আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার আহবান প্রবাসী বাংলাদেশীদের

ইউএনএ : বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আত্মঘাতি এবং তা দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে এমন আশংকা ব্যক্ত করে অবিলম্বে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়েছেন নিউইয়র্কের সচেতন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। সচেতন প্রবাসীদের এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রবাসী নেতৃবৃন্দ দেশের সহিংস জ্বালাও পোড়াও এর জন্য এককভাবে বিরোধীদলকে দায়ী না করে হুঁশিয়ার করে দেন যে যারা বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায় তারাই এই কর্মকান্ডের পেছনে কাজ করছে। এছাড়া প্রবাসীদের পক্ষ থেকে দেশের চলমান সঙ্কটের সমাধানের লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ ফুডকোর্ট পার্টি সেন্টারে ৭ ফেব্রুয়ারী শনিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত নিউইয়র্কের সচেতন প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাংবাদিক সম্মেলনে উপরোক্ত আহ্বান জানানো হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে সচেতন প্রবাসীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিউনিটি অ্যাক্টিভিষ্ট আতিকুর রহমান ইউসুফজাই সালু। এসময় কমিউনিটির বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্ক নিউইয়র্কের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম হাওলাদার, বাংলাদেশী আমেরিকান ফার্মাসিষ্ট এসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি আব্দুল আওয়াল সিদ্দিকী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গিয়াস মজুমদার ও মনিরুল ইসলাম, বিশিষ্ট রাজনীতিক আবু তালেব চৌধুরী চান্দু, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট সুভাষ মজুমদার, সৈয়দ বদরুল আলম, নুর দিদা খালেদ, এম.এ সিদ্দিক পল্লব, মুনির হোসেন, আতাউর রহমান আতা, লেখক মনিরুল ইসলাম প্রমুখ।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আহুত সাংবাদিক সম্মেলনে আতিকুর রহমান ইউসুফজাই সালু বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষের জানমাল আজ হুমকির সম্মুখীন। একদিকে সরকারের গণ-গ্রেফতার, ঢালাও মামলা, অন্যদিকে গুম, খুন, হত্যা এবং বিরোধী দলের লাগাতার হরতাল, অবরোধ এবং অন্যত্র জ্বালাও, পোড়াও পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ আজ আতংকিত। আমরা স্বদেশ ভূমি থেকে দুরে বহু দুরে জীবন ও জীবিকার জন্য এই প্রবাসে ছুটে এসেছি এবং মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে এই বিশ্ব মন্দার মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছি তারা যখন দেখি আমাদের ফেলে আসা দেশ এক ভয়ানক ‘আত্মঘাতি’ সংকটে আবর্তিত, তখন এই অবস্থায় আমরা প্রবাসীরা নিশ্চুপ দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারি না। একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন এই হানাহানি দেশের অকল্যাণই বয়ে আনবে। আমরা হৃদয় দিয়ে এটা উপলদ্ধি করি যে, এই অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না। আমরা, এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই যে, আজ দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে অতি দ্রুত একটি সমাধানে পৌছুতে হবে। অন্যথায় এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। তাই জাতির এই ক্লান্তিলগ্নে দল, মত, জাতি, ধর্ম, শ্রেণী ও পেশা নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের প্রবাসীদের একান্ত আহ্বান আসুন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরি। অনেক অশ্রু, ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখি।

লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়: বলা বাহুল্য যে স্বর্ণ চোরাচালান, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি মাদক বাণিজ্য এবং ককটেল/পেট্রোল বোমার প্রচলন আমাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনই ছিল না। আমাদের দেশকে যারা অস্থিতিশীল এবং অকার্যকর রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করতে চায় এই সংস্কৃতি অনুমান করি তাদেরই আমদানিকৃত এবং তারা কারা দেশবাসীর মধ্যে এটাই প্রশ্ন।

আতিকুর রহমান ইউসুফজাই সালু বলেন, গণতন্ত্রে সহনশীলতা, সমঝোতা ও আলোচনার কোন বিকল্প নাই। কবরের শান্তি নয়, হিংসার বিপরীতে আজ যে কোন মূল্যে প্রিয় বাংলাদেশে শান্তির রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এছাড়া দেশ বাঁচবে না। আমাদের আরেকটি মিনতি মতপার্থক্য নিয়েও সর্বত্র আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা যেন বজায় রাখতে পারি। আসুন আমরা সবাই দল মতের উর্ধ্বে উঠে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করি।

সাংবাদিক সম্মেলনে সচেতন প্রবাসী বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে সকলের বিবেচনার জন্য দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট ও সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রস্তাব ও সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. এ যাবত জ্বালাও পোড়াও ও সহিংসতায় যারা প্রাণ হারিয়েছে আমরা তাদের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে গভীর সমবেদনা জানানো।

২. জ্বালাও পোড়াও এবং  সহিংসতায় সত্যিকার অর্থে যারা দায়ী তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।

৩. বর্তমান সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট বিধায় সাংবিধানিকভাবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই আমাদের দাবী: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন করা।

৪. কোন ব্যক্তি দুই টার্মের বেশি রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী পদ অলংকৃত করতে পারবেন না।

৫. একটি স্বাধীন দল নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে।

৬. পার্লামেন্ট, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যকাল ৫ বছরের পরিবর্তে সময়সীমা চার বছর করতে হবে।

৭. দলমতের উর্ধ্বে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যমতের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ঐক্যমতের সরকারের কাজ হবে, ৩ মাসের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা এবং সামগ্রিকভাবে দেশ পরিচালনায় উপরোক্ত প্রস্তাব সমূহের আলোকে একটি রূপরেখা তুলে ধরা। এই ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে জরুরী ভিত্তিতে স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা। ক্ষমতাসীন দল হিসাবে যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারে অধিষ্ঠিত সেইহেতু সরকারকেই অবিলম্বে দেশপ্রেমিক সকল দল, গ্রুপ, ও বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কনভেনশন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে রাষ্ট্রপতিকে অবিলম্বে এই কনভেনশন আহবান করার জন্য অনুরোধ করছি। দেশ বাচাঁনোর স্বার্থে এটাই আমাদের কাম্য।

৮. নির্বাচনে পেশীশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

৯. শান্তি এবং সমঝোতার স্বার্থে অবিলম্বে মনগড়া ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার পূর্বক সকল দেশপ্রেমিক রাজবন্দীদের নি:শর্ত মুক্তি দিয়ে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এবং

১০. স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার ও তাদের হাতে স্বশাসনের ক্ষমতা অর্পণ করা।

লিখিত বক্তব্যের পর আতিকুর রহমান সালু উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

You Might Also Like