নাগরিকসমাজের চিঠি ও আজকের বাস্তবতা

হারুন-আর-রশিদ :

​১০ ফেব্রুয়ারি অবরোধের ৩৭তম দিবস। ওই দিন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৮৭, আহত সহস্রাধিক। পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয় ৫২ জন, সংঘর্ষে নিহত ১৩ জন, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় (১৯+২৩) ৪২ জন। এই সংখ্যা যোগ করলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭। আগুনে পুড়ে বা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মৃত্যু যেমন অমানবিক, বিনাবিচারে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা আরো অমানবিক। পেট্রলবোমা যারা মারে তারা সন্ত্রাসী। সে যে দলের বা মতাদর্শেরই হোক না কেন।

কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলোÑ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জনগণের জানমালের হেফাজতকারী; তারা যদি বলেন, দেখামাত্র গুলি, বিচারের প্রয়োজন নেইÑ এ ধরনের শব্দবোমায় মানুষকে সন্ত্রস্ত করা কি অন্যায় নয়? এ কথা এখন মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে (টক অব দ্য সিটি)। সত্য কথা বলা এখন বিপজ্জনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো দলের কর্মচারী হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। আর এই রাষ্ট্রের মালিক শুধু বড় দলের নেতা-নেত্রী নন, এই রাষ্ট্র ১৬ কোটি মানুষের, যাদের ট্যাক্সের টাকায় শীর্ষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতনভাতা পেয়ে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দলীয় বাহিনীর মতো আচরণ করে জনগণের সাথে তাহলে তাদের কর্মকাণ্ড আইনি দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেটিই এখন হচ্ছে। আইনেই আছেÑ দেখামাত্র গুলি করা যাবে না। অপরাধীকে জীবিত অবস্থায় যেভাবেই হোক ধরতে হবে। সে যদি সন্ত্রাসী হয়েই থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা যাবে; এতে সন্ত্রাসের হোতাদের ধরা সহজ হবে। আর যদি সে নিরপরাধ প্রমাণিত হয়, আইনি বিধানে সে খালাস পাবে। কিন্তু আমরা দেখছি, ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে অনেক মানুষ নিহত হচ্ছে। আগের সরকারের আমলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অপরাধ-বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যারা ঘটাচ্ছেন, তারাও অপরাধী। সেহেতু তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সরকার বিশেষ কোনো দলের হতে পারে না। সব দল, ধর্ম, মত, বর্ণ ও ভাষার মানুষদের নিয়েই চলতে হবে। একই দৃষ্টিতে দেখতে হবে সবাইকে। তা হলেই সে সরকার হবে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর স্বার্থে বিগত ৪৩ বছর কোনো সরকার দেশ পরিচালনা করতে পারেনি। এ কারণেই দেশে নানা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।

৯ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার লিড নিউজ : ‘শুধু ঢাকায় বিগত এক মাসে রাজনৈতিক গ্রেফতার এক হাজার’। গ্রেফতার হওয়া সবাই বিএনপি-জামায়াতকর্মী। রাজধানীর থানাগুলোতে মামলা করা হয়েছে ২২৭টি, আসামি ১০ হাজার। ভিন্ন মতের লোকদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার ও মামলা দেয়া গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জনপ্রিয় টকশো ‘ফ্রন্ট লাইন’ প্রচার করে আসছিল বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনÑ সেটিও ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ আছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ান, একুশে টিভি, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাসহ কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিক নেতাদের বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হয়েছে। জেল খেটেছেন, জরিমানা দিয়েছেন এমন সাংবাদিকের সংখ্যাও এ আমলে কম নয়। সাগর-রুনি, ফরহাদসহ প্রায় ৩২ জন সাংবাদিক বিগত ছয় বছরে খুন হয়েছেন। মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমের বহু সংবাদকর্মী। সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত করে দেয়া হয়েছে। পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, মহান পেশার শিক্ষকসমাজকেও রাজনৈতিক বলয়ে আবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের চিন্তাচেতনার কথা একই প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে কেউই বলতে পারছেন না। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ চিত্রটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যাবে না। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফরে এসেছিলেন। ভারতের বিরোধী দলের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বারাক ওবামা এক টেবিলে বসে চা খাচ্ছেন, ডিনার করেছেন। মোদি নিজেই দাওয়াত দিয়েছেন সোনিয়া গান্ধীকে। এ দৃশ্য আমাদের দেশে চিন্তাও করা যায় না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দু’জনই তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। অথচ চলমান জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনাকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে অবলোকন করছেন। এ দিকে প্রতিদিন লাশের মিছিল বাড়ছে। দেশের অভিভাবক এখন প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষাসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় তার একক দায়িত্বে। সুতরাং রাষ্ট্রপক্ষ বলতে মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই বোঝায়। তাই চলমান সঙ্কটের তালাবদ্ধ দরজার চাবি তার হাতেই। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সা: ইহুদি বুড়ির দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতিতে তার খোঁজখবর নেয়ার জন্য তার বাড়িতে উপস্থিত হতে পেরেছেনÑ যিনি রাসূল সা:-এর চলার পথে বিষাক্ত কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। বিশ্বনবী যদি এত বড় মহানুভবতা দেখাতে পারেন, তাহলে দেশের দুই নেত্রী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কেন উদারতার এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন না? দুই নেত্রীর অনড় অবস্থা দেখে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান বলেছেনÑ দেশে এখন ‘দেখে নেয়া’র রাজনীতি চলছে। আজকের বাংলাদেশটা এ রকম : প্রতিদিন দুর্ঘটনায় বহু হতাহত, সন্তানহারা বাবা-মায়ের হৃদয়বিদারক কান্না, নিরীহ মানুষের ভোগান্তি, ক্ষমতাসীন দলে দুর্নীতির মহোৎসব, দলের কর্মীদের খুনোখুনি, পুলিশের প্রধান কাজ বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া।

