সাংবিধানিক বৈধতাই গণতান্ত্রিক সরকারের একমাত্র ভিত্তি নয়

সংখ্যাগরিষ্ঠের কাঁধে চেপে রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে আপনার অধিকার। ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন আপনি, আপনার সম্পদ। আজ যে নিরাপদ, কাল যে পতিত হতে পারে চরম অনিশ্চয়তায়। অধ্যাপক আলী রিয়াজের ভাষায়, রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে আধিপত্য মারাত্মক রূপ নিতে পারে। উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা ও প্রয়োগ সমাজে সহিংসতার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের পুরো ইতিহাসে, বাংলাদেশীদের জীবনে এমন পরিস্থিতি ফিরে এসেছে বারবার। কিন্তু কি করে আমরা এমন একটি পরিবেশে এসে পড়লাম? প্রশ্নটির উত্তর অধ্যাপক আলী রীয়াজ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সম্প্রতি প্রকাশিত How did we arrive here নামের গ্রন্থে। এই প্রবন্ধ সংকলনটি প্রকাশ করেছে প্রথমা। গ্রন্থটি নিয়ে নতুনদিনেকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সাক্ষাৎকারটি এখন সময় পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

নতুনদিন: গ্রন্থটিতে আপনি দেখিয়েছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে `হাইব্রিড রেজিম`(নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত যে সরকার অগণতান্ত্রিক উপায়ে শাসন করে)। অন্যদিকে একই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় ভিন্ন জাতিসত্ত্বা ও ধর্মাবলম্বীদের অধিকার। তাহলে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার ধারণাটির মধ্যেই কি কোন প্রকার ত্রুটি আছে?

আলী রীয়াজ: এখানে দুটো বিষয় রয়েছে; হাইব্রিড রেজিম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা। হাইব্রিড রেজিম তৈরির কারণ কিন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়; প্রধানত হাইব্রিড রেজিম টিকিয়ে রাখার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহৃত হয়। হাইব্রিড রেজিম তৈরি হয় যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় না এবং রাজনীতিবিদরা (আপনি এলিট শ্রেনীও বলতে পারেন)গণতন্ত্রকে তাদের লক্ষ্য বলে বিবেচনা করেন না – ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই তাদের লক্ষ্য হয়, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা অনুপস্থিত থাকে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয় দুর্বল থাকে বা দুর্বল করে ফেলা হয়। আপনাকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণও দেখতে হবে। যেমন যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আপনাকে অবৈধ সম্পদের মালিক করে এবং যে কোন ধরণের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করে সেখানে হাইব্রিড রেজিম সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সমাজে সম্পর্কের ভিত্তি যখন পেট্রন-ক্লায়েন্ট হয়ে দাঁড়ায় তখন এই ধরণের ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নটাকে দেখতে হবে আদর্শিকভাবে। আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে নিজেকে জাহির করেন – সেটা জাতিগত, ধর্মীয় এমনকি আদর্শিকভাবে – তখন গোষ্ঠীগতভাবেই আপনি নাগরিকের সমতার ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। এই বিষয়ে আমার সম্প্রতি প্রকাশিত আরেকটি গ্রন্থ `ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি`-তে আমি আলোকপাত করেছি। রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে আধিপত্য মারাত্মক রূপ নিতে পারে। উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা ও প্রয়োগ সমাজে সহিংসতার সৃষ্টি করে।

নতুনদিন: বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে কোন সরকারকে বৈধতা দেওয়া শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ধারণা হচ্ছে- সংখ্যাগরিষ্ঠতাই গণতন্ত্র। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত জানান।

