল মিশনটি ছিল ভারতের সেবাদাস রূপে দায়িত্ব পালন করা।সেটির প্রমাণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাই একমাত্র দলিল নয়।ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি,পদ্মার পানি ও বাংলাদেশী ভূমি বেরুবাড়িকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার ন্যায় আরো অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধেও মুজিবের আক্রোশ কি কম ছিল? ভারত, রাশিয়া ও চীনের দালালদের এবং নাস্তিক কম্যুনিষ্টদের রাজনৈতীক দল গড়ার অধিকার দিলেও সে অধিকার ইসলামপন্থিদের দেয়নি। এমন এক জঘন্য স্বৈরাচারি ও খুনি মুজিবকে যারা বঙ্গব্ন্ধু বা জাতির পিতা বলে তারা কি তার চেয়ে আদৌ ভাল হতে পারে? বরং নৃশংসতায় তারা যে স্বৈরাচারি ও খুনি মুজিবকে ছাড়িয়ে যাবে সেটিই তো অতি স্বাভাবিক। আর সেটিরই শতভাগ প্রমাণ রেখে চলেছে আওয়ামী বাকশালীদের ক্যাডার ও শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার।

চুক্তিনামাটি মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

ঈমানদারীর দায়ভারটি স্রেফ নিজ দেহ,নিজ বসন বা নিজ বাসস্থানের পবিত্রতা নয়। বরং সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের।মোমিনের জীবনে এটি এক বিশাল দায়বদ্ধতা।মু’মিনের রাজনীতির মূল মিশন,রাষ্ট্রের বুকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথ গড়ে তোলা। মু’মিন চায়,রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের পূর্ণ বিজয়। চায়,শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। আগাছার মাঝে ফসল ফলে না,তেমনি অনৈসলামি শিক্ষা,সংস্কৃতি,রাজনীতি,প্রশাসনিক কাঠামোর মাঝে ইসলামের প্রতিষ্ঠা হয় না। এজন্যই কৃষক যেমন আগাছা নির্মূল করে,মু’মিন ব্যক্তিও তেমনি ইসলামের শত্রু নির্মূল করে।এ কাজে আপোষ চলে না। সে মিশনটি মহান আল্লাহতায়ালারও। সেটি হলো,“লিইয়ুযহিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি” অর্থঃ সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়। (সুরা সাফ)। মু’মিনের জীবনে যুদ্ধ তাই অনিবার্য রূপে দেখা দেয়।কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে জেঁকে বসা ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা ছাড়ে না। একারণেই ইসলামের বিজয় জানমালের বিপুল কোরবানী চায়।ইসলামের প্রাথমিক যুগে দুর্বৃত্তদের আধিপত্য নির্মূলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।তাদের সে রক্তের জোয়ারেই ভেসে গিয়েছিল আরব জালেমদের সাথে রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যের জালেমগণও।ফলে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পায় মুসলমানগণ। তেমন এক বিশাল বিনিয়োগের গুরুত্ব কি বাংলাদেশেও কম?

ইসলাম কবুলের সাথে সাথে মানব চরিত্রে সবচেয়ে বিশাল ও বিপ্লবাত্মক ঘটনাটি ঘটে যায়। এটি স্রেফ কালেমা পাঠ নয়। স্রেফ নামায-রোযা আদায়ও নয়। বরং মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নিজের প্রিয় জানমালের বিক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হওয়া।পব্ত্রি কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ঈমানদারের জানমাল ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিটি এসেছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়,তারা হত্যা করে(ইসলামের শত্রুদের)এবং নিজেরাও নিহত হয়।এটি আল্লাহর এমন এক ওয়াদা যার সত্যতা তাওরাত,ইঞ্জিল ও কোরআনে বর্নিত হয়েছে।এবং আল্লাহর চেয়ে ওয়াদা পালনে আর কে নিষ্ঠাবান? অতএব তোমরা উৎসব করো সে বিক্রয়নামাহ নিয়ে যা তোমারা আল্লাহর সাথে সম্পাদন করেছো, এবং সেটিই তো হলো শ্রেষ্ঠ বিজয়।” –(সুরা তাওবাহ আয়াত ১১১)। এ চুক্তির পর মু’মিনের জানমাল আর তার নিজের মালিকানায় থাকে না। তা মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত সম্পদে পরিণত হয়। মু’মিনে দায়ভার হলো, মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত সে জানমাল তার রাস্তায় বিলিয়ে দেয়া।