১৯৭১-এর পর যার জন্ম সেও আজ ‘রাজাকার’ যদি সরকারি দলের সদস্য বা সমর্থক না হন। ভিন্ন মতের মানুষ, যাদের সাথে সরকারি দলের মতের সাথে অমিল রয়েছেÑ তারাও নাকি পাকিস্তানপন্থী। তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার বা বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিতও হন তার পরও তিনি রাজাকার। দেশের বৃৃহত্তম বিরোধী দলের সমর্থক যাদের বেশির ভাগের জন্ম ৭১-এর পর, তারা সবাই আজ রাজাকার। আওয়ামী মতাদর্শের সাথে যাদের অমিল রয়েছে তারাও সবাই আজ রাজাকার। সেই হিসেবে আজ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী রাজাকার, মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজাকার, মরহুম মেজর জলিল রাজাকার। এ কে খন্দকার, মরহুম সিরাজ সিকদার, স্টুয়ার্ড মুজিব অগণিত মুক্তিযোদ্ধা আজ একটি দলের তালিকায় রাজাকার হিসেবে ‘নিবন্ধিত’। আমাদের প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজ দলের তোষামোদকারী নেতাদের এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেবেন। এ ধরনের বক্তব্য একসময়ে বুমেরাং হয়ে নিজ দলের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে এসে জাতিকে বিভক্তির রাজনীতির মধ্যে ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখেননি।

‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি’ বলে যারা নিজেদের জাহির করেন, তারাই আজ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশকে রাজাকার বলছেন। তাদের ‘দোষ’, তারা আওয়ামী লীগ করেন নাÑ বিএনপি বা অন্যদলের সমর্থক। একজন রাজাকার যার বয়স ষাটোর্ধ্ব তিনি আওয়ামী লীগের সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন, ছবিসহ এ সংবাদ পত্রিকায় উঠেছে। তখন স্থানীয় লোকজন বলাবলি করছিলÑ একজন রাজাকার যদি আওয়ামী লীগ করে তখন সে হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষের লোক। আর আওয়ামী লীগ না করলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় রাজাকার। এই কদর্য রাজনীতির চর্চা এখনো বেগবান। মিথ্যা রাজনীতির অনুসারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হীন রাজনীতি করার কারণে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্র্রেষ্ঠ সন্তান, যেমন ভাষা সৈনিকরাÑ তারা সব দলের জন্য অহঙ্কার, তারা দেশের গর্বিত সন্তান। তাদের রাজনীতির কূটকচালে ব্যবহার করা অমার্জনীয় অপরাধ। আমরা জাতীয় ইস্যুতেও এক হতে পারছি না। একদল নিরপেক্ষ ব্যক্তি যাদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই, এসব বিশিষ্ট নাগরিক মহামান্য প্রেসিডেন্ট, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পত্র দিয়েছেনÑ চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে গ্রহণযোগ্য সংলাপের আয়োজনের জন্য। দেশের মঙ্গলের জন্য নেয়া এই উদ্যোগকেও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন ক্ষমতাসীনেরা।

৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিশিষ্ট নাগরিকদের এই উদ্যোগকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘এক-এগারো’র কুশীলবেরা সংলাপের এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। বিএনপির দোষ তাদের চোখে পড়ছে না। প্রশ্ন হলোÑ বিএনপি তো সংলাপের জন্য আগেই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এখন প্রধানমন্ত্রী সাড়া দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য দেশের তিনজন অভিভাবকের কাছে একটি পত্র দেয়া নিয়ে শুধু সরকারি দল থেকেই আপত্তি উঠেছে। সংলাপে ‘হ্যাঁ’ শব্দটি বললেই তো অবরোধ ও হরতালের অবসান এবং সহিংসতা বন্ধের সুযোগ ঘটবে। দুই দলই ভালো উদ্যোগকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘবে গ্রহণ করা উচিত। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের দায়িত্ব বেশি। উদারতার উদাহরণ সৃষ্টি করার এই সুযোগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

লেখক : গ্রন্থকার ও কলামিস্ট

Email:harunrashid ar@gmail.com

You Might Also Like