আলী রীয়াজ: সংখ্যাগরিষ্ঠতাই গণতন্ত্র মনে করাটা মারাত্মক ভুল। আমি গণতন্ত্রকে দেখি ভিন্নভাবে। গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যালঘুর অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা সংখ্যালঘু মানুষকে – জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনোভাবে সংখ্যালঘু – যত কম নিরাপত্তা দিতে পারে সে ব্যবস্থা ততটাই কম গণতান্ত্রিক। নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে তার দায়িত্ব দেশ শাসন করা, দেশ তো কেবল সংখ্যাগুরুর নয়; তাই তার কাজ হচ্ছে সংখ্যালঘুর কথা গভীরভাবে শোনা, তার কণ্ঠস্বরকে বিবেচনায় নেয়া। নির্বাচনে আজ যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন আগামীতে তো তাঁদের সংখ্যালঘু হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আইনী ও সাংবিধানিক বৈধতাই গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতার একমাত্র ভিত্তি হতে পারেনা; সেটা সূচনা মাত্র। তদুপরি, আইন ও গণতন্ত্রের মর্মবস্তু কি বলে? বলে আপনাকে নাগরিকের সম্মতি নিতে হবে, নাগরিকের সম্মতির একটা উপায় হল নির্বাচন; কিন্ত জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আপনি যদি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর দিকে তাকান, ইতিহাস দেখেন – দেখবেন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা `আইনীভাবে` বৈধ। কিন্ত তাঁদের অবশ্যই আপনি `গণতান্ত্রিক` বলবেন না।

নতুনদিন: তুলনামূলকভাবে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা ও বাংলাদেশে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণার মধ্যে কোন গুণগত পার্থক্য আছে কি?

আলী রীয়াজ: আপনার প্রশ্নের ব্যাপারে একটু বলে নেই; আমি ঠিক `উন্নত গণতান্ত্রিক` এবং `অনুন্নত গণতান্ত্রিক` বলে ভাগ করি না। আপনি বলতে পারেন যেখানে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, সংহত (কন্সোলিডেটেড অর্থে) হয়েছে এবং যেখানে হয়নি। আপনি যদি একেবারে সংখ্যার বিবেচনায় বলেন তা হলে পৃথিবীর সর্বত্রই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা অভিন্ন। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে রাজনীতি ও সমাজে আপনি সেটা কীভাবে ব্যবহার করছেন। যে সব দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা জনমত জানার একটা উপায় বলে বিবেচিত হয়। লক্ষ্য করলে দেখবেন পৃথিবীর অনেক দেশে এখন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। নতুন গণতান্ত্রিক দেশের অধিকাংশই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি চালু হয়েছে; যে সব দেশে দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে সে সব দেশের অনেকগুলোতে এই পদ্ধতি চালু আছে। ফলে প্রশ্নটা হল আপনি আপনার `সংখ্যাগরিষ্ঠতা` দিয়ে কি করছেন।

নতুনদিন: আপনি দেখিয়েছেন, নির্বাচন পদ্ধতি থাকলেই কোন দেশে গণতন্ত্র থাকবে, তার কোন নিশ্চয়তা নাই। এই অনুসিদ্ধান্ত কি যে কোন নির্বাচন পদ্ধতির জন্যই প্রযোজ্য?

আলী রীয়াজ: নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি উপাদান; কিন্ত একমাত্র উপাদান নয়। কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে না; সেটা যে কোনো দেশের জন্যেই সমপরিমাণে সত্য। উন্মুক্ত, অবাধ, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আর কোনো উপায়ের কথা আমরা এখন পর্যন্ত জানি না, কিন্ত কেবল নির্বাচন করলেই একটা দেশ গণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হতে পারেনা।

নতুনদিন: আপনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শিক কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেনি। একারণেই কি সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতো ধারণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক দলগুলো?

আলী রীয়াজ: হ্যাঁ, আমার ধারণা যেহেতু আদর্শিকভাবে দলগুলো, বিশেষত প্রধান দুই দল, তাঁদের নৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি সেহেতু তাঁরা বল প্রয়োগের ওপরে নির্ভর করে, তাঁরা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দেশ শাসন করতে চায়। তা ছাড়া দেশে কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, সেটাও একটা অন্যতম কারণ।

নতুনদিন: বাংলাদেশ প্যারাডক্সের কথা বলছেন। কিন্তু অনেকেই তো বাংলাদেশ প্যারাডক্স ধারণাটি মেনে নিতে চান না। তাহলে আপনি কেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্রটিকে প্যারাডক্স মনে করছেন।