প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্তে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পাদিত চুক্তির স্মরণকে নিয়ে বাঁচাই মুসলমানের জীবনে সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা। সাহাবায়ে কেরাম এ চুক্তিনামাকে স্রেফ তেলাওয়াতের  মাঝে সীমিত রাখেননি। বরং সেটির প্রয়োগ করেছেনে জীবনের প্রতি পদে। তারা আল্লাহর শত্রুদের যেমন হত্যা করেছেন,তেমনি নিজেরাও নিহত হয়েছেন। সে চুক্তি পালনে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই সাহাবাদের উপর এত খুশি।পবিত্র কোরআনে বলেছেন,“রাযী আল্লাহু আনহুম” অর্থঃ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে সে পবিত্র চুক্তির প্রয়োগ কই? আল্লাহর রাস্তার জিহাদ ছাড়া কি সে চুক্তির প্রয়োগ সম্ভব? কিন্তু বাঙালী মুসলমানের জীবনে সে জিহাদ কই? নিজের জীবনদান ও ইসলামের শত্রুদের নির্মূলের সে আয়োজনটিই বা কই? বরং তাদের সদস্যপদ তো ইসলামের বিপক্ষীয় সেক্যুলার রাজনৈতীক দলগুলোর সাথে। ফলে তাদের রাজনীতিতে জিহাদ এবং সে জিহাদে প্রাণদানের অঙ্গিকার নাই। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মনিয়োগের বদলে তারা নিজেরই বরং অন্যায়ের প্রসারে জড়িত। তারা বায়াত নেয় এমন সব পীরদের হাতে যাদের কাজ হলো জিহাদের ময়দান থেকে জনগণকে দূরে রাখা এবং ইসলামের পরাজয়কে সহনীয় করা। তারা যেমন সেক্যুলার দলগুলিকে অর্থ দেয়,তেমনি সে নির্বাচনে দলগুলোর নেতাদের ভোটও দেয়। প্রয়োজনে তাদের পক্ষে লাঠিও ধরে। এমন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কি ইসলামের বিজয় আসে? বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয় পেয়েছে তো এমন মুসলমানদের পক্ষ থেকে অর্থদান,ভোটদান ও শ্রমদানের কারণে। অথচ প্রকৃত ঈমানদার কখনোই নিজ ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয় মেনে নেয় না।এমন আত্মসমর্পণে কখনোই ঈমান বাঁচে না। বরং তাতে প্রবলতর হয় শয়তানি শক্তির আধিপত্য।কোন সেক্যুলার বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য দলের সদস্য হওয়া তাই মুসলমানের কাজ নয়। ইসলামের এটি হারাম। মু’মিন ব্যক্তি তাই কোন সেক্যুলার দলকে বিজয়ী করতে ভোট দেয় না;অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগও করে না। বরং তার জীবনে অনিবার্য রূপে যেটি দেখা দেয় সেটি হলো জিহাদ। জিহাদ না থাকার অর্থ ঈমান না থাকা। মহান নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ হাদীসঃ “যে ব্যক্তি কখনো জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”

