সহিংসতার যন্ত্রণাবোধে কেঁদে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী

রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে হত্যাকাণ্ড বন্ধে দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়ে সহিংসতার যন্ত্রণাবোধে কেঁদে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যারা মানুষ পুড়িয়ে মারছে তাদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। এভাবে, নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা- এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। গত সোমবার জাতীয় জাদুঘরে ‘বিএনপি-জামায়াতের অগ্নি সন্ত্রাস: লুণ্ঠিত মানবতা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা উপ-পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও আহতদের নিয়ে প্রদর্শিত চিত্র প্রদর্শনীও ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। প্রদর্শনী দেখার সময় অনেকটা আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। এসময় তাকে কয়েকবার চোখ মুছতে দেখা যায়। পরে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেয়ার সময় অগ্নিদগ্ধদের নিয়ে কথা বলার সময়ও প্রধানমন্ত্রীর চোখে ছিল কান্নার জল। প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, কোন মায়ের কান্না কী তার বুকে বাজে না? একটু বোঝে না? একটুও মন কাঁদে না? তিনি বলেন, যারা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা শুরু করেছে- তারা মানুষের কল্যাণ চাইতে পারে না।

উপস্থিত অগ্নিদগ্ধদের দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরা তো কোন রাজনীতির সঙ্গে নেই। এই নিরীহ মানুষের ওপর কেন হামলা? জামায়াতে ইসলামী ধর্মের নামে ‘ভাঁওতাবাজি’ করছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দোজখের আগুন কেন জীবন্ত মানুষকে দেখতে হবে? কেন এই ছিনিমিনি খেলা? বাংলাদেশে কোন জঙ্গি-সন্ত্রাসীর স্থান হবে না। এর বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে।

তিনি বলেন, যাদের ভেতর একটু মানবিকতা আছে, যে রক্ত-মাংসের মানুষ- তারা তো এটা সহ্য করতে পারবে না। আর কত? কোথায় থামবে? কেন মানুষকে পুড়িয়ে মারা? এদের কি একটুও মানবিকতা নেই? বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে সংলাপের আহ্বানকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার একটা অনুরোধ থাকবে, এক পাড়ে ফেলবেন না। দয়া করে এক পাড়ে আমাকে ফেলবেন না।

তিনি বলেন, আমি রাজনীতি নিজের জন্য করি না। কোন চাওয়া-পাওয়া নেই আমার। এর প্রমাণ আমাকে দিতে হবে না। আমি রাজনীতি করি  দেশের মানুষের জন্য। এই দেশের মানুষের জন্য আমার বাবা-মা, ভাই জীবন দিয়ে গেছে। কত শহীদ রক্ত দিয়ে গেছে। এই দেশের মানুষকে আমি একটা সুন্দর জীবন দিতে চাই। সেজন্যই, আমার রাজনীতি। আমার একান্ত অনুরোধ, খুনিদের সঙ্গে, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে- তাদের সঙ্গে আমাকে এক পাড়ে ফেলবেন না। এটা আমার জন্য সব থেকে কষ্টের। আমাকেও তো হত্যার চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, বহু বাধা পেরিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি দেশকে নিয়ে। দেশের মানুষের একটা সুন্দর জীবনের জন্য দিন-রাত কাজ করছি। কিন্তু সেই মানুষগুলোকে যদি এভাবে পুড়িয়ে মারে, তাহলে এর থেকে কষ্টের কী থাকতে পারে? অনুষ্ঠানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্য ও অগ্নিদগ্ধ আহতরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিহত যশোরের জাসদ নেতা নুরুজ্জামান পপলুর স্ত্রী মাহরুফা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার চোখের সামনে আমার স্বামী-সন্তান পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। যারা পেট্রলবোমা মারছে তাদের কাছে ১৬ কোটি সাধারণ জনগণের হয়ে মাফ চাচ্ছি। জনগণ কী অন্যায় করেছে? জনগণকে  কেন পুড়িয়ে মারছেন? এভাবে মানুষ পুড়িয়ে মানুষের কল্যাণ করতে পারবেন না। বোমা হামলায় আক্রান্ত বাদাম বিক্রেতা মোশারফ হোসেন বলেন, আগুন যে এতো ভয়াবহ! আমরা কেন এর শিকার হবো? আমরা তো সাধারণ মানুষ। আমরা তো কাজ না পেলে চলবে না। আমাদের এই অবস্থা। এটা কেমন রাজনীতি? যারা করেছে, তারা সরকারের সঙ্গে কম্পিটিশন করুক। আমাদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কেন? যারা করছে, তাদের শুধু বলবো, আগুনে পুড়িয়ে মারবেন না।

১৪ বছর বয়সী সুমন ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, আমার মা ও ছোট বোন মারা গেছে। বাবার দুই হাত গেছে। এখন কিভাবে চলবে? ওইসময় কিশোর সুমনকে কাছে ডেকে নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় পুড়ে মারা যাওয়া নূর আলমের স্ত্রী চম্পা বেগম বলেন, আমার সব শেষ করে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই।

অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, যে চিত্র আপনারা দেখলেন, তারপর আর বক্তব্য থাকে না। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। রুখে না দাঁড়ালে মানবসভ্যতা থাকবে না। আসুন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলার মাটি থেকে তাদের উচ্ছেদ করি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। সঞ্চালনা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

You Might Also Like