আলী রীয়াজ: বাংলাদেশ প্যারাডক্সের যে ধারণা সেটা আমরা সাধারণত অর্থনীতির সাফল্যের দিকে তাকিয়ে বলি। সেটা একটা দিক। সুশাসনের অভাব স্বত্বেও দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে সেটার দিকেই মনোযোগ দেয়া হয়। কিন্ত আমি এটাও মনে করি যে এর আরো কয়েকটা দিক আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের যারা রূপকার – কৃষক, গার্মেন্টসের শ্রমিক – বিশেষত নারীরা, এবং স্বল্প মেয়াদে অভিবাসী শ্রমিক গোষ্ঠী – তাঁদের প্রতি রাষ্ট্র এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণের মধ্যে একটা প্যারাডক্স আছে। এদের সাফল্যের সুফল ভোগ করা স্বত্বেও তাঁদের প্রতি দেশ ও রাষ্ট্র যে অবহেলা প্রদর্শন করে সেটা রীতিমত অবিশ্বাস্য। তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ড বা রানা প্লাজার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী পরিস্থিতি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ; কিন্ত এই অবমাননাকর অবস্থা প্রতিদিন চলছে কিন্ত তার প্রতি কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি সেদিকেও মনোযোগ দেবার তাগিদ দিতে চাই। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও একটা বড় প্যারাডক্স আছে – বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র চায়, তার জন্যে বহুবার প্রাণ দিয়েছেন, কিন্ত এখনও গণতন্ত্রের ন্যূনতম কাঠামোগুলো, প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠলো না। শুধু তাই নয়, এখন তো একেবারে গোড়ার বিষয় – ভোটাধিকার, সেটাও নেই বললেই চলে।

নতুনদিন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটিয়ে উঠার মতো নিজস্ব কোন পদ্ধতি আমাদের সমাজে আছে আছে কি?

আলী রীয়াজ: যে কোন সমাজের সমস্যা মোকাবেলার পথ সেই সমাজের ভেতর থেকেই তৈরি হয়। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের ভেতরেই আছে। দীর্ঘমেয়াদে এর কোন বিকল্প নেই। কিন্ত তার জন্যে দরকার প্রথমে এটা মেনে নেয়া যে একটা সংকট আছে। সেই সঙ্কটটার চরিত্র ও প্রকৃতি না জানা থাকলে বা অস্বীকার করলে তো আপনি সমাধান পাবেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার পৌন:পুনিকতা – বারবার একই বৃত্তের মধ্যে ঘোরার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত যে কেবল সাময়িক সমাধান দিয়ে দেশ এই বৃত্ত থেকে বেরুতে পারবে না। বাংলাদেশের সমাজে এক সময় যে সহিষ্ণুতা ছিলো সেটা একটা বড় সম্পদ বলে বিবেচিত হতে পারতো; গত কয়েক দশকে সেই ঐতিহ্য প্রায় নষ্ট হয়েছে, সমাজে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। এখন দরকার প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, সংবিধানের দিকে ভালো করে তাকানো ও কাঠামোগত পরিবর্তন করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তার জন্যে একটা সামাজিক-রাজনৈতিক ঐকমত্য বা সোশ্যাল কম্প্যাক্টের বিষয় ভাবা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল সকলের অংশগ্রহণ।

নতুনদিন: চলমান অস্থিরতায় বাংলাদেশের নাগরিকদের কি ভূমিকা পালন করা উচিত?

আলী রীয়াজ: চলমান অস্থিরতা রাজনৈতিক সংকটের ফসল; ফলে আমার মনে হয় না এর আর কোনো ধরণের সমাধান আছে। একই সঙ্গে এবং জরুরি ভিত্তিতে সহিংসতার নিন্দা ও প্রতিরোধ, আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনার জন্যে দাবি করাটা নাগরিকের কর্তব্য বলে বিবেচনা করি। সেই লক্ষ্যে উদযোগ নেয়া, নিজ-নিজ অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে চাপ সৃষ্টি এবং সক্রিয় হওয়া হচ্ছে এই সময়ে নাগরিকের অন্যতম ভূমিকা।

You Might Also Like