জিততে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে

জিহাদ শুধু রণাঙ্গণে হয় না। লাগাতর যুদ্ধ হয় বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণেও। অথচ বাংলাদেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি ঘটেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এ রণাঙ্গেন ইসলামের পক্ষে লড়াকু সৈনিকের প্রচন্ড অভাব। বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে পরাজয়ের ফলেই চেতনার ময়দানে প্রবল ভাবে বেঁচে আছে সেক্যুলারিজম। চেতনা রাজ্যে সেক্যুলারিজমের বিজয়ে মানুষ আল্লাহমুখি ও পরকালমুখি না হয়ে দলে দলে শয়তানমুখি ও দুনিয়ামুখি হয়েছে। দুনিয়ামুখি এমন মানুষেরা সামর্থ হারায় মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক হওয়ায়। সে তখন রাজনীতির ময়দানে সেক্যুলার দল খোঁঝে এবং সে দলের পক্ষে অর্থদেয়,ভোট দেয় ও লাঠি ধরে।বাকশালীরা পায়ের তলায় মাটি পায় তো এদের কারণে। বাংলাদেশে এরাই সমাজতন্ত্রি, কম্যুনিস্ট ও নানা জাতের বামপন্থি জীবাণূতে পরিণত হয়েছে। এমন কি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ দস্যুগণও এদের মাঝ থেকে প্রচুর সেবাদাস পেয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৭০ হাজার ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছে। তাদের মধ্যে বহু হাজার ছিল কবি কাজি নজরুল ইসলামের মত মুসলমান। সেক্যুলরিজমের মিশনঃ পরকালের স্মরণকে ভূলিয়ে মানুষকে ইহকাল মুখি করা। ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল যুদ্ধটি এখানেই। এ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে তাদের অস্ত্রের ভান্ডার যেমন বিশাল,তেমনি ইন্সটিটিউশনের সংখ্যাও বিপুল। পতিতাপল্লি, মদ্যশালা, ক্লাব, ক্যাসিনো, নাট্যশালা, সিনেমা হল, সূদী ব্যাংক –এসবই হলো শয়তানের প্রতিষ্ঠান যা মানুষকে আখেরাতের ভয়-ভাবনা ভূলিয়ে দুনিয়ামুখি করে। ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধই এগুলোর মূল কাজ। মানুষকে জাহান্নামমুখি করতে শয়তান এখন মুসলমানদের পুতুলপুজায় ডাকে না। সে লক্ষ্যে সেক্যুলারিজম হলো তার মুল হাতিয়ার। এমন মতবাদের দীক্ষা নেয়া ইসলামে এজন্যই হারাম। এমন চেতনায় ঈমান বাঁচে না। আল্লাহর ভয় ও উত্তম চরিত্রও গড়ে উঠে না। তাই বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলির জনগণ যতই সেক্যুলারিজমের জোয়ারে ভাসছে ততই দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ছে।এবং ততই বাড়ছে আওয়ামী-বাকশালী শক্তির ভোটব্যাংক।

 

নবীজী (সাঃ)ও তার অনুসারি সাহবাগণ একমহুর্তের জন্য সেক্যুলার বা দুনিয়ামুখি ছিলেন না। বরং তাঁর জীবনের প্রতি মুহুর্তের বাঁচাটিই ছিল ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ও কোরবানী নিয়ে বাঁচা। এবং নবীজী (সাঃ)কে পূর্ন অনুসরণ করেছেন সাহাবায়ে কেরাম। অথচ আজকের মুসলমানদের সমগ্র চেতনা জুড়ে সেক্যুলারিজম। জিহাদের ময়দান এজন্যই সৈনিকশূণ্য। জিহাদের ময়দানে তো তারাই হাজির হয় যারা দ্রুত পরকালের মহাকল্যাণ চায়। মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছতে চায়। অন্ধকার কবরের আযাব,পুলসিরাতের বিপদ,আলমে বারযাখের অপেক্ষা এবং হাশরের ময়দানের “ইয়া নফসি ইয়া নফসি”র যাতনা এড়িয়ে যারা সরাসরি জান্নাতে হাজির হতে চায় তারাই তো জিহাদের ময়দানে হাজির হয়।বেশীর ভাগ সাহাবা তো এমন ভাবনা নিয়েই সে পথ ধরেছিলেন। কিন্তু দুনিয়ামুখি লোকদের সে আগ্রহ থাকে না। তাই যে দেশে সেক্যুলার চেতনার বিজয়,সেদেশের রাজনীতিতে ইসলামের পরাজয়টি অনিবার্য। নামে মুসলমান হলেও তাদের আগ্রহ থাকে না ইসলামের বিজয়ে। বরং ইসলামের বিজয়কে তারা চরমপন্থি জঙ্গিবাদ মনে করে। এমন দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এজন্যই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এজন্যই বিজয়ী হয়েছে দুনিয়াদারগণ। অথচ ইসলামের বিজয়ে শ্রমদান,অর্থদান ও প্রাণদান মূলতঃ প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানী দায়বদ্ধতা। মু’মিনের জীবনের সে দায়বদ্ধতা গভীরতর হয় পরকালমুখিতার কারণে।

আরবের মানুষেরা মহান আল্লাহতায়ালাকে যে অবিশ্বাস করতো তা নয়। নবীজী (সাঃ)র জন্মের বহু আগে থেকেই তারা আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করতো; নিজেদের সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ,ওবায়েদুল্লাহ,আব্দুর রহমান রাখতো। কিন্তু তাদের অবিশ্বাস ছিল আখেরাতে। চেতনায় তারা সেক্যুলার বা ইহকালমুখি ছিল। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদের চেতনার ভূমিতে মূল হামলাটি হয় তাদের সেক্যুলার চেতনার নির্মূলে। সেটি সম্ভব হয় কোরআনী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার মধ্য দিয়ে। ফলে আমূল বিপ্লব (প্যারাডাইম শিফ্ট) আসে তাদের সমগ্র চেতনা রাজ্যে জুড়ে। ফলে পাল্টে যায় তাদের জীবনের মূল গতি। পবিত্র কোরআনই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত সবচেযে কার্যকর অস্ত্র। আজও  মুসলমানদের সে অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। একমাত্র এ কোরআনী অস্ত্রই সেকালের সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় একালের সেক্যুলারিস্টদেরও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পরাজিত করতে পারে। তাদেরকে নির্মূল করতে পারে রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক ভাবেও। নইলে বাংলাদেশের মাটিতে বার বার আন্দোলন হবে। বহু মানুষের রক্তও ঝরবে, অর্থনৈতীক ক্ষয়ক্ষতিও হবে কিন্তু ইসলামের বিজয় আসবে না। এবং এতে ইসলামের শত্রুদের শিকড়শুদ্ধ নির্মূলও সম্ভব হবে না। বরং অতীতের ন্যায় বার বার আন্দোলনের ফসল তুলবে ইসলামের শত্রুপক্ষ।বাংলাদেশের চলমান আন্দোলন থেকে ইসলামের পক্ষে বিজয় আনতে হলে এ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

রণেভঙ্গ দেয়াটি কবিরা গুনাহ

জিহাদের বল বিশাল। জিহাদই পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নামিয়ে আনে। সে সাহায্যের বলে বিশাল বিশ্বশক্তিকে পরাজয় করাও তখন সহজ হয়ে যায়। কারণ বিজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকেই। পবিত্র কোরআনে সে সত্যটি ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে,“ওয়া মা নাছরু ইল্লা মিন ইন্দিল্লাহ, ইন্নাল্লাহা আজিজুন হাকীম।”–(সুরা আনফাল আয়াত ১০)। অর্থঃ “বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহ থেকেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী”। ঈমানদার তাই নির্ভীক হয়। এক কালে সোভিয়েত রাশিয়া একটি বিশ্বশক্তি ছিল। ১৯৭৯ সালে দেশটি আফগানিস্তানের উপর হামলা করে বসে। আফগান জনগণ তখন বিদেশী অস্ত্র বা আর্থিক সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকেনি। হাতের কাছে যা পেয়েছে তা দিয়েই হানাদার রুশদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করে,প্রায় এক যুগ যুদ্ধ করার পর সোভিয়েত রাশিয়াকে তারা পরাজয় করে। আফগানদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে আগ্রাসন হয় আরেক বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।আফগানগণ তখনও বসে থাকেনি, সাথে সাথে জিহাদ শুরু করেছে। মার্কিন সরকার সে যুদ্ধে জিততে না পেরে ৪০টি দেশ থেকে সৈন্য ডেকে আনে। তাতেও মার্কিনীদের বিজয় আসেনি,পরাজয় কাঁধে নিয়ে তাদেরকে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে।

শেখ হাসিনা ও তার দল সোভিয়েত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। শক্তিশালী নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও। আর বাংলাদেশের মুসলগণও কি আফগানিস্তানের আড়াই  কোটি মুসলমানের চেয়ে দুর্বল? অতএব বাংলাদেশে যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতে ঈমানদারদের হারানোর কিছু নেই। বরং সামনের বিজয়ের মহাসম্ভাবনা। হাসিনা যে ইসলামের শত্রুপক্ষ তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? অতএব ইসলামের পক্ষ নিয়ে জিহাদে চালিয়ে গেলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য অনিবার্য। বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামের শত্রু পক্ষের শিকড় উপড়ানোর এর চেয়ে মোক্ষম সময় অতীতে আর কখনোই আসেনি।বাকশালীদের নেতা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা যে ইসলামের জন্য কত ক্ষতিকর সেটি বুঝতে কি বক্তৃতার প্রয়োজন আছে? তারা নিজেরই সেটি প্রমাণ করেছে। যে কোন লড়াইয়ে প্রচুর রক্তক্ষয় আছে,সম্পদ ও ঘরবাড়ির বিপুল বিনাশও আছে। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া নৃশংস জালেম শাসকদের নির্মূলের আর কোন পথও কি খোলা আছে? নবীজী (সাঃ)কি লড়াইয়ের এ পথ ছাড়া অন্য কোন পথে বিজয় আনতে পেরেছেন?

শেখ হাসিনার সরকার যে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের প্রচার রুখতে যে বদ্ধপরিকর তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? সে লক্ষ্য নিয়েই হাসিনা সরকার বাংলাদেশে কোরআনের তাফসিরের উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে। প্রখ্যাত তাফসিরকারকদের কারারুদ্ধ করেছে। এবং ঘরে ঘরে গিয়ে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করছে।ইসলামের এমন শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ যদি ফরজ না হয় তবে আর কবে ফরজ হবে? সে জিহাদই আজ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। কোন জিহাদই দুয়েক বছরে শেষ হয়। মু’মিনের জীবনে লড়া্ই তো আমৃত্যু। শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের শত্রুদের শিকড় নির্মূল ছাড়া তা থামতে পারে না। জিহাদে রণে ভঙ্গ দেয়া বা পলায়ন করা তো কবিরা গুনাহ। বাংলাদেশের যে ১৫ কোটি মুসলমান কি জালেম শাসকের কাছে আত্মসমর্পণ বা পলায়নের পথ বেছে নিবে? হাসিনা সরকারের সাথে যারা আপোষ চায় তাদের লক্ষ্য,ইসলামের শত্রুপক্ষকে নির্মূল হওয়া থেকে বাঁচানো। তারা তাই ইসলামের শত্রুপক্ষ। যে লড়াই শুরু হয়েছে সেটিকে আরো ইসলামি করা ও প্রবলতর করার মধ্যেই কল্যাণ। তাতে আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্যপ্রাপ্তিও অনিবার্য করবে। আর আল্লাহর সাহায্য জুটলে বিজয় কি কেউ রুখতে পারে? ১৭/০২/১৫

You Might Also Like